Sunday, October 14, 2007

প্রবাসে দৈবের বশে ০০৫

কাসেলে এসে লোডশেডিং ব্যাপারটিকে মিস করছি। বোধ হবার পর থেকেই লোডশেডিং আমার নিত্যসঙ্গী। গত পরশু বাইরে থেকে ফিরে এসে দেখি আমার ভোওনহাইমের দরজায় একটি নোটিশ সাঁটানো। সেখানে কাসেল শহরের পাবলিক ওয়ার্কসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামীকাল বৃহস্পতিবার বেলা বারোটা থেকে দু'টো পর্যন্ত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিদ্যুৎ থাকবে না। কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে নাগরিকের সদয় বিবেচনার অনুরোধ জানাচ্ছে। মনটাই খারাপ হয়ে গেলো আমার। কবে আমি আমার ঢাকার বাসায় এমন নোটিশ দেখতে পাবো?

অবশ্য এখানে বিদ্যুতের খরচও সেইরকম। দেশে যেমন সন্ধ্যে হলেই আমরা ঘরে ঘরে বাতি জ্বালিয়ে রওশন করে রাখি, এমনটা এখানে ঘটে না। যে ঘরে কোন কাজ আছে শুধু সে ঘরের বাতি জ্বলবে, নাহলে মাস শেষে বিলের কোপের মুখে পড়তে হবে। বিদ্যুৎ অপচয় কমানোর কয়েকটা উপায়ের একটা হচ্ছে এর দাম বাড়িয়ে দেয়া। ইয়োরোপের কিছু দেশে যেমন গাছ কাটার প্রবণতা কমানোর জন্য কাঠের দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে সরকারী উদ্যোগে। কাটা কাঠের ক্রেতা খুঁজে পাওয়াই দুষ্কর তখন।

এখানে চুলোগুলি সব বৈদ্যুতিক, অবশ্য একসাথে সব চুলো চালাতে গেলে সার্কিট ব্রেকার ট্রিপ করে। আমার পড়শী জামুয়েল দেখি সবসময় পাঁউরুটির ওপর দিয়ে চলছে, মাঝে মাঝে চা খাওয়ার জন্য কেবল চুলায় হাত দেয়। আমার রান্নাবান্নার হিড়িক দেখে সে রীতিমতো বিস্মিত। একবেলা খাবার জন্য আমি যেরকম বিষণ্ন মলিন মুখে পেঁয়াজ কাটি, রদ্দা মেরে রসুনকে ন্যাংটো করি, আদা কুচাই এবং বাক্স খুলে আরো আরো মশলা বার করতে থাকি, দেখে সে ভয়ই পেয়েছে এক রকম।

একদফা রান্নাবান্নার পর প্রচুর আবর্জনা জমে যায়। পেঁয়াজরসুনের ছাল চামড়া ছাড়াও হাবিজাবি প্যাকেট জমে যায় একগাদা। এখানে ময়লা ফেলার জন্য সুনির্দিষ্ট বিন আছে। পুরনো কাগজের জন্য অনেকগুলি বিন, কারণ জার্মানরা প্রচুর কাগজ প্রতিদিন কাজে লাগায়। বিজ্ঞাপনের কাগজই জমে যায় একগাদা। ভোওনহাইমের লেটারবক্সের পাশেই একটা বড়সড় বাক্স, সেখানে কয়েকদিনের মধ্যেই বোঝাই হয়ে যায় বিজ্ঞাপনের কাগজ। রিসাইকেল করার প্যাকেটগুলির গায়ে সংকেত দেয়া থাকে, সেগুলিকে আবার হলুদ প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরতে হবে, অন্যান্য কাঁচ আর ধাতব বর্জ্য সহ। জৈব বর্জ্যের জন্য আছে আলাদা বাক্স। প্রতিদিন শ্টাড্টরাইনিগুঙের বিশাল ট্রাক এসে এই বিনগুলি খালি করে নেয়, এ জন্যে বেশ ভালোই কড়ি গুণতে হয় নাগরিকদের। জার্মানরা রাস্তাঘাটে কোন খোসা ফেলে না, কিছুদূর পর পরই কোন না কোন পোস্টের গায়ে একটা মুয়লআইমার ঝোলানো থাকে, বাসে বা ট্রামে থাকে ছোট বিন, তবে তারা সিগারেটের পোঙা ফেলে রেখে যায় প্রচুর। ইউনিফর্ম পরা রাইনিগুংসফির্মার লোক কাঠের চিমটা দিয়ে বেশ দক্ষতার সাথে সেসব তুলে নিয়ে ফুটপাথ বা ক্যাম্পাস পরিষ্কার রাখে, কাজটা দেখেই বোঝা যায় বেশ কঠিন। আমার ঘরে কোন ওয়েস্টপেপারবাস্কেট নেই, আমি একটা বড়সড় প্লাস্টিকের ব্যাগ দিয়ে কাজ চালিয়ে নিচ্ছি, আর দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেছি, দুই ইউরোর নিচে দাম না হলে কোন বাস্কেট কিনবো না, পৃথিবী উল্টোদিকে ঘুরতে শুরু করলেও না।

কাসেলে মোটামুটি ঠান্ডা পড়ে গেছে, সোয়েটার পরে ঘুরি সবসময়, আর রাতে হীটারটা অল্পস্বল্প ছেড়ে রাখি। এখন শরৎ, জানালা দিয়ে দেখতে পাচ্ছি বেশ দমকা বাতাসে গাছের পাতা ঝরে পড়ছে মন্দলয়ে। বহুদিন পর নিজের ঘরের জানালা দিয়ে আকাশ দেখছি। ঢাকায় আমার ঘরের জানালা দিয়ে পড়শীদের মুখ চোখে পড়তো, তা-ও আবার বালিকাশূন্য পরিবার! হায়, আমার বোধহয় পড়শী বালিকাদের সাথে দাড়িগোঁফ গজানোর পর আর এ জীবনে নষ্টামো করা হলো না!


[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।