Tuesday, October 16, 2007

প্রবাসে দৈবের বশে ০০৭

জার্মানির বাড়িঘরগুলি কমবেশি একই রকম। টালির ছাদ, চারতালা বা পাঁচতালা বাড়ি, বেসমেন্টে কাপড় ধোয়াশুকানোর জায়গা। ছাত্রাবাসগুলিতে গড়ে বর্গমিটার পিছু সবশুদ্ধু ভাড়া পড়ে তেরো ইউরোর কিছু বেশি।

পরে খবরের কাগজের বিজ্ঞাপন খুঁটিয়ে দেখলাম। কয়েকজন মিলে একসাথে বাস করার ব্যাপারটা এখানে ভেগে (ভোওনগেমাইনশাফট) নামে পরিচিত। কোন অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিলে আগে থেকে জানিয়ে দিতে হয় যে ভেগে হিসেবে নেয়া হচ্ছে, তখন বাড়িঅলা ভেগে-র সদস্যদের আলাদা ভাড়াটে হিসেবে গণ্য করবে এবং সেই অনুযায়ী চুক্তি হবে। বাড়ি ভাড়ার বিজ্ঞাপনগুলিতে অ্যাপার্টমেন্টের মোট ক্ষেত্রফল, ঘরের সংখ্যা আর ভাড়ার রকমসকম জানানো হয়। ঘর গরম করার খরচ বাদে যে ভাড়া তাকে কাল্টমিটে বলে লোকে, সেই ঠান্ডা ভাড়া, আনুষঙ্গিক খরচ (নেবেনকস্টেন) আর নিরাপত্তা খরচ (কাউৎসিওন) সব মিলিয়ে যা আসে। তবে সরজমিন খোঁজ নিলে দেখা যায় আরো হ্যাপা। হয়তো অ্যাপার্টমেন্টে রান্নাঘর নেই, চুলা আর ফ্রিজ কিনে রান্নাঘর বানিয়ে নিতে হবে! হয়তো টয়লেটে পানির নিরাপদ সংস্থান নেই। নানা ল্যাঠার সম্ভাবনা প্রবল।

একসাথে বিভিন্ন দেশের লোক থাকতে গেলেও মুশকিল। একেকজনের একেক রকম অভ্যেস। আমার পড়শী জামুয়েল যেমন চুলো প্রায় ব্যবহার করেই না, মাঝেমধ্যে চা খাওয়ার জন্য পানি গরম করে শুধু। সে কিভাবে দিনের পর দিন পাঁউরুটিতে জ্যাম, বা মাখন বা জেলি বা পনির মাখিয়ে খেয়ে যাচ্ছে দেখে আমি শুরুতে বিস্মিত হয়েছিলাম। একইভাবে জামুয়েলও আমার পর্বতপ্রমাণ মশলাসহ তরকারি রান্নার তোড়জোড় দেখে আতঙ্কিত। মিউনিখে যে ভোওনহাইমে ছিলাম, সেখানে এক ফ্লোরে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি মহাদেশ থেকে কেউ না কেউ ছিলো, তখন দেখেছি চীনা বা ফরাসীরা টয়লেটের মায়া না করেই মুষলধারে হেগে রেখে চলে যায়, চীনা আর কোরিয়ানদের রান্নার পর রান্নাঘরের চেহারা আর গন্ধে গ্রাউন্ড জিরো ছাড়া আর কিছু মনে হয় না, আর একটা মাত্র কিচেন নিয়ে আট-দশজনের মধ্যে হালকা খিটিমিটি লেগে যায়। সুমন চৌধুরীর এক পড়শিনী নানা ছুতো তুলে ঝগড়া করে যেমন হোস্টেল ছেড়ে চলে গেছে। আমাদের রান্নার বদনাম কেউ করতে চাইলে একটাই করতে পারে, একটু ঝাঁঝালো ব্যাপারস্যাপার হয়। তবে সুমন চৌধুরীর নতুন কানাডিয়ান পড়শী ইতিমধ্যে ভেড়া আর গরুর মাংসের ভুনার ভক্ত হয়ে গেছে, সে রীতিমতো চেয়ে চেয়ে খায়!

ছাত্রদের বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ঘরে টেবিল, চেয়ার, বইয়ের শেলফ, আলমারি আর একটা দিনে-সোফা-রাতে-খাট দেয়া হয়। জার্মানদের আসবাব অত্যন্ত মজবুত, প্রায়ই ভারি আর আর্গোনোমিক হয়। এছাড়া রান্নাঘরে ফ্রিজ, দুইপদের চুলা, ক্যাবিনেট আর খাবার টেবিলচেয়ার দেয়া হয়।

নিজের ঘরে ওঠার পর ইকেয়াতে গিয়েছিলাম হাঁড়িকুড়ি সহ আর যা যা বালছাল লাগে সেগুলি কিনতে। অনেক খুঁজে, অনেক ঢুঁড়ে, অনেক দামী জিনিসের ওপর থেকে চোখ সরিয়ে শ' শ' শেলফের গহীনতম কন্দর থেকে ভালোর মধ্যে সবচে' সস্তা জিনিস খুঁজে বার করে কিনেছি। তার মধ্যে আছে হাঁড়ি, সসপ্যান, ছুরি, কাটাকুটির বোর্ড, থালাবাসন, ভাজাভুজির জিনিস, চামচ-কাঁটা-ছুরি, টেবিল ল্যাম্প, খোসাসুদ্ধু কম্বল, প্রভৃতি। ইকেয়া নিয়ে পরে আরো কিছু বকার বদিচ্ছা রইলো, এখন কিছু খাই, পেটটা চোঁ চোঁ করছে।


[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।