Sunday, December 23, 2007

গোয়েন্দা ঝাকানাকা ও বিষ্ণুমূর্তিচুরি রহস্য


গোয়েন্দা ঝাকানাকা একটি ভুরু উত্তোলন করে দারুণ এক অট্টহাসি দিলেন। দারোগা কিংকর্তব্যবিমূঢ় চৌধারি গম্ভীর মুখে বসে রইলেন।

"কেস খুবই সরল।" ঝাকানাকা এক গাল মুড়ি চিবাতে চিবাতে বললেন। "বিষ্ণুমূর্তি আদৌ চুরি যায়নি।"

কিংকু চৌধারি বললেন, "কিন্তু ...।"

ঝাকানাকা চোখ পাকিয়ে তাকালেন শুধু।

কিংকু চৌধারি থেমে গিয়ে মুড়ির গামলার দিকে হাত বাড়ালেন।

ঝাকানাকা বললেন, "দেখুন, পুলিশে চাকরি করেন বলেই যে বুদ্ধু হতে হবে এমন কোন কথা নেই। ভাবুন মন দিয়ে। গোটা ব্যাপারটাকে দেখুন চোখের সামনে। শুধু একটা বাক্সকে নিয়ে চিন্তা করলেই তো হবে না। থিঙ্ক আউট অব দ্য বক্স!"

কিংকু চৌধারি মুড়ি চিবাতে চিবাতে বললেন, "কিন্তু ...।"

ঝাকানাকা বললেন, "কোন কিন্তু নাই। ঘটনা সরল। মূর্তি চুরি হয় নাই।"

কিংকু চৌধারি আরেক খামচা মুড়ি নিলেন।

ঝাকানাকা উঠে পড়লেন সোফা ছেড়ে। বললেন, "আপনাদের হাতে আসলে আছে কী? একটি ভিজা, স্ক্রু খোলা বাক্স, যার গায়ে যাদুঘরের সীল আছে। আর আছে কী? আছে অকুস্থল, বিমানবন্দরের পাশে একটা জলা, যেখানে আপনাদের লোকেরা লোক দেখিয়ে হাঁচড়পাঁচড় করেছে। আর আছে কী? ভারত-নেপাল সীমান্ত থেকে আটক করা একটা ট্রাক, যার সীটের নিচে এক হালি বিষ্ণুমূর্তি।"

কিংকু চৌধারি বললেন, "ঠিক!"

ঝাকানাকা বললেন, "আর এগুলি থেকে আপনারা ভাবছেন বিষ্ণুমূর্তি চুরি হয়েছে। ভুল।"

কিংকু চৌধারি বললেন, "কেন?"

ঝাকানাকা বললেন চোখ পাকিয়ে, "ভাবুন! ভেবে দেখুন!"

কিংকু চৌধারি মনমরা হয়ে আরেক খামচা মুড়ি তুলে নেন।

"রাত দু'টো পর্যন্ত পুলিশ পাহারায় ছিলো এয়ারপোর্টে। তারপর তারা চলে যায়। কেন চলে যায়? কারণ তাদেরও তো ঈদ আছে। তারাও তো গরুর মাংস দিয়ে পোলাও খেতে চায়। বেশ। খাক। কিন্তু তারপর কী হলো? একটা বাক্স লোপাট হয়ে গেলো। হই হই রই রই। সেই বাক্স আবার খুব বেশি কষ্ট করতে হলো না, ধারেকাছেই একটা জলায় তাকে পাওয়া গেলো। তার মাথার স্ক্রু খুলে পড়ে গেছে, ভেতরটা ফাঁকা। ... এখানে ভাবতে হবে, কেন? কেন বাক্সটা পাওয়া গেলো? বাক্সসুদ্ধুই কেন মূর্তিগুলি সরানো হয়নি?"

কিংকু চৌধারি বললেন, "বারে, বাক্সসুদ্ধু নিলে ধরা পড়ার একটা সম্ভাবনা থাকে না?"

ঝাকানাকা বললেন, "তা থাকে। কিন্তু বাক্সের গা থেকে কাগজের লেবেলটা টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেললেই কিন্তু ঝামেলা চুকে যেতো। বাক্স খুলে জিনিসটা বার করতে হতো না। আর এইসব মূর্তি খুব সাবধানে প্যাক করতে হয়। বাক্সের ভেতরে থাকলেই বরং জিনিসটা নিরাপদ থাকে। চোরও তা জানে। চোর জানে এই জিনিস গদাম করে গাড়ির বুটে ফেলে নেয়ার জিনিস নয়। সামান্য দাগদুগ পড়লেই কালোবাজারে এর দাম ফস করে নেমে আসবে একশো ভাগের এক ভাগে। তারপরও সে এতো কাঁচা কাজ করলো কেন?"

কিংকু চৌধারি একটা পুলিশি হাসি দ্যান। বলেন, "আপনি ভুলে যাচ্ছেন স্যার! বাক্সসহ জিনিসটা লোপাট করতে গেলে এয়ারপোর্টের দুর্ধর্ষ সিকিউরিটির হাতে বমাল ধরা পড়ার একটা সম্ভাবনা থেকেই যায়!"

ঝাকানাকা হাসেন। বলেন, "মুহাহাহাহাহাহা! তাই নাকি? তো বাক্স ছাড়া লোপাট করার সময় কি এয়ারপোর্টের দুর্ধর্ষ সিকিউরিটি ঘুমাচ্ছিলো?"

কিংকু চৌধারির মুখটা কালো হয়ে যায়। তিনি আমতা আমতা করে বলেন, "হয়তো কোন কাপড়টাপড় দিয়ে ঢেকেঢুকে, কিংবা ব্যাগে ভরে ...।"

ঝাকানাকা বলেন, "বাক্সটা টিভিতে দেখেছি। ওটাকেও তো কাপড়টাপড় দিয়ে ঢেকে নেয়া যেতো। কিংবা ব্যাগে ভরে। নিলো না কেন?"

কিংকু চৌধারি বলেন, "দেখুন, এইসব চোরছ্যাঁচড়ের কারবার বোঝা বড় দায় ...।"

ঝাকানাকা বলেন, "হুমম। আপনার আমার কাজই ওটা। ঐ দায় নিয়েই চলতে হবে। এখন ভাবুন। কেন বাক্সটা পাওয়া গেলো, একেবারে নাকের ডগায়?"

কিংকু চৌধারি বলেন, "কেন?"

ঝাকানাকা বলেন, "কারণ বাক্সটার নিয়তিই ছিলো ধরা পড়া। আশেপাশে কোথাও খালি পেট নিয়ে পড়ে থাকা অবস্থায় ধরা পড়া।"

কিংকু চৌধারি বলেন, "মানে?"

ঝাকানাকা বলেন, "মানে হচ্ছে, সময়মতো যদি বাক্সটা সরিয়ে ফেলা না হতো, এবং স্ক্রু খুলে তাকে কোথাও ফেলে রাখা না হতো, তাহলে ওজন করার সময় এয়ার ফ্রান্সের লোকজন বুঝে ফেলতো যে বাক্সটা আসলেই খালি, ওর ভেতরে কোন মূর্তি ছিলো না। তখন তারা হাউকাউ শুরু করতো।"

কিংকু চৌধারি বলেন, "মানে কী?"

ঝাকানাকা হাসেন। বলেন, "যদি ধরে নেই, রাত দু'টোর পর, পুলিশ চলে যাবার পর বাক্স থেকে মূর্তি দুটো চুরি হয়েছে, তাহলে কিভাবে ভোরবেলা ভারত-নেপাল সীমান্তে চারটা বিষ্ণু পাওয়া যায়? ভুলে যাবেন না, গতরাতে ঘন কুয়াশা ছিলো দেশে। উত্তরাঞ্চলের রাস্তা এ সময় কুয়াশায় ছেয়ে থাকে। হাজার বড় তালেবর ড্রাইভারও ঘন্টায় ষাট কিলোমিটারের বেশি গতিতে ঐ রাস্তায় গাড়ি চালাতে পারবে না। উত্তরে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত পার করতে গেলে অন্তত পক্ষে আট ঘন্টা লাগবে। সেখান থেকে ভারত নেপাল সীমান্ত আরো ঘন্টা তিনেকের রাস্তা। হিসাব তো মিলছে না।"

কিংকু চৌধারি বলেন, "তাহলে?"

ঝাকানাকা বলেন, "সম্ভাবনা দু'টো। এক, ঐ ট্রাকে যেসব বিষ্ণু আছে, সেগুলি আমাদের নয়। সেগুলি নকল বা অন্য বিষ্ণু। দুই, ঐ চারটার মধ্যে দু'টো আমাদের বিষ্ণুর রেপ্লিকা। তিন ...।"

কিংকু চৌধারি বলেন, "আপনি না বললেন দু'টো সম্ভাবনা?"

ঝাকানাকা বললেন, "চোপ! তিন, ঐ চারটার মধ্যে দু'টো আমাদের আসল বিষ্ণু।"

কিংকু চৌধারি বলেন, "এখন?"

ঝাকানাকা বললেন, "যদি এক বা দুই হয়, তাহলে হয়তো বিষ্ণু এয়ারপোর্ট থেকেই চুরি গেছে, এবং এই মূহুর্তে সে নিরাপদে চোরের আস্তানায় চলে গেছে। সেটা কোথায় বলতে গেলে অনেক লোককে খুব ভালোভাবে প্যাঁদাতে হবে। আর যদি তিন হয়, তাহলে এয়ারপোর্ট থেকে চুরি হয়নি, আমি যা ভাবছি তা-ই হয়েছে। যাদুঘর থেকে খালি বাক্স প্যাক করা হয়েছে। হোমবাউন্ডের গাড়ি পাহারা দিয়ে নিয়ে গিয়েছে পুলিশ, কিন্তু কিছু হাতসাফাই তাদের পক্ষেও করা সম্ভব, কাজেই এমনও হতে পারে যে ভরা বাক্স মাঝপথে পাল্টে খালি বাক্স লোড করা হয়েছে এয়ারপোর্টে। ওদেরকেও প্যাঁদানোর লিস্টে রাখুন।"

কিংকু চৌধারি বলেন, "খালি বাক্স?"

ঝাকানাকা বললেন, "হুম। খালি বাক্স পাঠিয়ে বিষ্ণুদু'টোকে চুপিচুপি ছালার বস্তায় ভরে তুলে দেয়া হয়েছে দুপুরের দিকেই। তারা চলে গেছে সীমান্তের দিকে। সেখান থেকে রাতে তারা বাংলাদেশ ছেড়ে ঢুকে পড়েছে ভারতে।"

কিংকু চৌধারি বলেন, "এখন হয়েছে কোনটা? এক, দুই না তিন?"

ঝাকানাকা বলেন, "প্যাঁদাতে হবে, বুঝলেন, প্যাঁদালেই বেরিয়ে পড়বে সব গড়গড় করে। তিব্বতি উষ্টাটা কাজে লাগাতে হবে এবার ... এতো কষ্ট করে শিখলাম, কাজে লাগাতে পারিনা ...।"

কিংকু চৌধারি বললেন, "দুই নাম্বার সম্ভাবনাটা বুঝি নাই। আমাদের বিষ্ণুর রেপ্লিকা কেন ধরা পড়বে নেপাল সীমান্তে?"

ঝাকানাকা হাসেন। বলেন, "যে কারণে খালি বাক্স ফেরত এসেছে, সে কারণেই! রেপ্লিকা ফেরত আসবে, তারপর বিষ্ণুর জায়গা দখল করে বসে পড়বে যাদুঘরে।"

কিংকু চৌধারি বলেন, "মানে? লোকজন বুঝে ফেলবে না?"

ঝাকানাকা হাসেন। বলেন, "না। যারা বুঝবে তারা মুখ বুঁজে থাকবে হয়তো।"

কিংকু চৌধারি বলেন, "কিন্তু ফ্রান্সের ওরা তো ঠিকই বুঝে ফেলবে!"

ঝাকানাকা হাসেন। বলেন, "একবার চুরি যাবার পর কি আর ঐ জিনিস এতো সহজে আর ফ্রান্সে যাবে?"

কিংকু চৌধারি বলেন, "আরেশশালা, তাই তো!"

ঝাকানাকা বলেন, "মুড়ি খান।"

কিংকু চৌধারি সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকান ঝাকানাকার দিকে, গালি দিলো নাকি?
.
.
.


গোয়েন্দা ঝাকানাকা! | Promote Your Page Too

.
.
.
[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।