Sunday, October 21, 2007

প্রবাসে দৈবের বশে ০১১

কাকভোরে উঠত হচ্ছে। কাকভোর মানে হচ্ছে, কাকও তখন ভোর হয়নি ভেবে ঘুমায়। কাসেলে সূর্যোদয় হচ্ছে সাড়ে সাতটায়। আমাকে উঠতে হয় মেরেকেটে সাড়ে ছ'টায়। কোনমতে টলতে টলতে উঠে একশোবার হাতড়ে অ্যালার্ম বন্ধ করে কিছুক্ষণ ঝিমাই। তারপর মেইল চেক করি। তারপর নির্জলা চা খাই পোয়া মগ। নির্জলা চা মানে হচ্ছে কেবল দুধে চিনি সহযোগে চা। সকালে বেশ কাজে দেয় জিনিসটা।

কিছু সুখী লোক আছেন, তাঁরা ভোরবেলাই প্রাতকৃত্য সেরে যা কিছু ঝরাবার ঝরিয়ে সারাদিনের জন্য ঝরঝরে তাজা হয়ে যান। এই ক্যাটেগরির লোকেরা সারাদিন ফূর্তিতে থাকেন, লোকজনের সাথে হাসিঠাট্টা করেন, দোকানদারের সাথে দরাদরি কম করেন, ফকিরকে হাসিমুখে ছেঁড়া দু'টাকার নোট দিয়ে দ্যান, অফিস থেকে ঘরে ফেরেন হাসিমুখ নিয়ে। বাকি লোকজন তা পারেন না। আমি বাকির খাতায় নাম লিখিয়েছি এখানে এসে। কবির মতোই নীরব হয়ে গেছে আমার কোষ্ঠ। ভয় পাচ্ছি, ব্যাপারটা দৈনিক থেকে সাপ্তাহিকের দিকে গড়াচ্ছে কি না ভেবে। "একবার বসা হয়ে গেলে কমপক্ষে তিনদিন তার রেশ থাকে শরীরে।"

যাই হোক, এই কয়দিন ভূতের মতো ক্লাস করলাম। জার্মান প্রফেসররা কী খান সকালে, জানার বড় ইচ্ছা। টানা চারঘন্টা কেবল কয়েক ঢোঁক পানি খেয়ে কথা বলেই চলেছেন একেকজন। ছাত্ররা অনেকে ঘুমিয়ে পড়ে। প্রফেসর ক্লাউডি এখানকার বেশ নামকরা লোক, ছোট্টখাট্টো মানুষ, একদম প্রফেসরসুলভ আপনভোলা চেহারা, সমানে একটা ব্ল্যাকবোর্ডে লেখেন আর আরেকটা ব্ল্যাকবোর্ড পানিতে ন্যাকড়া ভিজিয়ে মোছেন আর চুষনি বুলিয়ে শোষেন, তাঁর চমৎকার ক্লাসে বসে দেখলাম আমার পড়শি হাতে মুখ রেখে বেশ মনোযোগ দিয়ে ঘুমাচ্ছে। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে শেষের দিকে আমি দুহাতের ওপর মাথা রেখে বেশ দক্ষতার সাথে বসে বসে ঘুমাতাম, কিন্তু এদের কাছে আমি শিশু।

নবায়নযোগ্য শক্তির বেশ ডাকসাইটে লোকজন কাসেলে শিক্ষকতার সাথে জড়িত। তাঁদের পড়ানোর ভঙ্গিটা বেশ চমৎকার, আর মজার ব্যাপার হচ্ছে বেশির ভাগ শিক্ষকের পড়ানোর ধরন প্রায় একই রকম। প্রেজেন্টেশনগুলি দুর্দান্ত হয়, পুরনো দিনের প্রফেসররা অবশ্য ট্র্যান্সপারেন্ট শিট দিয়ে কাজ চালিয়ে দেন, আর ক্লাউডির মতো কয়েকজন কেবল চক-ব্ল্যাকবোর্ড। ক্লাস শেষে একটা ওয়েবসাইটের লিস্ট দিয়ে দেয়া হয়, সেখানে সেদিনকার ক্লাসের লেকচার স্ক্রিপ্ট দেয়া থাকে, ছাত্ররা সেখান থেকে নামিয়ে নিয়ে দেখতে পারে। প্রত্যেক কোর্সের জন্য আলাদা একটা মেইলগ্রুপ খোলা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইলব্যবস্থায়, কোর্স সংক্রান্ত যাবতীয় কথাবার্তা সেখানে জানিয়ে দেয়া হয়। দেখি আর দীর্ঘশ্বাস ফেলি। ভাবি, হয়তো ক্লাস শেষে বাড়ি ফিরলে হবে। হয় না। দেরি হয়, দেরিতে হয়।


[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।