Tuesday, April 29, 2008

দেজা!

পাঁপড়ির সাথে ফটিকের বিচ্ছেদের ঘটনা শুনে আমরা যত না মর্মাহত হয়েছিলাম, তারচেয়ে বেশি দুঃখ পেয়েছি পাঁপড়ির সাথে প্রেমযাত্রার পর ফটিকের আচরণে।

মানিক ওরফে মাইনকার ধারণা ছিলো, যার নাম ফটিক, বন্ধুরা যাকে ফইটকা বলে ডাকে, তার কখনোই কোন বাঙালি তরুণীর সাথে প্রেম হওয়া সম্ভব নয়। অন্তত এই কুড়ি বছর বয়সে নয়। তার জন্যে ফইটকাকে আরো কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে এফিডেভিট করে নাম পাল্টে নেয়ার পর। নতুন নামটাকে রইয়ে সইয়ে হালাল করে নেয়ার পর কিছু একটা হোলেও হোতে পারে। তাছাড়া ফইটকা দেখতেও বানরের মতো, লেখাপড়ায়ও মাঝারি, আর বাপেরও পকেট থেকে টাকা ছিটকে পড়তে দেখা যায় না। প্রেম বিষফোঁড়া নয়, কোষ্ঠকাঠিন্যও নয়, যে এমনি এমনি হয়ে যাবে। অনেক কার্যকারণ থাকতে হবে। তাছাড়া সৌরজগতে আর তার বাইরে অনেক গ্রহনক্ষত্রকে লাইনে আসতে হবে ফইটকার প্রেমের জন্যে, আদৎ-সুরৎ-দৌলৎ এর কথা বাদই দেয়া যাক।

কিন্তু মানিক যথেষ্ঠ সুদর্শন হওয়া সত্ত্বেও ফটিক মানিকের এই সম্ভব-নয় তত্ত্বকে গুল্লি মেরে নিজের পিতৃদত্ত নাম আর চেহারা নিয়েই পাঁপড়ির মতো শাঁসালো এক তরুণীর সাথে প্রেম বাঁধিয়ে ফেললো। মাইনকার উর্দু ফ্যাক্টরগুলিতে কিসমতের ব্যাপারটা ছিলো না, দেখা গেলো ওর জোরেই ফইটকা অনেকদূর এগিয়ে গেছে। পাঁপড়ি দেখতে বেশ, দূর থেকে দেখতে ভালোই লাগে। কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয় না, কারণ পাঁপড়ি আশেপাশে থাকলে ফটিক আমাদের ধারেকাছে ঘেঁষতে দেয় না, দেখলে খ্যাঁক করে ওঠে।

হাবিব, যাকে আমরা গত আট বছরে কখনো হাইব্যা ছাড়া অন্য কিছু ডাকিনি, শান্তশিষ্ট ছেলে বলেই হয়তো পাঁপড়ি-ফটিক জুটিকে খোঁচানোর সব পরিকল্পনায় ভেটো দিয়ে চলছিলো। "থাক না ওরা ওদের মতো!" এই ছিলো তার করুণ আর্তি। ওর চশমার পেছনে ভেজা বেড়ালের মতো চোখ দেখে আমরা ওকে তখনকার মতো ক্ষমা করে দিলেও ফইটকাকে জ্বালানোর প্ল্যানগুলিতে পানি ঢেলে দেয়ার ফলে জোশ হারিয়ে ফোঁসফোঁস করতাম। পাঁপড়ি-ফটিক একসাথে সিনেমা দেখতে যাবে, আমরা কি ঘটনাচক্রে কাকতালীয়ভাবে ওদের আশেপাশেই গিয়ে সে সিনেমা দেখতে বসতে পারি না? ফটিক পাঁপড়িকে কবিতার বই কিনে উপহার দেবে বইমেলা থেকে, আমরা কি ঘটনাচক্রে সেই আসরেই ফইটকাকে "দুষ্টু মেয়ে" উপন্যাসটি কিনে উপহার দিতে পারি না? ফটিক পাঁপড়িকে খাওয়াতে নিয়ে যাবে বুমারস এ, আমরা কি ফটিকের বাবাকে সেদিন চাঁদা তুলে বুমারস এ খাওয়াতে নিয়ে যেতে পারি না?

হাইব্যা রাজি হয় না। শুধু নেতিবাচক কাতর শব্দ করে। ইচ্ছা করে ধরে লাত্থি মারা শালাকে। সন্দেহ হয়, ফটিকের সাথে হাইব্যার কোন টেবিলাচ্ছাদিত লেনদেন আছে কি না। হয়তো পাঁপড়ির ছোট বোন ঠুমরি, যে কি না দেখতে পাঁপড়ির চেয়েও অনেক মিষ্টি ও দুষ্টু, তার সাথেই হয়তো একটা কিছু ঘটিয়ে দেবার অঙ্গীকার করেছে ফইটক্যা। হয়তো বলেছে, "দোস্ত! একটু দেখিস! ঠুমরি কিন্তু ঐদিন তোর কথা জিগাইতেসিলো!" তাই হয়তো হাইব্যা দেখছে ফইটক্যাকে।

হাইব্যাই ফোন করে জানায় আমাকে। "মইত্যা রে, ফইটকার তো প্রেম ভেঙে গেসে!"

মইত্যা নামটা আমার পছন্দ না, এই নামে রাজাকার আর ধান্ধাবাজ আছে অনেক, কিন্তু যার নাম মতিউর তাকে মইত্যাই ডাকে লোকে। আমি উল্লসিত হয়ে বললাম, "পাঁপড়ির ফোন নাম্বার আছে না তোর কাছে?"

হাইব্যা পষ্টাপষ্টি অস্বীকার করলো।

একটু পরেই মাইনকার ফোন। "পাঁপড়ি এখন রাহুর গ্রাস থেকে মুক্ত। ফোন নাম্বারটা দে।"

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে জানালাম যে পাঁপড়ির ফোন নাম্বার আমার কাছে নেই। থাকলে এই ফাউল প্রেম অনেক আগেই ভেঙে যেতো।

মাইনকা আত্মবিশ্বাস নিয়ে সায় দেয় আমার কথায়। আমার কাছে ফোন নাম্বার থাকলে নাকি অনেক আগেই সেটা নিয়ে ও পাঁপড়ির সাথে ভাব জমিয়ে ফেলতো।

ফোন করি ফইটকাকে। ফইটকার ছোট ভাই ছইটকা জানায়, দাদার ঘর বন্ধ। টোকা দিলে হুঙ্কার দিচ্ছে।

পরদিন মাইনকা বাসায় এসে হাজির। "চল ফইটকার বাসায় যাই। বোকাচোদা শালা নাকি ঘরের দরজা খুলতাসে না।"

আমি বলি, "দাঁড়া, ওর মনটা ভালো করা দরকার। কিছু জিনিস নিয়ে যাই।"

এরই মধ্যে হাইব্যাও এসে হাজির।

"আমি একটা বোতল নিয়ে এসেছি।" মাইনকা ব্যাগ থেকে একটা বোতল বার করে। হাইব্যা নিরাশাবাদী বলে খুঁতখুঁত করতে থাকে, "এটা তো অর্ধেক খালি!"

মাইনকা বলে, "ন্যাকামি করিস না। এইটার অর্ধেক ভরা!"

হাইব্যা বলে, "এইসবে কাজ হবে? এই দ্যাখ ... আমি দুইটা চুটকির বই নিয়ে এসেছি!"

আমি আমার শেলফের গোপন কন্দর থেকে কিছু জিনিস বার করি। হাইব্যা বলে, "এগুলি আবার ক্যান?"

মাইনকা বলে, "কাজে লাগবে। ফইটকার এখন এগুলি কাজে লাগবে।"

তিনজনে দুড়দাড় করে যাই ফটিকের বাসায়।

ছইটকা বাড়ি ছিলো না, ফটিকের মা বিরক্ত হয়ে বললেন, "শুরু করসে এক ঢং! ঘর ছাইড়া বাইর হয় না! আসুক ওর বাপ!"

আমরা ফইটকার ঘরে টোকা দেই। "ফটু! ফটু রে! আছিস? আমরা আসছি, দরজা খোল!"

ফইটকা দরজা খুলে সন্দিহান চোখে তাকায় আমাদের দিকে। "কী হইসে? কী চাস?"

আমরা দরজা আবার লাগিয়ে দিয়ে বলি, "তোমার পোন্দে লাত্থি মারতে চাই! তোর কী হইসে খুইলা ক। দরজা বন্ধ কইরা থিয়েটার করস ক্যান?"

ফইটকা কিছু বলে না, গম্ভীর মুখে একটা বই খুলে বসে আবার।

মানিক গিয়ে বইটা টান মেরে ওর হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে বলে, "এ কী? তুই ফ্রেঞ্চ শিখতাসস নাকি? অলিয়ঁসে?"

ফটিক গম্ভীর হয়ে বলে, "উই!"

মানিক বলে, "কইতি আমাগো। আমরাও শিখতাম তোর লগে।"

ফটিক আবার বইটা হাতে নিয়ে পৃষ্ঠা ওল্টায়।

মানিক ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দ্যায়। "কোন ব্যাপার না। জীবনটাই এমন। মাইয়ারা আসবে আর যাবে। তুই হবি প্ল্যাটফর্ম। মেয়েরা হবে ট্রেন। একের পর এক আসবে, কিছুক্ষণ থামবে, চলে যাবে।"

ফটিক অগ্নিদৃষ্টিতে তাকায় মাইনকার দিকে।

মানিক বলে, "আচ্ছা আচ্ছা, তুই প্ল্যাটফর্ম না। তুই ট্রেন। মাইয়ারা হইলো গিয়া প্ল্যাটফর্ম। তুই একের পর এক প্ল্যাটফর্মে যাবি, খাড়াবি, আবার রওনা দিবি। চিয়ার আপ বাডি!"

আমি বলি, "ফইটকা রে, এই দ্যাখ কী নিয়াসছি!" নেংটু সিডি বার করে দেখাই ওকে।

দেখে ফটিকের ভাবান্তর হয় না। কাভারটা মনোযোগ দিয়ে দেখে সে ঘোঁৎ করে শুধু বলে, "দেজা ভু!"

আমরা একে অন্যের দিকে তাকাই। মানে কী এর?

ফইটকাই ব্যাখ্যা করে, "দেখসি এইটা, অলরেডি দেইখা ফালাইসি!"

মাইনকা ব্যাগ থেকে বোতলটা বার করে। "আয় মাল খাই। বাসায় ফান্টা আছে?"

ফইটকা বোতল দেখে মুখ কুঁচকায়, বলে, "দেজা বু!"

দেজা ভু শুনে আমরা গোঁৎ খেয়েছিলাম, দেজা বু শুনে আবারও হোঁচট খাই।

ফইটকাই টীকা যোগ করে, "খাইসি, অলরেডি খাইসি একটু আগেই।" ঘরের কোণে টুলের ওপর একটা খালি বোতল দেখায় সে আঙুল দিয়ে।

হাইব্যা ব্যাগ থেকে চুটকির বই দুইটা এগিয়ে দেয়। "এগুলি পড়। হাসতে হাসতে শেষ হয়ে যাবি! একটা শোনাই দাঁড়া ...।"

ফটিক বই দুইটা হাতে নিয়ে দ্যাখে। তারপর ফিরিয়ে দেয় আবার হাইব্যার হাতে। "দেজা লু!"

আমরা আঁচ করতে পারি। ফইটকা বই দুইটা পড়ে ফেলেছে ইতিমধ্যে।

মানিক ক্ষেপে যায়। "ঐ হারামী, তোরে এতো খাতির যত্ন করতেসি, আর তুই পাত্তা দেস না আমাগো! ঐ মাইয়ার লাইগা অ্যাতো অ্যাতো অপমান আমাগো?"

ফইটকা গোঁ গোঁ করতে থাকে।

হাইব্যা বলে, "বল। সব খুইলা বল। অ্যাতো দুঃখ কীসের?"

আমি বলি, "দোস্ত, কদ্দুর কী হইসিলো বইলা ফেল।"

মাইনকা বদমাইশটার কোন মায়াদয়া নাই, সে বলে, "হ, কইয়া ফালা সব। দেজা চু?"

ফইটকা অম্নি ক্ষেপে ওঠে দারুণ। লাফিয়ে উঠে আমাদের ঠেলতে থাকে। "বাইরা, বাইরা সব! হালারা! আসছে আমারে জ্বালাইতে!"

আমরা হতবাক হয়ে যাই এই আচরণে। ফইটকা আমাদের হাত থেকে বোতল, বই আর সিডি কেড়ে নিয়ে একরকম ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বার করে দেয় ঘর থেকে।

1 comment:

  1. লেখাটা পড়লাম।অবশ্যই ভাল লাগল।
    হিমু ভাই ম্যালাদিন হয়ে গেল কিছু লেখেন না এখানে।
    পরের লেখা কবে আসছে ??

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।