Thursday, October 18, 2007

প্রবাসে দৈবের বশে ০০৯

ইস্কুল খুইলাছে।

প্যান্ডোরার বাক্সও পাশাপাশি খুলে গেছে মনে হলো। বেশ কলিজা কাঁপানো কোর্স, হপ্তায় বিশ ঘন্টা ক্লাস, কিন্তু তার পরও প্যান্ট নষ্ট হয়ে যাবার একটা উজ্জ্বল হলদে সম্ভাবনা দেখছি চোখেমুখে। টানা দুই ঘন্টার ক্লাস, প্রফেসরেরা হাসি হাসি মুখে বকে চলে, এদিকে আমার অবস্থা কাহিল। প্রথম দু'দিন গেলো শক্তির অর্থনৈতিক হালচাল নিয়ে ব্লকফেরআনষ্টালটুং, সকাল আটটা থেকে বিকাল পাঁচটা পর্যন্ত মুষলধারে লেকচার, মাঝে কেবল তিনটা দশ মিনিটের ব্রেক আর একটা রোগাভোগা লাঞ্চব্রেক। মেনজা (বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্টিন)তে না খেয়ে হামলা করলাম সুমন চৌধুরীর রান্নাঘরের ওপর, যিনি কি না লেকচার হলের পাশের ভবনেই থাকেন।

কাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ক্যাম্পাস বলা যেতে পারে হল্যান্ডিশার প্লাৎসকে। বেশ গোছানো সুন্দর ক্যাম্পাস, পুরোটা লাল ইঁটের, এককালে এটা ছিলো হিটলারের অস্ত্রকারখানা, একটা বিশাল চিমনি আজও রয়ে গেছে। লেকচার হল বেশ চমৎকার। আমার সহপাঠীদের মধ্যে অনেকেই মধ্যবয়স্ক, আবার একেবারে চ্যাংড়াও আছে কিছু। ব্লক ফেরআনষ্টালটুঙে পুরো একটা কোর্সের বক্তব্য দু'দিনে বোঝানো হয়, কাজেই প্রফেসর ফিশেডিক বেশ দ্রুত এগিয়ে গেলেন। প্রথম দফায় একটু সমস্যা হচ্ছিলো তাঁর কিছু কথা বুঝতে, প্রেজেন্টেশন না থাকলে হয়তো মাথার ওপর দিয়ে চলে যেতো। পরিবেশ প্রসঙ্গে দেখলাম সরাসরি বাংলাদেশের কথা বলা হচ্ছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নে বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ হতে যাচ্ছে। কফিবিরতির সময় কয়েকজন এসে পাকড়াও করলো আমাকে, আমি বিমর্ষ মুখে জানালাম, দেশে গিয়ে ভালো দেখে একটা নৌকা কিনবো। মনে মনে ভাবলাম, বিএমডব্লিউকে ভালো দেখে কিছু মোটরবোট বানানোর পরামর্শ দেয়া যেতে পারে আমাদের গুলশানপট্টির হিজলতমালদের জন্য।

পর পর দুইদিন নবায়নযোগ্য শক্তি, পরিবেশ আর অর্থনীতির চাপে পিষ্ট হয়ে আজ সকালে বায়ুশক্তির ওপর ক্লাস করতে গেলাম ইঙ্গশুলেতে। প্রফেসর হায়ার বেশ স্পষ্ট লেকচার দেন, বেশ রসিক মানুষ, শুরুতেই নিজের লেখা বইগুলি গছিয়ে দিলেন। পোলাপানও পোংটা কম না, একজন জানতে চাইলো, লেখকের কাছ থেকে কিছুটা সস্তায় বই পাওয়া যাবে কি না। হায়ার প্রশান্ত হাসি হেসে জানালেন, নিজের বই তিনি নিজে বিক্রি করতে পারেননা, আইনত পেজগি আছে। তবে দশবারোজন কিনতে চাইলে তিনি অর্ডার দিয়ে আনিয়ে দিতে পারেন। তাঁর লেখা জার্মান বই তুলনামূলকভাবে সস্তা হলেও ইংরেজি সংস্করণের দাম একশো ঊনত্রিশ ইউরো। এরপর তিনি কিছুক্ষণ মুলামুলি করে পরীক্ষার তারিখ ঠিক করলেন। একঘন্টার পরীক্ষা হবে, ক্রেডিটপিছু দশমিনিট করে। তারপর অনবদ্য লেকচার দিলেন জার্মানিতে বায়ুশক্তি নিয়ে। ভদ্রলোক এই ক্ষেত্রে খুবই অভিজ্ঞ, প্রাথমিক প্রায় সব বড় প্রজেক্টে ছিলেন, নিজের তোলা ছবি দিয়ে প্রেজেন্টেশন সাজিয়েছেন।

আরো কিছু ক্লাস আজ না হওয়ায় বাড়ি ফিরে এসেছি। এই ক'দিন সচলে ঠিকমতো বসতে পারিনি, ভবিষ্যতে সমন্বিত বাঘ কিংবা অপরিণত ঘুড়ার খাবার খেয়ে বেঁচে থাকতে হবে মনে হচ্ছে। বুড়া বয়সে ক্যান যে আবার লেখাপড়া করতে গ্যালাম!


[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।