Saturday, January 05, 2008

গোয়েন্দা ঝাকানাকা ও জাঙ্গিয়া রহস্য


এক.

আবদুল গোলাম হক নাক কুঁচকে বললেন, "শেষ পর্যন্ত আমাকে ট্রেনে চড়ে চট্টগ্রাম যেতে হবে? য়্যাঁ? তা-ও পরের ট্রেনে?"

সেক্রেটারি মিস জুলিয়া বললেন (ভাই, বিলিয়নেয়ারের বাড়ির বেড়ালটাকেও আপনি আপনি করে বলতে হয়, আর মিস জুলিয়া তো কুখ্যাত ক্রোড়পতি আবদুল গোলাম হকের বিশেষ প্রিয়পাত্রী আর সেক্রেটারি, তাঁকে আপনি না বলে শেষে লেখালেখির পাট খোয়াই আর কি), "কিন্তু স্যার, আপনার নিরাপত্তার জন্যেই তো ...।"

আবদুল গোলাম হক গজগজ করতে লাগলেন, "তাই বলে পরের ট্রেনে করে চট্টগ্রাম যাবো ...।"
এই সেই জাঙ্গিয়া!এই সেই জাঙ্গিয়া!

মিস জুলিয়া বললেন, "স্যার, বাংলাদেশে তো সব ট্রেনই পরের ট্রেন। সব ট্রেনই বাংলাদেশ রেলওয়ের সম্পত্তি। খালি কয়েকটা খেলনা ট্রেন আছে স্যার শিশুপার্ক আর ফ্যান্টাসি কিংডমে ...।"

আবদুল গোলাম হক খাপ্পা হয়ে গেলেন। বললেন, "দ্যাখো মিস জুলিয়া, পদে পদে জ্ঞান দিতে এসো না! পয়সা খরচ করলে সব পাওয়া যায়। দাঁড়াও না, ফাঁড়াটা খালি কাটুক আগে, আমি ঢাকা-টু-চিটাগাং ট্রেন সার্ভিসের ব্যবসা শুরু করবো। একটা ট্রেন কিনতে কয় টাকা লাগে?"

মিস জুলিয়া তাঁর ল্যাপটপে খুটখুট করে নোট করতে করতে বললেন, "দেখি স্যার ইন্টারনেটে সার্চ করে। ... কিন্তু স্যার, রেলওয়ে কি তাদের লাইনে আপনার ট্রেন চলতে দেবে?"

আবদুল গোলাম হক উত্তেজিত হয়ে পড়লেন, "দিবে না মানে? একশোবার দিবে! দিতেই হবে! না দিলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে রেল চলাচল আমি বন্ধ করে দিবো!"

মিস জুলিয়া বললেন, "জ্বি স্যার, তা তো অবশ্যই!"

আবদুল গোলাম হক বললেন, "এক্ষুণি খোঁজ নাও, ট্রেন কিনতে কত টাকা লাগে।"

মিস জুলিয়া আমতা আমতা করে বললেন, "স্যার, গুগলে তো ট্রেনের দাম পাওয়া যাচ্ছে না, সচলায়তনে জিজ্ঞেস করবো?"

আবদুল গোলাম হক বললেন, "যাকে খুশি জিজ্ঞেস করো, আমার দাম জানা হলেই হয়!"

মিস জুলিয়া আবার খুট খুট করে টাইপ করতে লাগলেন।

আবদুল গোলাম হক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, "প্লেনে গেলে কী সমস্যা ছিলো?"

মিস জুলিয়া বললেন, "প্লেনে স্যার একটু বিপদ নাকি ছিলো, উনি বললেন।"

আবদুল গোলাম হক বললেন, "কী বিপদ?"

মিস জুলিয়া বললেন, "তা তো স্যার আমাকে খুলে বলেননি। আমি জিজ্ঞেস করে ধমক খেলাম খামাকা।"

আবদুল গোলাম হক বললেন, "থাক তাহলে। ঐ ব্যাটাকে খামাকা ঘাঁটিয়ে লাভ নেই। বলেছে যখন, তখন নিশ্চয়ই একটা কিছু বিপদ ছিলো!"

মিস জুলিয়া বললেন, "জ্বি স্যার।"

আবদুল গোলাম হক একটু পর আবারও ক্ষেপে গেলেন। "কিন্তু তাই বলে ট্রেনে? বাসে গেলেও তো হতো।"

মিস জুলিয়া বললেন, "বাসে নাকি স্যার সবচেয়ে বেশি বিপদ। তাছাড়া আপনাকে তো লোকে চেনে জানে ...।"

আবদুল গোলাম হক বললেন, "আরে, ট্রেনে কোন বিপদ নাই নাকি? টয়লেটের অবস্থা কী খারাপ জানো?"

মিস জুলিয়া বললেন, "স্যার শহিদুলকে বলবো, টয়লেটে আপনার জন্য পটি ফিট করে দেবে নাহয় ...?"

আবদুল গোলাম হক গোঁ গোঁ করে বললেন, "আচ্ছা, আবারও গেলে দেখা যাবে। আর টয়লেটে যাওয়াও তো এক কষ্ট। একটু আগে যখন বেরোলাম, করিডোরের বাতি গেলো নিভে। অন্ধকারে ধাক্কা খেলাম এক লোকের সাথে ... ওফ ... কী এক জ্বালা! এ কারণেই আমার এই দেশে থাকতে ইচ্ছা করে না। নিরিবিলিতে একটু টয়লেটে যাওয়ার উপায়ও নাই, মানুষ গিজগিজ করে!"

মিস জুলিয়া বললেন, "ঠিকাছে স্যার, এরপর দরকার হলে আমি আর শহিদুল আপনার সাথে যাবো টর্চ নিয়ে।"

আবদুল গোলাম হক বললেন, "ঠিকাছে ঠিকাছে! এইবার দ্যাখো ট্রেনের দাম কতো!"

মিস জুলিয়া বললেন, "স্যার, সচলায়তনেও পেলাম না।"

আবদুল গোলাম হক বললেন, "কেন, ওরা জানে না?

মিস জুলিয়া বললেন, "না স্যার, জানে তো না-ই, উল্টা মশকরা করছে। বলছে, আপনাকে উত্তম উত্তম জাঝা! আর বিপ্লব।"

আবদুল গোলাম হক গজগজ করে উঠলেন, "যত্তোসব বখাটের আড্ডা ... আমি পরশুদিনই আবার দুবাই ফিরে যাবো!"
দুই.

গোয়েন্দা ঝাকানাকা আনমনে ঘড়ি দেখছিলেন একটু পর পর। পুলিশের গোয়েন্দা শাখার দুঁদে কর্তা কিংকর্তব্যবিমূঢ় চৌধারি, ওরফে কিংকু চৌধারি তাই কৌতূহলভরে প্রশ্ন করলেন, "ব্যাপার কী স্যার? একটু পর পর ঘড়ি দেখছেন কেন?"

ঝাকানাকা ভুরু কুঁচকে তাকালেন। বললেন, "ঘড়ি তো একটু পর পরই দেখতে হয়, চলছে কি না! ঘড়ি মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায় যদি?"

কিংকু চৌধারি থতমত খেয়ে বললেন, "তা ঠিক। কিন্তু সে তো আপনি না দেখলেও বন্ধ হবে।"

ঝাকানাকা বললেন, "আরে কী আপদ! তাই তো চোখে চোখে রাখছি! বন্ধ হয়ে গেলেই এটা খুলে ফেলবো।"

কিংকু চৌধারি বললেন, "তারপর?"

ঝাকানাকা বললেন, "তারপর ব্যাটারি পাল্টে ফেলবো। এই দেখুন, নতুন ব্যাটারি নিয়ে এসেছি সাথে।" পকেট থেকে সেলোফেনের প্যাকেটে ভরা ব্যাটারি দেখালেন তিনি।

কিংকু চৌধারি বললেন, "তাহলে এখনই পাল্টে ফেলুন না, বার বার তাহলে আর ঘড়ি পাহারা দিতে হয় না।"

ঝাকানাকা বললেন, "কেন, এখনো তো ঘড়ি চলছে, থামেনি তো!"

কিংকু চৌধারি বললেন, "তা ঠিক, কিন্তু ...।"

ঝাকানাকা বললেন, "কিন্তু আর কিছুই না, আপনাদের আলসেমি! একটা লোক কাজ করে খাচ্ছে, এ ব্যাপারটা আপনারা পুলিশেরা সহ্য করতে পারছেন না। একটা ঘড়িকে দেখেশুনে রাখছি, এই তত্ত্বাবধান আপনার পছন্দ হচ্ছে না। কারণ আপনি পুলিশ। কোন কিছুই দেখেশুনে রাখা আপনাদের পছন্দ না। একটা কিছু হলে পরে তারপর আপনারা নড়েনচড়েন। আমার ঘড়িটা খোয়া গেলেই মনে হয় আপনি খুশি হন?"

কিংকু চৌধারি হেঁ হেঁ করে হাসলেন একটু। বললেন, "যা-ই বলুন স্যার, গেলো গল্পে আপনার আন্দাজ মেলেনি একদম! বিষ্ণুমূর্তি স্যার, পাওয়া গেলো টুকরাটাকরা অবস্থায় ...।"

ঝাকানাকা বললেন, "বাজে কথা বলবেন না জনাব চৌধারি। ভুল লোককে প্যাঁদানোর কারণেই মূর্তিটার এই হাল। ঠিক লোকগুলিকে প্যাঁদালে মূর্তি সোজা জাদুঘরে ফেরত আসতো অক্ষত অবস্থায়।"

কিংকু চৌধারি কিছু বলতে যাবেন, এমন সময় টিকেটচেকার এসে বললো, "আপনাদের টিকেট প্লিজ।"

কিংকু চৌধারি পকেট থেকে টিকেট বার করে চেকারের হাতে দিলেন। চেকার আনমনে সেটার একটা পাতা ছিঁড়ে আরেকটা পাতায় খসখস করে টিকমার্ক দিয়ে টিকেট ফিরিয়ে দিলো।

চেকার চলে যাবার পর ঝাকানাকা বললেন, "সময় হয়েছে প্রায়, তৈরি হোন।"

কিংকু চৌধারি চমকে গিয়ে বললেন, "কেন কেন?"

ঝাকানাকা বললেন, "দেখুন, বদরু খাঁকে আমি প্রায় ছোটবেলা থেকে চিনি। সে-ও সবসময় ধরা খায় তার আলসে স্বভাবের জন্য। অবশ্য আপনারা ওরচেয়েও অলস, তাই আমি আপনাদের তাড়া না দিলে সে ধরা পড়ে না।"

কিংকু চৌধারি বললেন, "কিন্তু সময় হয়েছে বুঝলেন কিভাবে?"

ঝাকানাকা বললেন, "এই চেকারকে আপনি চেনেন?"

কিংকু চৌধারি বললেন, "না, আমি কিভাবে চিনবো?"

ঝাকানাকা বললেন, "আমি চিনি। এর নাম ইদ্রিস আলি। আজকে সকাল থেকে ওকে আমার লোক ফলো করছে। রাতে ট্রেনে ওঠার আগ পর্যন্ত সে নজরবন্দি ছিলো। আমার লোক জানিয়েছে, এই লোক খাঁটি ইদ্রিস আলি।"

কিংকু চৌধারি থতমত খেয়ে বললেন, "তো?"

ঝাকানাকা বললেন, "কিছুক্ষণের মধ্যেই ইদ্রিস আলি আক্রান্ত হবে বদরু খাঁ-র হাতে। চেকারের ছদ্মবেশ নিয়ে বদরু খাঁ ঢুকে পড়বে হক সাহেবের কামরায়।"

কিংকু চৌধারি বললেন, "কিন্তু হক সাহেবের কামরার আশেপাশে তো সাদাপোশাকের পুলিশ আছে পাহারায়! ওনার নিজস্ব সিকিউরিটির লোক শহিদুলকেও তো দেখলাম ট্রেনে!"

ঝাকানাকা বললেন, "আমি কিছুক্ষণ আগে টয়লেটে গিয়েছিলাম, আপনার মনে পড়ে?"

কিংকু চৌধারি বললেন, "হুঁ, মনে পড়ে। বলেছিলেন, নাম্বার ওয়ান।"

ঝাকানাকা বললেন, "হ্যাঁ। তখন গিয়ে দেখি, টয়লেটের মধ্যে কে বা কাহারা শহিদুলকে পেঁদিয়ে অজ্ঞান করে ফেলে রেখে গেছে। বাধ্য হয়ে আমি জানালা দিয়ে নাম্বার ওয়ান করে এসেছি।"

কিংকু চৌধারি ধড়ফড় করে আসন ছেড়ে দাঁড়ালেন, "বলেন কী? য়্যাঁ? সর্বনাশ ...!"

ঝাকানাকা বললেন, "ব্যস্ত হবেন না। মাঝে মাঝে ট্রেনের জানালা দিয়ে নাম্বার ওয়ান করার অভ্যেস থাকা দরকার। আমি তো গেলবছর কাম্পুচিয়ায় প্লেনের জানালা দিয়ে নাম্বার টু পর্যন্ত করেছি ... আর এ তো সামান্য ট্রেন ...।"

কিংকু চৌধারি বললেন, "তাই বলে ... শহিদুলকে কে পেটালো?"

ঝাকানাকা বললেন, "হয়তো বদরু খাঁ! হয়তো অজ্ঞান পার্টির লোক! হয়তো পিকলু পটল!"

কিংকু চৌধারি চমকে গিয়ে বললেন, "পিকলু পটল! তার কথা আপনি জানলেন কী করে?"

ঝাকানাকা মুহাহাহাহাহাহা করে হেসে উঠলেন। বললেন, "পিকলু পটলের কথা আমি জানবো না-ই বা কেন? যেভাবে আপনারা তার ছবি, জীবনী, চিঠিপত্র সব ছাপিয়ে দিচ্ছেন আপনাদের ভাড়াটে পত্রিকা আমোদী রসময়-এ! তার কথা ছেলেবুড়ো সকলেই জানে। পিকলু পটলের পোস্টার বিক্রি হচ্ছে দেখলাম আমার মহল্লায়। তাকে নিয়ে ইস্তফা মনোয়ার সুজুকি নাটক পর্যন্ত বানিয়ে ফেলেছে। তাকে নিয়ে ফালতু কবির প্রোডাকশনস এর সিনেমা তৈরি হচ্ছে, হাতে মারি! ... কোথায় থাকেন আপনি?"

কিংকু চৌধারি সাগ্রহে জিজ্ঞেস করলেন, "নাটকটা দেখেছেন?"

ঝাকানাকা বললেন, "সময় পাইনি। মিস মিলি দেখেছে বললো, ওর কাছ থেকে পরে সময় করে শুনে নেবেন। কিংবা ইউটিউবে খোঁজ নিয়ে দেখবেন আছে কি না ...।"

কিংকু চৌধারি লজ্জা পেয়ে বললেন, "না, মানে, মিস মিলি তো কিছু বললো না নাটকটা দেখে ...। আর ইউটিউব দেখতে বলছেন? ইন্টারনেটে লগ ইন করা-ই এক দায়, আর ইউটিউব তো কোন ছার ...!"

ঝাকানাকা বললেন, "তবে আপনি যে পিকলু পটলের সন্ধান পেয়েই এ ট্রেনে আজ আমার সাথে এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চড়েছেন, তা আমি কিভাবে জানলাম, সেটা আপনাকে বলা যাবে না। সেটা আমার গোপন রহস্য, পারলে আপনি সমাধান করুন গিয়ে।"

কিংকু চৌধারি মলিন মুখে বললেন, "আর বলবেন না স্যার, হাড্ডিচর্বি এক হয়ে যাচ্ছে এই পিকলু শালার পেছনে ছুটতে গিয়ে! জেল থেকে পালিয়ে শালা আমার জীবনটা বরবাদ করে ছাড়ছে! সেদিন বিশ্বব্যাঙ্কের কান্ট্রি ডিরেক্টরের পকেট মেরেছে স্যার! আমাদের তো চাকরি টেকানো নিয়েই মুশকিল! বড় বড় স্যারেরা ফোন করে ধমকায় রোজ!"

ঝাকানাকা হাসলেন। বললেন, "আপনার চাকরি অনেক আগেই যাওয়া উচিত ছিলো। অবশ্য আপনারটা গেলে পুলিশের আরো আরো কর্তারও যাওয়া উচিত। যাকগে, চলুন, আগে আমার শিকার পাকড়াও করি।"

কিংকু চৌধারি বললেন, "আগে মানে? স্যার, আপনি কি পিকলু পটলকে ট্রেস করে ফেলেছেন?"

ঝাকানাকা চোখ টিপে বললেন, "ঐটা চার নাম্বার চ্যাপ্টারে গিয়ে জানতে পারবেন। এখন আপনার বন্দুকে গুলি ভরে নিন। বদরু খাঁ কিন্তু ভয়াবহ চিজ!"

কিংকু চৌধারি মাথা নেড়ে পকেটে হাত ঢুকিয়ে পিস্তল বার করতে গিয়ে থমকে গেলেন, তারপর আর্তনাদ করে বললেন, "স্যার, আমার পিস্তল! আমার পিস্তল হারিয়ে গেছে স্যার!"

ঝাকানাকা গোঁফ চোমড়াতে চোমড়াতে বললেন, "হারিয়ে গেছে না পিকপকেট হয়েছে?"

কিংকু চৌধারির কালোপানা মুখটা রাগে লাল হয়ে গেলো। তিনি হুঙ্কার ছেড়ে বললেন, "বটে? কিংকু দারোগার পকেটে হাত! তবেরে শয়তান ...!"

ঝাকানাকা চোখ বুঁজে মুহাহাহাহাহাহা করে হাসলেন। বললেন, "তাবৎ এশিয়ার সবচেয়ে ধুরন্ধর পকেটমার পিকলু পটল এই ট্রেনে আপনার সঙ্গী, তা জেনেও আপনি আপনার পিস্তল কী করে পকেটে গুঁজে ঘুরে বেড়ান আমি বুঝি না। আমার মতো শোল্ডার হোলস্টারে রাখতে পারতেন না?"

কিংকু চৌধারি ফ্যাকাসে মুখে বললেন, "চিন্তার কিছু নাই স্যার, আমার ব্যাগে আরেকটা পিস্তল আছে।"

ঝাকানাকা বললেন, "ঠিকাছে, ওটা বার করে গুলিটুলি ভরে নিন। বদরু খাঁ কিন্তু বাগে পেলে একদম ফুঁড়ে দেবে আপনাকে!"

কিংকু চৌধারি কেবিনের তাকের ওপর রাখা ব্যাগ নামিয়ে পিস্তল খুঁজতে লাগলেন। ঝাকানাকা শোল্ডার হোলস্টার থেকে নিজের বিখ্যাত ষোলঘরা রিভলভার "ষোড়শী" বার করে পরীক্ষা করতে লাগলেন। বদরু খাঁর সাথে প্রায়ই তাঁকে গুলিবিনিময় করতে হয়। বদরু খাঁর বারো ছররার দোয়াজদাহাম পিস্তলের সাথে মোকাবেলা করার জন্য জিঞ্জিরা থেকে বিশেষ অর্ডার দিয়ে তৈরি করা রিভলভার এই ষোড়শী, চোরডাকাতরা এর চেহারা দেখলেই অনেক সময় ঘাবড়ে গিয়ে বন্দুকপিস্তল ফেলে দেয়।

কিংকু চৌধারি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সোজা হলেন। "যাক, স্যার, এই পিস্তলটা খোয়া যায়নি। এটাতে সবসময় গুলি ভরাই থাকে ...।" বলতে বলতে তিনি ঝাকানাকার রাগরক্তিম চেহারা দেখে থেমে গেলেন। "কী ব্যাপার স্যার?"

ঝাকানাকা তাঁর ষোড়শীকে বাড়িয়ে ধরলেন কিংকু চৌধারির দিকে। কিংকু চৌধারি সেটা হাতে নিয়ে দেখলেন উল্টেপাল্টে। "সে কি স্যার, গুলি ভরেননি কেন এখনো?"

ঝাকানাকা বললেন, "দুপুরে আমি নিজের হাতে গুনে গুনে ষোলটা গুলি ভরেছিলাম এটাতে।"

কিংকু চৌধারি বললেন, "এখন খালি কেন?"

ঝাকানাকা বললেন, "পিকলু পটলের কাজ। রিভলভারটা রেখে গেছে, তবে গুলিগুলো ঝেড়ে দিয়েছে!"
তিন.

বদরু খাঁ ইদ্রিস আলির হাত পিছমোড়া করে বাঁধতে বাঁধতে বললো, "ইদ্রিস আলি! ... বেশি চোট লাগেনি তো?"

ইদ্রিস আলির চোখ দিয়ে দরদর করে অশ্রু ঝরতে লাগলো।

বদরু খাঁ গিঁট টেনে পরীক্ষা করে দেখতে দেখতে বললো, "এই যে প্যাঁচটা কষিয়ে তোমাকে বাঁধলাম, এই গিঁট্টুর নাম জাহাজবন্ধন গিঁট্টু। মোগল আমলে এই গিঁট মেরে আমাদের চট্টগ্রাম বন্দরে বড় বড় সমুদ্রগামী জাহাজ ডকের সাথে বাঁধা হতো। এমনও হয়েছে, যে ঝড়ে দড়ি ছিঁড়ে গেছে, কিন্তু গিঁট অটুট রয়েছে! কিছুদিন আগে একটা ফারসী পুঁথি পাওয়া গিয়েছিলো সাতকানিয়ায়। পুঁথিটা আমিই চুরি করেছিলাম যাদুঘর থেকে। পথে যেতে যেতে বোরড হয়ে যেতে পারি ভেবে যাদুঘরের এক ফারসী-দুরস্ত কর্মকর্তাকেও কিডন্যাপ করেছিলাম সে কারণে। তিনি আমাকে সেদিন সারারাত মাইক্রোবাসে বসে বসে দুলে দুলে পুঁথি পড়ে আর অনুবাদ করে শুনিয়েছিলেন। ... আহ, ইতিহাস! বড় ইন্টারেস্টিং জিনিস। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষাটা পাস করতে পারলে আমি হয়তো ইতিহাসের ছাত্রই হতাম! তো, ঐ পুঁথিতে এই গিঁট্টুর সব রহস্য এঁকে দেয়া ছিলো। ভোরবেলা যখন আমি চিলমারি হয়ে বর্ডার টপকাচ্ছি, তখন ভাবলাম, যাদুঘরের ভদ্রলোকের ওপরই এই গিঁট একটু পরীক্ষা করে যাই না কেন? দিলাম বেচারাকে গিঁট মেরে। আজ থেকে এক বছর আগের ঘটনা। এখনো বেচারা ঐ মাইক্রোবাসেই বাঁধা আছে। কোন শালার ব্যাটা খুলতে পারেনি ঐ দড়ি। ড্রাইভার বাধ্য হয়েছে গাড়িটা সস্তায় ঐ যাদুঘরওয়ালার বউয়ের কাছে বেচে দিতে। বেচারা এখন গ্যারেজে বাস করে কাটিয়ে দিচ্ছে জীবনটা। ... কী করে ছুটবে, বলো? গিঁট খোলার তরিকা জানি দুনিয়াতে কেবল আমি, আর পুঁথিটা যে গুজরাটির কাছে বিক্রি করেছি, সে।"

ইদ্রিস আলি ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলে, বলে, "স্যার গো, রহম করেন!"

বদরু খাঁ এক ভুরু উত্তোলন করে বলে, "স্যার? তুমি আমায় স্যার ডাকলে শেষ পর্যন্ত? যখন তোমাকে ভদ্রভাবে গিয়ে বলেছিলাম, ইদ্রিস আলি, চুপচাপ বোসো, তোমাকে কেবল একটু বেঁধে এখানেই, সীটের কোণায় বসিয়ে থুয়ে যাবো। তখন তো তুমি খুব শালার ব্যাটা বলে গালি দিয়েছিলে আমাকে। তোমার এত বড় সাহস, চড় তুলে আমাকে মারতেও এসেছিলে! তুমি জানো, আমার গায়ে মশা পর্যন্ত ভয়ে বসে না? আর বসলেও যে আমি কিছু করতে ভয় পেতাম, কারণ আমার নিজের গায়ে হাতো তোলার সাহস আমার নিজের পর্যন্ত নেই! এক পল্টন গুর্খা পেয়াদা কুকরি নিয়ে আমাকে সেবার মারতে এসেছিলো বার্মিংহ্যামে, দশটি বছর আগে, আজও নেপালে তাদের গ্রামে সন্ধ্যেবেলা তাদের কান্নার আওয়াজে লোকে টিভি দেখতে পারে না, এমনি পেঁদিয়েছিলাম সবক'টাকে! আর তুমি, ইদ্রিস আলি, একজন দুর্নীতিবাজ, ভুঁড়ো, টেকো টিকিটচেকার, যে কি না গত দশ বছরে একটা বার ডন বৈঠকও ভাঁজোনি, এসেছিলো আমাকে মারতে! ... প্রথমে ভেবেছিলাম, তোমাকে পিটিয়ে ছাতু করে টয়লেটে গুঁজে দেবো। কিন্তু টয়লেটটা সেই কখন থেকে কে যেন ভেতরে ঢুকে জাম করে রেখেছে, বাধ্য হয়ে আমাকে ট্রেনের জানালা দিয়ে নাম্বার টু সারতে হয়েছে, শালা! আর তোমাকে এখানে ফেলে যেতে হচ্ছে এই কেবিনে!"

ইদ্রিস আলি কাঁদতে কাঁদতে বললো, "কেন মিছিমিছি গরীবের জান কালি করছেন স্যার? আমি আপনার কী ক্ষতি করলাম? খালি তো টিকেট দেখতে চেয়েছিলাম! ... এই অপরাধে আমাকে এরকম করে মারলেন? এখন আবার জাহাজমারা গিঁট দিয়ে বাঁধলেন? এ-ই কি আপনার ইনসাফ, স্যার?"

বদরু খাঁ মুহাহাহাহাহাহাহাহাহা করে হাসে। বলে, "শুধুই কি টিকেট দেখতে চেয়েছিলে? টিকেট দেখাতে পারিনি বলে ঘুষ চাওনি? যখন বললাম, আমি ঘুষ দেই না, তখন বলোনি, পুলিশ ডেকে ধরিয়ে দেবে ঘুষ না দেয়ার অপরাধে? য়্যাঁ? তারপর যখন মিষ্টি করে বললাম এসো বেঁধে তোমার খাটনি ক্ষণিকের জন্যে লাঘব করে দিচ্ছি, তখন পাঞ্জা বাগিয়ে এলে আমাকে থাপড়াতে? এখন বাকিটা জীবন কাটাও এই ট্রেনে, এই কেবিনে। বাংলাদেশ রেলওয়ে তো আর তোমার বউয়ের কাছে এই বগিটা বেচে দেবে না, তোমার কপাল যাদুঘরঅলার চেয়ে খারাপ। কী আর করা, কর্মফল!"

ইদ্রিস আলি কাঁদতে কাঁদতে বলে, "স্যার, আপনার বিচার আল্লায় করবে! এমন জুলুম আল্লা সহ্য করবে না! আল্লার আরশ কেঁপে উঠবে আজ আমার মাতমে। ভ্যাঁ ....!"

বদরু খাঁ হাসে মুহাহাহাহাহাহা করে। বলে, "তোমার মাতম আল্লার আরশ তো দূরের কথা, এই কেবিন পেরিয়েই বেরোতে দেবো না!"

ইদ্রিস আলি বলে, "না না স্যার, দোহাই আপনার, জানে মারবেন না!"

বদরু খাঁ বলে, "জানে মারবো কি মারবো না, নির্ভর করছে তোমার পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার ওপর।"

ইদ্রিস আলি বলে, "মানে?"

বদরু খাঁ বলে, "মানে হচ্ছে, তোমার একটা মোজা খুলে সেটা আমি তোমার মুখে গুঁজে দেবো! যদি তোমার মোজা পরিষ্কার হয়, তুমি বেঁচে থাকবে, আর যদি আমার মোজার মতো ময়লা হয়, তুমি মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই মরে যাবে।"

ইদ্রিস আলি কিছু বলতে গিয়ে হঠাৎ টলে পড়ে যায় সীটের ওপর। বদরু খাঁ মুহুহুহুহুহু হেসে উঠে এক জোড়া গ্লাভস পরে নেয়, তারপর ইদ্রিস আলির একটা মোজা খুলে নিয়ে তার মুখটা কষে বাঁধে। তারপর ইদ্রিস আলির রেলওয়ের মনোগ্রাম আঁকা কোটটা নিজের শরীরের ওপর চাপায়।

"উঁহুহুহু। টাইট হচ্ছে।" বদরু খাঁ একটু হতাশ হয়, তারপর ব্যাগ থেকে আয়না বার করে নিজেকে দেখে। বলে, "নাহ, মানাচ্ছে না। আমাকে শালার শুধু কয়েদিদের ডোরাকাটা পায়জামাতেই যে কেন মানায় বুঝি না! নাহ ... শিগগীরই বুবি রসুলকে কিডন্যাপ করে আমার জন্য কিছু নতুন ফ্যাশনের জামাকাপড় ডিজাইন করাতে হবে!"

কেবিনের বাতি নিভিয়ে হাতে একটা ব্যাগ নিয়ে বদরু খাঁ বেড়ালের মতো নিঃশব্দে এগিয়ে যায় আবদুল গোলাম হকের কেবিনের দিকে।

কেবিনের দরজার সামনে কিছুক্ষণ কান পেতে এদিক ওদিক শোনে বদরু খাঁ। চারদিকে শুধু ট্রেনের ঝুকঝুক শব্দ।

দরজায় টোকা দেয় সে। "এক্সখিউজ মি, টিকিট প্লিজ!"

মিস জুলিয়া কেবিনের দরজা খুলে দেন, "কে? ওহ, চেকার সাহেব?"

ভেতর থেকে আবদুল গোলাম হক বলেন, "শহিদুল গাধাটা কোথায় গেলো?

বদরু খাঁ কেবিনের ভেতর ঢুকে বিনীত একটা হাসি দেয়, "টিকেট প্লিজ!"

মিস জুলিয়া তাঁর হাতব্যাগ থেকে গোলাপি খাম বার করেন একটা, সেটা থেকে বার করেন টিকিট। "এই যে নিন।"

বদরু খাঁ মুগ্ধ হয়ে দ্যাখে মিস জুলিয়ার কান্ডকারখানা। তারপর বলে, "বাহ, কী চমৎকার টিকেট! এটা রইলো আমার কাছে। পরে কাজে লাগবে।"

মিস জুলিয়া থতমত খেয়ে বলেন, "মানে?"

বদরু খাঁ মধুর হাসি হেসে বলে, "মানে খুব সহজ।" এই বলে সে পকেট থেকে বার করে তার দেখতে-ভয়ানক-শুঁকতে-ভয়ানক-শুনলে-পরে-আরো-ভয়ানক দোয়াজদাহাম পিস্তল।

মিস জুলিয়া অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান সীটের ওপরে।

আবদুল গোলাম হক সটান দাঁড়িয়ে যান সীট ছেড়ে, "হচ্ছেটা কী? বলি, হচ্ছেটা কী?"

বদরু খাঁ জিভ দিয়ে চুকচুক করে শব্দ করে। তারপর সে ফেরে উত্তেজিত আবদুল গোলাম হকের দিকে।

"ডাকাতি হচ্ছে, আবার কী? বসুন চুপটি করে। নইলে কিন্তু এই পিস্তল পুরোটা খালি করবো আপনার টাকের ওপর!"

আবদুল গোলাম হক মুখ চুন করে বসে পড়েন।

বদরু খাঁ মিস জুলিয়ার পাশে বসে পড়ে। "বড়ই সুন্দরী আপনার সেক্রেটারি, কী যেন নাম ... ওহ, হ্যাঁ, মিস জুলিয়া! একেবারে সুচিত্রা সেন! আপনার কপালটা চওড়া হলেও ভালো স্যার! সবারই একটা করে সুন্দরী সেক্রেটারি থাকে। আপনার আছে, মিস জুলিয়া। বদের হাড় গোয়েন্দা ঝাকানাকা বদমাশটারও একজন আছে, মিস মিলি। আমি কত খুঁজলাম একজন সেক্রেটারি, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিলাম, বিশ্ববিখ্যাত দস্যুসম্রাট বদরু খাঁ একজন সুন্দরী, তন্বী, চালাকচতুর, চটপটে, পায়খানার পাইপ বেয়ে উঁচু বিল্ডিং আরোহণে পারদর্শী সেক্রেটারি প্রয়োজন। ... আমার শালা কপালটাই খারাপ!"

আবদুল গোলাম হক বললেন, "পাও নাই?"

বদরু খাঁ বললো, "নাহ! একজন চাক্কা সাবান ফটো সুন্দরী প্রতিযোগিতায় রানার আপ যোগাযোগ করেছিলো, কিন্তু সে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে জানে না। এক সুন্দরী কম্পিউটার সায়েন্স পড়ুয়া মেয়ে অ্যাপ্লাই করলো, সে পায়খানার পাইপ তো দূরের কথা, সিঁড়ি বেয়েই উঠতে নারাজ। ... পায়খানার পাইপ বেয়ে যে মহিলা উঠতে পারেন, তিনি ইন্টারনেট ব্যবহারেও বেশ চটপটে ছিলেন, কিন্তু দেখতে স্যার অনেকটা আপনার মতোই, কালো, ভুঁড়ো, টেকো। সেক্রেটারি কি আর অমন হলে চলে, আপনিই বলুন?"

মিস জুলিয়া নড়েচড়ে উঠে বসেন।

বদরু খাঁ মুগ্ধ কণ্ঠে বলেন, "আপনি কি পায়খানার পাইপ বেয়ে উঁচু বিল্ডিঙে উঠতে পারেন?"

মিস জুলিয়া আবারও টলে পড়ে অজ্ঞান হয়ে যান।

বদরু খাঁ মাথা নাড়ে। "নাহ, উনি বড় সুশীলা। ফিটের ব্যারাম আছে। ওনাকে দিয়ে হবে না। কাজের সময় ওনার নাকে চামড়ার জুতা ধরার সময় কই আমার?

আবদুল গোলাম হক বললেন, "কী চাও তুমি? রাতদুপুরে ট্রেনের কামরায় ঢুকে আমার সেক্রেটারির দিকে কুনজর দিচ্ছো? জানো, তোমাকে আমি পুলিশে দিতে পারি?"

বদরু খাঁ কেবিন কাঁপিয়ে হাসে ঠা ঠা করে, পাক্কা দুই মিনিট। তারপর বহুকষ্টে হাসি সামলে বলে, "সাদা পোশাকের পুলিশের কথা বলছেন তো স্যার? সর্বমোট ছয়জন ছিলো। ইন ফ্যাক্ট, এখনও আছে, মরেনি। তবে ওনাদের অবস্থাও এই সফেদ মিস জুলিয়ার মতোই। ওনারাও ফিটের ব্যারামের শিকার। কারণটাও এই আমিই। মৃদু প্যাঁদাতে হয়েছে সকলকেই। এদের মধ্যে দু'জন আবার কমান্ডো ট্রেনিং পাওয়া, তাদের একটু বেছে প্যাঁদাতে হয়েছে। তবে ভয় নেই, বেঁচে উঠবে সকলেই। কাল সকাল সকাল চিটাগাং মেডিকেলে নিয়ে ভাঙা হাড়গুলি জোড়া দিতে পারলে চাকরিও টিকে যাবে।"

আবদুল গোলাম হকের মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে যায়। তিনি কাঁদো কাঁদো গলায় বলেন, "কী চাও তুমি, শয়তান?"

মিস জুলিয়া আবারও উঠে বসেন।

বদরু খাঁ উঠে দাঁড়ায়, বলে, আমি আসলে আমাদের তিনজনের জন্যেই কিছু উপহার এনেছি। ... নিন ম্যাডাম, ব্যাগটা খুলুন।" হাতের ব্যাগটা মিস জুলিয়ার দিকে এগিয়ে দেয় সে।

মিস জুলিয়া ভয়ে ভয়ে ব্যাগটা খোলেন। সেটার ভেতর থেকে বার হয় একটা কালো স্কার্ফ, আর দুইটা লুঙ্গি।

"এসব কী?" আবদুল গোলাম হক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যান।

বদরু খাঁ হাসে ঠা ঠা করে। বলে, "স্কার্ফটা হচ্ছে আপনার এই লাস্যময়ী সেক্রেটারি মিস জুলিয়ার জন্য। লুঙ্গিদু'টো আপনার আর আমার জন্যে।"

মিস জুলিয়া ফুঁসে উঠে বলেন, "এর মানে কী?"

বদরু খাঁ চোখ টিপে বলে, "মানে খুব সোজা। এখন আমি আর জনাব হক দু'জনেই এই লুঙ্গিদু'টি ব্যবহার করে কাপড় পাল্টাবো। আর আপনি যেহেতু এই দৃশ্য সহ্য করতে পারবেন না, তাই আপনি এই স্কার্ফটা দিয়ে নিজের চোখ বেঁধে বসে থাকবেন ন্যায়মূর্তির মহিলাটার মতো!"

আবদুল গোলাম হক উত্তেজনায় তোৎলা হয় পড়েন, বলেন, "ক্কী ... ক্কী বলছো তুমি? কী-কী-কীসের কাপড় পাল্টাবো?"

বদরু খাঁ এবার ঘর কাঁপিয়ে হাসে। বলে, "এলিমেন্টারি, মাই ডিয়ার হক! আপনার জাঙ্গিয়াতে যেসব অমূল্য হীরের টুকরো সেলাই করা আছে, সেই জাঙ্গিয়াটাই আপনি খুলে আমাকে দেবেন। আর আমি সেই জাঙ্গিয়াটা নিজে পরে আমারটা আপনাকে দিয়ে দেবো! মুহাহাহাহাহাহাহাহা!
চার.

কিংকু চৌধারি একটু অভিমান করেন, বলেন, "চার নাম্বার চ্যাপ্টারে তো এসে পড়েছি, এখন একটু বুঝিয়ে বলুন না!"

ঝাকানাকা হাসেন। বলেন, "আপনার সাদা পোশাকের লোকজনের হাল দেখলেন?"

কিংকু চৌধারি দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, বলেন, "হ্যাঁ! নির্মমভাবে পেঁদিয়েছে ব্যাটাদের। সবক'টাকে হাসপাতালে পাঠাতে হবে।"

ঝাকানাকা বলেন, "আপনার পুলিশ সব অজ্ঞান। হক সাহেবের দেহরক্ষী শহিদুলও অজ্ঞান। টিকেট চেকার ইদ্রিস আলি অজ্ঞান। বাকি রইলাম আমি, আপনি, মিস জুলিয়া, হক সাহেব আর বদরু গরুচোরাটা! এখন নাটকে আমরাই পাত্রপাত্রী।"

কিংকু চৌধারি বললেন, "পিকলু পটল? পিকলু পটলের কী হবে?"

ঝাকানাকা বললেন, "পিকলু পটলকে নিয়ে চিন্তা নেই। ওর একটা ব্যবস্থা হয়ে গেছে।"

কিংকু চৌধারি উত্তেজনায় সোজা হয়ে দাঁড়ান। "য়্যাঁ? বলছেন কী স্যার?"

ঝাকানাকা বললেন, "পিকলু পটল ছদ্মবেশে খুব ওস্তাদ, জানেন নিশ্চয়ই?"

কিংকু চৌধারি বলেন, "তা তো বটেই! কিন্তু হঠাৎ একথা বলছেন কেন স্যার?"

ঝাকানাকা হাসেন।

কিংকু চৌধারি বলেন, "আপনি কি বলতে চান, আমাদের মধ্যে কেউ একজন আসলে পিকলু পটল, ছদ্মবেশ নিয়ে আছে?"

ঝাকানাকা উদাস গলায় বলেন, "হোলেও হোতে পারে! যা-ই হোক, মাথা ঘামানোর দরকার নেই এ নিয়ে। আসুন এখন বদরু খাঁকে সাইজ করা যাক।"

ওদিকে কেবিনের ভেতরে চলছে এক করুণ দৃশ্য।

মিস জুলিয়া নিজে থেকেই স্কার্ফ দিয়ে নিজের চোখ বেঁধে বসে আছেন। আর আবদুল গোলাম হক দাঁত দিয়ে লুঙ্গি কামড়ে ধরে আছেন, যাকে বলে দাঁতে দাঁত চেপে।

বদরু খা হাসিমুখে বলে, "অণুবীক্ষণ লুঙ্গি, বাজারের সেরা লুঙ্গি! সাড়ে আটশো টাকা দিয়ে কেনা স্যার। দেখুন কি মসৃণ কলাপাতারঙা জিনিস। হেভি আরাম পাবেন স্যার পরে।"

আবদুল গোলাম হক নিজের জাঙ্গিয়া খুলতে খুলতে বলেন, "গমমমমমমমমমফফফফফফফফফ ...!"

বদরু খাঁ বলে, "আহাহা, আগে আন্ডি খুলুন, লুঙ্গির গিঁট বাঁধুন সহি কায়দায়, তারপর নাহয় আমার সুনাম গাইবেন দুয়েক কলি!"

আবদুল গোলাম হক এবার লুঙ্গির গিঁট দিতে দিতে বলেন, "তুমি কিভাবে জানলে আমার এই হীরে চালানের কথা?"

বদরু খাঁ লাজুক হাসে। বলে, "ফোর্বস এর ড়্যাঙ্কিঙে আমি এশিয়ার সবচেয়ে ভয়ানক দস্যু ছিলাম গত তিন বছর ধরে। তার আগে ছিলাম টানা চারবছর দ্বিতীয় স্থানে। আপনার এসব মামুলি হীরে চালানের কারবার জানা আমার সাগরেদদের কাজ। ... তবে আপনার বোধহয় মনে আছে, কিছুদিন আগে আপনার স্ত্রীর সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছিলো ঠমক টিভির পক্ষ থেকে? ঢ্যাঙামতো এক মেয়ে সাংবাদিক গিয়েছিলো ইন্টারভিউ নিতে, যার পেছনে চিমটি কাটতে গিয়ে আপনি আঙুলে ব্যথা পেয়েছিলেন?"

আবদুল গোলাম হক চমকে ওঠেন।

মিস জুলিয়া বলেন, "মুনিয়া সরফরাজ!"

বদরু খাঁ মুগ্ধ হাসি দ্যায় মিস জুলিয়ার দিকে তাকিয়ে। বলে, "ঠিক! মুনিয়া সরফরাজ সেজেই গিয়েছিলাম বটে! হাঁ স্যার, সিনসিয়ারলি ইয়োরস!"

আবদুল গোলাম হক চমকে ওঠেন আরো!

"সেদিনই আপনার স্ত্রীকে হিপনোটাইজ করে সব খবর বার করে নিয়েছি। উনি যে আপনার একটা জাঙ্গিয়াতে কয়েকদিন ধরে বেশ কিছু অমূল্য হীরের টুকরো সেলাই করছেন বসে বসে, সে খবর তাঁর কাছ থেকেই পাওয়া। আর আপনি কবে চিটাগং যাচ্ছেন সে খবর তো টেলিফোনে একটু আড়ি পাতলেই জানা যায়!"

মিস জুলিয়া বলেন, "স্যার, আপনাদের কি জামা পাল্টানো শেষ?"

বদরু খাঁ বলে, "তিষ্ঠ, কাজ অতি অল্প অবশিষ্ট!"

আবদুল গোলাম হক এবার নিচু হয়ে পা গলিয়ে নিজের আন্ডি বার করে বদরু খাঁর হাতে দিতে গিয়ে থমকে যান। অস্ফূটে বলেন, "এ কী!"

বদরু খাঁ হেসে ওঠে ঠা ঠা করে। "গোলাপি? গোলাপি আন্ডি পরেন নাকি আপনি? তা-ও সবুজ ফুল আঁকা? ছি ছি স্যার, আপনার এ-ই রুচি! ... উঁহুহু মিস জুলিয়া, বাঁধন আলগা করে দেখবেন না এই জিনিস, আপনি আবারও ফিট খেতে পারেন! আমার নিজেরই তো গা গুলাচ্ছে দেখে! ... দুঃখ করবেন না স্যার! জাঙ্গিয়ার মতো জাঙ্গিয়া একটা দিচ্ছি আপনাকে। পুরুষের জাঙ্গিয়া হবে মিশকালো! আমারটা অবশ্য কেনার সময় ধূসর ছিলো, তবে এখন বেশ কালচে মেরে গেছে! আমার কপাল খারাপ, নেহায়েত কোটি কোটি টাকার হীরে সেলাই করা আছে এতে, তা না হলে আপনার জাঙ্গিয়া আমি জানালা দিয়ে ছুঁড়ে বাইরে ফেলে দিতাম!"

এমন সময় হাট করে খুলে যায় দরজা, পিস্তল উঁচিয়ে ঘরে ঢোকেন গোয়েন্দা ঝাকানাকা, আর বেত উঁচিয়ে ঢোকেন কিংকু চৌধারি।

"খেল খতম, বদরু খাঁ!" ঝাকানাকা গর্জে ওঠেন। "পিস্তল মাটিতে না ফেললে গুনে গুনে তোর পোঁদে ছ'টা গুলি করবো!

বদরু খাঁ পিস্তল মাটিতে ফেলে দেয় খটাস করে।

কিংকু চৌধারি সযত্নে মিস জুলিয়ার চোখের বাঁধন খুলে দ্যান। "আপনার কোন সমস্যা হয়নি তো মিস?"

মিস জুলিয়া টলে পড়ে যান।

ঝাকানাকা বলেন, "চৌধারি, যে কোন ভদ্রমহিলাই পুলিশ দেখে ভয় পাবেন। সেন্টু খাবেন না।"

বদরু খাঁ হাসে। বলে, "পুলিশ না, তোকে দেখে অজ্ঞান হয়ে গেছে মিস জুলিয়া!"

কিংকু চৌধারি বলেন, "আমার মনে হয় এই গোলাপি জাঙ্গিয়া দেখে অজ্ঞান হয়ে গেছে মিস জুলিয়া!"

ঝাকানাকা বলেন, "থাকুন উনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে। পরে ময়লা একটা মোজা নাকের সামনে ধরলেই হবে।"

আবদুল গোলাম হক ফুঁপিয়ে ওঠেন, "আমার সর্বনাশ হয়ে গেছে!"

কিংকু চৌধারি বলেন, "কী সর্বনাশ হলো আবার? জাঙ্গিয়া তো উদ্ধার হলো শেষমেশ!"

আবদুল গোলাম হক বলেন, "ওটা আমার জাঙ্গিয়া নয়!"

বদরু খাঁ অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। "বটে?" জাঙ্গিয়া উঁচিয়ে বলে সে। "নিজের হাতে নিজের গা থেকে খুললেন, এখন পষ্টাপষ্টি অস্বীকার যাচ্ছেন? আপনারা, এই বিলিয়নেয়াররা পারেনও বটে! চোখের চামড়া নেই এক বর্গমিলিমিটারও!"

আবদুল গোলাম হক অসহায়রে মতো বলেন, "হ্যাঁ, আমি এটা পরেছিলাম, এটা নিজেই খুলেছি একটু আগে, কিন্তু এটা আমার আন্ডি নয়! আমি সবসময় ফ্রান্সের গোঁগোঁ ব্র্যান্ডের জাঙ্গিয়া পরি। এটা গোঁগোঁ নয়! গোঁগোঁর জাঙ্গিয়াতে গোঁগোঁর লোগো থাকে।"

বদরু খাঁর হাসি এবার একটু শুকিয়ে আসে, সে জাঙ্গিয়াটা নেড়েচেড়ে টিপেটুপে দ্যাখে, তারপর আর্তনাদ করে ছুঁড়ে ফেলে দ্যায় এক কোণে।

"সাবান! সাবান!" তারস্বরে চেঁচিয়ে ওঠে সে। "হীরা নাই এইটাতে! কোন কিছুই সেলাই করা নাই! শুধু শুধু এই হোঁৎকাটার আন্ডি ঘাঁটলাম এতক্ষণ! ডেটল! ডেটল!"

ঝাকানাকা হাসেন। "হক সাহেব, আপনার জাঙ্গিয়াটা তাহলে কোথায়?"

আবদুল গোলাম হক সীটে ধপ করে বসে পড়ে লুঙ্গি দিয়ে নিজের চোখ মোছেন। "জানি না!" ডুকরে ওঠেন তিনি। "সন্ধ্যাবেলা তো নিজের হাতে পরলাম!"

ঝাকানাকা বলেন, "আমি বলছি আপনার জাঙ্গিয়ার কী হয়েছে! আপনার জাঙ্গিয়া পিকপকেট হয়েছে!"

আবদুল গোলাম হক সটান দাঁড়িয়ে যান। দাঁড়িয়ে যান বিস্মিত কিংকু চৌধারিও। থমকে যায় বদরু খাঁ।

"পিকলু পটল, এশিয়া তথা গোটা দুনিয়ার অন্যতম সেরা পকেটমার, বেশ কিছুদিন আগে জেল ভেঙে পালিয়েছে, এ তো বোধহয় জানেন!" ঝাকানাকা বলে যান। "জেল ভেঙে বেরিয়েই সে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মোবাইল, কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের গভর্নরের কলম, বিমানবাহিনীপ্রধানের বিয়ের আংটি আর বিশ্বব্যাঙ্কের কান্ট্রি ডিরেক্টরের মানিব্যাগ হাতিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর সকলকে এক দফা কাঁচকলা দেখিয়েছে। আর ছদ্মবেশেও সে যথেষ্ঠ ঘাগু।"

আবদুল গোলাম হক বললেন, "আমি সন্ধ্যাবেলা আমার হীরেসেলাই করা জাঙ্গিয়াটা পরলাম! আর আপনি বলছেন ওটা পিকপকেট হয়েছে?"

ঝাকানাকা বললেন, "হ্যাঁ! পিকলু পটল, দুনিয়ার সকল পকেটমারের গুরু! আজ যখন আপনি ট্রেনে টয়লেটে যান, তখন মনে পড়ে, করিডোরের বাতি নিভে গিয়েছিলো? অন্ধকারে ধাক্কা খেয়েছিলেন এক লোকের সঙ্গে?"

আবদুল গোলাম হক অস্ফুটে বলেন, "হ্যাঁ, কিন্তু ...!"

ঝাকানাকা বলেন, "ওটাই ছিলো পিকলু পটল! ঐ সামান্য ধাক্কার সময়েই সে আপনার হীরেবসানো জাঙ্গিয়া খুলে নিয়ে এই গোলাপি সবুজ ফুল আঁকা বিশ্রী বাজেরুচির আন্ডিটা পরিয়ে দিয়েছিলো! জ্বি স্যার ... পিকলুর পক্ষেই কেবল এটা সম্ভব!"

বদরু খাঁ বুকে হাত দিয়ে বসে পড়ে।

ঝাকানাকা বলেন, "কিন্তু আমার চোখকে ফাঁকি দেয়া অত সোজা নয়। কারণ ঠমক টিভির সাক্ষাৎকারের দিন আমিও ছিলাম ওখানে! বদরু খাঁ, মনে আছে, নাস্তা পরিবেশন করতে এসেছিলো ঢ্যাঙামতো একটা মেয়ে, যার পেছনে চিমটি কাটতে গিয়ে তুমি আঙুলে ব্যথা পেয়েছিলে?"

বদরু খাঁ অস্ফূটে বলে, "নূরী ...!"

ঝাকানাকা সগর্বে বলেন, "সিনসিয়ারলি ইয়োরস! নূরীর ছদ্মবেশেই গিয়েছিলাম ক্লু এর নুড়ি কুড়াতে! ঠমক টিভির সাংবাদিক সেজে আসা বদরু খাঁ আর রেডিও ব্রডগেজের আরজে গফুর সেজে আসা পিকলু পটল, দু'টোকেই শনাক্ত করেছি সেদিন। আর তাই আজ পিকলুকে এক নজর দেখেই চিনতে অসুবিধে হয়নি!"

কিংকু চৌধারি এবার মিস জুলিয়াকে হাত পিছমোড়া করে পাকড়াও করেন। "বুঝেছি স্যার!" গর্জে ওঠেন তিনি। "পিকলু মিস জুলিয়ার ছদ্মবেশ নিয়েছে! আমার চোখকে ব্যাটা ফাঁকি দিতে পারবে না!"

ঝাকানাকা বিরক্ত হয়ে বলেন, "খামাকা বেচারিকে ব্যথা দেবেন না চৌধারি। উনি পিকলু পটল নন! পিকলু আজ ট্রেনে উঠেছে হক সাহেবের বডিগার্ড শহিদুলের ছদ্মবেশে!"

কিংকু চৌধারি থতমত খেয়ে মিস জুলিয়াকে ছেড়ে দেন।

আবদুল গোলাম হক আর্তনাদ করে ওঠেন, "এই জন্যই তো বলি, শহিদুল হারামজাদাটাকে আজ চোখে পড়েনি কেন! আমার সামনেই আসেনি আজ!"

ঝাকানাকা বলেন, "এসেছিলো, তবে অন্ধকারে! না এলে আপনার জাঙ্গিয়া চুরি হবে কখন?"

হক সাহেব লুঙ্গি দিয়ে অশ্রু মোছেন আবারো।

কিংকু চৌধারি বলেন, "কিন্তু স্যার, আপনি এতকিছু জানলেন কিভাবে?"

ঝাকানাকা বললেন, "আমার কাজই তো পর্যবেক্ষণ, জনাব চৌধারি! আজ শহিদুল ওরফে পিকলুকে সন্দেহ হবার পর থেকেই ওকে চোখে চোখে রেখেছি। ও যখন করিডোরের বাতিটা খুলছে, তখন আমি আড়ালে দাঁড়িয়ে। তারপর হক সাহেব বেরোলেন, আমি আমার নাইটভিশন চশমা লাগিয়ে সব কান্ডকারখানা দেখলাম সিনেমার মতো। পিকলু পটলের হাতের কাজ অসাধারণ! এক লহমায় কেমন করে হক সাহেবের প্যান্টের ভেতর থেকে জাঙ্গিয়া একটা খুলে এনে আরেকটা পরিয়ে দিলো, তা না দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না! অসাধারণ!"

আবদুল গোলাম হক বললেন, "এখন কথা হচ্ছে, আমার কোটি টাকা দামের জাঙ্গিয়াটা এখন কোথায়?"

ঝাকানাকা বললেন, "বলছি দাঁড়ান! তারপর হক সাহেব টয়লেটে গেলেন, পিকলু পটল রওনা দিলো পাশের বগির টয়লেটের দিকে। আমি আর দেরি করলাম না, সোজা গিয়ে শুরু করলাম প্যাঁদানো। আচ্ছামতো পিটিয়ে অজ্ঞান করে হাতপা বেঁধে ওকে রেখে এসেছি ঐ টয়লেটে। আর জাঙ্গিয়াটা আসলে পকেটে রাখার সাহস পাইনি, তাই ওটা আমাকেই পরে থাকতে হয়েছে। তবে জাঙ্গিয়াটা গোঁগোঁ কোম্পানির হলেও আমার ঢোলা হয়েছে অনেক, জুত লাগছে না কিছুতেই।"

বদরু খাঁ সটান উঠে দাঁড়ায় এবার।

ঝাকানাকা হাসেন। "উহুঁ বদরু, কোন বেচাল দেখলেই তোর ভুঁড়ি ফাঁসিয়ে দেবো একদম!"

আবদুল গোলাম হক কৃতজ্ঞচিত্তে বলেন, "ভাগ্যিস আপনাকে জানিয়ে চট্টগ্রাম রওনা হয়েছিলাম, নাহলে আজ যে কী ক্ষতি হতো! হীরেগুলি তো যেতই, প্রাণটাও যেতো এই ডাকুটার হাতে!"

ঝাকানাকা বলেন, "কোন চিন্তা নেই! এই ব্যাটাকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে তারপর আপনার জাঙ্গিয়া আপনাকে ফেরত দেবো হীরেসহ। বাহ, বদরু দেখি লুঙ্গি এনেছে একটা আমার জন্য! অনুবীক্ষণ লুঙ্গি নাকি, য়্যাঁ?"

বদরু খাঁ দাঁতে দাঁত পিষে বলে, "রোসো! বদরু খাঁকে পুলিশে দেয়া এতো সহজ হলে বদরু পুলিশের কব্জাতেই থাকতো সারাজীবন!"

ঝাকানাকা কিছু বলতে যাবেন, চোখের পলকে বদরু কেবিনের চেইন ধরে টান দেয়। ট্রেন ব্রেক কষে হঠাৎ, সবাই টাল হারিয়ে পড়ে যায় এদিক ওদিক, বদরু খাঁ চোখের পলকে ট্রেনের জানালা খুলে বাইরে লাফিয়ে পড়ে।

ঝাকানাকা টাল সামলে জানালার দিকে ছুটে যান, কিন্তু অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না।

ঝাকানাকা বিড়বিড় করে বলেন, "দাঁড়া, আসছে গল্পে যদি তোকে ইসকুরু টাইট না দিই, আমার নাম ঝাকানাকাই নয়!"

কিংকু চৌধারি মিস জুলিয়ার কাঁধ ধরে ঝাঁকি দ্যান, "মিস, উঠুন! আর ভয় নেই!"

আবদুল গোলাম হক খ্যাঁক করে ওঠেন, "খবরদার, আমার সেক্রেটারির গায়ে হাত দেবেন না!"
.
.
.


গোয়েন্দা ঝাকানাকা! | Promote Your Page Too

.
.
.

[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।