Thursday, March 06, 2008

প্রবাসে দৈবের বশে ০৩৫

সেদিন ভোরে ঘুম ভেঙে গেলো ঝড়ের শব্দে।

কাসেল এমনিতেই বেশ হাওয়ালো শহর, কিন্তু যাকে অন্তত আমি ঝড় বলি, তেমন কিছু এ পর্যন্ত দেখিনি। জানালায় বাতাসের ঝাপটা শুনে বুঝলাম, শুধু বাতাস নয়, তুষারও আছে সাথে। পরে শুনলাম এই ঝড় বয়ে গেছে পুরো মহাদেশের ওপর দিয়ে। সুমন চৌধুরী একটু বেরিয়েছিলেন ভোরবেলা, তিনি সেদিন বিকেলে বিরসমুখে জানালেন, আমার তো ঝড়ের শব্দে ঘুম ভেঙেছে, আর তিনি ঝড়ে ভিজে চুপচুপে হয়ে বাড়ি ফিরেছেন, কাজেই এ নিয়ে আর ফালতু আলাপ যাতে না হয় ...।

এ কয়দিন ব্যস্ত ছিলাম পরীক্ষা নিয়ে। বিয়োমাসে, মানে জৈববস্তু নিয়ে পরীক্ষা, গোটা সেমিস্টারের সবচেয়ে একঘেয়ে আর চাপ ফেলার কোর্স ছিলো এটা। হপ্তায় একদিন টানা চার ঘন্টা বকর বকর। রসায়ন আমার অপছন্দের বিষয়, কোনমতে টেনেটুনে পাশ করে এসেছি এতে সারাজীবন, এবারও তার ব্যতিক্রম হয়তো হবে না। কোর্সটার দুটো টুকরো ছিলো, এক অংশে জৈববস্তুর নানারকম তাত্ত্বিক ব্যবচ্ছেদ, অন্য অংশে এর রাসায়নিক গুণযাচাই। শেষের অংশ যে প্রফেসর নিয়েছেন, তিনি খুব নিষ্ঠার সাথে পড়ালেও সকলেই তাকে একটু সমঝে চলে বদমেজাজের কারণে। পরীক্ষার হলে তার নমুনা দেখলাম।

এখানে পরীক্ষার আগে পরীক্ষা দপ্তরে নিবন্ধন করতে হয় নাম, ছাত্র ক্রমিক আর স্বাক্ষরসহ। এই পরীক্ষা দপ্তরের ব্যাপারটাও একেক বিভাগের জন্যে একেক রকম। ইলেকট্রোটেকনিক বা ইনফরমাটিক এর ছাত্ররা অনলাইনে ফটাশ করে এই কাজ সেরে ফেলে কোনরকম ঝামেলা ছাড়াই, আর আমরা যারা এরএকোয়াড্রাটলার, তাদের সিঁড়ি ভেঙে দাপাদাপি করে যেতে হয় বিভাগের পরীক্ষা দপ্তরে, সেখানে খিটখিটে ফ্রাউ মারিনেল্লির কাছে গিয়ে রেজিস্টার খাতায় নামধাম লিখতে হয়। পরীক্ষার কমপক্ষে চৌদ্দদিন আগে এই কর্মটি সাধন করা না হলে পরীক্ষা দেয়ার কোন অধিকার থাকে না ছাত্রের। আমি যেমন একটা সেমিনারের মৌখিক পরীক্ষায় সময়মতো নিবন্ধন করতে পারিনি, সেজন্যে আবার পরীক্ষা দপ্তর থেকে ফর্ম নিয়ে তাতে পরীক্ষকের অনুমোদনসূচক স্বাক্ষর নিয়ে জমা দিতে হয়েছে। হের রোরিগ এবং হের লাঙ্গে অবশ্য কোন রকম ঝামেলা করেননি, ফর্মে সই করে দিয়ে উল্টো আমার হাতে আরেকটা ফর্ম ধরিয়ে দিয়ে বলেছেন, "এবার তাহলে আপনিও একটা সই করে দিন এখানে!"

পরীক্ষার হলে এক বেচারা প্রফেসর ক্লোজের কাছে এই একই অনুরোধ নিয়ে এসেছে। এই প্রথম কোন জার্মান প্রফেসরকে রাগারাগি করতে দেখলাম। হোয়রজাল ৎস্বাই কাঁপিয়ে এক গর্জন শুনলাম, "এখানে পরীক্ষা চলছে! তার কিছু নিয়ম কানুন আছে! আপনি বেরোন!"

নিবন্ধন করতে দেরি হয়ে গেলে যে ফর্ম দিয়ে পার পাওয়া যায়, সে ফর্ম নিয়ে স্বাক্ষরের জন্যে অনুরোধ করতে ক্লোজে আরো ক্ষেপে গেলেন! "আপনি সময়মতো নিবন্ধন করেননি! কথা শেষ! যান এখান থেকে!"

হলের আরেক প্রান্ত থেকে সেই ছোকরার এক বন্ধু বিরক্ত হয়ে বললো, "হের ক্লোজে, একটু বিবেচনা করুন!"

ক্লোজে পাঁই করে ঘুরে বললেন, "বিবেচনা করে আপনার বন্ধুকে বেরিয়ে যেতে বলা হয়েছে। বাস!"

আমি মনে মনে কপালকে ধন্যবাদ দিলাম। ঐ পরীক্ষার জন্যে নিবন্ধনের শেষ দিনে কর্মটি সেরে এসেছিলাম। সময়ের এক ফোঁড় না দিলে অসময়ে যে অগুনতি ফোঁড়েও যে কাজ হয় না, তা দেখে শিখলাম।

ক্লোজে অবশ্য পরিচয়পত্র যাচাই করার সময় আমাকেও ভোগালেন খানিকটা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয়পত্রে ছবি থাকে না এখানে, কেন জানি না, লোকজনকে তাই ছবিসহ তাদের পেরজোনালআউসভাইজ সাথে রাখতে হয়। আমার পেরজোনালআউসভাইজ বা ব্যক্তিগত পরিচয়পত্র আমার পাসপোর্ট, তার একটা কপি করে সঙ্গে রেখেছিলাম সৌভাগ্যক্রমে, ক্লোজে আমার মাত্রিকেলনুমার মিলিয়ে দেখে খটখটে গলায় অবিকল পুলিশের মতো করে বললেন, "লিখটবিল্ডআউসভাইজ বিটে!" ছবিসহ পরিচয়পত্র বার করে দেয়ার পর তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে আমার খোমাটিকে পরখ করে দেখলেন।

সেই পরীক্ষার একদিন পর, অর্থাৎ আজ আবার ছিলো ব্যবস্থাকৌশলের পরীক্ষা। এই ক'দিন পড়তে পড়তে চোখ ব্যথা হয়ে গেছে। ব্যবস্থা কৌশল বেশ গোলমেলে বিষয়, আগের বছরের কোন পরীক্ষার প্রশ্নও কারো কাছে নেই, কী আসতে পারে পরীক্ষায়, তা জিজ্ঞেস করলে প্রফেসর প্রিস গম্ভীর মুখে শুধু বলেন, "যা পড়ানো হয়েছে তা থেকেই একটা কিছু আসবে।"

গতকাল রাতে যখন মোটামুটি একবারের মতো সবকিছু পড়ে শেষ করেছি, তখন পর পর দু'টো মেইল এলো। প্রথমটা পাঠিয়েছে আমারই কোন এক সহৃদয় সহপাঠী, সে জানিয়েছে, ভাইসব, তোমরা শুধু অমুক অমুক জিনিস পড়লেই চলবে না, প্রিসের ওয়েবসাইটে আরো কিছু জিনিস তুলে দেয়া হয়েছে, সেগুলোও দেখো। দ্বিতীয় মেইলে টাকলু রোলান্ড জানিয়েছে, আগামীকাল স্ট্রাইক, ট্রাম বাস চলবে না।

আরো পড়তে হবে শুনে মেজাজ খিঁচড়ে গিয়েছিলো, স্ট্রাইকের কথা শুনে বুঝলাম, পৃথিবীতে কিছু শব্দকে কেন লোকে খারাপ কথা হিসেবে রেখে দিয়েছে। এর আগেও একবার স্ট্রাইকের ভেতর হেঁটে হেঁটে পরীক্ষা দিতে গেছি। আর হবি তো হ পরীক্ষা আবার ইংশুলে, সেই দূর ভিলহেল্মসহোয়ার আলেতে, আমার বাসা থেকে পায়ে হেঁটে সত্তর মিনিট লাগে যেতে।

সেদিন রাস্তায় যেখানে আমার বুলগেরিয়ান সহপাঠী স্লাভের সাথে দেখা হয়েছিলো, প্রায় সেই একই জায়গায় আজ দেখা হয়ে গেলো ওলাফের সাথে। সে স্ট্রাইকের কথা জানতো না, ঘর ছেড়ে বেরিয়েছে তার ঢাউস ল্যাপটপ নিয়ে, তার মেজাজ আরো খারাপ।

পথে চলতে চলতে চোখে পড়লো বিক্ষোভ মিছিল। এখানে মিছিলের আগে পিছে পুলিশের গাড়ি থাকে কয়েকটা। জার্মান পুলিশ একটি দর্শনীয় বস্তু, দৈর্ঘ্যপ্রস্থে পৃথিবীর বেশিরভাগ দুষ্কৃতীর চেয়ে বড় হয় তারা। বিক্ষুব্ধ জনতা কোনরকম বেচাল করলে সোজা এসে পিটিয়ে ঠান্ডা করতে তারা সদা প্রস্তুত। মিছিল যারা করে, তারা আমাদের মতো কাঁচভাঙা বা গাড়ি পোড়ানোতে এখনও হাত পাকাতে পারেনি, এরা কয়েকটা লাউডস্পীকার আর হুইসেল-পতাকা নিয়ে মাঠে নামে। পতাকা নাড়াতে নাড়াতে হুইসেলে এক সাথে ফুঁ দেয়, আর লাউডস্পীকারে তাদের পালের গোদাবৃন্দ জলদগম্ভীর স্বরে দাবিদাওয়া জানাতে থাকে। মনে মনে ভাবলাম, এদের সবার আউসবিল্ডুং (প্রশিক্ষণ) করানো উচিত পল্টন ময়দানে নিয়ে গিয়ে।

পরীক্ষা শেষ করে খুব হালকা লাগছিলো আজ। এমনিতেই বহুদিন পর লেখাপড়া শুরু করেছি, রীতিমতো চাপ পড়ে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে গেলে। চার বছর আগে কঠিন ম্যালেরিয়ায় ভুগে প্রায় মরতে বসেছিলাম, তার পর থেকে লক্ষ্য করে দেখেছি, আগের মতো আর অঙ্ক করতে পারি না। পর পর দু'টো পরীক্ষার ঝামেলা শেষ হবার পর আজ সুমন চৌধুরীর বাড়ি গিয়ে উৎপাত করলাম। হের চৌধুরীর কানাডীয় প্রতিবেশী ভিনসেন্ট কাসেল ছেড়ে চলে গেছে, যাবার আগে দুই বোতল খাসা ওয়াইন রেখে গেছে পড়শীদের জন্যে, তার একটি আমি আর চৌধুরী মেরে দিলাম আজ। দুই হাজার ছয়ের অর্ধশুষ্ক ডর্নফেল্ডার সবসময়ই খাচ্ছি, কিন্তু আজকেরটা রীতিমতো খাসা ছিলো। ভিনসেন্টের পবিত্র স্মৃতির উদ্দেশ্যে কিছু অপবিত্র স্নেহবাক্য বর্ষণ করলাম মনে মনে।

গতকাল এমনিই হঠাৎ কী মনে করে খুঁজতে খুঁজতে অনলাইনে পেয়ে গেলাম আগাথা ক্রিস্টির সত্তরটি রহস্যোপন্যাস। ডাউনলোড করে ছি। সামনের ক'টা দিন স্বাভাবিকভাবেই সচলে একটু অচল মেরে যাবো। ষ্ট্রোয়মুংসমাশিনেন এর ওপর কষা পরীক্ষা তো আছেই, ক্রিস্টির অনেক না পড়া উপন্যাস এখন নাগালের মধ্যে।

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।