Thursday, February 14, 2008

প্রবাসে দৈবের বশে ০৩১

বহুদিন পর আবার অঙ্ক করতে বসেছিলাম। বছর চারেক তো হবেই। কাজের সূত্রে হরদম অঙ্ক করতে হয়, কিন্তু পরীক্ষার জন্যে অঙ্ক করার হ্যাপাই অন্যরকম। বায়ুশক্তির ব্যবহার শীর্ষক এক কোর্সের জন্য রীতিমতো ঘাম ঝরিয়ে খাটলাম গতকাল।

কারো ফাল্গুন মাস আর কারো সর্বনাশ। পয়লা ফাল্গুনে কাসেলে নতুন করে শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়েছে। গতকাল যখন বেরিয়েছি বাসা থেকে, তখন বেশ রোদেলা ছিলো চারদিক, ফেরার পথে দেখি পুরো কনকনে ঠান্ডা। একটা কাজের জন্যে ইন্টারভিউ দিলাম গতকাল, সেটা পেয়ে গেছি, বসন্তের এ-ই উপহার আমার জন্যে, আরো আরো ইয়েমারা খাওয়ার রাস্তা তৈরি হচ্ছে।

কাল সারাদিন ঘাড় গুঁজে অঙ্ক করার পর চোখ আর মাথাব্যথা নিয়ে ঘুমাতে গিয়েছিলাম। প্রিন্টার নাই হাতের কাছে, সব কম্পিউটার থেকে পড়তে গিয়ে চোখের বারোটা বেজে গেছে। সকালে ওঠা আমার জন্যে বরাবরই একটা সমস্যা, আজকে ভোরে বহুকষ্টে সময়মতো পরীক্ষার হলে গিয়ে দেখি গিজগিজ করছে পোলাপান। সবমিলিয়ে ঊনষাট জন পরীক্ষা দিলাম, ক্রিস্তফ পরীক্ষার আগের দিন পর্যন্ত টেনে অঙ্ক করলেও অসুস্থ হয়ে পড়ায় আর পরীক্ষা দেয়নি। পরীক্ষার হলে গিয়ে দেখি সবাই বই, স্ক্রিপ্ট নিয়ে বসেছে। পরীক্ষার কিসিমও বেশ মজার, কেবল প্রশ্নপত্র বিলানো হচ্ছে, যে যার খাতায় লিখে উত্তর দিচ্ছে। বইখোলা পরীক্ষা বলেই হয়তো সেইরকম কষা প্রশ্ন এসেছে, পরীক্ষা দেয়ার পর একেক জনের প্রশ্নের উত্তর আসে একেকরকম। এর আগে দু'টো পরীক্ষায় মোটামুটি গ্রেড পেয়ে আমার এমনিতেই মন কিছুটা খারাপ, আজকেরটাও দিয়ে সন্তুষ্ট হতে পারছিলাম না। পরীক্ষা শুরুর আগে প্রফেসর হায়ার এসে খুব গম্ভীর মুখে কিছু রসিকতা করলেন, যেমন, আশা করি আপনারা সবাই পরীক্ষাদপ্তরে গিয়ে নাম লিখিয়ে এসেছেন, তা না হলে আপনাদের শাইনলাইস্টুং নিয়ে সমস্যা হতে পারে। শাইনলাইস্টুং তড়িৎকৌশলের একটা টার্ম, ইংরেজিতে যাকে বলে অ্যাপারেন্ট পাওয়ার (S)। আবার পরীক্ষার ফলাফল যে দলিলে থাকে, সেটাকেও শাইন বলা হয়, শাইনলাইস্টুং এক্ষেত্রে এই দলিল বিষয়ক কাজকেও বলা যেতে পারে। প্রশ্নপত্রে নাম, ছাত্র নিবন্ধন ক্রমিক, নাম্বার আর গ্রেড (জার্মানে বলা হয় নোটে) লেখার ঘর আছে, ডক্টর হায়ার বললেন, এবার সবাই যত্ন করে নিজের নাম, মাত্রিকেলনুমার আর নোটে লিখুন! পরীক্ষা চলার সময় শুরু হলো অভিযোগ, প্রশ্ন বুঝতে পারছে না অনেকেই, কেউ কেউ রীতিমতো ক্লু দাবি করে বসছে। আমি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, প্রশ্ন বুঝতে না পারলে প্রফেসরের কাছে ক্লু চাইবো, সেই বুকের পাটাই তৈরি হয়নি, আন্দাজে যা মাথায় আসে তা-ই কষে গেলাম। বেচার ডক্টর হায়ার দেখলাম একটু পর পর একে ওকে গিয়ে নসিহত করছেন, আহাহা, আপনি এটা মন দিয়ে পড়েননি, হুমম, এক কাজ করুন, একটা ক্লু দিচ্ছি, টারবাইনের ব্লেডের ডগায় বাতাসের বেগ কিভাবে বার করতে হয় জানেন তো ... ?

পরীক্ষা শেষ হবার পর শুনলাম এক অভাবনীয় খবর (অন্তত আমার জন্যে), এখনই নাম ধরে সবাইকে ডাকা হবে লেকচার হলে, সেখানে তৎক্ষণাৎ পরীক্ষক আর পরীক্ষার্থী এক সাথে বসে খাতা দেখবেন, কেউ ভুল করে থাকলে কী ভুল হয়েছে তা তাকে জানিয়ে দেয়া হবে, আর ফলাফলও সে তৎক্ষণাৎ জেনে যাবে। পদ্ধতিটা খুবই দারুণ মনে হয়েছে আমার কাছে, আমার সহপাঠীরাও দেখলাম তাদের কনফিউশনগুলি খাতায় টুকে নিয়ে তৈরি হচ্ছে হায়ারের মুখোমুখি হবার জন্যে।

আগামী সপ্তাহ কেটে যাবো মৌখিক পরীক্ষায়। পরীক্ষার সিজনটা কেটে গেলে একটু ঝাড়া হাত-পা হবো হয়তো, ঠিক করেছি ক্যামেরা নিয়ে একটু বের হবো শহরের বাইরে।

[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।