Monday, May 05, 2008

প্রবাসে দৈবের বশে ০৩৮

কাসেলে এখন বসন্ত।

দিন দীর্ঘ হচ্ছে ক্রমশ, ন'টার দিকে সূর্য ডোবে। রোদ থাকলে ব্যাপারটা সবসময় খারাপ লাগে না। মেঘলা দিনে অসহ্য মনে হয়। গ্রীষ্মের দিকে এগোচ্ছে সময়, কিন্তু কখনো কখনো ভোরে তাপমাত্রা দুই-তিন ডিগ্রী সেলসিয়াসে নেমে আসে, কুয়াশাও থাকে কোন কোন ভোরে। বৃষ্টির হাবভাবে কৈশোরের ছাপ পুরোপুরি মুছে গেছে, একেবারে তেড়েফুঁড়ে নামে মাঝে মাঝে। সেদিন এই দেশে পা দেয়ার পর প্রথমবারের মতো শুনলাম বজ্রপাতের শব্দ। রীতিমতো হাসি পাচ্ছিলো আকাশের হাবভাব দেখে। মনে মনে বললাম, পার্ট লস? বাংলাদেশে গিয়া দেহিস!

গ্রীষ্ম সেমিস্টারে কিছুটা হালকা থাকতে চেয়েছিলাম, কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে লাউ সেই কদুই থেকে যাচ্ছে। সকালে ঘুম থেকে উঠতে কষ্ট হয় কেন যেন, মনে হয় মারি!

গ্রীষ্ম এলে কাসেলে আমরা যারা বদলোক আছি, তাদের ক্রিকেট খেলাটা একটু পোক্ত হয়। এদিকে ক্রিকেটের মাঠ দখল করে দালানকোঠা উঠে যাবার সংস্কৃতি স্পর্শ করেছে এই সুদূর ম্লেচ্ছদেশকেও, আগে লেগে তারের বেড়া নিয়ে সমস্যায় ভুগতাম, এখন অফে ল্যাবরেটরির দরজা। বিষন্ন মারকুটে ব্যাটসম্যানরা একেকজন ব্যাডমিন্টন ড়্যাকেট নিয়ে ঘোরাফেরা করছেন। ওদিকে গ্রীষ্মের সমস্যা হচ্ছে, সস্তায় যে লাখস আমরা সাধারণত মাঝে মাঝে ভেজেভুজে খাই, সেটা উধাও হয়ে গেছে বাজার থেকে। এখন তা প্রায় দেড়গুণ দাম দিয়ে কিনতে হবে টেগুট থেকে।

এখানে ডিপার্টমেন্ট স্টোরগুলোর মধ্যে রয়েছে আলদি, লিডল, এডেকা, রেভে, রেয়াল আর টেগুট। টেঙেলমান বা কারষ্টাট নেই কাসেলে। টেগুট কিছুটা ব্যতিক্রম, এটাকে বলা যেতে পারে নাকউঁচুদের দোকান। ওয়াইন ছাড়া আর সবকিছুর দামই টেগুটে অন্যান্য ডিপার্টমেন্ট স্টোরের তুলনায় অনেক বেশি। ভালো ওয়াইন বা ভালো সব্জি কিনতে হলেই কেবল টেগুটে যাওয়া হয় সাধারণত, তা না হলে রেভে বা রেয়াল থেকেই কেনাকাটা করি আমরা। আলদিতে যাই চকলেট ফুরালে। তাছাড়া এডেকা আর রেভে খোলা থাকে রাত দশটা (কোথাও কোথাও এগারোটা) পর্যন্ত, বাকিগুলো সন্ধ্যা আটটায় গুটিয়ে যায়।

ভদকা আবহাওয়া (বাইরে বরফের পুরু স্তর চারদিকে) কিংবা হুইস্কি আবহাওয়া (টিপটিপ বৃষ্টি পড়ে চলছে দিনমান) ফুরিয়ে বিয়ারের আবহাওয়ার রাজত্ব শুরু হয়েছে। চৌধুরীর বাড়িতে একের পর এক বোতল জমছে আপাতত। জার্মানিতে বিয়ারখোররা যাতে যত্রতত্র বোতল বা ভাঙা বোতল ফেলে উৎপাত না করে, সেজন্যে বোতলের ওপর ফান্ড (Pfand) ধরা হয়, অর্থাৎ বোতল ফেরত দিলে আট পয়সা ফেরত পাওয়া যায়, ক্যান ফেরত দিলে পঁচিশ পয়সা। এক কেস বিয়ারের বোতল ফেরত দিলে এক প্যাকেট বিয়ারের পয়সা উঠে আসে। লম্বা যাত্রায়, বিশেষ করে ফুটবল খেলা থাকলে ছেলেমেয়েরা কয়েক কেস বিয়ার নিয়ে ট্রেনে ওঠে, সারা পথ পান করতে করতে যায়, ট্রেন থেকে নেমে কেস জমা দিয়ে টাকা তুলে নেয় সেই শহরের দোকান থেকে। জার্মানদের আকারআকৃতি যেমনই হোক (এ কথা বলছি, কারণ সব জার্মানই দৈত্যের মতো নয়, ছোটখাটো জার্মানের সংখ্যাও অনেক), তারা বিয়ার পানে সিদ্ধকণ্ঠ, আমি সর্বোচ্চ তিন লিটার খেয়ে "আমি আজ পিয়েছি তো কী" শুরু করি, সেখানে একজন জার্মান অবলীলায় সাত থেকে আট লিটার টেনেও মোটামুটি লাইনে থাকে। কাসেলের স্থানীয় ভাঁটির বিয়ারের স্বাদ জঘন্য বললেই সুবিচার করা হয়, জার্মানিতে বিয়ারের মুল্লুক বরং বায়ার্ন। বায়ার্ন বা বাভারিয়ার ছোটবড়ো ভাঁটিগুলোর প্রায় সবক'টাই অত্যুৎকৃষ্ট বিয়ার তৈরি করে।

গ্রীষ্ম মানেই গ্রিলমহোৎসব, বাড়ির সামনে বা পেছনের জায়গায় গ্রিলের লোহালক্কর নিয়ে ছুটির দিনে বসে পড়ে সবাই, পাশে অবশ্যই একাধিক কেস বিয়ার। সসেজ গ্রিল চলছে একপাশে, অন্যদিকে বিয়ারের বোতল খালি হচ্ছে পটাপট। খেলার মাঠে ফুটবল বা ভলিবলের সরঞ্জাম নিয়ে গ্রিলবাজরা হাজির। সেদিন দেখি সোফাশুদ্ধু বয়ে এনেছে একদল।

আমাদের ক্রিকেটের মাঠ বেদখল হয়ে পড়ায় শহরের অন্যান্য মাঠ পরখ করে দেখতে বেরিয়েছিলাম আমি আর চৌধুরী। একটা মাঠ একটু দূরে, কিন্তু তা নিদারুণ অসমান আর ঘেসো। অবশিষ্ঠ মাঠগুলির পাশ দিয়ে আবার "নদী" বয়ে চলছে, বল খোয়া যাবার সম্ভাবনা সেখানে প্রবল, তাছাড়া বিশ-বাইশগজ সমতল পিচ পাওয়াও সহজ নয়। শুনেছি কাসেলে একটা ক্রিকেট ক্লাবও রয়েছে, কিন্তু বদস্বভাব পাকিদের আনাগোনা সেখানে। মাঠের অভাবে শেষমেশ হয়তো ক্রিকেট ফেলে ব্যাডমিন্টন আর টেবিলটেনিসই খেলতে হবে ভবিষ্যতে। "হাবিবুল বাশার ক্যাপ্টেনসি মেমোরিয়াল টুর্নামেন্ট" যদি হয়ও, অন্য শহরে হতে হবে।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।