Friday, May 16, 2008

প্রবাসে দৈবের বশে ০৩৯

১.
কেমন একটা থমথমে ভাব চারদিকে। মনে হচ্ছে দাঁতের ফাঁকে পিন কামড়ে ধরে আছি, গ্রেনেডটা বুকের সাথে চেপে ধরা, একটু পরেই দারুণ বিস্ফোরণে সব কিছু এলোমেলো হয়ে যাবে। সকালে ঘুম ভাঙার পর অনেকক্ষণ ধরে ধুকধুক করতে থাকে বুক। হৃৎপিন্ডটাও হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটছে আমার সাথে, হাঁসফাঁস করে একটা কিছু বলার চেষ্টা করছে, বুঝে উঠতে পারছি না।

আগামী সেমেস্টারে থিসিস, যাকে এখানে বলা হয় ডিপ্লোমআরবাইট, লিখতে হবে। আমার ব্যাচেলর ডিপ্লোম-আইন্স (আইন্স = ১) এর সমকক্ষ, মাস্টার্স করার পর সেটা ডিপ্লোম-ৎস্বাই (ৎস্বাই = ২) হবে। জার্মানীতে প্রকৌশল নিয়ে পড়ালেখা করলে ডিগ্রীটাকে লেখা হয় Dipl.-Ing., অর্থাৎ প্রকৌশলে ডিপ্লোমপ্রাপ্ত। ডক্টরেট করলে কপালে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার দুই খেতাবই জোটে, অর্থাৎ লেখা হয় Dr.-Ing.। এ নিয়েও কিছু কালা কানুন আছে, যেমন হিটলুর আমলের একটা আইন ছিলো, জার্মানির বাইরে কেউ যদি ডক্টরেট করেন, তাহলে জার্মানির ভেতরে সে পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহার করতে পারবেন না, করলে সেটা অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত হবে, এবং জরিমানা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাভোগ জাতীয় ভোগান্তিতে পড়তে হতে পারে। কয়েক বছর আগে এই হুজ্জতের সীমা একটু কমানো হয়েছে, এখন ইয়োরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরে কেউ যদি ডক্টরেট করেন, তাহলে জার্মানিতে সে পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহার করতে পারবেন, অন্যথায় নয়। কিছুদিন আগে এক মার্কিন বিজ্ঞানীকে এ নিয়ে পুলিশি জেরার মুখে পড়তে হয়েছে। ওয়াশিংটন পোস্টের একটা লিঙ্ক ছিলো, সংরক্ষণ করতে ভুলে গেছি, নইলে শেয়ার করা যেতো।

আরো হ্যাপা নাকি আছে। প্রকৌশলে পোস্ট ডক্টরেট, এখানে যাকে বলে হাবিলিটাৎসিওন, করলে কেবল পুরনো পূর্ব জার্মানীর লোকজনই তা ব্যবহার করেন, পশ্চিম জার্মানীতে প্রকৌশলশাস্ত্রের লোকেরা নামের গোড়ায় Dr.-Ing. Habil. লিখতে পারবেন না। তবে নাটুওরভিসেনশাফট, অর্থাৎ প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের লোক হলে ভিন্ন কথা।

আগামী সেমেস্টারে ডিপ্লোমআরবাইট নিয়ে প্রফেসরদের কাছে ঘোরাফেরা করছি। আমার আগ্রহ সৌর আর বায়ুশক্তিক্ষেত্রে, যদিও বাংলাদেশে এই দুয়ের প্রয়োগই কিছুটা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। বাংলাদেশে এই দুই নবায়নযোগ্য শক্তির প্রয়োগযোগ্যতা নিয়ে একটা ছোট সিরিজ লেখার প্রস্তুতি নিচ্ছি আপাতত। প্রফেসর আর তাঁদের ডক্টোরান্ডদের কাছে আনাগোনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কী নিয়ে কাজ করবো। এ নিয়ে একটা চাপা টেনশন কাজ করছে কেন যেন। প্রফেসররা দেখলাম এই আগেভাগে খোঁজ নেয়ার ব্যাপারটাকে বেশ ভালো চোখেই দেখেন। আমার পরামর্শক প্রফেসর কাজ করেন উচ্চবিভব নিয়ে, আমার আগ্রহের কথা শুনে তিনি সরাসরি জানালেন, ওরকম কোন কাজ তিনি আপাতত করছেন না, তবে ইনসুলেশন নিয়ে টাটকা কিছু কাজ হচ্ছে, আমার আগ্রহ থাকলে করতে পারি। কাজের কিছু নমুনা দেখালেন তিনি, বেশ ইন্টারেস্টিং, কিন্তু ঐ পথে হাঁটবো না হয়তো। সৌর আর বায়ুশক্তি নিয়েও প্রচুর কাজ হচ্ছে, এই দুই ক্ষেত্রের তিন প্রফেসরকে জ্বালিয়ে মারবো আপাতত কয়েক সপ্তাহ। যে প্রফেসরের অধীনে কাজ করার খুব ইচ্ছা ছিলো, তিনি আপাতত দূরদূরান্তের সব কাজ গছিয়ে দিচ্ছেন ছাত্রদের, আর কাজ করছেন জৈববস্তু নিয়ে, যে ব্যাপারে আমার আগ্রহ থাকলেও রসায়নে আক্কেলগত শৈথিল্যের কারণে ঐ পথে যাওয়া হবে না।

গত সেমেস্টারের একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে গেলো লিখতে লিখতে। কাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ে তাপগতিবিদ্যার দুঁদে প্রফেসর হচ্ছেন ক্লোজে। বেশ বদমেজাজি লোক, কিন্তু খুব খেটে পড়ান। বয়স হয়ে গেছে, অঙ্ক করাতে গিয়ে মাঝে মাঝেই ভুলভাল হয়ে যায়, পিএইচডির ছাত্ররা তড়িঘড়ি করে আবার ঠিক করে দেয় বোর্ডে গিয়ে। এক রাতে আড্ডা সেরে আমি আর হের রেহমান যাচ্ছি যে যার বাড়ি, এক বিপন্নমুখো ছোকরা কোত্থেকে এসে হাল্টেষ্টেলেতে পথ আগলে দাঁড়ালো।

"ক্ষমা কোরো ... কিন্তু তুমি কি জানো, কিভাবে কোন সংখ্যার ঘাত বার করতে হয়?"

ছোকরার উচ্চারণ আর চেহারা দেখে মনে হলো সে জাতিতে আরব, বললাম, "হুমম, জানি! ক্যালকুলেটর দিয়ে!"

ছোকরা হেসে ফেলে বললো, "ক্যালকুলেটর ছাড়া কিভাবে করতে হয় তা-ই বলো!"

থতমত খেয়ে বললাম, "টেইলর সিরিজে ভেঙে করা যায়। কিন্তু ক্যালকুলেটর ব্যবহার করছো না কেন?"

ছোকরা এবার জানালো তার দুঃখের কাহিনী। ক্লোজের পরীক্ষা সামনে, যন্ত্রকৌশলের ছাত্রদের জন্যে তাপগতিবিদ্যার প্রথম পাঠ, সে পরীক্ষায় ক্যালকুলেটর ব্যবহার নিষিদ্ধ। ঐ যন্ত্রটি ছাড়াই এক দশমিক ছয় তিন দুই ঘাত শূন্য দশমিক পাঁচ তিন দুই আট এর মান বার করতে হবে।

হের রেহমান চুপচাপ শুনছিলেন, এবার তিনি ধীরে ধীরে কিভাবে টেইলর ধারা দিয়ে এইসব হাবিজাবি বার করতে হয়, কিভাবে তৃতীয় ও পরবর্তী ঘাত অগ্রাহ্য করে সংক্ষেপে কাছাকাছি মান বার করা যায়, তা বিশদ বুঝিয়ে বললেন। ছোকরা সব নোট করে নিলো। মনে মনে ভাবলাম, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রোগ্র্যামেবল ক্যালকুলেটর ব্যবহার করা নিষিদ্ধ ছিলো, কিন্তু কোন ক্যালকুলেটর ছাড়া তাপগতিবিদ্যার পরীক্ষা নেয়াকে ভোগলামি ছাড়া আর কিছু বলা যায় না।

জৈববস্তু নিয়ে কাজ করতে গেলে ক্লোজের মুখোমুখি হতে হবে অনেকবার। দূর থেকেই নমস্কার জানিয়ে তাই কেটে পড়ি।


২.
এই রেনেট ছোকরাটাকে ধরে প্যাঁদানো উচিত। কী একটা মুভি স্ট্রীমিং সাইটের ঠিকানা দিলো, এখন শুধু প্রাণ ভরে মুভি দেখি।

[img=auto]http://upload.wikimedia.org/wikipedia/en/b/b9/RatatouillePoster2.jpg[/img]

খুব খুব খুব ভালো লাগলো রাতাতুয়ি (Ratatouille) দেখে। ভোজনরসিক এক ইঁদুর রেমি, যে কি না বাড়ির রান্নাঘরে লুকিয়ে চুরিয়ে টেলিভিশনে দেখে দুঁদে শেফ গুস্তো-র রান্নাবান্নার কলাকৌশল। গুস্তো-র মোটো হচ্ছে, যে কেউই রান্না করতে পারে। রেমির বাপ রেমির ওপর একটু চটা, কারণ রেমির চালচলন অন্য ইঁদুরদের মতো নয়। যেমন, রেমির নাক অন্যদের চেয়ে একটু বেশি স্পর্শকাতর, তাই সব ইঁদুরদের যোগাড় করে আনা খাবার শুঁকে দেখে রেমি রায় দেয়, কোনটা বিষ মাখানো আর কোনটা নিরাপদ। কিন্তু রেমি আবার সব খাবার মুখে দেয় না, বেছে বেছে সবচেয়ে ভালো এক চিমটি খায়। রেমি কুড়িয়ে খেতে ভালোবাসে না, খাবার চুরি করে খাওয়া তার পছন্দ নয়, সে চায় রান্না করে খেতে। ছবির শুরুতেই দেখা যায় রেমি এক টুকরো ফরাসী পনির পেয়ে খুঁজে বার করেছে মাশরুম, তারপর বাড়ির ছাদে চড়ে সেই চীজ আর মাশরুম সেঁকে নিচ্ছে চিমনির ধোঁয়ায়। এই দৃশ্যটিই রাতাতুয়িকে অনেক ওপরে ঠেলে নিয়ে গেছে বলে মনে হয়েছে। ছোট্ট রেমি, ছোট্ট তার ইচ্ছা, কিন্তু কী অসামান্য তার চেষ্টা!

এরপরে ঘটনা আরো অনেক গড়ায়, সম্ভাব্য দর্শকের মজা মাটি করার কোন ইচ্ছে আমার নেই। সিনেমা রিভিউ করতে গিয়ে অনেকেই গোটা সিনেমার গল্প বলে দ্যান, যা অতিশয় বিরক্তিকর ব্যাপার, তাই ও পথে পা বাড়াচ্ছি না। গুস্তো, তার রান্নার সমালোচক আন্তন ইগো, কিংবা ঝাড়ুদার থেকে শেফ বনে যাওয়া লিঙ্গুয়িনি, এদের সবার কাহিনী সুযোগ পেলে দয়া করে দেখে নেবেন রাতাতুয়িতে। শুধু বলি, রাতাতুয়ির সুরের কাজ অসাধারণ হয়েছে।

আমি সারা জীবনে কখনো রেঁধে খাইনি, এমনকি চা বানিয়েও খাইনি খুব বেশি, এখন বাটে পড়ে রান্না করে খাই। যা নিজে রান্নার সাহস করি না, তা খাবার ইচ্ছে হল চৌধুরীর ঘাড়ে হামলা করি। চৌধুরীও আমার পথেরই পথিক, কিন্তু তাঁর তেহারি খাওয়ার বাসনা অনেক বেশি সলিড, তাই তিনি নিজেই রান্না করে ফ্যালেন, আমি খানিকটা জবরদস্তি করেই হামখোরাক হই। রাতাতুয়ির মূলমন্ত্র, এনিওয়ন ক্যান কুক দেখে তাই আমি খুবই স্পৃষ্ট। ঠিক করেছি, নতুন কিছু রান্না করে সবাইকে চমকে দেবো। এমন কিছু, যা খেয়ে লোকজন হয় মরে যাবে, নয়তো আর জবান নড়াতে পারবে না।

কিন্তু ছবিটা দেখতে দেখতেই গভীর একটা বিষাদ আমাকে গ্রস্ত করে। শেষ পর্যন্ত, একটা ইঁদুরই তো আমি, রেমির চেয়ে একটু বড়, রেমির চেয়ে আরো অলস। রেমির মতো আমিও তো স্বজনদের ছেড়ে পড়ে আছি দূর প্রবাসে, নিজের ধান্ধায়। নিজেকে ডুবন্ত জাহাজ থেকে লাফিয়ে পড়া ইঁদুরের মতো মনে হয়, যে ঢেউয়ের মাথায় চড়ে জাহাজের দিকে তাকিয়ে চোখ মোছে। খুব শব্দ করে কাঁদতে ইচ্ছা হয়, অন্য অনেক ইচ্ছার মতোই অপূর্ণ থেকে যায় এটাও।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।