Thursday, November 15, 2007

প্রবাসে দৈবের বশে ০১৮

১.
অ্যাডভাইজিং নিয়ে রীতিমতো একটা টেনশনে ছিলাম। তেমন কিছু না, কেবল দুটো কম্পালসরি কোর্স করতে চাই না, এই ব্যাপারে অনুমতি আর ছাড়পত্র চাই, আর যেসব কোর্স নিয়েছি সেগুলোর ব্যাপারে পরামর্শ। কিন্তু সবকিছু মিলিয়ে একটা চাপে ছিলাম। যদি কোর্স দুটো আবার গছিয়ে দেয়, এমন একটা চিন্তা কাজ করছিলো।

আমার অ্যাডভাইজার অবশ্য দুশ্চিন্তা দূর করে দিলেন অনেকখানি। কাগজপত্র বেশ খুঁটিয়ে দেখে তারপর কাজের কথা শুরু করলেন। এখানে কাগজের দৌরাত্ম্য তুলনামূলকভাবে কম, দুটো এক্সেল ফাইলে যাবতীয় কাজকর্ম সেরে ফেলা হয়েছে। কোথাও এক (হ্যাঁ) আর কোথাও শূন্য (না) দিয়ে গোটা ব্যাপারটার হাল হকিকত একটা সামারি পেজে দেখা যায়। কাজ শেষে প্রফেসর জানালেন, বেশি কোর্স নিয়ে ফেলেছি আমি। এত কোর্স নিয়ে বাটে পড়ার কোন মানে হয় না, তবে আমি চাইলে বাটে পড়তেও পারি। তাঁর পরামর্শ মতোই কিছু কোর্সকে অতিরিক্তের খাতায় যোগ করলাম, কিছু নিয়ে গেলাম পরবর্তী সেমিস্টারে।

কাজ শেষ করে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। যাক বাবা কামড়ে দেয়নি, হালুম করেই ছেড়ে দিয়েছে! প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার দয়ালু অ্যাডভাইজারের কথা মনে পড়ে গেলো, যিনি টার্মের পর টার্ম আবার অবনতি দেখে মুষড়ে পড়েছিলেন রীতিমতো, শেষের একদিন করুণ কণ্ঠে বলেছিলেন, তুমি একটা ফাইট দাও!

এক বস্তা কোর্স নিয়ে ফেলেছি এবারে। উদ্দেশ্য, সামার সেমিস্টারে হালকা থাকা। বায়ুশক্তির ওপরে দুটো, ফোটোভোল্টায়িকের ওপর একটা, জলশক্তির ওপর একটা, বাড়িঘরের শক্তিদক্ষতার ওপর একটা, আর সাথে একটা সেমিনার আর একটা প্রোয়েক্টশ্টুডিয়ুম, যাকে বলে কাজের ফাঁকে পড়া। দেখি আবার ফাইট দিয়ে। যা হোক একটা নিই কিছু হাতে, একবার মরে বাঁচি।

সামনেই একটা বিশ্রী পরীক্ষা আছে, লাড্ডু খাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। দাঁত মেজে রাখছি এখন থেকেই।

২.
আলাদা পোস্ট হিসেবে দেবো ভাবছিলাম, কিন্তু জঞ্জাল না বাড়িয়ে এখানেই লিখছি। বিষয় চা।

আমার চা খাওয়ার হাতেখড়ি আমার বাবার কাছ থেকে, আমার চা পানের অভ্যাসের বয়স প্রায় আমার সমান। আমার স্কুল শুরু হতো বেশ ভোরে, ঘুম ঘুম ভাবটা চায়ের দাপটে একটু একটু করে কেটে যেতো, মনে আছে স্পষ্ট। শুক্রবার সকালে শুধু আয়েশ করে চা খাওয়া যেতো। সন্ধ্যেবেলা খেলেধূলে এসে নাস্তার পর টিভি দেখতে দেখতে চায়ের কাপে শেষ চুমুক দেয়ার পর পড়তে বসতাম, ভূগোলের ম্যাপ হোক বা লগারিদম, সবকিছু জুড়ে তখন মিষ্টি ঝাঁঝালো চায়ের স্বাদ।

চা নিয়ে একসময় খুঁতখুঁত করতাম, কারো বাড়িতে চা খেয়ে ভালো না লাগলে মনে মনে গজগজ করতাম, কিন্তু কলেজে উঠে চায়ের ব্যাপারে একটা বিশ্বগ্রাসী উদারতা জেগে উঠলো মনের মধ্যে, মনে হলো চা হচ্ছে সুন্দরী তরুণীদের মতো, কোন চা-ই একেবারে খারাপ হতে পারে না। উদার রয়েছি উদর মেলিয়া, এই গুণ আমি এখনও বেশ ধারণ করি, হাসিমুখে অন্যের বানানো খারাপ চা খেয়ে যাই।

আমার কর্মজীবন শুরু ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেয়ার কিছুদিন পর থেকে, এই বাজে ব্যাপারটা থামছে না আর কিছুতেই। পড়া আর কাজের ক্লান্তিকে চায়ে চুবিয়ে মেরে মেরে অনেক বছর কাটিয়ে দিলাম। বৃষ্টিতে ভিজে কাঁপতে কাঁপতে, রোদে চলে ঘামতে ঘামতে, হিম বাতাসে শুকিয়ে আমসি হয়ে শেষমেষ নিজেকে সঁপে দেই চায়ের কাছে। প্রেয়সীর ঠোঁট হারিয়ে যায়, কিন্তু চায়ের কাপ আমার প্রতীক্ষায় বসে থাকে সবসময়।

কতো ক্লান্তি, কতো দুঃখ, কতো হতাশার চড় খেয়ে বসে পড়ে এক কাপ চায়ের ফরমায়েশ দিয়েছি, হিসেব রাখতে একটা সেই আমলের তিরিশ টাকা দামের খাতা কিনতে হতো।

কিন্তু সবচেয়ে বড়ো দুঃখ হচ্ছে নিজের হাতে বানানো বাজে চা খাওয়া। এক নদীতে দুইবার গোসল করা যায় না, এক ঠোঁটে দুইবার চুমু খাওয়া যায় না, কিন্তু এই পোড়ার দেশে এসে অব্দি আমি একই রকম বাজে চা আশ্চর্য অধ্যবসায়ের সাথে বানিয়ে চলছি। নিজের পারফরম্যান্স দেখে আমি তাজ্জুব। দেশে হরদম চা খেতাম, চাপটা ঘরের লোকের ওপর দিয়ে যেতো, এখানে এসে আমি আমার চায়ের খারাপ হাত দেখে সেটা মাথায় দিয়ে বসে পড়েছি।

কফি জিনিসটা আমার তেমন পছন্দ না, আমার অনেক সফিস্টিকেটেড বন্ধু কফি না খেয়ে এখন তিষ্ঠাতে পারে না, কিন্তু এই আবিসিনিয়ান বেবুনবিচির চেয়ে চায়ের তৃষ্ণাই আমার বেচারা রক্তে বেশি। হয়তো এই বদখদ কফিই খেতে হবে এখন থেকে। কাল একটা প্রেজেন্টেশন, তার তিলেকমাত্র শুরু করিনি এখনো, ভাবছিলাম এক কাপ চায়ে চুমুক দিয়ে শুরু করবো যা করার, বয়ামের ভেতর দেশ থেকে নিয়ে আসা প্রায় নিঃশেষ চা দেখে হঠাৎ মনে হলো, এতদিন পর যেন সত্যি সত্যি দেশছাড়া হলাম।


[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।