Wednesday, April 02, 2008

প্রবাসে দৈবের বশে ০৩৬

পরীক্ষার ভিড়ে হাবুডুবু খেয়ে শেষ হলো মার্চ মাসটা। শেষ দু'টো পরীক্ষা ভালো হয়নি মোটেও, মেজাজটা বিষিয়ে আছে নিজের ওপর। বিশেষ করে সৌরতাপের ওপর প্রেজেন্টেশনটা একেবারেই জঘন্য হয়েছে, দয়ালু প্রফেসর একটু ঘষা দিয়ে ছেড়ে দিয়েছেন। সারারাত জেগে প্রেজেন্টেশন তৈরির আইডিয়াটা মোটেও ভালো নয়, ঘুমে টলে পড়ে যাচ্ছিলাম কথা বলার সময়।

এদিকে আমার পড়শী স্যামুয়েল ভোনহাইম ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে। পড়শী হিসেবে স্যামুয়েলকে ১০০তে ১০০ই দেয়া যায়, ওর চলে যাওয়ার সংবাদ শুনে মেজাজ আরো খারাপ হলো।

সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে অ্যালার্ম নিবিয়ে দিয়ে আবার ঘুমাচ্ছি, এমন সময় কানে এলো দুমদাম শব্দ। গম্ভীর এক কণ্ঠ শুনলাম, "উঁহু, এটা আমার ঘর নয়।"

হাউজমাইস্টার অধৈর্য হয়ে বললো, "বাইরে যে নাম্বার লেখা দেখছো, ওটা অ্যাপার্টমেন্টের নাম্বার। তোমার ঘরের নাম্বার হচ্ছে অমুক!"

আবার প্রতিবাদ শুনলাম, "উঁহু। আমার ঘর সবচেয়ে ওপরের তালায়। এই যে লেখা আছে, ওবারগেশস!"

হাউজমাইস্টার বললো, "ওবারগেশস নয়, ওটা ৎদ্রিটেস ওবারগেশস (চতুর্থ তলা)! তুমি যেটার কথা বলছো, সেটা হচ্ছে ফিয়ারটেস ওবারগেশস (পঞ্চম তলা)! এটাই তোমার ঘর।"

এবার সেই গম্ভীর কণ্ঠ আবার শোনা গেলো। "আহ, আমারই ভুল!"

হাউজমাইস্টার কাগজ দেখে দেখে জিনিসপত্র বুঝিয়ে দেয়া শুরু করলো। "এই তোমার খাট। এই তোমার তোষক। এই তোমার শেলফ। আর বাইরে যা দেখছো, সব কমন জিনিস। চুলা, আবষ্পুয়লে (রান্নাঘরের সিঙ্ক) ...।"

এইবার আবার শোনা গেলো প্রতিবাদ, "আবষ্পুয়লে মানে? আবষ্পুয়লে কী?"

হাউজমাইস্টার চটে গেলো, "বাপরে বাপ! আসো আমার সাথে, দেখাচ্ছি আবষ্পুয়লে কী চীজ!"

আবষ্পুয়লে কী বস্তু তা অনুধাবনের পর এবার আরো কড়া প্রতিবাদ এলো, "দেখুন, আমি এই তুমি-তুমি করে কথা বলতে অভ্যস্ত নই। আপনাকে তুমি বলতে আমার অস্বস্তি হচ্ছে।"

হাউজমাইস্টার মোটেও পাত্তা দিলো না এই তীর্যক আপত্তিকে। "আমরা সবাই প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ। তুমি আমাকে তুমি করে বললে কোন সমস্যা নাই। এইবার তোমার রিসিট দেখাও।"

"কীসের রিসিট?"

"আরে যাহ, তুমি পয়সা দাও নাই ঘরের জন্য?"

"না।"

"তাহলে তোমাকে আমি চাবি দিতে পারবো না। তুমি গিয়ে পয়সা দিয়ে আসো আগে।"

"আমি যদি আপনাকে এখন পয়সা দিই?"

"তো দাও!"

"কত?"

হাউজমাইস্টার বিড়বিড় করে কী যেন বললো, তারপর টাকা গুণে নিলো। "এই নাও, তোমাকে রিসিট লিখে দিলাম। তোমার কাছ থেকে নগদ টাকা বুঝে পেয়েছি। এই নাও চাবি, এইটা তোমার ঘরের, এইটা তোমার চিঠির বাক্সের।"

"কিন্তু আমি সবচেয়ে ওপরের তলায় থাকতে চেয়েছিলাম।"

"তুমি ষ্টুডেন্টেনভেয়ার্কে গিয়ে এ নিয়ে আলাপ করো।"

"ওপরের তলায় কি কোন ঘর খালি আছে?"

"না, খালি নাই।"

"আমি সাইকেল চালাতে চাই।"

"বেশ, চালাও। আমি বাধা দিচ্ছি না তো।"

"ষ্টুডেন্টেনভেয়ার্ক কি আমাকে সাইকেল জোগাড় করে দেবে?"

"মমমমম, হ্যাঁ, একটা ব্যবস্থা আছে বটে। তোমাকে সেমিস্টার পিছু ভাড়া দিতে হবে সেটার জন্যে। তুমি তোমার ভোনহাইমের টিউটোরিনের সাথে যোগাযোগ করো।"

"সে কে? আমি তাকে চিনি না।"

"চেনার কথাও না। তার নামধাম তুমি পাবে নিচে তথ্যবোর্ডে।"

"সে কি এখানেই থাকে?"

"থাকতেও পারে। বোর্ড দেখলেই সব পরিষ্কার হবে তোমার কাছে।"

"আমি কি এই অ্যাপার্টমেন্টে একা, নাকি এখানে অন্য কেউ থাকে?"

"অবশ্যই অন্য কেউ থাকে। দেখছো না, চুলোর ওপর হাঁড়ি বসানো?"

"কে সে?"

"আমি জানি না! সে কোন একজন মানুষ! আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি!"

"আপনি উত্তেজিত।"

"দুঃখিত। তুমি কি সবকিছু বুঝেছো? নাকি অন্যকোনভাবে তোমাকে সাহায্য করতে পারি?"

"না, আমি সব বুঝেছি। অসংখ্য ধন্যবাদ।"

দড়াম করে দরজা লেগে গেলো।

কম্বলের নিচে শুয়ে আমি প্রমাদ গুণলাম। স্যামুয়েল রে, তুই এ কী করলি?

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।