Saturday, February 02, 2008

পর্নস্টার

ভদ্রলোককে দেখেই বোঝা যায়, বাংলাদেশের মানুষ। বোধহয় বোঝা যায় আমাকে দেখেও। তিনি বেশ একগাল হাসি নিয়ে সোজা আমার টেবিলে চলে এলেন ট্রে হাতে।

"আপনি বাংলাদেশের লোক।" প্রশ্ন নয়, একেবারে রায় দিয়ে দিলেন তিনি।

আমি আড়চোখে তাকালাম তার হাতের ট্রের দিকে। মাছ আর সব্জি, আর অবধারিতভাবেই ফরাসী কায়দায় ভাজা আলু। আমি আমার প্লেটে আধখাওয়া শুয়োরের পরিপাটা ভাজা মাংসে ছুরি চালানো বন্ধ করে বলি, "হুমম, একেবারে ঠিক ধরেছেন।"

ভদ্রলোক দুম করে বসে পড়েন আমার উল্টোদিকে। "শুয়োর যত কম খাওয়া যায়, ততই মঙ্গল।" আবারও রায় দ্যান তিনি। "বড় বেশি চর্বি।"

আমি রাজি হয়ে যাই। বলি, "ঠিক বলেছেন।"

তিনি কাঁটা চামচ উঁচিয়ে বলেন, "গুটেন আপেটিট!"

আমি মুখে ততক্ষণে এক টুকরো পমেস, মানে সেই ফরাসী ছাঁটে ভাজা আলু মুখে পুরে দিয়েছি। মুখে খাবার নিয়েই বলি, "এবেনফালস!"

ভদ্রলোক মাছের একটি সূক্ষ্ম কুচি মুখে দিয়ে বলেন, "আপনি ছাত্র।" কী মুশকিল, ইনি দেখি শুধু সিদ্ধান্তে পৌঁছে যান। কোন প্রশ্ন নেই, কোন জিজ্ঞাসা নেই, কেবল রায়।

আমি বলি, "হ্যাঁ, এখনও। আপনি?"

ভদ্রলোক হাসেন। বলেন, "আমি একজন পর্নস্টার।"

আমি একটু গম্ভীর হয়ে যাই কেন যেন। বিশ্ববিদ্যারয়ের মেনজায় বসে একজন পর্নস্টারের সাথে এক টেবিলে বসে লাঞ্চ করা অন্যায় নয় নিশ্চয়ই, কিন্তু তবুও কেন যেন মনটা ভারি হয়ে যায়।

তিনি বলেন, "গুম মেরে গেলেন একটু। কিন্তু পর্নস্টাররাও মানুষ।"

আমি বলি, "বেশ সৌভাগ্যবান মানুষ।"

তিনি এবার হেসে ওঠেন খলখল করে। বলেন, "আর সৌভাগ্য!"

আমি এবার বেশ নির্মমভাবে ছুরি চালাই শূকরের মাংসে। আমার চোয়ালের পেশী নিশ্চয়ই ফুলে ওঠে, মানসচোখে দেখতে পাই। "তা, আপনি কী ধরনের পর্নস্টার?"

ভদ্রলোক একটুকরো আলু চিবাতে থাকেন চোখ বুঁজে। বলেন, "প্রচলিত ঘরানারই। অর্থাৎ, শুধু নারীদের সাথেই কাজ করি।"

বচনের ব্যবহারে আমার মনের মধ্যে গুমোট ভাবটা আরো বেড়ে ওঠে। নারী, আবার দের! অযথাই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জোরে চিবাতে থাকি মাংসের টুকরোটাকে। বলি, "কতদিন হলো?"

ভদ্রলোক বললেন, "মাস চারেক। এর আগে আপনার মতোই নিরীহ লোক ছিলাম।"

আমি নিরীহ শুনে নিজের ওপর রাগ হয়। ঝালটা ঝাড়ি এক টুকরো আলু ভাজার ওপর। বলি, "বটে?"

তিনি বলেন, "হুম।"

বললাম, "আপনার আত্মীয়স্বজন আপত্তি করেননি?"

তিনি বললেন, "সবাই করেছে। রীতিমতো হইচই।"

আমি বললাম, "এত ঢাকঢোল পেটালেন কেন? এই কাজে নেমে তো লোকে শুনেছি ছদ্মনাম নেয়।"

তিনি বললেন, "আমিও নিয়েছি। আমার ছদ্মনাম কার্লো শ্নেললয়ফার। তাতে বিশেষ একটা লাভ হয়নি।"

বললাম, "কেন?"

তিনি বললেন, "দেশ ছেড়ে আসার পর থেকেই আছি বিপদে। কাজকাম জোটাতে পারি না। লেখাপড়া করতে গিয়ে চোখে অন্ধকার দেখি। ওদিকে দেশ থেকে পাড়াতুতো কাকাদের খবরদারি। এক একজন ফোন করেন, মেইল করেন। বলেন, হালাল হারাম বেছে খাবি। আমি বলি, ঠিক আছে তাহের কাকু, খাবো। আরেকজন বলেন, মদ খাবি না। আমি বলি, ঠিক আছে মোতালেব চাচা, খাবো না। আরেকজন বলেন, তোর বাবা কতো সজ্জন লোক, তার ছেলে হয় তুই কখনোই বেশ্যাপাড়ায় যেতে পারিস না, এ ভরসা আমার আছে। আমি বলি, কী যে বলেন হানিফ চাচা, তা-ই কী হয়?"

আমি বলি, "তারপর?"

তিনি বলেন, "বহুকষ্টে একা একা এই বিশ্রী দেশে দিন কাটাচ্ছিলাম। কাজ যা পাই, বেশিদিন থাকে না। একেবারে আধপেটা অবস্থা। একদিন দেখি এক ন্যাংটো ক্লাবের বাইরে ঘটা করে বিজ্ঞাপন, এক ঘন্টার অভিনয়ের জন্য একশো মুদ্রা। আর কিছু ভাবলাম না। দুম করে ঢুকে পড়লাম।"

আমি বলি, "বলেন কী?"

তিনি বললেন, "হ্যাঁ। ওরাও আমার অভিনয় দেখে হতবাক। এমন লায়েক লোক নাকি এই লাইনে কমই জোটে। আমিও লজ্জা পেয়ে গেলাম।"

আমি বলি, "বলেন কী এসব?"

তিনি বললেন, "হুঁ। সেই থেকে শুরু। মাসখানেকের মধ্যেই বড় বড় চুক্তি করলাম কয়েকটা স্টুডিওর সাথে। আপনি যদি ইন্টারনেটে এই বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র দেখে থাকেন তাহলে হয়তো শিগগীরই আমাকে দেখতে পাবেন পাইকারি হারে।"

কেন যেন ভালো লাগে না কথাটা।

তিনি মাছ খান আর বকে চলেন, "মাস দুয়েকের মধ্যেই দেশ থেকে তাহের কাকুর ফোন এলো। বললেন, হারামজাদা, শেষ পর্যন্ত ন্যাংটা সিনেমায় নামলি? মোতালেব চাচা বললেন, একটুও লজ্জা লাগলো না? হানিফ চাচা বললেন, তুই নিজেই একটা বেশ্যা হয়ে গেলি?"

আমি খাবি খাই। বলি, "ওরা ...?"

ভদ্রলোক বললেন, "হুমম। মনে হচ্ছে ওদের কাছে সব লেটেস্ট সিডি-ডিভিডি পৌঁছে যায়। তো, আমার পরিবারের লোকজনও ওদের যন্ত্রণায় জেনে গেলো সব। সে কী এক বিড়ম্বনা।"

আমি বলি, "কিন্তু ...।"

তিনি বললেন, "হুমম। কেউ আপনাকে বেছে খাবার উপদেশ দিলে সাবধান, কখনো ন্যাংটো ছবিতে অভিনয় করবেন না। জানাজানি হয়ে যাবে।"




শুভ ক্ষুধা।
আপনাকেও।
হাইস্পিড মোটর।

মন্তব্য গল্প কাল্পনিক। ঈমানে কইতাছি হালায়।


[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।