Monday, June 09, 2008

এক্সপ্লোরার

২০০২ সালের শেষ দিকে একদিন পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখলাম, সূর্যোৎসব হবে কেওকারাডঙে। সূর্যোৎসব মানে বছরের নতুন দিনের সূর্যকে বরণ করে নেয়ার উৎসব। আগ্রহীদের যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞান সভার কর্ণধার মশহুরুল আমিনের সাথে। ছাত্রদের জন্যে তিনহাজার টাকা, অছাত্রদের জন্যে পাঁচহাজার টাকা ফি। অংশগ্রহণকারীকে অবশ্যই শারীরিকভাবে ফিট হতে হবে। আসনসংখ্যা সীমিত।

নিজেকে শারীরিকভাবে আনফিট মনে করতে খুব বাধছিলো বলে দিনকতক পরে ফোন করলাম জনাব মশহুরুল আমিনকে। তিনি জানালেন, সত্তর বছর বয়স্ক জনৈক বৃদ্ধ কিছুক্ষণ আগে জানিয়েছেন, তিনি যেতে পারবেন না, কী যেন একটা জরুরি কাজ পড়ে গেছে। তাঁর বদলে আমাকে নেয়া যেতে পারে, যদি পরদিনই টাকাসহ যোগাযোগ করি।

লালমাটিয়ায় অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের অফিসে পরদিন সকালেই গেলাম। উন্মাদের অফিসের সাথে ভাগাভাগি করে তখন চলতো এই সভা। মশহুরুল আমিন ইন্টারভিউ নিলেন আমার, শারীরিক ফিটনেসসহ আর নানারকম ব্যাপারস্যাপারের ওপর খোঁজখবর করলেন, যদিও তাঁকে দেখেই জিন্দালাশের মতো মনে হচ্ছিলো। পরে দেখেছি, মশহুরুল আমিন ওরফে মিলন ভাই ওরফে মহাকাশ মিলন দুর্দান্ত ফিট লোক।

সূর্যোৎসবে নাম লেখানোর পর কয়েকদিন বাড়িতে বসে তুমুল ব্যায়াম করলাম। আমি বেঈমান ও নাফরমান বলে রোজার সিজনে সেহরি থেকে ইফতারের মাঝে চর্বচোষ্যলেহ্যপেয় সাঁটাই বলে রোজার পর আমার রীতিমতো স্বাস্থ্য খুলে যায়, এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না।

সূর্যোৎসবে সেবার দলনেতা ছিলেন প্রসিদ্ধ পক্ষীপ্রেমিক ও ট্রেকার ইনাম আল হক। একটা ছোট ব্রিফিং মতো হয়েছিলো তাঁর বাসায়, সেটা আমি মিস করেছিলাম। ফলে অনেক উপদেশ অজানা থেকে গিয়েছিলো ব্যাকপ্যাক গোছানোর সময়। মিলন ভাইয়ের অতীত পরামর্শের ওপর ভিত্তি করে শাহবাগ থেকে রুকস্যাক, কাকরাইলের তাবলীগী মার্কেট থেকে স্লিপিং ব্যাগ আর নানা টুকিটাকি কিনেছিলাম। আমার সেই রুকস্যাক আমার প্রাণ রক্ষা করেছিলো পরবর্তীতে, এখনও লেখার সময় কৃতজ্ঞ চোখে তাকিয়ে আছি বেচারার দিকে। অনেক ধকল গেছে তার ওপর দিয়ে। পাহাড় থেকে পড়া, সাঙ্গু নদীতে ডোবা, সাগরের পানিতে চুবানি খাওয়া থেকে শুরু করে আমার সাথে দুই দুইবার জার্মানীযাত্রার ধকল সহ্য করতে হয়েছে বেচারাকে। স্লিপিং ব্যাগের কপালে অত কিছু জোটেনি, আমার সাথে পুকুড়পাড়া যাত্রার সময় অনবধানতাবশত বিশ্রীভাবে একটা অংশ পুড়ে গিয়েছিলো বেচারার। এখন সে হয়তো ঢাকায় আমার কেবিনেটে পড়ে পড়ে ধূলো খাচ্ছে।

স্লিপিংব্যাগ আর রুকস্যাক সহ টালমাটাল হয়ে যখন কলাবাগানে পৌঁছলাম শীতের ভোর পাঁচটার সময়, মেজাজটা কিছুটা খারাপই ছিলো। একটু পর দেখি অচেনা সব মানুষের ভিড়। হরেক রকম তাঁদের চেহারা, কণ্ঠস্বর, আকারআকৃতি, কিন্তু উদ্দেশ্য একটাই। বাঙালির স্বভাবসুলভ সময়াধিবর্তিতার (সময়ানুবর্তিতার বিপরীত হয় না এটা?) কারণে আমাদের সেবার যাত্রা শুরু করতে করতে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিলো। যাত্রাপথে আর বান্দরবানে রিগ্রিক্ষ্যং রিসোর্টে পৌঁছে মোটামুটি সবার সাথে পরিচয় হয়ে গেলো। কয়েকজনের সাথে আগেও সামান্য পরিচয় ছিলো, তা-ও পরিষ্কার হয়ে গেলো।

সে-ই আমার প্রথম পাহাড়ে হাঁটা (পাহাড়ে চড়া ঠিক বলবো না, ঐ কাজটা একেবারেই ভিন্নরকম)। আর সেই হাঁটার সূত্রেই পরিচয় হয়েছিলো অনেক ভ্রমণপিপাসুর সাথে, যাঁদের সাথে একযোগে ঢাকায় ফিরে এসেই পত্তনি ঘটে এক্সপ্লোরারস ক্লাব অব বাংলাদেশের।

এরপরের কাহিনী অনেক। প্রতিমাসে কোথাও ট্রেকিং বা হাইকিঙে যাবার পরিকল্পনা ছিলো আমাদের। সেই সূত্র ধরে আমরা ফেব্রুয়ারিতে টেকনাফ থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত হাঁটি, তো মার্চে আবার যাই মৌলভীবাজারের আদমপুরের জঙ্গলে ঘুরতে। কয়েকবার বান্দরবান-রাঙামাটি-খাগড়াছড়িতে অভিযান চলে আমাদের। গারো পাহাড়ের কোল ঘেঁষে শেরপুর থেকে নেত্রকোণা পর্যন্ত এক দুর্দান্ত হাইকিং (যা আমি মিস করেছিলাম মিউনিখযাত্রার কারণে) আর সোমেশ্বরী নদীর তীর ধরে হাঁটার ট্রিপগুলিও স্মরণ করার মতো।

তবে সময়ের সাথে মানুষের জীবনের মোড়গুলো আসে খুব আকস্মিকভাবে। কেমন হঠাৎ করে শেষ হয়ে গেলো ছাত্রজীবন, আগের মতো আর সময় দেয়া গেলো না প্রিয় ক্লাবকে। প্রেসিডেন্ট বরুণ বকশী হুট করে একদিন পাড়ি জমালেন প্রবাসে (বরুণদা, আপনাকে আজও ক্ষমা করতে পারি না এজন্যে হাসি ...), অন্য দেশে তাঁরই পন্থার অনুগামী হলেন প্রিয় সদস্য বখতিয়ার রানা, শান্ত ভাই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন টিভির চাকরি নিয়ে, উচ্ছল ভাই আর ইকবাল ভাইও নতুন চাকরির চাপে কাবু, শিলা আপা চলে গেলেন কঙ্গো, বদমেজাজি পারভিন আপাও একদিন রাগ করে নিজের মতো ঘোরা শুরু করলেন। নাজমুল ভাই, চঞ্চল আর শামীম খান নিখোঁজ, সালেহিন আর ওয়াহিদ ভাই ব্যস্ত হয়ে পড়লেন নিজেদের কাজে, অতএব সামিয়াও গায়েব, অজর অটল শাহেদ ভাই-ই কেবল সবসময় "আছি" বলে আওয়াজ দিতেন। অভিমানী পুতুল আপাও আমাদের লুথামি দেখে তিতিবিরক্ত হয়ে হাল ছেড়ে দিলেন একদিন।

খুব মনে পড়ছে শেষ দু'টি এক্সকারশনের কথা, চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের বাগান দেখতে যাওয়া, আর বিডিআরের বাধা পেয়ে থানচি হয়ে রুমায় ট্রেক করতে না পেরে সাঙ্গু নদী ধরে অপূর্ব শ্বাসরুদ্ধকর এক নৌযাত্রার কথা। আমার ক্যামেরাটা নষ্ট হয়ে গিয়েছিলো সেই ট্রিপে, বেশ কিছু ভালো ছবি তাই মিস করেছিলাম, এতো দুঃখ পেয়েছিলাম যে অবশিষ্ট ছবিগুলিও আর প্রিন্ট করিনি শেষ পর্যন্ত। সঙ্গীদের ক্যামেরায় তোলা ছবি নিয়েই শেষ পর্যন্ত সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে।

সেদিন সাল্লুর সাথে এমএসএনে আলাপ হচ্ছিলো এ নিয়ে। খুব খুব নস্টালজিক লাগে সেই দিনগুলির কথা মনে পড়লে। ক্লাবের সদস্যদের নিজের স্বজন বলেই ভাবি, তাঁদেরও খুব মিস করি। ইসিবি-র সদস্যরা, যে যেখানে আছেন, যদি এই পোস্ট পড়ার সুযোগ হয়ে থাকে, জানবেন, আপনাদের খুব ভালোবাসতাম বরাবরের মতো, এখনও বাসি। আমার জীবনের অন্যতম আনন্দময় সময়গুলি আপনাদের সাথে কেটেছে, এ জন্যে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

আমি বহুদূরে চলে এসেছি, তবে ইসিবির কার্যক্রম থেমে যায়নি বলেই জানি। আজকে মেইল পেলাম আমাদের কনিষ্ঠতম সদস্য মামুনের, এভারেস্টের বেইস ক্যাম্পে পৌঁছেছে সে। মামুনকে অভিনন্দন জানাই, যদি সম্ভব হয়, তার কাহিনী সচলায়তনে তুলে ধরার ব্যবস্থা করবো।

3 comments:

  1. লেখাটি পড়ে ভাল লেগেছে,বেড়াতে ইচ্ছে করছে আপনাদের সাথে!!

    ReplyDelete
  2. বস এক্সপ্লোরার ক্লাবের হইলোটা কি এইটা তো কইলেন না। বিলুপ্ত হইয়া গেসে? আমি ট্র্যাকিং করার মত উৎসাহী মানুষজন পাইনা।

    ReplyDelete
  3. আপনি ট্রাকিং ক্লাবের সদস্য জেনে আনন্দিত হলাম। সত্যি আপনার সাহসের প্রশংসা করতে হয়।

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।