Wednesday, October 17, 2007

প্রবাসে দৈবের বশে ০০৮

আমার ভাষাপ্রীতির ইতিহাস নিয়ে অযথা প্যাঁচাবো না ভেবেছিলাম, কিন্তু একটু বলতে হচ্ছেই। মাতৃভাষা বাদে অন্য ভাষার প্রতি আমার একটা সহজাত টান সবসময় কাজ করে। ইংরেজি ভাষাটা লেখাপড়ার মধ্যে এত বিশ্রীভাবে গুঁজে দেয়া যে টিনটিন না থাকলে হয়তো আমি ভাষাটার প্রতি একটা বিতৃষ্ণা আরো দীর্ঘদিন অনুভব করতাম। বিটিভির চমৎকার সব সিরিয়াল আর বৃহস্পতিবারের মুভি অব দ্য উইকের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হয়। জন "হ্যানিবল" স্মিথের মতো চুরুট কামড়ে ধরে একদিন আমিও গড়গড় করে ইংরেজি বলতে পারবো, এ আত্মবিশ্বাস আমি প্রতি সপ্তাহেই নতুন করে ফিরে পেতাম।

আমার অগ্রজ দীর্ঘদিন রুশ ভাষা শিখেছিলেন। ইংরেজি বাদে তৃতীয় একটা ভাষা আমার আগ্রহ প্রবলভাবে আকর্ষণ করেছিলো, বিশেষ করে সিরিলিক হরফ। রুসকি ইয়াজ্ক দ্লিয়াভজিয়েখ (সবার জন্যে রুশ ভাষা) লেখা সেই রহস্যময় বইগুলি মাঝে মাঝে উল্টেপাল্টে দেখতাম, কিন্তু সিরিলিক হরফ পর্যন্তই আমার দৌড়, আর পরবর্তীতে খুচখাচ ইয়ো তে লিউবলিউ ... সেই বইতে ছবি এঁকে দেখানো ছিলো কিভাবে গলার গভীর গহীন থেকে এক একটা শব্দ উগরে দিতে হয়, খুবই আগ্রহমারা পদ্ধতি সেটা, বিশেষ করে সদ্যকিশোরদের জন্য।

রুশ ভাষা আমার আর শেখা হয়নি, ক্লাস সেভেনে উঠে জানতে পারলাম আরবী শিখতে হবে দু'বছর। আমার আরবীর পারিবারিক শিক্ষার দৌড় হরফ পর্যন্তই, আমার বাবার কাছ থেকে শেখা। সেই আক্ষরিক জ্ঞান সম্বল করে আমি স্কুলের আরবী শিক্ষকের কাছে পিঠ আর চিত্ত সমর্পণ করলাম। তখন মনে হতো তিনি আমার প্রতি অকারণ বিদ্বিষ্ট ছিলেন, তা না হলে গরুর মতো পেটাবেন কেন? তাঁর বেতের ভয়ে নয়, প্রচন্ড ক্রোধ আর বিদ্বেষ নিয়ে আমি আরবী চর্চা শুরু করি। বাসায় রাতের বেলা বসে বসে ইংরেজি ট্রান্সলেশন ফেলে আমি আরবী লেখা চর্চা করতাম, খুব গর্বের সাথে বলতে পারি, আমার আরবী লেখা মুক্তাক্ষরের মতো ছিলো। রাজুলুন আলিমুন থেকে বাড়তে বাড়তে মোটামুটি নাজমুল আদাব আর খায়রুল আদাবের চিপাগলিও আমি চর্চা করে ফেলি। ক্লাস সেভেন আর ক্লাস এইট, দু'বছরই আমি আরবীতে সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়েছিলাম স্কুলে। ক্লাস নাইনে উঠে আমি দুইবছরের বিদ্বেষ ঝাড়ি আরবী বইগুলিকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে। আমার আরবী জ্ঞানও অতি দ্রুত আবার রাজুলুন আলিমুনে নেমে আসে। স্কুলের টেস্টে আমার আশাতীত রকমের ভালো নাম্বার ছিলো ধর্মশিক্ষায়, কিন্তু এস এস সিতে লেটারও পাইনি।

নটরডেম কলেজে ভর্তি হওয়ার পর আমার সময় কিছুটা খারাপ যাচ্ছিলো। পিতৃবিয়োগের শোকের পাশাপাশি নতুন বন্ধুবৃত্ত গঠনের বিচিত্র প্রক্রিয়া, আর নটরডেম কলেজের পদার্থবিদ্যা ব্যবহারিক ক্লাসে একের পর এক "রিপীট" খেয়ে আমি একেবারে জেরবার হয়ে যাই, ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কলেজে একরকম বন্দী। টেবিল টেনিস আর কতক্ষণ খেলা যায়, আমি লাইব্রেরির বিভিন্ন গলিঘুঁপচি ঘেঁটে অচিরেই ইতালিয়ান, ল্যাটিন আর স্প্যানিশ ভাষা শিক্ষার বিশাল এক লিখিত রিসোর্স আবিষ্কার করি। ইতালিয়ান ভাষার ওপর তেমন বেশি বই ছিলো না, ল্যাটিনের ওপরও কম ছিলো, কিন্তু স্প্যানিশের ওপর কম করে হলেও গোটা দশেক ব্যকরণচর্চার ফাঁপা বই ছিলো। আমি সেগুলিকে বসে বসে সমাধানের চেষ্টা করতাম। শুধু বই পড়ে শেখা সেই তুচ্ছ স্প্যানিশ দিয়ে আমি ইয়াহুতে প্রথম বন্ধুত্ব করি এক মেক্সিকান বালিকা, আদ্রিয়ানা ওচোয়ার সাথে। আদ্রি পরবর্তীতে আমাকে ডিকশনারী, বই, চিঠি, কার্ড এবং অনেক মিষ্টি মেইল করে দীর্ঘদিন স্প্যানিশের প্রতি আমার ভালোবাসাকে জিইয়ে রেখেছিলো।

কিন্তু বই পড়ে ভাষা শেখা যায় না। ভাষা লিখে, পড়ে, বলে, শুনে, ভেবে শিখতে হয়। যে কোন বিদেশী ভাষা শেখার উপায় হচ্ছে সেই ভাষাভাষিণী কোন তরুণীর সাথে প্রেম করা, কিন্তু ঢাকায় হিস্পানিক ভাষা শিক্ষাসুযোগ বা হিস্পানিক ভাষাভাষিণী প্রেমাস্পদা, দুই-ই অপ্রতুল। এ ভাষাটা আমার আজও শেখা হয়নি, পণ করে রেখেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাশিক্ষাকেন্দ্রে আগামী সেমেস্টারে সুযোগ ও অর্থাগম ঘটলে স্প্যানিশ শিখেই ছাড়বোই ছাড়বো।

এর পর আমার ভাষা শিক্ষা মোড় নেয় ফরাসীর দিকে। আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে উদ্ভিন্নযৌবনা সব বালিকাদের সাথে দুই টার্ম ফরাসী শিখে আমি কিছুটা বিরতি নিই। আমার প্রিয় শিক্ষক ছিলেন মিজানুদ্দিন খান (তখন শিক্ষক দেখে কোর্স বাছাই করা যেতো), জানিনা তিনি এখনও শেখান কি না, মাঝখানে শুনলাম কঙ্গো চলে গিয়েছিলেন।

ফরাসীতে হঠাৎ বিরতি পড়ে কিছু ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে। বেশ মানসিক চাপের মধ্যে থেকে দুই হাজার দুই থেকে জার্মান শেখা শুরু করি গোয়েটে ইনস্টিটুটে। উদ্দেশ্য, নিজেকে ব্যস্ত রাখা।

এরপর আবারও এপ্রিল থেকে জার্মান আর ফরাসী একসাথে শেখা শুরু করি। সে এক আপদ। ফরাসী ক্লাসে গিয়ে ইয়া বলে ফেলতাম, জার্মান ক্লাসে উয়ি। ফরাসী শিক্ষক স্বপন বর্মণও জার্মান শিখতেন, তিনি চোখ রাঙাতেন কেবল, মুখে কিছু বলতেন না। তো, সারাদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের হাবিজাবির পর হয় ফরাসী, নয় জার্মান, নয় ফরাসী-জার্মান দুই-ই, নয়তো টিউশনি, আমি খুব আঁটো একটা রুটিনে ঢুকে পড়ি।

আমার কান ফরাসী ভাষাকে মুখের ওপর না বলে দেয়। কোঁ কোঁ করে ফরাসী লোকজন কী বলে আমি কিছুই ধরতে পারি না, কিন্তু জার্মানটা আস্তে আস্তে সড়গড় হয়ে আসতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ফরাসী শেখায় ইস্তফা দিয়ে দিই দ্যো সঁ দ্যো শেষ করে। আমার বন্ধুদের অনেকেই খুব চোস্ত ফরাসী জানে, আমি ফরাসীমূর্খ হয়ে জার্মান শিখতে থাকি মালকোঁচা মেরে।

আমার জার্মান শিক্ষায় বিশেষভাবে গতি এনে দেয় একটি বৃত্তি, গোয়েটে ইন্সটিটুটের প্রেমিয়েনষ্টিপেন্ডিয়ুম, বাহান্ন দিনের জন্য মিউনিখের গোয়েটে ইন্সটিটুটে আমি মিটেলষ্টুফে (মাধ্যমিক) পর্যায়ে জার্মান ভাষা শিখতে যাই। আমার কান আর মুখ দুটোই খুব ভালো তৈরি হয়ে গিয়েছিলো ঐ কোর্সের পর, তবে মুখটাকে আমি ২০০৫ এর শুরুর দিকে এসে হারিয়ে ফেলি, এখনও কিছুটা হাতড়ে জার্মান বলতে হচ্ছে।

জার্মান ভাষার ওপর এ যাবৎ আমি চারটি পরীক্ষা দিয়েছি, তার প্রায় প্রতিটিই প্রায় হাগিয়ে দেয়ার মতো ছিলো। ২০০৩ এর জানুয়ারিতে যখন ৎসেট-ডে দিই, তার কয়েকদিন আগে বান্দরবন থেকে ফিরেছি সূর্যোৎসবের ট্রেকিং শেষ করে, হাতে পায়ে প্রচুর ব্যথা। ডিসেম্বরে যখন ৎসেটএমপে দিই, তখন পরীক্ষা রীতিমতো কঠিন হয়েছিলো, বিশেষ করে বায়ার্ন এর আঞ্চলিক টানে বলা জার্মান ছিলো হোয়রফেরষ্টেয়েনে (শুনে-বোঝা)। ২০০৬ এ দিই টেস্টডাফ, আর ২০০৭ এ এসে দিলাম ডেএসহা (বিশ্ববিদ্যালয়ে জার্মান ভাষায় পরিচালিত কোন প্রোগ্রামে অংশগ্রহণের জন্য ভাষার পরীক্ষা)। টেস্টডাফ টোয়েফল বা আইইএলটিএসের মতো, সেটাতে আমি দুটি ইউনিটে নব্বই শতাংশের বেশি, একটিতে আশি শতাংশের বেশি পেলেও লিখিত পরীক্ষায় আশি শতাংশের কম নাম্বার পেয়েছিলাম বলে কাসেল বিশ্ববিদ্যালয় আমাকে ডেএসহা দিতে একরকম বাধ্য করে। সেখানে আমাকে পেতে হবে সাতষট্টি শতাংশ। অনেক দুশ্চিন্তা আর বিরক্তি সম্বল করে পরীক্ষা দিয়ে ঊনআশি শতাংশ নাম্বার পেয়ে শেষমেশ ভর্তি হতে হয়েছে প্রোগ্রামে। টেস্টডাফ দিয়ে আমি রীতিমতো কাহিল হয়ে পড়েছিলাম, এতো প্রচন্ড ক্লান্তি আর কোন পরীক্ষা দিয়ে লাগেনি (জার্মান ভাষার পরীক্ষাগুলি সবই পাঁচ ঘন্টার ওপরে)। ডেএসহা তুলনামূলকভাবে সহজ, পাশ করে বুঝলাম, আশির কম পেলে চলবে না, সাতষট্টির ওপরে পেতে হবে।

এই দীর্ঘ পরীক্ষার অভিজ্ঞতায় যা বুঝলাম, তা হচ্ছে, আমি জার্মান রুশের মতো না শিখে, আরবীর মতো ভুলে গিয়ে, স্প্যানিশের মতো অধরা রেখে, ফরাসীর মতো মাঝপথে থামিয়ে পার পাবো না। আমাকে জার্মান কুপিয়েই খেতে হবে। কাজেই আমার ওপর চাপিয়ে দেয়া এ পরীক্ষার ঝাল একমাত্র টিউটোনিক বালিকাদের ওপরই ঝাড়তে হবে। কাজেই কাসেল বিশ্ববিদ্যালয়ের দুষ্টু মেয়েরা, ফোরজিখট!

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।