Sunday, November 25, 2007

প্রবাসে দৈবের বশে ০২১

আমি যে একজন মাইওপিক, সেটা ধরা পড়ে যখন আমি ক্লাস টুতে পড়ি। আমার বড় ভাইও একজন মাইওপিক, তিনি হঠাৎ একদিন সন্ধ্যেবেলা এসে পাকড়াও করলেন আমাকে, ব্যাপার কী, তুমি এতো কাছে বসে টিভি দেখো কেন?

আমি যে কাছে বসে টিভি দেখি সেটা আমিও খেয়াল করিনি, কেউই খেয়াল করেনি, সেদিন সাথে সাথেই আমাকে কয়েক গজ পেছনে নিয়ে বসিয়ে টিভির বিভিন্ন লেখাজোকা পড়তে বলা হলো। খালি চোখে সেইসব ইকড়িমিকড়ি পড়তে আমি নিদারুণভাবে ব্যর্থ হলাম, আমার ভাই তাঁর নিজের চশমা চোখ থেকে খুলে নিয়ে আমাকে পরিয়ে দিয়ে বললেন, এবার পড়তে পারছো? চশমা চোখে নিমেষেই টিভিতে আজানের দোয়ার বঙ্গানুবাদ আমার কাছে স্বচ্ছ হয়ে গেলো, সেই সাথে জানলাম, আমার চোখ খারাপ।

ভীষণ আতঙ্কিত বোধ করেছিলাম সেদিন। চশমা ব্যাপারটার প্রতি শিশুদের একটা আকর্ষণ সাধারণত থাকে দেখেছি, আমার ছিলো না, কিন্তু সারাজীবন চশমা পড়ে চলতে হবে ভেবে আমি হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেছিলাম।

পরদিন আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো, তিনি আমার নাকে একটা ফ্রেম চড়িয়ে লেন্সের পাওয়ার মাপলেন প্রথমে, তারপর টর্চলাইট দিয়ে চোখে আরো অনেক কিছু দেখলেন। শেষমেশ আমার বাবার সাথে কী কী সব শলাপরামর্শ করলেন বুঝলাম না।

একেবারে সাথে সাথেই চশমা নেয়া হয়নি আমার, কিছুদিন পর লালচে ফ্রেমের একটা গোদা চশমা আমি নাকের ওপর নিয়ে ঘুরতে শুরু করলাম। আমার সহপাঠীরা প্রথমে আমার মতো একজন দেড়ব্যাটারিকে পেয়ে উল্লসিত হয়ে উঠলো, কিন্তু ব্যাপারটা ধামাচাপা পড়ে গেলো কিছুদিন পর। আমার শৈশবে পোলাপানের চোখ সম্ভবত ভালো ছিলো, স্পষ্ট মনে আছে, ক্লাস সিক্সে ওঠার আগ পর্যন্ত আমার বয়েসী আর কোন ছেলেমেয়েকে চশমা পড়তে দেখিনি। চশমা জিনিসটাই একটা বড়দের ব্যাপার ছিলো।

ক্লাস টু এর পর আমি আর চশমার সঙ্গ ত্যাগ করতে পারিনি। এখন অনেকে কনট্যাক্ট লেন্স পড়ে, কিন্তু জিনিসটা আমি কখনো পরখ করে দেখিনি, আমার চশমা-ই ভালো লাগে। চোখের দুরবস্থার কারণে আমি কখনো সানগ্লাস পড়ি না, চোখ যারা অকারণে ঢেকে রাখে তাদের তস্কর কিসিমের মনে হয়। পেশাগত কারণে যখন প্রখর রোদের মুখোমুখি কাজ করতে হয়েছে, তখনও আমি পরিমিত শেডের সাধারণ চশমা ব্যবহার করেছি।

তবে একটা দীর্ঘ সময় আমি কাটিয়েছি কোন ব্যাক আপ চশমা ছাড়া। কপাল ভালো রাস্তাঘাটে চশমা ভাঙেনি সেই সময়টাতে। আমি প্রথম চশমার অভাবে বিপদে পড়ি এক বন্ধুর বোনের গায়ে হলুদে যাবার আগে। প্রথমে ভেবেছিলাম অনুষ্ঠানেই যাবো না, কিন্তু সেই বন্ধু ফোনে এমন গর্জন করে উঠলো যে ঘাবড়ে গিয়ে বাক্সপ্যাঁটরা হাতে উইন্ডোজ ৯৫ মার্কা এক চশমা খুঁজে পেয়ে সেটা নাকে-কানে দিয়েই গেলাম। পরদিন চোখের ডাক্তারের কাছে গিয়ে চোখ দেখিয়ে তিন তিনটা চশমার টেন্ডার হাঁকিয়ে এলাম, চশমার অভাবে যেন আর ভ্যাজালে পড়তে না হয়।

এখানে কয়েকটা চশমা নিয়ে এসেছি, তবে জুতার মতোই চশমারও স্বাদ আছে, চোখ নাক কান সেই স্বাদে অভ্যস্ত হয়ে যায়। একটার বদলে আরেকটা পরলে প্রথমে একটু সমস্যা হয়। আমার পছন্দের চশমাটা এখানে আসার দিনখানেক বাদেই হঠাৎ একদিন একপাশের স্ক্রু থেকে মুক্তকচ্ছ হয়ে লেন্সটা জলাঞ্জলি দিয়ে বসলো। খপ করে ধরে ফেলতে পেরেছিলাম, নাহলে গোটা জিনিসটাই বরবাদ হয়ে যেতো। একটা ভোঁতা ছুরি দিয়ে সেই সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ইসকুরু আবার টাইট দিলাম, কিন্তু ক'দিন বাদে বুক চিতিয়ে বীরদর্পে রাস্তা পার হবার সময় মাঝপথেই আবার যে-ই কে সে-ই। মেজাজটা চরম খারাপ হয়ে গেলো। এতো আদর যত্নে ধোয়ামোছা করে মাথায় করে রাখি, এরকম ব্যভিচার আর কত ভালো লাগে? যা-ই হোক, আবারও জোড়াতালি দিয়ে ম্যানেজ করলাম, আজ সকালে উঠে চশমা পড়তে গিয়ে দেখি স্ক্রু গায়েব!

দীর্ঘশ্বাস ফেলে আরেকটা চশমা বার করে স্ক্রু খোঁজা শুরু করলাম। স্ক্রু খুঁজে আবার টাইট দিয়ে চশমা পড়ে কাজ শুরু করতে করতে পনেরো মিনিট লেগে গেলো।

চশমাধারী বা ধারিণীরা প্রবাসে এলে হাফ ডজন চশমা সাথে করে নিয়ে আসবেন, সেই সাথে আসার আগে চোখ দেখিয়ে আসবেন ডাক্তারের কাছে, সেই প্রেসক্রিপশন রেখে আসবেন দেশে কারো কাছে, যাতে এই হাফ ডজনের পাঁচটা ভেঙেচুরে গেলেও শেষটা চোখে লাগিয়ে দেশে ফোন করে বলতে পারেন, আরো কয়েকটা চশমা করিয়ে পোস্টে পাঠিয়ে দিতে।


[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।