Saturday, September 29, 2007

পিচ্চিতোষ গল্প ০৬: শিলাবৃষ্টির গল্প

লুলুদের বাড়ির পাশে একটা মস্তবড় একতলা বাড়ি আছে, যার ছাদ টিনের। সেই বাড়িটাতে বাস করে বদমেজাজী মোমবাতি দাদু। মোমবাতি দাদুর নাম মোটেও মোমবাতি নয়, কিন্তু তিনি খুব ফর্সা, আর খুব রোগা, আর সবসময় ধবধবে সাদা লুঙ্গি আর কুর্তা পরে থাকেন বলে সবাই তাঁকে আড়ালে মোমবাতি সাহেব ডাকে। কে যেন একবার সামনাসামনি মোমবাতি ডেকে ফেলেছিলো, আর মোমবাতি দাদু ভীষণ রেগে একটা ছড়ি হাতে নিয়ে তেড়ে গিয়েছিলেন পেটানোর জন্য। মানুষকে নাকি উল্টোপাল্টা নামে ডাকতে নেই, কিন্তু লুলুও অন্যদের মতো আড়ালে তাঁকে মোমবাতি দাদু ডাকে।

মোমবাতি দাদুদের সেই একতলা বাড়ির পেছনে কয়েকটা সুপুরি গাছ আছে। সুপুরি গাছ দেখতে খুব মজার, আর সুপুরি গাছের ছবিও আঁকা সহজ, খুব সরু লম্বা গাছের একদম মাথায় পাতা, সেখানে সুপুরি ধরলে কিছু গুটিগুটি দেখা যায়। লুলু তার ছবি আঁকার খাতায় মাঝে মাঝে সুপুরি গাছ আঁকে বিভিন্ন রং দিয়ে। পৃথিবীর সব গাছ যদি দেখতে সুপুরি গাছের মতো সোজা হতো, তাহলে তাকে ছবি আঁকার ক্লাসে ড্রয়িংআপার বকা শুনতে হতো না। একটা আমগাছের ছবি আঁকতে দিয়েছিলেন আপা, কিন্তু লুলু আমগাছ ঠিকমতো আঁকতে পারেনি। আমগাছের অনেক পাতা, সেই পাতাগুলি আঁকতে অনেক ঝামেলা। সুপুরি গাছের ছবি আঁকতে দিলে কিন্তু লুলু পটাপট এঁকে ফেলতে পারতো। অবশ্য লুলু শুধু আমের ছবি বেশ ভালোই আঁকতে পারে।

মোমবাতি দাদুদের বাড়িতে অবশ্য নারকেল গাছও আছে একটা, তবে নারকেল গাছের ছবি আঁকতে লুলুর অতটা ভালো লাগে না কেন যেন। সেই নারকেল গাছে মাঝে মাঝে একটা কাঠঠোকরা এসে বসে, খটখটখট করে গাছ ঠুকতে থাকে ঠোঁট দিয়ে। মোমবাতি দাদু মাঝে মাঝে বেরিয়ে এসে হুসহুস করে তাড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু কাঠঠোকরা তো আর কাক বা চড়ুই নয় যে হুস হুস শুনে উড়ে যাবে, সে আপনমনে গাছ ঠোকরাতে থাকে।

নারকেল গাছটায় একটা কাকের বাসাও আছে, জানে লুলু। সে একদিন জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে, কাকটার বাসায় ছাই ছাই নীল রঙের তিনটা ডিম! কাকের ডিম দেখে খুব আশ্চর্য লেগেছে লুলুর। সে তার ছবির খাতায় ঐ কাকের বাসার একটা ছবি এঁকে ফেলেছে তৎক্ষণাৎ। মুরগির ডিম লালচে হয়, সাদা হয়, হাঁসের ডিম সাদা হয়, কিন্তু কাকের ডিম ওরকম গোমড়া নীলচে কেন?

তবে লুলুর ভালো লাগে মোমবাতি দাদুর বাড়ির টিনের ছাদটা। যখন বৃষ্টি পড়ে, তখন গোটা ছাদটা একসাথে ঝমঝম করে হেসে ওঠে, আকাশের মেঘগুলো আবার জবাবে গুড়গুড় করে ওঠে। লুলুর এ শব্দটা খুব ভালো লাগে। শব্দ তো আর এঁকে রাখা যায় না, রাখা গেলে লুলু খুব যত্ন করে তার ছবির খাতায় টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ এঁকে রাখতো।

সেদিন সন্ধ্যার আগে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হলো, সাথে খটাখট শব্দ, যেন অনেক কাঠঠোকরা মোমবাতি দাদুর নারকেল গাছটাকে ঠোকরাচ্ছে। লুলু দৌড়ে বারান্দায় গিয়ে দেখে, ও মা, সামনের মাঠে সাদা সাদা দানার মতো কী যেন আছড়ে পড়ছে বৃষ্টির সাথে। বাতাসে কেমন হিম হিম ভাব।

লুলু দৌড়ে গিয়ে তার মা-কে ডেকে আনে। লুলুর মা এসে বলেন, "ও মা, শিল পড়ছে! লুলু ঘরে যাও, ঠান্ডা লাগবে!"

লুলুর অবশ্য ইচ্ছে করছিলো মাঠে গিয়ে কয়েকটা শিল কুড়িয়ে আনতে। কিন্তু লুলুর মা লুলুকে বেরোতে দেবেন না।

"কী জোরে শিল পড়ছে দ্যাখো! মাথায় এসে পড়লে মাথা ফেটে যাবে!"

লুলু বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে আর মোমবাতি দাদুর টিনের চালে শিলের ঝুমঝুম শব্দ শোনে। কে যেন একবার মোমবাতি দাদুর চালে ঢিল মেরেছিলো, দাদু লাঠি হাতে বেরিয়ে এসেছিলেন। আজ আকাশ ফুঁড়ে হাজার হাজার শিল পড়ছে, আজকে তিনি কাকে পেটাবেন?

একটু পরে বৃষ্টিটা ফুরিয়ে যায়। লুলু দেখতে পায়, সারা মাঠের সবুজ ঘাসের ফাঁকে চিক চিক করছে অজস্র শিল। তার খুব ইচ্ছে করে ওগুলি কুড়িয়ে নিয়ে আসতে।

লুলুর মা নিষেধ করেন। "ঠান্ডা লাগবে লুলু!"

লুলু ঝুলোঝুলি করতে থাকে। লুলুর মা কী ভেবে রাজি হয়ে যান। শুধু তা-ই না, তিনিও মস্তোবড় একটা বাটি নিয়ে লুলুর সাথে বাইরে নেমে আসেন।

লুলু মনের আনন্দে মাঠ জুড়ে ঘুরে ঘুরে শিল কুড়িয়ে এনে মায়ের হাতে ধরা বাটিতে জড়ো করতে থাকে। সাদা সাদা হিম হিম টুকরো একেকটা, হালকা বালির কণা লেগে আছে সেগুলোর সাথে, আর ঘাসের সবুজ টুকরো।

[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।