Sunday, January 27, 2008

প্রবাসে দৈবের বশে ০২৮

কানের পাশ দিয়ে গুলি গেছে জীবনে বহুবার। কানের লতি তাই গরম হয়ে থাকে সবসময়। গত হপ্তাটাও এমনি ছিলো। তবে সেসব কাহিনী বলছি না।

নেট ফেরত পেয়েছিলাম দুয়েকদিনের জন্যে, তবে খোঁড়া অবস্থায়। আজব এক সমস্যা, মেইল পাঠাতে পারি না, আর মেইল পাঠানো গেলে কোন ফাইল সংযোগ করতে পারি না। সচলায়তনে পোস্টিং করার সুযোগও তাই নেই।

এই পোস্ট লিখছি পরের বাড়ি বসে। হখশুলরেশেনৎসেন্ট্রুমের লোকজনকে ধরে জুতোপেটা করতে ইচ্ছে করছে ভীষণ।

জুতোর প্রসঙ্গে মনে পড়লো, আমার বাংলাদেশ থেকে বয়ে আনা দুই জোড়া জুতোর দ্বিতীয়টার তলাও ফেটে চৌচির। গাঁটের গভীর তলদেশ থেকে খামচে বার করা কুড়ি ইউরো দিয়ে একজোড়া জুতো কিনতে হলো। ফেটে যাওয়া জুতোর পাটিটা দিয়েই জুতাতে হবে শালাদের।

শুধু জুতো ফাটলে অ্যাতো প্যানপ্যান করতাম না, সেদিন ল্যাবে বসে সোলার প্যানেল নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতে হঠাৎ গুরুতর ডাক পেলাম অন্তঃস্থলে, সহকর্মীদের বললাম, ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে, রইবো না আর বেশিক্ষণ তোদের মাঝারে। ল্যাব থেকে বেরিয়ে দেখি বেসমেন্টের টয়লেটে মেরামতির কেরামতি চলছে, সেটা বন্ধ। উল্কাবেগে ছুটতে ছুটতে ঢুকলাম দোতলার টয়লেটে, প্যান্ট খোলার সময় শালা বোতামের মুন্ডু ভেঙে মেঝেতে পড়ে গেলো। অ্যাত্তো চমৎকার জিন্সের একটা প্যান্ট বরবাদ। অন্দরমহলকে হালকা করে বোতামটা খুঁজে বার করে দেখলাম, আবার মেরামত করা সম্ভব, তবে পদে পদে ভুগতে হবে। হাগার আনন্দ আর প্যান্টের বোতামভাঙার কষ্টে কাটাকুটি হয়ে গেলো, কঠোর সাধনাক্লিষ্ট চেহারা নিয়ে বার হলাম টয়লেট থেকে। প্রফেসর হায়ার টলতে টলতে ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের টয়লেটে ঢুকছিলেন, আমার অভিব্যক্তি দেখে রীতিমতো ঘাবড়ে গেলেন।

ফ্যালনা এক উপহার পেলাম এক পাবলিকের কাছ থেকে, আমাজনের উপহারকোড, একটা কাজে খাটনি খাটার বদৌলতে। কী কেনা যায় আমাজন থেকে, ভাবতে ভাবতে হয়রান হয়ে গেলাম। কফি বানানোর স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র? উঁহু, অনেক দাম, তাছাড়া কফি পছন্দ করি না। তাহলে চা বানানোর ফ্লাস্ক? সেটারও অগ্নিমূল্য। শেষমেশ নাগালের মধ্যে পেলাম পানি গরম করার যন্ত্র, যেটা পেলে একটু আরাম করে চা খাওয়া যায়। গতকাল সক্কালবেলা দরজায় দুমদাম ঘন্টা শুনে টলতে টলতে বার হয়ে দেখি পোস্টমান, হাতে বাক্স। খুলে দেখলাম, মন্দ না জিনিসটা।

নেট থেকেও নাই, কী করি ছুটির দিনে ঘরে বসে বসে? পড়তেও তো ভাল্লাগে না, যদিও এই হপ্তায় একেবারে হারকিউলিয়ান টাস্ক চেপে বসেছে কাঁধে। সাতপাঁচ ভেবে নেটের মা-কে ভালোবেসে চলে গেলাম কাপড় ধুতে।

কাপড় ধুতে দিয়ে নেটের অনুপস্থিতিতে ভাবলাম, একটা গান দাঁড়া করাই। কিন্তু মেজাজ খুবই খারাপ, গান লিখতে গেলে বাজে গান লেখা হবে শুধু। সেদিন গীটার হাতে পন্ডশ্রম করছি, এমন সময় দরজায় ঘন্টা। আমার পড়শিনী ষ্টেফি এসে হাজির, নেট সংক্রান্ত খোঁজখবর নিতে। আমার নেট আছে, ওর নাই। বেচারি করুণ কণ্ঠে বায়না ধরলো, "তোমার পিসি থেকে একটা মেইল করি?"

আমার ঘর মোটামুটি গোয়ালঘরের মতোই, গোবর নেই যদিও (ওটা মাথায় নিয়ে ঘুরি)। রাজি হয়েও বিপদে পড়লাম। কাঁচুমাচু হয়ে বললাম, "আমার ঘর কিন্তু খুবই ইয়ে।"

ষ্টেফি বললো, "তুমি তো ছাত্র, আর কী প্রত্যাশা করো?" এই বলে সে জাঁকিয়ে বসলো আমার চেয়ারে, আর নড়ার নাম নাই। এদিকে আমারও হাজারটা কাজ বাকি। ছেমরি নিজের কাজ করে চলছে, আর বকবক করে যাচ্ছে আমার সাথে। আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি, ও এসেছে হানোভারের কাছে এক ছোট শহর থেকে। আমি পড়ি নবায়নযোগ্য শক্তি নিয়ে, সে পড়ে শিক্ষকতা নিয়ে। আমাদের রান্নাঘরটা ছোট, ওদের রান্নাঘরটা অনেক বড়। আমি হ্যান, সে ত্যান। শেষমেশ বললাম, চা খাবা? এতে বোধ করি তার টনক নড়লো, মেইল শেষ করে বললো, না না, আমি যাইগা।

যাবার আগে ষ্টেফি আমার খাট টিপেটুপে দেখে বললো, "অনেক শক্ত! আমার এই খাটগুলি ভাল্লাগে না, আমি ইকেয়া থেকে অনেক সুন্দর একটা খাট কিনে এনেছি!"

মনে মনে বললাম, "রোসো বাছা, আমরা একজন আরেকজনের খাট সম্পর্কে অচিরেই আরো ব্যবহারিক জ্ঞান লাভ করতে পারি, হাতের কাজগুলি শেষ হোক আগে ...!" মুখে একটা মিষ্টি হাসি এনে বললাম, "বাহ, তাই নাকি? হুমম ... !"


[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।