Friday, November 23, 2007

প্রবাসে দৈবের বশে ০২০

অবশেষে শেষ হলো সেমিনার।

বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে কাসলার সিম্পোজিয়ুম, নবায়নযোগ্য শক্তি নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করা হচ্ছে। কাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ইনস্টিটিউট ইজেট গোটা ইয়োরোপেই বেশ সমাদৃত, জার্মানিতে তো বটেই। বড় বড় নবায়নযোগ্য শক্তি শিল্পোদ্যোক্তারা গবেষকদের সাম্প্রতিক সংযোজন সম্পর্কে জানতে এসেছেন, পাশাপাশি গবেষণার জন্যেও আলাদা তাগাদা দেয়া হবে।

ওদিকে আমার সেমিনার নিয়ে বিষম দৌড়ের ওপর ছিলাম। এই সেমিনারের উদ্দেশ্য হচ্ছে নবায়নযোগ্য শক্তির ক্ষেত্রে কাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্বকপোলকল্পিত উদ্যোগকে সহায়তা করা। সেমিনারের অধ্যক্ষ ডাকসাইটে প্রফেসর য়ুর্গেন শ্মিড স্বভাবসুলভ মৃদু কণ্ঠে জানালেন, পোলাপানকে পাশ করার পর দুনিয়াতে একা ছেড়ে দেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ না। তাকে বিভিন্ন রাস্তা দেখানোও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তব্য। একজন প্রকৌশলী নিজে কোন উদ্যোগ নিতে গেলে শুরুতেই বিরাট হোঁচট খেতে পারে, কারণ হয়তো ব্যবসা সম্পর্কে তার কিছুই জানা নেই। ওদিকে সেন্ট গালেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের ছাত্ররা হয়তো ব্যবসা সম্পর্কে খুবই ভালো জানে, কিন্তু প্রযুক্তির সাম্প্রতিক বাস্তবতা সম্পর্কে তাদের ব্যবহারিক জ্ঞান খুব কম। কাজেই এই সেমিনারের মাধ্যমে এই দুই পক্ষের দূরত্ব কমিয়ে আনার একটা চেষ্টা করা হচ্ছে। একদল প্রকৌশলী একটা নতুন আইডিয়া উপস্থাপন করবেন, একদল ব্যবসায় প্রশাসক সেই আইডিয়ার বাণিজ্যিক উপযোগিতা যাচাই করে একটা বিজনেস মডেল দাঁড় করাবেন, এ-ই ছিলো আড়াই দিনের সেমিনারের মূল কাজ।

আমার আইডিয়া নিয়ে প্রাথমিক উপস্থাপন মোটামুটি ভালোই হয়েছিলো, গতকাল চারজন সুইস মোটামুটি ছাই দিয়ে ধরলো আমাকে আইডিয়ার আগাপাস্তলা বোঝার জন্যে, মার্কেটিং ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে তিনজন আর ফিনান্স থেকে একজন। আমার প্রস্তুতি ভালোই ছিলো, নানা প্যাঁচঘোঁচ গলিঘুঁপচি নিয়ে আলোচনা শেষে তারা ঝড়ের বেগে একটা কাঠামো দাঁড় করিয়ে ফেললো। আজ সকালে সেটার ওপর শেষ দফা উপস্থাপন হলো, মনটা ভালো, কারণ বেশ মসৃণভাবে শেষ হয়েছে জিনিসটা। প্রথম যেদিন প্রফেসর শ্মিডের সামনে উপস্থাপন করেছিলাম, শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তির কারণে একটু গুলিয়ে ফেলেছিলাম, তিনি বেশ সুন্দরভাবেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে এমন উপস্থাপন নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট নন, আরো ভালো কিছু চান। আজকে দেখলাম তিনি সব কিছু শেষ হবার পর এসে জানালেন, ভালো হয়েছে।

সুইসরা বেশ স্নব হয় নানা ব্যাপারে, আমার অন্য তিন আরব সহকর্মীর সাথে যারা গ্রুপ করেছে তারা দেখলাম তাদের আইডিয়াটা নিয়ে বেশ হাসাহাসি করলো। অপমানিত হতে কে-ই বা আর ভালোবাসে, ফিলিস্তিন, তিউনিসিয়া আর জর্দানের তিন তরুণ মুখ কালো করে কর্তব্যকর্ম করে গেলো। উপস্থাপন শেষে ওদের গিয়ে সান্ত্বনা দিলাম, বেচারারা খুবই মন খারাপ করেছে এমন অনাকাঙ্খিত সারকাজমের শিকার হয়ে।

তবে সুইস দলের কয়েকজন যাবার আগে এসে আরো খোঁজখবর নিয়ে গেলো আমার আইডিয়া নিয়ে ভবিষ্যত চিন্তার। আমার গ্রুপের সদস্যরা বেশ সিরিয়াস কিসিমের লোক, ফিনান্সের ফাবিয়ান অল্প কথায় কিছু টিপস দিলো আমাকে, ছোকরার মাথা দারুণ সাফ।

গতকাল সকালে আবার গোটা দলের সাথে এক্সকারশনে গিয়েছিলাম কাসেলের অন্যতম এক ইলেকট্রনিকস ইন্ডাস্ট্রিতে। ইন্ডাস্ট্রির প্রতিষ্ঠাতা এককালে কাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ে নবায়নযোগ্য শক্তি গবেষণায় গবেষণা সহকারী হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন, ১৯৮১ সালে তাঁরা তিন সহকর্মী ও বন্ধু মিলে সেই ইন্ডাস্ট্রির গোড়াপত্তন করেন। এখন সেই ইন্ডাস্ট্রি ইনভার্টার নির্মাতা হিসেবে দারুণ সফল। কাসেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং এই ইন্ডাস্ট্রি একে অপরকে গবেষণা বিষয়ে সহায়তা করে লাভবান হচ্ছে। ইন্ডাস্ট্রির নির্বাচিত কিছু অংশ ঘুরে দেখার পর প্রতিষ্ঠাতা এসে উপস্থিত হলেন, ছাত্রদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিতে। তাঁর কথা শুনতে শুনতে মনে হচ্ছিলো, বাংলাদেশে শিল্পোদ্যোক্তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বারস্থ হলে অনেক লাভবান হতেন। উদ্ভাবনের কোন বিকল্প নেই, জানালেন হের ক্রামার, আর উদ্ভাবন নিয়ে দেরি করলে পস্তাতে হবে। আমি শুনি আর দীর্ঘশ্বাস ফেলি। হায় বাংলাদেশের শিল্পোদ্যোক্তা, হায় আমার প্রিয় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়।

এই সেমিনার করতে গিয়ে যা শিখলাম, তা হচ্ছে, পূর্বপ্রস্তুতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। আমার উপস্থাপন আমি সব মিলিয়ে চারবার চর্চা করেছি, শিক্ষকদের কাছে তিনবার আর আমার পড়শী লম্বু জামুয়েলের কাছে একবার। পাশাপাশি SWOT বিশ্লেষণ করে দুর্বল জায়গাগুলোর জন্য জবাব তৈরি করে রেখেছিলাম। আমার আরব সহকর্মীদের অবস্থা দেখে বুঝেছি, পূর্বপ্রস্তুতির বিকল্প হচ্ছে হাস্যাস্পদ হওয়া। কোন কিছু ঠিকমতো বোঝাতে না পেরে কারো দাঁত ক্যালানো দেখার মতো বিড়ম্বনা আর হয় না।

জানি না অনাগত উপস্থাপনগুলির জন্য এমন সময় পাবো কি না, কিন্তু দেখানোর মতো বত্রিশ দাঁতের পাটির যে অভাব হবে না এই দেশে, এটা বুঝলাম। আমার সহপাঠীদের দেখেছি, কেউ কোন উপস্থাপন করতে গিয়ে ফেঁসে গেলে তাকে একটু টোকা দিয়ে ছেড়ে দিতে, খুব একটা প্যাঁচে কেউ কাউকে ফেলে না। কিন্তু সহপাঠীদের সামনে জীবনে খুব বেশিবার কোন কিছু উপস্থাপন করতে হয় না, নানা দেশের নানা রুচির মানুষের সামনেই হয়তো হাজিরা দিতে হবে বার বার।


[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।