Thursday, March 13, 2008

অনুবাদ

১.

সেবা প্রকাশনীর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে কখনো দ্বিধা করি না। কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি কাজী আনোয়ার হোসেনের উদ্যোগকে। তাঁর নামে প্রকাশিত হলেও শুনেছি কাজগুলো বেশিরভাগই অন্যের করা (সত্যিমিথ্যা যাচাই সম্ভব নয়, তবে বইয়ের ফ্রিকোয়েন্সি তেমনটিই নির্দেশ করে), সেই আড়ালে থাকা লেখকদের প্রতিও শ্রদ্ধা জানাই সবসময়। শেখ আবদুল হাকিম, নিয়াজ মোরশেদ, জাহিদ হাসান, রকিব হাসান, সেলিম হোসেন টিপু ... এক একটা নাম শৈশবের এবং কৈশোরের সেই অসম্ভব সুন্দর সময়গুলির সাথে মিশে আছে। আপনারা যেখানেই থাকুন, খুব ভালো থাকুন, দীর্ঘায়ু হোন, আমার সশ্রদ্ধ কৃতজ্ঞ অভিবাদন গ্রহণ করুন।
২.

সেবা প্রকাশনী যে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করে দিয়েছিলো আমার এবং আমার মতো আরো অনেকের জন্যে, তা হচ্ছে বিশ্ব সাহিত্যের ক্লাসিকগুলোর চমৎকার ঝরঝরে অনুবাদ খুব স্বল্পমূল্যে তুলে দিয়েছিলো আমাদের হাতে। আমি ইংরেজিতে বই পড়তে শুরু করেছি কলেজে উঠে, তার আগে পুরো একটা বই পড়ে বোঝার মতো ইংরেজি জ্ঞান ছিলো না। কিন্তু প্রাইমারি স্কুলে থাকতেই পড়ে শেষ করেছি অনেক ক্লাসিক। সহজ ভাষায়, সহজ ভঙ্গিতে করা সেইসব অনুবাদ আমার মনে রস যুগিয়েছে, আমার কল্পনাকে উসকে দিয়েছে। এখনও মনে করতে পারি, অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট পড়ে কী তীব্র কষ্ট অনুভব করেছিলাম (জাহিদ হাসানকে ধন্যবাদ আবারও), আমি যুদ্ধ কেন, বড় আকারের মারপিটও দেখিনি তখন, কিন্তু পলের বন্ধুরা সবাই যখন এক এক করে মারা যাচ্ছে, আমি বই বন্ধ করে কাঁদছিলাম হু হু করে। এই বইটা যদি আমি কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠে পড়তাম, আমি হয়তো দুঃখটা অনুভব করতাম না সেভাবে। পলের বন্ধুরা মরলে আমার সেই বয়সে তখন আর কিছু যেতো আসতো না। আমার বয়স তখন কত, এগারো? ঐ বয়সের একজন কিশোরের কাছে অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্টের মতো একটি মহৎ উপন্যাস পৌঁছে দেয়ার জন্যে সেবা প্রকাশনী ধন্যবাদার্হ। খটমটে, আক্ষরিক অনুবাদ হলে আমি হয়তো বিরক্ত হতাম, বইটা শেষ না করেই হয়তো উঠে পড়তাম, হয়তো শেষে গিয়ে হাঁপ ছেড়ে বাঁচতাম, যখন প্রজাপতি দু'টো পলের করোটি ছেড়ে উড়ে চলে যায় অন্য কোথাও, কিন্তু জাহিদ হাসানের অনুবাদটি এতো নরম, এতো হৃদয়গ্রাহী যে তা গভীর ছাপ ফেলেছিলো মনের মধ্যে। পরবর্তী ইংরেজি সংস্করণটি পড়ে অনুভব করেছি, তাঁর কাজটি খুব একটা সহজ ছিলো না।

সেবা প্রকাশনীর সেই সময়ের লেখকরা শক্তিমান অনুবাদক ছিলেন, তাঁরা কিছুটা স্বাধীনভাবে খানিকটা ছাড় দিয়ে অসাধারণ সব অনুবাদকর্ম হাজির করেছেন আমাদের সামনে। ইংরেজির পায়ে পায়ে অবোধ শিশুর মতো ঘোরেফেরেনি তাঁদের অনূদিত লেখাগুলো, কিছুটা স্বতন্ত্র থেকে স্বাদ যোগ করেছে। পরবর্তীতে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে প্রচুর অনুবাদকর্ম পড়েছি, সেই সাবলীল গতি আর ভঙ্গি না পেয়ে হতাশ হয়েছি খুব।
৩.

আমি অনুবাদের কাজ শুরু করি বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের মাঝামাঝি এসে। কোথাও প্রকাশ করার জন্যে নয়, সময় (দুঃসময়ও বলা যেতে পারে) কাটানোর জন্যেই। মার্ক টোয়েনের কিছু গল্প আর আজিমভের কিছু কল্পবিজ্ঞানগল্প। অনুবাদের কাজটি যে কতটা খাটুনির হতে পারে, তখন তা একেবারে রগেমজ্জায় অনুভব করি। সেবা প্রকাশনীর অনুবাদকবৃন্দের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা ও শ্রদ্ধা বহুগুণিত হয় সেই অনুবাদের কাজগুলো করতে গিয়ে। আজিমভের গল্পগুলির অনুবাদ হয়তো কঠিন নয়, কিন্তু তার স্বাদ বজায় রাখতে গিয়ে হিমসিম খেতে হয়। ইংরেজি আর বাংলা ভাষার "গতি" একরকম নয়, ইংরেজিতে যা পড়ে চমৎকৃত হই, নিজের করা তার বাংলা অনুবাদ পড়ে ইচ্ছা করে নিজের গালে চড় বসাতে।

সব দুঃসময়ই কেটে যায় একসময়, তাই অনুবাদের কাজে আমিও ক্ষান্ত দিই। অনূদিত গল্প পড়া হয়েছে প্রচুর, বেশিরভাগই ইংরেজিতে, সেখানেও অনুবাদকের দক্ষতা দেখে মুগ্ধ হয়েছি। গার্সিয়া মার্কেজের বেশিরভাগ লেখাই পড়েছি এডিথ গ্রসমানের অনুবাদে, মূল স্প্যানিশ তো চোখে দেখিনি, কিন্তু লেখাগুলো গভীরভাবে স্পর্শ করেছে আমাকে। বাংলায় অনুবাদকর্ম পড়তে গেলে তাই অনুবাদের জড়তা খুব দ্রুত হতাশ করে আমাকে, যদিও নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, ঝরঝরে অনুবাদ কী ভীষণ কষ্টসাধ্য একটি কাজ। বাংলায় জি. এইচ. হাবীবের করা শার্লক হোমসের অনুবাদ পড়ে যেমন ভালো লাগেনি, একটা কিছুর অভাব বোধ করেছি।

অনুবাদকের কষ্টগুলো পাঠকের অনুধাবন করা মুশকিল। যিনি অনুবাদ করছেন, তিনি অন্য একটা ভাষায় গল্প বা উপন্যাসটিকে পাঠ করেছেন, সেই অন্য ভাষার ভঙ্গিটি তাঁর কাছে পরিচিত, সেই ভাষার রস তিনি আস্বাদন করছেন অনুবাদের প্রতিটি মূহুর্তে। অথচ তাঁকে হয়তো ভিন্ন ভঙ্গিতে, ভিন্ন ছাঁচে ঢালতে হচ্ছে সে রস, আর সেটি হয়তো প্রায়ই সম্ভব হচ্ছে না। বাংলা বাক্যে ঢুকে পড়ছে অন্য ভাষার ভঙ্গি। এই হংসমধ্যে বকো যথা এড়ানো এক ভীষণ কষ্টসাধ্য কাজ। অনুবাদক হিসেবে যখন আমি চাইছি, পাঠক এ ব্যাপারটি অনুভব করে কিছুটা ছাড় দিয়ে পড়ুন লেখাটি, পাঠক হিসেবে আমি হয়তো একপাশে সরিয়ে দিচ্ছি অন্য কারো করা অনুবাদকর্ম। এ এক বিষম জ্বালা।

আক্ষরিক অনুবাদের কষ্টসাধ্য কাজ এড়িয়ে ভাবানুবাদের সমস্যা অন্য জায়গায়। তাতে মূল লেখার রসটুকু অনেকখানি ফেলে আসতে হয় পথে। যাঁর লেখা আমি অনুবাদ করবো, তাঁর লেখার মণিমুক্তোগুলো ফেলে শুধু ঝিনুকের খোসা পাঠকের সামনে ধরার মতো পরিস্থিতি দাঁড়ায় তখন।
৪.

বহুদিন হয়ে গেলো, সেবা প্রকাশনীর নতুন কোন বই পড়া হয়নি। আশা করছি তাঁরা এখনও তাঁদের মহৎ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। টিফিনের পয়সা জমিয়ে জমিয়ে এখনও কি বাচ্চারা খাওয়া ফেলে, পড়া ফেলে, টিভি ফেলে পড়ছে বইগুলো? এখনও কি বাচ্চারা অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট পড়ে কাঁদে পলের বন্ধু কাৎসিনস্কির মৃত্যুতে, রূদ্ধশ্বাসে সময় গুণতে থাকে আশি দিনে বিশ্বভ্রমণ পড়তে পড়তে, জলদস্যু হবার স্বপ্ন দেখে লং জন সিলভারের বর্ণনা পড়ে? দেশ থেকে বহুদূরে বসে তা-ই কামনা করি, পড়ুয়ায় ছেয়ে যাক আমাদের দেশটা, তাদের ভেতরটা বর্ণিল হয়ে উঠুক বিশ্বসাহিত্যের রঙে।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।