Sunday, May 04, 2008

ধূসর গোধূলির একক সঙ্গীতসন্ধ্যায় কয়েকজন সচল

ধূসর গোধূলির ফোন পেয়েই বুঝলাম, ডাল মে কুছ কালা হ্যায়। ফোন ধরে বুঝলাম, ফোন না ধরে যা বুঝেছি তা ঠিকই বুঝেছি। অভাবনীয় সংবাদ, ফ্রাঙ্কফুর্টে মিলা আর গোধূলির যুগ্ম সঙ্গীত পরিবেশন, শনিবারে।

হাজারো কাজের ফাঁকে আমি আর চৌধুরী অস্থির, বলাই অসুস্থ। কিন্তু ধূসর গোধূলি গান গাইবেন, আর এত কাছে থেকেও তা শোনা হবে না, তা-ই কি হয়?শেষমেশ চৌধুরী আর আমি চড়ে বসলাম ট্রেনে, অসুস্থ বলাইকে বার্লি খাইয়ে। বলাই শুধু ইঙ্গিতে ডিমের কথা বললেন। আমরা আশ্বাস দিলাম, হবে। পঁচা ডিম পৃথিবীর সব জায়গাতেই পাওয়া যায়।

জার্মানিতে রেল যোগাযোগের কিছু সুবিধা আছে টিকিটের রকমফেরে। ছুটির দিনে দুই গোছের টিকিট কাটা যেতে পারে, সপ্তাহান্তের ভখেনএন্ডে টিকিট, কিংবা প্রাদেশিক টিকিট। ফ্রাঙ্কফুর্টে সেদিনই গানবাজনা শুনে হাঁটুপানির সচল হাঁটুপানিতে ফিরে আসার পরিকল্পনা ছিলো, তাই তুলনামূলকভাবে সস্তা হেসেন টিকিট কাটা হলো। এর সুবিধা হচ্ছে, গোটা হেসেন প্রদেশের যে কোন জায়গায় সেইদিন রাত বারোটা পর্যন্ত এই টিকিটে সর্বোচ্চ পাঁচজন ভ্রমণ করতে পারবেন, যতবার খুশি। কাসেলেই জনৈক কৃষ্ণাঙ্গ আমাদের টিকিটসঙ্গী হলেন। প্লাটফর্মেও অনেকে রীতিমতো প্ল্যাকার্ড উঁচিয়ে খোঁজখবর করছিলেন টিকিটসঙ্গী চেয়ে। এটা হরদমই হয়, হয়তো তিনজনের একটা গ্রুপ এই প্রাদেশিক টিকিট কিনেছে, তারা আরো দু'জনকে সঙ্গে নিতে চায় মাথাপিছু খরচ কমানোর জন্যে।

যাত্রাপথে দুই পাশের অপূর্ব সরষেছাওয়া উপত্যকা, আর সহযাত্রিণী এক ক্ষুদে বিচ্ছুর দুষ্টুমি উপভোগ করা গেলো। বিচ্ছুর নাম লরা, তার মনে হাজারটা প্রশ্ন, সে দশ পর্যন্ত ঠিকঠাক গুণতে পারে, এরপর এগারো তেরো সতেরো ঊনিশ হয়ে যায়। গোটা কম্পার্টমেন্টের সবাই একটু পর তার সাথে পরিচিত হয়ে গেলো, কারণ একটু পর পরই লরা'র মায়ের উদ্বিগ্ন ডাক ভেসে আসে, "লরা, অতদূরে যেও না!"

ফ্রাঙ্কফুর্টে নেমেই ধাক্কা খেলাম সচল তীরন্দাজ আর শাহীন হাসানের সাথে। বিস্ময়ের পর বিস্ময়! আমরা উল্লসিত হয়ে বলি, "আরে তীরুদা, আপনি! শাহীন ভাই, কেমন আছেন?" তো ওনারা ফেরতা ঠোকেন, "আরে হিমু যে! সুমন চৌধুরীও দেখি চলে এসেছেন!"

বুঝলাম, ধূসর গোধূলি যাকেই নাগালে পেয়েছেন, খবর করেছেন তাঁর কনসার্টে। কিন্তু এই নাটের গুরুটি কোথায়? ফোন করে জানা গেলো, তখনও এসে পৌঁছাননি শহরে। প্লেন ল্যান্ড করবে আরেকটু পর।

কী আর করা, মায়েস্ত্রোকে আকাশে ঝুলিয়ে রেখেই তীরন্দাজের আমন্ত্রণে কফি পান করতে বসলাম সবাই। ফ্রাঙ্কফুর্টে শেষ পা রেখেছি অনেক আগে, বেশ জেল্লাদার শহর, নরম রোদের নিচে ছাতার আভায় বসে নানা সুখদুঃখের আলাপ করতে করতেই ধূসর গোধূলি এসে হাজির হলেন মিনিট বিশেক পর। হাতে একতাড়া কাগজ।

কাগজ হাতে নিয়ে মেজাজটা খারাপই হলো। দলিল বানিয়ে নিয়ে এসেছে ব্যাটা। শালি সংক্রান্ত পঞ্চবার্ষিকী লেনদেন। আগামী পাঁচ বছরে একে অন্যের হাতে নিজের শালি তুলে দেয়ার অঙ্গীকারপত্র। গালি দিতে যাচ্ছিলাম, চৌধুরী দেখি চোখ টিপছেন। তীরন্দাজ আর শাহীন হাসানও দেখলাম একই রোগে আক্রান্ত। বুঝলাম, পঁচা ডিম সময়মতো প্রয়োগের চক্রান্ত চলছে।

ধূসর গোধূলিকে নরম গলায় বুঝিয়ে বললাম, এইসব দলিল দস্তাবেজ নিয়ে পরে কোন একদিন মাল্লু খেয়ে টাল্লু হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে। আজ বরং কনসার্টই হোক।

ধূসর গোধূলি বিষন্ন হয়ে জানালেন, মিলার সাথে গতরাতে কিছু মনকষাকষি হয়েছে তার কিছু ব্যক্তিগত প্রসঙ্গে। মিলা কী যেন চাইছিলো, দিতে পারছিলেন না তিনি। আবার তিনি যা চাইছিলেন, তা দিতেও মিলা অপারগতা প্রকাশ করেছেন। ফাঁকতালে নাকি মুখ ফসকে রায়হান, জিহাদ, মহিব ... এইসব সারাসিন নামধাম বেরিয়ে এসেছে আলাপে। ধূসর গোধূলি মহা নাখোশ, তিনি কনসার্ট বর্জনের আহ্বান জানালেন আমাদের।

স্পষ্টতই হতাশ হলাম সবাই। এত এত পঁচা ডিম বয়ে আনা, সে কি বৃথা যাবে?

শাহীন হাসান সমাধান যোগালেন। তাঁর বাসাতে তাহলে একটা ঘরোয়া কনসার্ট হয়ে যাক। আরেক দফা চোখ টেপাটেপির পর সবাই দল বেঁধে রওনা দিলাম সেদিকেই।

শাহীন হাসানের রান্না অতুলনীয় বললে তাঁকে অপমানই করা হবে, এমন দুর্ধর্ষ গরুর মাংস আর খিচুড়ি যে কেবল আমার স্বহস্তে কর্তিত পেঁয়াজ, রসুন আর আদার গুণেই সম্ভব, তা বলা বাহুল্য। বেচারা বলাই, খোরাকিটা মিস করলেন বেচারা। পেটভরে খেয়েদেয়ে সকলে গোল হয়ে বসলাম ধূসর গোধূলির গান শুনতে।

ধূসর গোধূলি প্রথমে বায়না ধরলেন, তবলা আর হারমোনিয়াম, দুটোই তিনি স্বহস্তে বাজাতে চান। বহুকষ্টে তাঁকে রাজি করিয়ে তীরন্দাজ বসলেন তবলায়। হারমোনিয়ামে এক পশলা আঙুল চালিয়ে উদাত্ত কণ্ঠে ধূসর গান ধরলেন, "আমি নেশাখুর, চলেছি খড়মপুর ...।"

পঁচাডিম সেদিন শাহীন হাসানের ময়লার ব্যাগে চুপিচুপি ফেলে আসতে হয়েছে। ধূসর গোধূলির গান শুনে চোখের জল আটকানো যায়নি গতকাল। একের পর এক গান শুনিয়ে শ্রোতা সচলদের কাঁদিয়ে ছেড়েছেন তিনি। "আমার দিল খাড়িয়া নিলো রে ঐ পাশের বাড়ির ছেরি" শুনে কঠোরচিত্ত সুমন চৌধুরীকেও গামছা দিয়ে চোখ মুছতে দেখা গেছে।

মিলা হয়তো তখন দূরে কোথাও নেচেকুঁদে একটা কান্ডই করছে, কিন্তু শাহীন হাসানের ঘরে বসে ধূসর গোধূলির দারুণ সব গান শুনে শেষমেশ ঘরে ফেরার কথা মনে পড়লো আমাদের। ধূসরের এক বান্ধবী তাঁকে পিক করবেন, রাতে কীসব প্রোগ্রাম যেন আছে তাঁদের, আমি আর চৌধুরী ফেরত চললাম কাসেলে।

ফ্রাঙ্কফুর্টের ষ্ট্রাসেনবান সার্ভিসকে চ-বর্গীয় গালাগালি করা ছাড়া আর গতি ছিলো না, একেবারে মোক্ষম সময়ে দক্ষিণ স্টেশনে পৌঁছে দেখি, মূল স্টেশনে যাবার সার্ভিস বাতিল করা হয়েছে। সময়ের হিসাব করে দেখলাম, সম্ভব না আর কাসেলে ফেরা। হাউপ্টবানহফে পৌঁছে দেখি তিন মিনিট আগে ছেড়ে গেছে কাসেলগামী শেষ ট্রেন।

খানিক মাথা খাটিয়ে শেষমেষ ফ্রাঙ্কফুর্টের অদূরে ডার্মষ্টাটে এক বন্ধুর বাড়িতে আশ্রয় নেয়াই স্থির হলো। অত রাতে মিটফার (আনুষ্ঠানিক হিচহাইকিং বলা যেতে পারে। একা কেউ গাড়ি নিয়ে যাত্রা করলে অনেক সময় সঙ্গী নিয়ে নেন, এতে করে অনেক কম খরচে যাত্রার একটা সুযোগ পাওয়া যায়। জার্মানিতে এ পদ্ধতি বেশ জনপ্রিয়) জোটানো একটা ঝামেলা, তার ওপর আবার শনিবার। কী আর করা, ডার্মষ্টাটে বন্ধুদের রাতবিরাতে জ্বালানোর দায় কাঁধে নিয়ে সক্কালে আবার কাসেলের দিকে যাত্রা করলাম আমি আর চৌধুরী। চৌধুরী আফসোস করে বলছিলেন, "আমাদের সময়ের মানুষেরা ধূসর গোধূলির কদর করলো না!" আর আমি আফসোস করে বলছিলাম, "এতগুলি পঁচা ডিম ...!"

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।