Sunday, June 01, 2008

প্রবাসে দৈবের বশে ০৪১

১.
প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার পর চুল বড় করার একটা খায়েশ হয়েছিলো আমার। অনেকে বাগান করেন, কেউ কেউ পাখি পালেন, অ্যাকুয়ারিয়ামে মাছ পালেন আমাদের মাছপাগল হের রেহমান, কুকুরবিড়ালখরগোশও পালেন অনেকে, আমি চুল (মাথার) পোষার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। আমার সহপাঠী বা বন্ধুরা সবাই একে স্বাগতম জানাননি। প্রাথমিক পর্যায়ে একজন এসে জানালেন, মাইক্রোস্কোপের নিচে মশাকে যেমন দেখায়, আমাকেও নাকি সেরকম দেখাচ্ছে। আরেক বন্ধুর সাথে একই রিকশায় চড়ে বাড়ি ফিরি, তিনি একদিন অভিযোগ করলেন, তার এক বন্ধু নাকি ফোন করে ঝাড়ি দিয়েছে, "তুই এত লম্বা কাউলা একটা মাইয়ার লগে প্রেম করস, আমাগো লগে আলাপ করায়া দ্যাস নাই ক্যা?" সেই বন্ধুর বন্ধুর বোধহয় গ্লুকোমা ছিলো, তা না হলে আমার হাফকাস্ত্রো দাড়ি কিভাবে তার নজর এড়িয়ে গেলো, সেটাও প্রশ্ন। তবে মাস দশেকের চেষ্টায় আমি চুলকে পোষ মানিয়ে ফেললাম। দুর্জনেরা আমাকে "কেশবৎ" বলে ব্যঙ্গ করার চেষ্টা করলেও গর্বের সাথে বলতে পারি, তাদের অনেকেরই মাথায় টাকের আভাস দেখা যাচ্ছিলো সেই সময়েই। সেইসব হিংসুকদের মুখে ছাই দিয়ে আমার চুল দিনকে দিন শনৈঃ শনৈঃ বৃদ্ধি পাচ্ছিলো পূর্বপুরুষের পূণ্যগুণে।

তবে চুলকে পোষ মানাতে গিয়ে টের পাই, এরচেয়ে মাছ কিংবা খরগোশই ভালো ছিলো। শহরের ধূলিবহুল এলাকায় বাস করি বলে প্রায় রোজই শ্যাম্পু দিয়ে মাথা পরিষ্কার করতে হতো। এছাড়া আমার মা এবং বোন মাঝে মাঝেই নানারকম ভেষজ গবেষণার জন্যে আমাকে গিনিপিগ হিসেবে বেছে নিতেন। শুক্রবার সকালে তাঁদের আবিষ্কৃত কোন একটি বিকটগন্ধী আরক আমাকে মাথায় মেখে বসে থাকতে হতো ঘন্টাখানেক। এতে আমার চুলের গুণবৃদ্ধি হলেও সংখ্যা হ্রাস পেতো, সেটা টের পেতাম হাড়ে হাড়ে। তৎকালীন বান্ধবী চুল নিয়ে তেমন আপত্তি করেননি, তবে মাঝে মাঝে টান দেয়ার চেষ্টা করতেন। চুল এবং দাড়ির সাথে রাত্রি জাগরণের রক্তচক্ষু যোগ হওয়ায় বিভিন্ন বিল দিতে গিয়ে ব্যাঙ্কে আমি অন্যায় সুবিধা নিতাম। একেবারে শেষ বর্ষে এসে জনৈক সদ্যযোগদানকারী প্রভাষক ছাড়া প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের আর কোন শিক্ষক আমার মতো একজন নগণ্য ছাত্রের চুলের দৈর্ঘ্য নিয়ে কথা বলে সময় নষ্ট করেননি।

আমার দীর্ঘ ছয় বছরের সাধনা ধূলিস্যাৎ হয় শেষ টার্মের পরীক্ষা দেয়ার পর পর বান্দরবান-লোয়ার রাঙামাটিতে এক রোমহর্ষক ট্রেকযাত্রার বোনাস হিসেবে পাওয়া তীব্র ম্যালেরিয়ার সময়। এভাবে মানুষের মাথার চুল গোছা গোছা উঠে আসতে পারে, তা-ও আবার নিজের মাথা, না দেখলে বিশ্বাস করা মুশকিল। একেবারেই ব্যাঙ্করাপ্ট হবার আগেই আমার চুল বাটিছাঁট দিয়ে ফেলা হয়। একশো তিন থেকে একশো সাত ডিগ্রী জ্বরের মধ্যে থাকতাম বলে এ ব্যাপারে অসম্মতির সুযোগও তেমন একটা ছিলো না। ষোল কেজি হারানো ওজনের মধ্যে অন্তত এক কেজি চুলে ছিলো বলে আমার ধারণা।

চুল হারানোর পর নিজেকে ওল্ড টেস্টামেন্টের শিমশোনের মতো মনে হতে লাগলো, তবে হাতের কাছে কোন দেলাইলা ছিলো না বলে আয়নায় অচেনা আমিকে দেখে বিরক্ত হওয়া ছাড়া গতি ছিলো না। এ ছাড়া পরিচিত লোকজন দেখেও চেনে না, ভাইয়ের বিয়েতে গিয়ে তার তুতো-শালিদের প্রশ্নের মুখে পড়লাম, হিমু ভাই আসে নাই কেন? ইচ্ছা করছিলো ধরে ... যাই হোক।

যাই হোক, চাকরিবাকরি করি বাটিছাঁটা চুল নিয়ে, একদিন বিকেলে এক মার্কেটে দেখা হলো আমার সেই পুরনো কেশবিদ্বেষী প্রভাষকের সাথে। আমার মাথা দেখে তিনি রীতিমতো উলু দিয়ে উঠলেন। জানতে চাইলেন বস ধরে কেটে দিয়েছে কি না চুল। বিনয়ের সাথে বললাম, আমার চুল নিয়ে সময় নষ্ট করার মতো নির্বোধ বসের অধীনে চাকরি করি না। তিনি অগ্নিদৃষ্টি হেনে চলে গেলেন গটগটিয়ে।

আমি চুল কেটে ফেলার পর লম্বাচুলো ছেলেপিলেদের দেখলে অসহ্য লাগতো। মনে হতো, বাটিছাঁট রুলজ। আমার ধারণা সত্যি প্রমাণ করে বছর কয়েকের মাথায় দেশ বাটিছাঁটদের দখলে চলে যায়।

এই প্রবাসে এসে চুল ছাঁটার কাজে ইস্তফা দিয়েছি আবার। আজ থেকে দশ বছর আগে আমার মাথার চুলের ডেনসিটি দুইতিনগুণ ছিলো বলেই আমার ধারণা, অন্তত পুরনো ছবি দেখলে সেরকমই মনে হয়। তবে আয়নায় নিজের লম্বা চুল দেখে কিছুটা নস্টালজিক হয়ে পড়লাম সেদিন। আমার কাছের এক বন্ধু চুল ছাঁটার পর একদিন পথে আমাকে দেখে চমকে গিয়ে এ কথাটাই বলেছিলো, আমার ছোট চুল দেখে নাকি তার ছয় বছর আগের কথা মনে পড়ে গিয়ে নস্টালজিক লাগছিলো। হেসেছিলাম সেদিন, চুলও স্মৃতির মাইলস্টোন হয়ে থাকে জেনে। অনুভব করছি আবারও, কথাটা সত্যি।

কেশবৎ হয়ে যেটা লস, তা হচ্ছে নাপিতের অভিজ্ঞতা না হওয়া। আবারও পড়ালেখা ফুরোলে হয়তো চুল ছাঁটাবো, তার আগে জার্মানির নরসুন্দরীদের ওপর কিছু লিখতে পারছি না।

২.
সবজান্তাকে ধন্যবাদ। রাত জেগে বসে এতক্ষণ দেখলাম "লিটল ম্যানহাটান"। অপূর্ব লেগেছে। বহু বছর আগে একই রকম আপ্লুত হয়েছিলাম "দন হুয়ান দি মার্কো" আর "অ্যাডিক্টেড টু লাভ" দেখে। অনুচ্চকিত, ছিমছাম, কিন্তু খুব ছাপ ফেলা সিনেমা। যাঁদের দেখার সুযোগ আছে, দেখে নিতে পারেন।

1 comment:

  1. আপনাকে যেহেতু কখনো সামনা-সামনি দেখার সৌভাগ্য হয়নি তাই প্রোফাইলে দেওয়া ছবিটাই আমার কাছে হিমু ভাই।ছবিটা একবার দেখি আরেকবার চিন্তা করি এই মানুষটির লম্বা চুল থাকলে কেমন দেখাবে !!!

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।