Friday, December 21, 2007

রসময় রেসিপি ০১

ভূমিকা

প্রবাসে একাকী বাস করলে যা হয়, মাথায় শুধু পচা কথা ঘোরে। আবার সকালে নাস্তা করি মধু দিয়ে। অতএব সারাদিন সারারাত চায়ে গরম অবস্থা। ক্লাস করি, কামলা খাটি, সচলায়তনে গুঁতাগুঁতি করি কিছু একটা লিখে ফেলার আশায়, হয় না, হয় না রে ভাই হয় না।

এত কাজের পর খিদা লেগে যায়। বাজার করতে ভালোই লাগে, কিন্তু ফ্রিজ খুলে দেখি কিছু নাই, এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হই প্রায়ই। আমার আবার ডিপ ফ্রিজ নাই, তাই দিন আনি দিন খাই জীবন নিয়ে বেঁচে আছি।

এইসব অত্যাচারের ফলে মাঝে মাঝেই সৃজনশীল হতে হয়। চাকরি যখন করতাম, ইমিডিয়েট বসের সাথে শলা করে সৃজনশীলতা করতাম উচ্চতর বসকে চাপের মুখে ম্যানেজ করার জন্য, এখন পেট চালানোর জন্যই সৃজনশীলতা জরুরি।

আমি যা রাঁধি তা পেটে পড়ার আগে জিভে চাবুক মেরে যায়। লবণ ব্যাপারটার আন্দাজ আমার ভালো ছিলো না কোন কালেই, ভাবছি একটা মাইক্রোপাল্লা কিনবো কিনা, যেটাতে মিলিগ্রাম মেপে লবণের "আন্দাজ" ঠিক করা যাবে। একই সমস্যা হয় মশলা নিয়েও। বিভিন্ন মশলার আবার নানারকম প্রিট্রিটমেন্ট বা প্রাগপ্রস্তুতি থাকে, যেমন মৌরি আর জিরা খালি তাওয়ায় "আন্দাজমতো" সময় ধরে ভেজে নিতে হয়, ইত্যাদি। রীতিমতো পূর্বরাগ। ফোরপ্লেয়ার হিসাবে একটা জীবন কাটিয়ে দিচ্ছি।

আজকে সারাদিন কম্পিউটারের সামনে বসে কামলা খাটতে খাটতে সন্ধ্যার দিকে মেজাজটা বিষিয়ে গেলো। দীর্ঘদিন ধরে স্যান্ডউইচ খেয়ে দিন কাটিয়ে দিচ্ছি। দুই টুকরা ব্রেডের মাঝে চিজ আর শিঙ্কেন (বরাহমাংসের পাতলা ফালি), শিঙ্কেনের ওপর সরিষার পেস্ট দিয়ে সেটাকে ইলেকট্রিক তন্দুরে গলাই। রুটির ওপর চিজ বেশ গলো গলো হয়ে আসলে বার করে খাই। জিনিসটা বেশ সুস্বাদু, কিন্তু ভ্যারিয়েশন নাই। মাঝে মাঝে টমাটো বা শসা ঢোকানো যায়, কিন্তু ঐ পর্যন্তই। এরচেয়ে বেশি বৈচিত্র্য চাইলেই খাটনি। মাঝে মাঝে সুমন চৌধুরীর বাড়ি হামলা করি, তখন ভালোমন্দ রান্না হয়। বলাই মাঝে মাঝে সবার দুরবস্থা আন্দাজ করে নিজের বাড়িতে রান্নার দাওয়াত দ্যান, তখন ঢেঁকুরে একটু তৃপ্তি থাকে।

ভ্যারিয়েশনবিহীন স্যান্ডউইচ খেতে খেতে মনে হলো মধ্যবয়স্কের বিবাহিত জীবন যাপন করছি। আঁৎকে উঠলাম রীতিমতো। আমি নিজে মধ্যবয়স্ক হলেও বিবাহিত তো নই। পণ করলাম, আজকে শালা রান্না করবো একটা কিছু। ফ্রিজ খুলে পনির আর শিঙ্কেনের প্যাকেটের মুখের ওপর মুহাহাহাহা করে হাসলাম। থাকো পড়ে সোনা, আ'ম গনা সুইং দ্য হেল আউট অফ মি।

কিন্তু মুখের হাসি বাসি হতে সময় লাগে না। ফ্রিজে কিছু নাই। আজকে রবিবার, তার ওপর রাত আটটা বাজে। চারদিক সুনসান। আজকে কাসেলে শুধু সৃজনশীলতার দরজা খোলা আমার জন্য।

প্রথমে ভাবলাম টয়লেটে যাই, ভাবনঘরে বসে ভাবি। কিন্তু আজকে নতুন কিছু করার একটা জেহাদি জোশ চেপেছে মাথায়, পায়চারি করতে করতে শুরু করলাম ভাবনা।

নিজের আর্সেনাল খতিয়ে দেখলাম, চাল আছে, ডাল আছে। চারখানা পেঁয়াজের পাশাপাশি একটি রুগ্ন রসুন আর একটি গলাকাটা আদাকেও চোখে পড়লো। ফ্রিজের ভেতরে একটি বিষণ্ণ বাঁধাকপি, কতগুলি ডিম, ধনেপাতা আর কাঁচামরিচ। প্যানের ওপর আমার গতকালের ভাজা টুনামাছের আদ্ধেকটা।

বিয়ার নাই ঘরে, পানি খেতে খেতেই নেশা ধরে যাওয়ার যোগাড়। অনেক চিন্তে অনেক ভেবে বার করলাম রেসিপি। ঠিক করলাম, এই রেসিপি ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়া অতীব জরুরি। তাই একটা পোস্টই ছেড়ে দিচ্ছি।

ডিশের নামঃ "বালিকা, তোমায় চুমু"

উপকরণঃ

আন্দাজ ষোল আনা। এটাই সবচেয়ে বড় উপকরণ। পদে পদে এটাকে পকেট থেকে বার করতে হবে।

একদিন আগে এক ক্যান টুনামাছ ভাজুন। একটা কৌটায় দু'শো গ্রাম টুনামাছ থাকে। আন্দাজমতো পেঁয়াজ, রসুন, আদা, কাঁচামরিচ, জিরা আর সামান্য হলুদের গুঁড়ো দিয়ে ভেষজ তেলে ভাজুন শালাকে। সয়াবিন পেলে সয়াবিন, সরিষা পেলে সরিষা, সূর্যমুখী পেলে সূর্যমুখী, বাদাম পেলে বাদাম। তেলের জাত বাছবেন না অত।

তারপর আদ্ধেকটা খেয়ে বাকি আদ্ধেকটা ঢেকে রাখুন।

তারপর আজকে ফ্রিজ খুলে প্রথমে মাথায় হাত দিয়ে বসুন। কিচ্ছু রাখা চলবে না ফ্রিজে।

অনেক ভেবেচিন্তে তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ান। তারপর একটা হাঁড়ি টেনে নিয়ে আনমনে তাতে আন্দাজমতো মাখন কেটে নিয়ে ফেলে চুলায় মাঝারি আঁচে বসান। মাখন গলে যাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই। তার মধ্যে একটা এলাচ দানা, এক চোকলা দারচিনি আর দুতিন কণা লবঙ্গ দিন। তারপর একটা পেঁয়াজকে যত্ন করে কুচি করুন। রসুন নিন দুই কোয়া। রদ্দা মেরে ন্যাংটা করা বোঝেন? বোঝেন না? বলেন কী? তাহলে তো আর রান্না হলো না আপনাকে দিয়ে। এখনও রসুন ন্যাংটা করতে পারেন না আবার রেসিপি পড়েন। যান মিয়া ভাগেন!

যারা বোঝেন তারা রসুন কুচি করুন। আদাও নিন আন্দাজমিটারে মেপে। আগে পেঁয়াজকে ঢালুন গলা মাখনের ওপর। কিছুক্ষণ নেড়েচেড়ে রসুন আর আদাও দিন উমরাও জানের কথা ভাবতে ভাবতে। এরপর ঘুঁটা দিন সাবধানে। সাবধান! এই ঘুঁটার ওপরই স্বাদ নির্ভর করছে‌! উল্টাপাল্টা ঘুঁটা দিয়ে রান্না নষ্ট করবেন না!

এরপর কুঁচকি চুলকাতে চুলকাতে কেবিনেট খুলে উল্লেখযোগ্য কী আছে দেখুন। জিরা পেলে খানিকটা দিয়ে দিন। তারপর আন্দাজমতো হলুদ আর ধনিয়ার গুঁড়াও দিন। তারপর আন্দাজমতো চাল, চালের বহিরাস্তর ঢেকে মসুর ডাল আর মসুর ডালের বহিরাস্তর ঢেকে মুগ ডাল দিন। কম বেশি হলে সমস্যা নাই।

এরপর গোটা চারেক কাঁচামরিচকে চুলচেরা করে চিরে দিন এরওপর। কিছু ধনেপাতাকে নির্মমভাবে কুঁচিয়ে একশা করে ফেলুন ডেগচিতে। তারপর কিছুক্ষণ আন্দাজমতো ঘুঁটে যান। চালডালের মিশ্রণ ডেগচির সাথে সেঁটে যাচ্ছে মনে হলে পানি দিন আন্দাজমতো। উঁহু, কম হয়ে গেলো। আরেকটু বেশি দিন। তারপর কম আঁচে চুলা রেখে ডেগচি ঢেকে মিনিট পনেরো কিছু কুচিন্তা করুন। ভাবুন এই হিম ঠান্ডায় রান্নাঘরে আপনার সাথে আপনার উজবেক প্রতিবেশিনী থাকলে কী একটা পরিস্থিতির দিকে মোড় নিতে পারতো ঘটনা। মোড় যখন নিচ্ছে না তখন আবার রান্নায় ফিরে আসুন। আজেবাজে চিন্তা করে তো ডেগচির পানি আদ্ধেকটা শুকিয়ে ফেলেছেন, সময় থাকতে কিছু লবণ দিন। মাখন কিন্তু লবণনাশক। কাজেই এ কথা মনে রেখে আন্দাজমিটার রিক্যালিব্রেট করুন।

আরো কিছুক্ষণ খাইষ্টা চিন্তাভাবনা করুন। আপনার সৌরতাপ কোর্সের পূর্ব ইয়োরোপিয়ান সহপাঠিনীর কথা ভাববেন না এই রাতের বেলা, রান্না পুড়ে ঝামা হয়ে যেতে পারে। বরঞ্চ মনে মনে ৩৪৫, ২৩ আর ২ এর ল.সা.গু. কষুন। উত্তরটাকে ভেরিফাই করতে করতে গতকালের ঢেকে রাখা টুনাভাজাটাকে প্রায় ভুনা খিচুড়ির ওপর ঢেলে দিয়ে আবার একটা ফ্রিস্টাইল ঘুঁটা দিন। তারপর চুলার আঁচ নিভিয়ে দিয়ে কী নিয়ে কুচিন্তা করা উচিত ছিলো ভাবতে ভাবতে বিরক্ত হয়ে এক পর্যায়ে ডেগচি চুলা থেকে নামিয়ে এনে খাবার পাতে বেড়ে গরমাগরম খাওয়া শুরু করুন। ঠান্ডা হলে এই খাবারের স্বাদ রীতিমতো অতিথিতাড়ানিয়া, কিন্তু গরম খেতে পারলে বেশ লাগে।

এই ডিশের নাম হওয়া উচিত ছিলো টুনা দিয়া ভুনা খিচুড়ি। কিন্তু "বালিকা, তোমাকে চুমু" রাখার গূঢ় কারণ হচ্ছে, কোন দূরবর্তিনী বালিকার সাথে ফোনে নখড়া করার সময় "কী করো" জাতীয় ফালতু প্রশ্নের জবাবে গাঢ় স্বরে বলতে পারবেন, বালিকা, তোমাকে চুমু খাই।

আপাতত এইটা খান। পরে দেখি আরো কিছু রেসিপি ছাড়া হবে। আগামী পর্বে থাকতে পারে "ভ্যানগগ" এবং "গুয়ামা"। খুব খিয়াল কইরা।


[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।