Wednesday, April 16, 2008

মোনোপোলি

মোনোপোলি প্রথম যখন দেখি তখনও এই খেলার নেশার ব্যাপারটা বুঝিনি। বাসায় যারা একটু বড় তারা হট্টগোল করে খেলতেন। টাকাপয়সার ব্যাপার, একদিন রক্তচক্ষু স্বৈরাভিভাবকের হুকুমে মোনোপোলির সরঞ্জাম বাজেয়াপ্ত হলো। যারা মোনোপোলি খেলতেন জমিয়ে, তারাও একে একে চলে গেলেন দূরে। আমি একাই মাঝে মাঝে বোর্ডটা বার করে দেখতাম।

সেই পুরনো বোর্ড কোথায় হারিয়ে ফুরিয়ে গেলো, ক্লাস এইটের শেষদিকে উপহার পেলাম টাটকা নতুন আরেকটা। এবার আর ঘরে বসে মোনোপোলি খেলার বোকামি করলাম না, বন্ধুবান্ধবদের জানিয়ে শুরু হলো স্কুল ছুটির পর নির্জন বাড়িগুলিতে খেলা। আমরা সাধারণত ভলিবল বা ক্রিকেট খেলতাম স্কুল ছুটির পর, ফুটবল খেলার খুব ঝামেলা ছিলো বলে সেটা কম খেলা হয়েছে, মোনোপোলি আসার পর মেঘলা দিনগুলোর একটা দারুণ সমাধান বেরিয়ে গেলো।

খেলতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম, আমরা এক একটা কী চীজ। রীতিমতো মারপিট লেগে যাবার অবস্থা। দরকষাকষিতে বনিবনা হচ্ছে না, একজন আরেকজনের দিকে আঙুল তুলে শাসাচ্ছে। সে এক বিচিত্র উত্তেজনার সময়। ছক্কা জোড়ার ওপর কখনো পাঁচ জোড়া, কখনো ছয় জোড়া চোখ সম্মোহিতের মতো চেয়ে আছে। কারো সেট পন্ড হলে বাকিরা উল্লাসে গর্জন করে উঠছে, কেউ সেট মিলিয়ে ফেললে তার একার হঙ্কার শোনা যাচ্ছে দূরে সদর দরজা থেকেও। দর কষাকষির ধরনও দেখার মতো। "আমি তোকে ওল্ড কেন্ট রোড দেবো। তুই আমাকে মেফেয়ার দিবি। সাথে কত টাকা দিবি বল।" যাকে বলা হচ্ছে, সে টাকা দিতে রাজি, কিন্তু সে টাকা সে গোল করে পাকিয়ে প্রস্তাবদাতার পেছন দিক দিয়ে প্রবেশ করাতে চায়। আবার কেউ হোটেলে পড়ে ভাগ্যের ফেরে সব খোয়াতে বসেছে, তাকে আবার বাকিরা মিলে চাঙা করে তুলছে, যাতে পরের দানে সেই হোটেলওয়ালা আবার কোন বাটে পড়ে। সর্বস্বান্ত হয়ে এক একজন রাগের চোটে উঠে পড়ে হনহনিয়ে হেঁটে চড়ে বসছে সাইকেলে, এখানে আর এক মূহুর্তও না!

স্কুল ছাড়ার পর মোনোপোলি আর জমেনি। সেই শৈশবের বন্ধুদের ছাড়া আর কারো মধ্যেই মোনোপোলির সেই রক্তারক্তি স্পিরিট চোখে পড়েনি। এটা যে একটা নিষ্ঠুর, কাকের-মাংস-খাওয়া-কাকের জগতের খেলা, সেই উপলব্ধি পরবর্তী মোনোপোলির আসরের বন্ধুদের মধ্যে দেখিনি।

কাসেলে এসে কিছুদিন আগে আবার শুরু হয়েছে মোনোপোলি উন্মাদনা। এখানে যাঁরা বন্ধু, তাঁদের অনেকেই বেশ পাকড়ালো খেলোয়াড়, তাঁদের সাথে খেলে স্কুলের সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায়। আমাদের যিনি দেখভাল করে রাখেন, যাঁর কারণে একজন আরেকজনকে ধরে পিটাই না, তিনি খুবই ঠান্ডা মাথার লোক। তবে মোনোপোলির নেশা তাঁরও মারাত্মক, ভোনহাইমে রীতিমতো নেটওয়ার্কে মোনোপোলি খেলেন গভীর রাতে।

চৌধুরী আরো সরেস, নেট থেকে একটা চোরাই কপি নামিয়েছেন খেলাটার। রাতদিন খেলেন কম্পিউটারের সাথেই। তাঁর বাড়িতে গেলেই শোনা যায় টুকরো জ্যায। আমি গজগজ করতে করতে বসে পড়ি পরের গেমে।

আবারও টের পাই, মোনোপোলি একদম অন্য একটা আমাকে বার করে আনে। লোভী, অস্থির করে তোলে আমাকে। খেলার সময় মাঝে মাঝে বিস্মিত হই, আসলেই কি আমি এমন? টাকার প্রয়োজন সবসময়ই ছিলো আমার, এখনও আছে, কিন্তু টাকার লোভ ব্যাপারটা কখনোই কাজ করেনি মনে। মোনোপোলি খেলতে বসে আমি যেন কালচে একটা আয়নায় অন্য এক আমার ছায়া দেখি, যে ছক্কা ছুঁড়ে মারে রূদ্ধশ্বাস আশা নিয়ে, গোপন হিসেব কষতে থাকে জমির দলিল নিয়ে, বোর্ডের বাকিদের ভিটেমাটি চাঁটি করে ঘটিবাটি বিক্রিতে বাধ্য করে। মাঝে মাঝে মনে হয়, এই খেলার ওটাই নেশা। সেই কালচে আয়নার অন্য ছায়াটাই টানতে থাকে মানুষকে। গেম শেষ হয়ে গেলে বিষণ্ন লাগে, স্বস্তিও ফিরে পাই, মনে মনে ধন্যবাদ দিই কাকে যেন, সেই ছায়াটা সত্যি নয় বলে। তবুও মনে হয়, অনিচ্ছাসত্ত্বেও আরো ছায়াচ্ছন্ন কোন মোনোপোলির খেলায় ঢুকে পড়েছি জীবনে। নিস্তার নেই ওটার হাত থেকে, নিষ্কৃতি নেই, খেলা ছেড়ে উঠে যাবার উপায় নেই।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।