Monday, April 14, 2008

প্রবাসে দৈবের বশে ০৩৭

১.

সেদিন ভোরে স্বপ্নে দেখলাম, বিয়ে করেছি। বউ দুইজন। দুইজনই হাসিহাসিমুখে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। তাদের গায়ে জামাকাপড় তেমন ছিলো না। আমি গলা খাঁকারি দিয়ে তাদের বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম যে কিছু পর্দাপুশিদা জগতে অতীব জরুরি, পরস্ত্রীর গায়েই কেবল বস্ত্রসঙ্কট মানায়। জবাবে শুনলাম বাসন মাজার আওয়াজ হচ্ছে। এত সুন্দর স্বপ্নটা ভেঙে খান খান হয়ে গেলো হারামজাদা উগোর জন্য।

উগো আমার নতুন মিটবেভোনার (ফ্ল্যাটমেট)। ভাস্কো দা গামার দেশের লোক। পয়লা দিন থেকেই খিটিমিটি লেগে আছে ওর সাথে, কেন কে জানে। এমনিতে সে লোক খারাপ নয়, কিন্তু রাত দেড়টা পর্যন্ত রেডিও ছেড়ে গান শোনে। শুধু শুনলেই সমস্যা ছিলো না, সে বেশ উদাত্ত কণ্ঠে রেডিওর সাথে গলা মিলিয়ে গান গায়। পরদিন পরীক্ষা, রাত জেগে পড়ছি, এই অভূতপূর্ব ক্যাকোফোনিতে তাজ্জুব লেগে গেলো। এই দেশে পা রাখার পর থেকেই বাস করছি আশ্চর্য নৈঃশব্দ্যের মধ্যে, শহরের বেশ সুনসান অংশে বাস করি, আর রাত দশটার পর পড়শিরাও একেবারে চুপ মেরে যায়। সেখানে এই মাঝরাতে কোন চুদির্ভাইয়েরা এইসব গোলমাল করে? দরজা খুলে উত্তর পেলাম, উগো আর তার রেডিও। রেডিওর বোন নাই। উগোর আছে।

পরীক্ষা দিয়ে এসে উগোকে মিষ্টি করে বুঝিয়ে বললাম, বাপু হে, গান শোনো, গান গাও, খুব ভালো কথা, কিন্তু রাতের বেলা একটু আস্তে শুনলে কেমন হয়? উগো লজ্জিত হয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শুরু করলো রান্নাঘরের বদনাম। রান্নাঘর ময়লা। পরিষ্কার করা প্রয়োজন। বুঝলাম, স্যামুয়েল কতো ভালো লোক ছিলো।

উগো খুবই পরিচ্ছন্ন, আর আমি কিছুটা উচ্ছন্নে গেছি বললেই চলে। রান্নাঘর যতদূর সম্ভব পরিষ্কার করলাম সেদিন বসে বসে। নতুন কেউ এলে রান্নাঘর পরিষ্কার করে দেয়াই রেওয়াজ, আমিও এসে একেবারে পরিষ্কার পেয়েছি সবকিছু।

গ্রীষ্মভাগ শুরু হয়েছে কোর্সের। আবারও সেই সপ্তাহে আটাশ ঘন্টা ক্লাস। যদিও আবহাওয়ার লক্ষণ ভালো না, মাঝে রীতিমতো তুষারপাত হলো কয়েকদিন ধরে, আর এখন চলছে টিপটিপ বৃষ্টির দিন। দিনের আলো নেভে সোয়া আটটার দিকে। ক্লাস ফাঁকি দেয়ার বদভ্যাস তৈরি হয়েছে, সেটাকে গলা টিপে খুন করার ধান্ধায় আছি। হাতে আগাথা ক্রিস্টির বিশাল এক সংগ্রহ, সেটাই পড়ছি গোগ্রাসে। মার্ডার অব রজার অ্যাক্রয়েড, ডেথ কামস অ্যাজ দ্য এন্ড (সেবা প্রকাশনী থেকে এর ভাবানুবাদ বেরিয়েছিলো, "কামিনী"), আ পকেটফুল অব রাই, ক্যাট অ্যামাং দ্য পিজিয়নস শেষ করে গতকাল শেষ করলাম অনবদ্য মার্ডার অন দ্য ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস। ক্রিস্টির লেখা খাই আলুর চিপসের সাথে, দুটোই মচমচে। সিনেমাটা দেখার সুযোগ পেয়েও দেখিনি বইটা পড়বো বলে, এখন মনে হচ্ছে সিনেমাটাও দেখা জরুরি।

২.
দ্রোহীকে অনলাইনে পেয়ে ফিসফিসিয়ে জানতে চাইলাম, একসাথে জোড়া বউ পাওয়া যাবে কি না। দ্রোহী চুপিচুপি জানালেন, তিনি ৫০% সফলতা অর্জন করেছেন এ কাজে। বাকি ৫০% নিয়ে আপাতত এগোচ্ছেন না, প্রথম এবং একমাত্র বউ জানলে নাকি সমস্যা হতে পারে। তবে আমার খাতিরে তিনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন বলে জানিয়েছেন। দুই বান্ধবী, বা দুই খালাতো বোন হলেও চলবে শুনে তিনি একটু চিন্তিত হয়ে পড়েছেন (কেন, কে জানে?)। সিয়ামিজ যমজে আমার আপত্তির কথা শুনে মুষড়ে পড়েছেন একেবারে। একটা বউ নিয়েই তিনি হিমসিম খাচ্ছেন, আমি কী ভেবে এক জোড়া বউ চাইছি, সেটার কৈফিয়ৎ তলব করলেন কিছুক্ষণ। পাশাপাশি এ-ও জানালেন, আমার কুমতলবের ছাপ নাকি আমার শিঙালো ছড়ায় পড়েছে, সম্ভাব্য স্ত্রীযুগল দৈবাৎ সেসব ছড়া পাঠ করলে আমাকে সম্মার্জনী হাতে তাড়া করতে পারেন। আমি খুবই হতাশ হলাম এসব শুনে। আমি যে একজন সৎ, নিষ্ঠাবান ও কর্মঠ যুবক, তা আমার প্রতিটি শিঙালো ছড়ার পংক্তিতেই ফুটে আছে বলে আমার ধারণা ছিলো। প্রাঞ্জল বাংলা ভাষায় বলে দেয়া আছে, আমি কী করতে চাই। তারপরও যদি আমার দুই বউ আমাকে ঝাড়ু মারতে আসে, তা খুবই গ্লানিকর ব্যাপার হবে বলে আমার মনে হয়। দ্রোহী জানালেন, স্বপ্ন সফল করার ব্যাপারে যদি আমি সিরিয়াস হয়েই থাকি, তাহলে কর্মঠ হতেই হবে, নাহলে অনেক সমস্যা হতে পারে (একটা বউ থাকার সমস্যাকে মনে মনে দুই দিয়ে গুণ করেই বললেন কি না বোঝা গেলো না) । কিন্তু তিনি একই সাথে ঘ্যান ঘ্যান করতে লাগলেন, দুটো বউ কেন? দুটো বউ কেন?

বিষয়টা বুঝিয়ে বললাম। ব্যাপারটার চার্মই আলাদা। লোকজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো, এরা আমার বউ। তারপর ধরা যাক, সচলায়তনে পোস্ট দেবার সময় হাঁক পাড়বো, ছোট বউ! চা দিও!! আরো আরো সম্ভাবনার কথা ভাবতেই খুব ভালো লাগে। শরীর কন্টকিত হয় রীতিমতো।

দ্রোহী একটু আনমনা হয়ে বললেন, দেখি বাসায় গিয়ে ...।

আমি বললাম, আপনি বাসায় গিয়ে কী দেখবেন?

দ্রোহী শুধু বললেন, আপনার আইডিয়াটা কিন্তু ভালো!

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।