Monday, May 26, 2008

প্রবাসে দৈবের বশে ০৪০

১.
অসহ্য লাগে এক একটা আয়ুষ্মান দিন, ভোরে জন্মে প্রায় মাঝরাতে গিয়ে মৃত্যু হচ্ছে রোদের, রাত ন'টাতেও জানালার পর্দার ফাঁক দিয়ে কৌতূহলী রোদের বৃদ্ধ আস্তিন হেলান দিচ্ছে ঘরের দেয়ালে। এতোখানি উত্তর অক্ষাংশে আগে কখনো গ্রীষ্ম কাটাইনি, আমার শরীরের ঘড়ি তাই বিকেলের রোদেই সন্ধ্যার ইঙ্গিত দিতে থাকে।

ভোরে ঘুম থেকে ওঠাও একটা কিচ্ছা। ভোরে বেশ ভালোই ঠান্ডা থাকে, লেপের আরামটুকু ছেড়ে বেরোতে ভাল্লাগেনা। ওদিকে রাতেও ঘুমাতে দেরি হয়ে যায়। রীতিমতো আপদ।

গতকাল এক্সকারশন ছিলো নয়ডর্ফ বলে এক জায়গায়, একটা ভিন্ডপার্কে। কাসেল থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে সে জায়গাটা, অপূর্ব সর্ষে ক্ষেতের মাঝখানে দানবের বউয়ের মতো এক একটা ফুটফুটে উইন্ড টারবাইন আনমনে ঘুরে চলছে হু হু বাতাসের স্রোতে ডানা ভাসিয়ে। ক্যামেরা সাথে নিয়েছিলাম, কিছু ছবিও তুলেছি, তবে আমার ক্যামেরা ম্যানুয়াল বলে ফিল্ম ডেভেলপ করার আগে তেমন কিছু দিতে পারছি না। আর সবচেয়ে শ্বাসরুদ্ধকর জায়গায় ক্যামেরা নিয়ে আর ওঠা যায়নি বলে টারবাইনের চূড়া থেকে আশপাশটা চর্মচোখে দেখেই কর্ম সেরে আসতে হয়েছে। দুঃখিত।

আমাদের এক্সকুরজিওনের আয়োজিকা ছিপছিপে কাথরিন, ওর গাড়িতে চড়েই গিয়েছি নয়ডর্ফে। নয়ডর্ফ যাওয়ার পথও অপূর্ব সুন্দর, ঘন বিশাল উঁচু সব গাছ রাস্তার দুই পাশে, একটু পর পর হরিণ পারাপারের চিহ্ন। নয়ডর্ফ একেবারেই গ্রাম, খেতে চড়ে বেড়াচ্ছে ঘোড়া আর ভেড়া, বাড়ির পাশে পাকা আস্তাবলে গোমড়ামুখো জার্মান গরু কী যেন চিবাচ্ছে, তার পাশেই ওয়ার্কশপে পড়ে আছে চাষের নানা যন্ত্রপাতি, সরু রাস্তার পাশে অলস হেঁটে বেড়াচ্ছেন গ্রামের বুড়িদাদীরা। আমরা মোট এগারোজন, ওদিকে পার্কের মালিকপক্ষের তিনজন অপেক্ষা করছিলেন আমাদের জন্যে। তাঁরা জার্মানির একদম শুরুর দিকের টারবাইনগুলির সাথে জড়িত ছিলেন, এখন ঈশ্বরের রহমতে নিজেরাই ব্যবসা করছেন। পাঁচটা টারবাইন নিয়ে তাঁদের দশ মেগাওয়াটের পার্ক, মোটামুটি এগারো মিলিয়ন ইউরো (একশো দশ কোটি টাকার মতো) খরচা পড়েছে মোটমাট। আমাদের দেশে তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলির ইরেকশন কস্ট মোটামুটি প্রতি মেগাওয়াট তিন কোটি, আর এর পর বাকিটা খাবার খরচ, স্থলভাগে বায়ুবিদ্যুতের ইরেকশন কস্ট মোটামুটি তিনগুণ হলেও অপারেশনাল কস্ট প্রায় নেই বললেই চলে। ভেস্তাস ডেনমার্কের নামকরা উইন্ড টারবাইন নির্মাতা, এক সময় ইন্ডাস্ট্রির মাথা ছিলো তারাই (এখন এনারকন ভেস্তাসকে টেক্কা দিয়ে এগিয়ে গেছে), জার্মানিতেও তাদের মার্কেট খারাপ ছিলো না বছর ছয়েক আগে। এক একটা টারবাইনের হাব হাইট নব্বই মিটার, রোটর ব্যাস আশি মিটার। টিলার চূড়ায় একেকটা টারবাইনের টাওয়ার, রোটরের ঘূর্ণনের ফলে সাগরের স্রোতের মতো শব্দ ভেসে আসছে ওপর থেকে। একটা টারবাইনের নিচে গিয়ে না দাঁড়ালে ঠিক বোঝা যায় না জিনিসটা কী বিশাল।

আমাদের জন্যে কয়েক পদের পানীয় মজুদ ছিলো টাওয়ারের গোড়ায়, তাতে চুমুক দিতে দিতে জনাব ব্রুনোর বক্তৃতা শুনলাম সবাই। ষাটের কাছাকাছি বয়স হবে, রীতিমতো জোয়ানের মতোই চলাফেরার ভঙ্গি, বরং তাঁর ছেলেকে দেখে অনেক বেশি ল্যাবা মনে হলো। বক্তৃতা শেষ করে টাওয়ারে চড়া শুরু হলো।

মই বেয়ে টাওয়ারে চড়ার অভিজ্ঞতা আমার খুব কম নয়, কিন্তু নব্বই মিটার আগে কখনো চড়িনি। তাছাড়া দেশে টাওয়ারে চড়ার সময় কোন ধরনের নিরাপত্তা-বেল্ট ব্যবহার করিনি, কারণ দেশে কোন টাওয়ারেই ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত সেফটি লাইন বাঁধা নেই, বেল্টের হুক বাঁধবো কীসের সাথে? নয়ডর্ফের টাওয়ারগুলিতে তা-ও মই মাটির সাথে নব্বই ডিগ্রী কোণ করে আছে, অন্যান্য টারবাইনের টাওয়ারে মই থাকে দেয়ালের সাথে গাঁথা, আর টাওয়ারও ক্রমশ সরু হতে থাকে বলে একটা পর্যায়ে গিয়ে রীতিমতো ঝুলে ঝুলে উঠতে হয়। প্রফেসর হায়ার একদিন পরম তৃপ্তির সাথে কিছু ছবি দেখাচ্ছিলেন, পোলাপাইন অনেকেরই দেখেছিলাম মুখ শুকিয়ে গেছে।

টাওয়ারের গন্ডেল, অর্থাৎ চোঙার ভেতরে খুব সামান্যই ফাঁকা জায়গা, সেখানেই পালা করে দাঁড়িয়ে যা দেখার দেখলাম সবাই। গন্ডেলের ঘুলঘুলি খুলে মাথা বার করে যা দেখলাম তা খুবই দারুণ ব্যাপার। নিচে অপূর্ব টুকরো টুকরো হলুদ সর্ষে ক্ষেত আর সবুজ বন, যতদূর পর্যন্ত দেখা যায়, একই রকম। খুবই আফসোস হচ্ছিলো ক্যামেরার জন্য, কিন্তু ক্যামেরা নিয়ে ওপরে ওঠা সম্ভব ছিলো না। আমরা যতক্ষণ ছিলাম ওপরে, টারবাইন লক করা ছিলো বলে ব্লেডগুলো ঘোরার দৃশ্য আর কাছ থেকে দেখা হয়নি, চল্লিশ মিটার দীর্ঘ বিশাল তিনটা ব্লেড নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো শূন্যে, শুধু পুঁচকে অ্যানেমোমিটার ঘুরে চলছিলো বনবন করে। বাতাসের বেগ ওরকম উচ্চতায় ভয়ানক, সাতআট মিটার প্রতি সেকেন্ডে। বাংলাদেশের দক্ষিণে কিছু স্পটে একশো মিটার উচ্চতায় ছয় থেকে সাত মিটার প্রতি সেকেন্ডে পাওয়া সম্ভব, হিসেব করে দেখেছিলাম।

যতক্ষণ নিচে ছিলাম, আরেক ভদ্রলোকের সাথে আলাপ হচ্ছিলো। আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি শুনে তিনি খুব উৎসাহ নিয়ে গেস্টবুক বার করে দেখালেন, বাংলাদেশ থেকে আগেও আরো চারজন অতিথি এসেছিলেন এই পার্ক দেখতে। জার্মানির অজ পাড়াগাঁয়ের ভিন্ডপার্কের অতিথির খাতায় সুন্দর হস্তাক্ষরে বাংলায় লেখা মন্তব্য দেখে খুব ভালো লাগলো, মনে মনে বললাম, হুঁ হুঁ বাবা, দুনিয়াতে প্রতি চল্লিশ জনে একজন বাংলাদেশী, প্রতি তিরিশজনে একজন বাঙালি, যাবা কই?

এক্সকারশন শেষে একটা প্লাস্টিকের গ্লাসে করে বিয়ারের খরচ চাঁদা করে ওঠানো হলো। তারপর কয়েকটা গ্রুপ ছবি তুলে আবার কাসেলের দিকে যাত্রা শুরু হলো।

২.
এই ক'দিনে কাজের ফাঁকে আরো কিছু সিনেমা দেখলাম। খেকশিয়ালকে ধন্যবাদ, চমৎকার লেগেছে "দ্য প্রেস্টিজ" দেখে। জাড আপাতো-র "নকড আপ" দেখেছিলাম দুর্দান্তের সুপারিশে, সেটাও দারুণ লেগেছে। মোটামুটি লাগলো "হাউ টু রব আ ব্যাঙ্ক" আর "আই অ্যাম লিজেন্ড" দেখে, যদিও শেষেরটাকে পিচ ব্ল্যাক আর আই রোবোট এর একটা ককটেল বলে মনে হচ্ছিলো কেন যেন। আরও একটা ছবি ভালো লেগেছে, "কিস কিস ব্যাং ব্যাং।" এ সপ্তাহে লালনীল সুতার বাম্পার ফলন হবে মনে হচ্ছে, অন্তত নোটবুক দেখে তা-ই মনে হচ্ছে।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।