Tuesday, February 05, 2008

প্রবাসে দৈবের বশে ০২৯

চোখেমুখে মাঝে মাঝে অন্ধকার দেখি।

আজকে ভোরে বাথরুমে গিয়ে যেমন দেখলাম। ঘোর কেটে যাবার পর বুঝলাম, ঐ পুঞ্জীভূত আঁধার আর কিছু নয়, আমারই কেলোবদন, আয়নায়।

আয়না ছাড়াও অন্ধকার দেখছি বাকিটা সময়। ব্যবস্থাকৌশল নামের এক কোর্স নিয়ে রীতিমতো হিমসিম খাচ্ছিলাম গত কয়েক হপ্তা ধরে। প্রফেসর দুর্ধর্ষ স্মার্ট লোক, দারুণ গুছিয়ে কথা বলেন, আর অল্প কথা বলে লোকজনকে ফ্যাসাদে ফেলে দেন। গত হপ্তায় এক মেইল পেয়ে রীতিমতো খাবি খাওয়ার দশা। গ্রুপের বাকি দুইজন পারলে গলাগলি করে কাঁদে। এদিকে ইন্টারনেটের সংযোগের ছিন্নমূল অবস্থা, প্রফেসর সাহেবকে মেইল লিখে সেন্ড করতে গিয়ে দেখি নেট গায়েব। ছোটো আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার পুলে। সেখানে বসে ওলাফকে ফোন করে জানালাম, আমাদের স্ট্র্যাটেজি এখন মারমুখো হওয়া উচিত। ওলাফেরও ঘরে নেট নাই, বউ থাকে ড্যুসেলডর্ফ, সে-ও মুখ গোমড়া করে থাকে আমার মতো, সব শুনে সে বললো, উঁহু, আমাদের একটু ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বলতে হবে। এভাবে ... বলে সে শুরু করলো গড়গড়িয়ে।

ওলাফের ড্রাফট শুনে মুগ্ধ হয়ে গেলাম, শালা বাংলায় লিখতে পারলে সচলে অতিথি লেখক হিসেবে পোস্ট দিতে বলতাম। ঝটপট টাইপ করে সেটা পাঠিয়ে দিলাম প্রিসের কাছে, যদিও ততক্ষণে ব্যাটা অফিস ছেড়ে বেরিয়ে গেছে নিঃসন্দেহে।

আমাদের খসড়া করা সিস্টেম ঠিক সুবোধ আচরণ করছিলো না, ভুলটা কোথায় সেটাও বার করতে পারছিলাম না, তিনজন মিলে মাথা খাটিয়েও না। শেষমেশ গত হপ্তায় প্রবল সর্দি আর মাথাব্যথা নিয়েও আবার নতুন করে ডিজাইন করলাম সবকিছু। দু'টো গুরুতর ভুল করেছিলাম, নতুন ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতে গিয়ে সেগুলো চিহ্নিত করা গেলো অবশেষে। এবার সিস্টেম রান করে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। শেষমেশ মিলেছে!

পরদিন ক্লাসে গিয়ে শুনি ফতোয়া, প্রিস তাঁর এক সহকর্মীর কাছে আমাদের সিস্টেম দেখানোর হুকুম করেছেন। সেই ব্যাটাও হুবহু প্রিসের মতোই, ঠান্ডা, গুছিয়ে কথা বলে, আর একই রকম চালু। আমাদের ঈস্টার দ্বীপের সিস্টেম মনোযোগ দিয়ে দেখে আর শুনে নতুন এক গলদ বার করে বসলো ব্যাটা। কপাল আর কাকে বলে! তবে আজ একদম শেষ দেখে ছাড়া হয়েছে ব্যাপারটার, একটু পরই কাজ শুরু করবো প্রেজেন্টেশন নিয়ে।

শুক্কুরবার ছিলো আমার আরেক সেমিনারের চরম-উপস্থাপনা, সেটার জন্যেও দৌড়ুতে হয়েছে প্রচুর। প্রফেসর শ্মিডের ডকটোরান্ড জন জিভার্স রীতিমতো মাটির মানুষ, সে মাঝখানে একদিন অন্য এক কোর্সের মাঝে এসে আমাকে জানিয়ে গেলো, এই শুক্রবার প্রেজেন্টেশনের তারিখ চূড়ান্ত হয়েছে, আমি যেন প্রস্তুত থাকি। বিনামেঘে বজ্রপাত খেয়ে খেয়ে এখন মনে হচ্ছে নিয়তি আমাকে প্লাগ-অ্যান্ড-প্লে পদ্ধতিতে মেরে চলছে অনবরত। বহুকষ্টে বললাম, ঠিক আছে, কোন ব্যাপারই না। বৃহস্পতিবার ধুঁকতে ধুঁকতে কোনমতে জিনিসপত্র নিয়ে গেলাম জনের কাছে। সে দারুণ খুঁতখুঁতে লোক, অনেকগুলি খুঁত বার করে শুধরে দিলো অনেক কিছু।

ওদিকে বাংলাদেশের বায়ুশক্তি সম্ভাবনা নিয়ে একটা উপস্থাপনা করতে হবে আরেক কোর্সে। সেটার খসড়া গত হপ্তায় জমা দেয়ার কথা ছিলো, দেয়া হয়নি। কী যে গেরো! গতকাল বাড়িতে নেটের অভাবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে কোনমতে করলাম কিছু, এদিকে আজ সকালে একটা পরীক্ষা আর তার অ্যাসাইনমেন্ট জমা দেবার পালা, সেগুলোও জমে আছে ... সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিলো ... মনে হচ্ছিলো ... খারাপ খারাপ কথা মনে হচ্ছিলো আর কী।

যাই হোক, সকালে পরীক্ষা দিতে গেছি দশমিনিট দেরি করে। ভোরে উঠে অ্যাসাইনমেন্টের বাকি অংশ শেষ করতে করতে হঠাৎ দেখি সাতটা সাতান্ন বাজে। আবারও বজ্রপাত। কোনমতে প্যান্ট পরে চোঁচাঁ করে দৌড় মারলাম। বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে দেখি ষ্টেফি রাস্তার ওপর, হেলতে দুলতে যাচ্ছে। ওকে বললাম, সময় থাকতে দৌড়াও! অন্য লোকের বাড়ির পেছনে ছুটতে ছুটতে শর্টকাট দিচ্ছি, কোত্থেকে এক মহিলা দুইটা বাঘের মতো কুকুর নিয়ে হাজির। কুকুর অপরিচিত ছুটন্ত মানুষ পছন্দ করে না, দুই দুইটা আদমসন্তানকে দৌড়াতে দেখে তারা পাড়া কাঁপিয়ে হুঙ্কার ছেড়ে তেড়ে এলো। কপাল ভালো মহিলার গায়ে জোর ছিলো, বেল্ট টেনে ধরে রেখে আমাদের জান বাঁচিয়ে দিলো শেষ পর্যন্ত। পরীক্ষা দিতে গিয়েও আরেক মুশকিল, ব্রেন্ট দারুণ রসিক লোক, সে একটু পর পর এক একটা রসিকতা করে আর সবাই হেসে কুটিপাটি। আমার কাছে এসে সে খাতা খুঁটিয়ে দেখে এক জায়গায় হাত রেখে সে বললো, এটা কী লিখেছো? আমি থতমত খেয়ে বললাম, আকুমুলিয়ের্ট! সে হুমহাম শব্দ করে বললো, অঙ্কটা নিয়ে সমস্যা নাকি, সাহায্য করবো? আমি সানন্দে বললাম, হ্যাঁ করেন! তড়িৎচৌম্বকীয় ক্ষেত্র ও তরঙ্গ কুইজে প্রফেসর মতিনের আগে বা পরে কোন শিক্ষক আমাকে পরীক্ষায় সাহায্য করেনি, আজকে ব্রেন্ট সেই তালিকায় নাম লেখালো। একটু পরে দেখলাম, সবারই ঐ একই জায়গায় সমস্যা, মারিয়েনকেও গিয়ে অঙ্ক কষে দিয়ে আসছে ব্রেন্ট। মারিয়েন অবশ্য হিন্ট পেয়েও খুশি না, সে দাঁত কেলিয়ে সেক্সি হাসি দিয়ে বললো, ভাস ডান? তারপর কী? ব্রেন্ট দাঁত খিঁচিয়ে বললো, ভাস ডান? আজকালকার ছেরিগুলি চায় কী? ভাস ডান! মারিয়েনের পাশে বসা আরেক ছেমরি, সে দাবি জানালো, যেহেতু এক্সপেরিমেন্ট গ্রুপে করা হয়েছে, পরীক্ষাও গ্রুপে দেয়ার সুযোগ দেয়া হোক! ব্রেন্ট বললো, জেগে ওঠো! দুই ছোকরা খুব আলোচনা করে পরীক্ষা দিচ্ছিলো, ব্রেন্ট গিয়ে হানা দিয়ে বললো, হাতের লেখা ভালো হলে চলবে না! হাতের লেখা খারাপ হতে হবে, যাতে তোমার পড়শী তোমারটা পড়তে না পারে!

পরীক্ষা শেষ করে এসে প্রেজেন্টেশনের বাকি কাজ শেষ করলাম, ভাগ্য ভালো নেট সংযোগ ছিলো। যে কথা না বললেই নয়, তা হচ্ছে, এই উপস্থাপনায় দুই সচল সদস্য দ্রোহী আর তানভীর অপরিমেয় উপকার করেছেন কিছু জিনিস যুগিয়ে দিয়ে। প্রেজেন্টেশন বেশ ভালো হয়েছে, এর জন্যে তাঁরাই ধন্যবাদার্হ। পাশাপাশি সুখের খবর হচ্ছে, ঝড় নিয়ে তানভীর শুরু করতে যাচ্ছেন তাঁর জমজমাট সিরিজ "তানভীর-তুফান ভাই ভাই!" এর আংরেজি সংস্করণ আমি মোটামুটি আঁতিপাঁতি করেই পড়েছি, বাংলাটাও আশা করি দমকা ও ঝোড়ো ধরনের সুখপাঠ্য হবে।

বিষ্যুদবারে ঈস্টার দ্বীপের ওপর বক্তৃতা শেষ হলে আপাতত বাঁচি। কয়েকটা উপস্থাপনার অভিজ্ঞতা থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এখন থেকে সবসময় প্রোবেফোরত্রাগ বা পরীক্ষামূলক বক্তৃতা সেরে নেবো কাউকে মুরগি বানিয়ে। সেদিন যেমন স্যামুয়েল বা ষ্টেফি কাউকেই হাতের কাছে না পেয়ে একটু হিমসিম খেয়ে গিয়েছিলাম। আজ সুমন চৌধুরী আর ষ্টেফান ব্রাককে মুরগি বানানোর সুফল একদম হাতে নাতে পেয়েছি।


[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।