Wednesday, September 26, 2007

ইজ্জত আব্রাহাম ও নরসুন্দর বিভ্রাট

১.

আমাদের পাড়ার আন্তর্জাতিকখ্যাতি-কিন্তু-আভ্যন্তরীণঅবহেলাপ্রাপ্ত মানবাধিকারকর্মী ইজ্জত আব্রাহামকে কে বা কাহারা একেবারে দিনে দুপুরে --- দুপুর তিনটের দিকে --- নির্মমভাবে ঠেঙিয়ে রাস্তার মোড়ে ফেলে রেখে চলে গেছে। তাঁর শখের ঢেউ খেলানো চুলগুলো এখানে ওখানে খাবলে তুলে ফেলা হয়েছে, দুই চোয়ালে দুটো জোরালো আলু তুলে দেয়া হয়েছে, বাম চোখে কালসিটে, একটা দাঁতও নড়ে গেছে, শরীরের কিছু প্রশস্ত অংশে প্রাপ্ত স্যান্ডেলের শুকতলির ছাপ বিশ্লেষণ করে সেখানে নির্বিচারে কঠোর পদাঘাত করা হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা অনুমান করছেন। বিদেশবরেণ্য মানবাধিকারকর্মীর ওপর এহেন বর্বরোচিত হামলার প্রতিবাদে আগামীকাল প্রেসক্লাবের সামনে একঘন্টার প্রতীকী অনশন করবে পাশের পাড়ার মানবাধিকার সংরক্ষণ সংগঠন "মানুষ আমরা --- নহি তো মেষ"-এর কর্মীরা। ইজ্জত আব্রাহাম এখন একটা বেসরকারী হাসপাতালে খোদ মৃত্যুর সাথে কষে পাঞ্জা লড়ছেন।
এই খবরটা কিন্তু আমরা পাড়ার লোকেরা খবরের কাগজে পড়ার আগে পাইনি। আর খবরের কাগজে এ সংবাদ লিখেছে সাংবাদিক ছারপোকা। পাঠকরা হয়তো জানেন, ছারপোকা হচ্ছে আমাদের পাড়ার ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক বদিউল হুদার অনেকগুলো ছদ্মনামের একটা।

তবে এ ধরনের উটকো সংবাদ বদিউল হুদার পক্ষেই যোগান দেয়া সম্ভব। নিশুতি দুপুরে কে কোথায় মার খেয়ে পড়ে আছে বা পড়ে থাকতে পারে, তা আমাদের জানার সম্ভাবনা খুবই কম। ঐ সময়টায় আমরা হয় বাড়িতে নাক ডাকিয়ে ঘুমোই, অথবা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন একটি রসশুন্য কষা ক্লাসে নাক না ডাকিয়ে ঝিমোই। কাজেই ইজ্জত আব্রাহামের সেবায় ঐ সময়টায় আমরা কিছুই করতে পারবো না।

এরপর পেছনের পাতা থেকে সাত এর পাতা আট এর কলামে গিয়ে আমরা আরো জানতে পারি, পরিচয় জানা যায়নি এমন একজন ষন্ডা লোক গতকাল দুপুরে আচমকা পথের ওপর ইজ্জত আব্রাহামের ওপর হামলা করে। ইজ্জত আব্রাহাম আজীবন মানবের অধিকার আদায়, সংরক্ষণ ইত্যাদি কাজে লড়েছেন, বেশির ভাগ সময় যতো রাজ্যের নরপশুর বিরূদ্ধে, কিন্তু মানবের বিপরীতে মানবের যে চিরাচরিত হাতাহাতি লড়াই, তাতে তিনি অতটা দড় নন। তাই প্রথমটায় ক্ষীণ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারলেও অচিরেই ষন্ডাটা তাঁকে পেয়ে বসে, এবং আগাপাশতলা কচুয়া মার লাগিয়ে কাবু করে ফেলে। লোকটার চেহারার বর্ণনা দিতেও ব্যর্থ হয়েছেন আহত এই মানবাধিকারকর্মী। তাঁর অসম্পূর্ণ বিবৃতি থেকে জানা যায়, লোকটা ষন্ডা ছিলো মোষের মতো, গা থেকে একটা বোঁটকা মোষালো গন্ধও যেন বেরোচ্ছিলো, আর লোকটার গায়ে হেভি জোর --- কারণ তিনি কিছুতেই তার সাথে পেরে ওঠেননি। লোকটার পরনে যে কী ছিলো, তা-ও তাঁর খেয়াল নেই, কারণ জামাকাপড় খুঁটিয়ে দেখার ফুরসত জংলিটা তাঁকে দেয়নি --- গেঞ্জি-লুঙ্গিও হতে পারে, আবার শেরওয়ানী-সালোয়ারও হতে পারে। কাউকে কী তিনি সন্দেহ করেন? --- অবশ্যই। যে নরপশুরা এদেশে মানবাধিকারকে পানিতে চুবিয়ে তিলে তিলে দগ্ধে মারছে, তাদেরই ভাড়া করা কোন গুন্ডা ছিলো ব্যাটা। কিন্তু ইজ্জত আব্রাহাম ভয় পান না, তিনি সুস্থ হয়ে উঠলে আবারো মানবাধিকার-এর খাতিরে লড়ে যাবেন।

সংবাদে আরো জানা যায়, এলাকার প্রখ্যাত সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী জনাব বদিউল হুদা রাস্তা থেকে প্রায় সংজ্ঞাহীন অবস্থায় ইজ্জত আব্রাহামকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান। তাঁর প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের জন্যেই আজ অল্পের জন্যে প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন এক মহৎপ্রাণ।

২.

আমরা এখন আমাদের নিত্যকালীন সান্ধ্য গাড্ডাস্থল, কলিমুদ্দির পাড়ায় সাড়া জাগানো তেলেভাজার স্বর্গ, দি আদি তেলোত্তমা রেস্তোরাঁর ছাপরার নিচে বসে। আমাদের সামনে ধূমায়মান সিঙ্গারা, কিন্তু নিতান্ত ঠান্ডা মেরে যাওয়া আধাকাপ করে চা। আমরা নিজেদের উদ্যোগেই চা নিয়ে বসেছিলাম, কিন্তু আধকাপ খেয়ে শেষ করতে না করতেই পিন্টুর মেজমামা, আমাদের পাড়ার সেরা গুলন্দাজ, হাতে একটা আট ভাঁজ করা খবরের কাগজ আর মুখে অভিজাত বিদ্রুপের হাসি নিয়ে উপস্থিত। সিঙ্গারার অর্ডারটা তাঁরই দেয়া, আর আমাদেরকে পেপার পড়ার হুকুমটাও তিনিই দিয়েছেন। সেটা পড়তে গিয়েই আমাদের চা জুড়োলো, আর নটে গাছটি শুরোলো, মানে, শুরু হলো আর কি।

‘ব্যাটা কতবড় বাটপার দেখেছিস?’ নিজের ভাগের সিঙ্গারায় শার্দুলসুলভ দংশন করে বলেন মামা।

আমরা খানিকটা মর্মাহত হই। বেচারা ইজ্জত আব্রাহাম, পদে পদে মানবের অধিকার নিয়ে মাথা ঘামায় বলে, পান থেকে চুন খসলে চ্যাঁচামেচি করে বলে, সবার সাতেপাঁচে থাকে বলে কেউ তাকে পছন্দ করে না, কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই মার খেয়ে আলু হয়ে যাওয়া লোকটার প্রতি মামার কেন এহেন বিতৃষ্ণা, মরার ওপর এমন নির্বিচার খাঁড়ার ঘা?

‘কী করেছে সে?’ খানিকটা আহত সুরেই বলি আমি। ‘এমনিতেই তো তাকে মেরে খোঁড়া করে দিয়েছে শুনলাম ।’

‘সে তো ইজ্জত ভাইকে মেরেছে।’ মামা সিঙ্গারায় আরেকটা কামড় দিয়ে সেটার দফা রফা করে ছাড়েন। ‘আমি বলছি এই বদের হাড্ডি বদিউল হুদার কথা! নিজের নিউজে নিজের কেমন ক্যানভাসিং করলো দেখলি? ও নাকি আবার বুদ্ধিজীবী!’

আমাদের মন হালকা হয়ে যায়। আমরাও সিঙ্গারায় কামড় দেই হুমহাম করে।

‘যা বলেছেন  লোকটা অত্যন্ত বদ! নামের শুরুই হয়েছে বদ দিয়ে! বিসমিল্লায় গলদ!’ শিবলি খেতে খেতে বলে।

‘ফাজিল শালা!’ রেজা সংক্ষেপে কাজ সেরে এক কামড়ে সিঙ্গারাটা শেষ করে ফেলে।

আমি সিঙ্গারার উল্লেখযোগ্য একটা অংশ চিবোতে চিবোতে বলি, ‘ওটাকেও আগাপাস্তলা পেঁদিয়ে ইজ্জত ভাইয়ের পাশের বেডেই চাপিয়ে দেয়া যেতো ---।’

মামা ক্রুর হাসেন, ‘মুহাহাহাহা --- সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন --- যাই হোক, কিন্তু গতকাল রাতে ইজ্জত ভাইকে দেখতে গিয়েছিলাম।’

শিবলি সন্দেহ প্রকাশ করে, ‘কিন্তু কাগজে তো লিখেছে উনি মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন নাকি --- এ অবস্থায় আপনাকে দেখা করতে দিলো?’

মামা প্রবল বঙ্কিম একটি ভ্রুকুটিকুটিল কটাক্ষ ঝাড়েন শিবলির দিকে, যার একমাত্র অনুবাদ হতে পারে --- ওনাকে দেখা করতে দেবে না এমন বুকের পাটা কার আছে, আর এ ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশের স্পর্ধাই বা শিবলির হয় কিভাবে? কিন্তু মুখে বলেন, ‘আরে ধুর  ওসব হচ্ছে অতিরঞ্জন, ঐ হুদা গাধাটারই কাজ। আমি তো গিয়ে দেখলাম ইজ্জত ভাই একটা সিনেম্যাগাজিন পড়ছে আর বার্লি খাচ্ছে কোঁৎ কোঁৎ করে। তো, আসল ঘটনা ওনার কাছ থেকেই শুনলাম!’

আমরা সোৎসাহে বলি, ‘তারপর তারপর ---?’

৩.

প্রতিটি ঘটনার বীজই পোঁতা থাকে আপাতদৃষ্টিতে অসংলগ্ন সব ঘটনার ভিড়ে। যেমন গতকাল যে নিখিল নগরী নরসুন্দর সংঘের ধর্মঘট চলছিলো, আমরা কি কেউ জানি?

কিন্তু কেনই বা শহরের সব নাপিত একসাথে ক্ষেপে গেলো? --- সে ঘটনার বীজও আবার অনেক দূরে। সুত্রাপুর না ডেমরা কোথায় যেন এক চুল কাটার সেলুনে স্থানীয় এক শীর্ষ সন্ত্রাসী চুল কাটা, শেভ করা আর মাথা বানানোর জন্যে গিয়েছিলেন। সন্ত্রাসীদের যেমন ছবি আমরা কল্পনা করে থাকি, ওনারা দেখতে মোটেও তেমন নন --- তাঁরা গজলগায়কদের ঢঙে কুর্তা পরেন, বোম্বাই ছাঁটে চুল রাখেন, পাইলটদের মতো ফিটফাট থাকেন বেশিরভাগ সময়। তো, সেই বেচারা নাপিত নিখুঁত শাহরুইখ্যা ছাঁটে তাঁর চুল কেটে দিলো, আবলুস কাঠের পালিশের মতো মসৃণ করে দিলো গাল, কিন্তু মাথা বানাতে গিয়েই একেবারে সব পন্ড করে দিলো। কিভাবে মাথা বানিয়েছিলো, খোদা মালুম, কিন্তু সব কিছু সেরে ওঠার পর দেখা গেলো সেই সন্ত্রাসী স্মৃতিভ্রষ্ট হয়েছেন, অতীতের কিছুই তার মনে পড়ছে না। তিনি যে একজন সন্ত্রাসী, নানারকম শ’খানেক মামলাহামলার অভিযোগ আছে তাঁর নামে, তা-ও বিস্মৃত হয়েছেন তিনি। এমনকি নাপিতের টাকা পর্যন্ত বেচারা মিটিয়ে দিয়ে গেছেন, সেলুন থেকে বেরোবার আগে। এ থেকেই বোঝা যায়, কী ভীষণভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তিনি --- সম্ভবত মস্তিষ্কের স্মৃতিসংক্রান্ত কোন স্পর্শকাতর জায়গায় চাঁটি পড়ে যাওয়ায় এমন বিপর্যয় ঘটে গেছে।

তো যাই হোক, চুল কাটার পর সেই স্মৃতিভ্রষ্ট ব্যক্তি ঘুরতে ঘুরতে আপন মনে স্থানীয় দারোগার সাথে সাক্ষাৎ করতে গেছেন, কেন কে জানে! প্রাণের কোন গভীর গোপন টানেই হয়তো, কিংবা অবচেতনের গোপন কোন ব্যাখ্যাতীত নির্দেশনায় --- কেননা দারোগাদের সাথে সাধারণত শীর্ষসন্ত্রাসীদের বেশ দহরমমহরম থাকে, জল যেমন জলের দিকে গড়ায়, সন্ত্রাসীরাও পুলিশের দিকেই হেলে থাকেন। তো, তাঁর সাথে মিনিট দশেক আলাপ করেই দারোগা হঠাৎ তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠেন, বুঝে ফেলেন যে ডাল মে জরুর কুছ কালা হায় --- তাঁকে এক উপদারোগার নিরাপদ হেফাজতে রেখে জরুরি স্বাস্থ্যসেবার জন্যে এক কনস্টেবলকে পাঠান স্থানীয় এক শীর্ষডাক্তারকে ডেকে আনতে, আর স্বয়ং একটা ব্যাটন হাতে সেই নাপিতের সেলুনে হানা দেন, তারপর নাপিত মনু মিয়া ও তার অ্যাসিস্ট্যান্টকে নানা কদর্থক গালাগালি করেন এবং বেধড়ক পেটান। কে বলে যে আমাদের দেশের পুলিশ তদন্ত করে কিছু বার করতে পারে না? শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে এই ভুল দুর্নাম অপ্রমাণ করেছেন সেই দোর্দন্ডপ্রতাপ দারোগা দিলদারুদ্দৌলা, দু®কৃতীকে একেবারে হাতেনাতে ধরে প্রাথমিক শাস্তিদানের পর্বটাও সেরে ফেলেছেন।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত মারাত্মক আহত মনু মিয়া, মনু মিয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট, আর সেই শীর্ষ সন্ত্রাসী, লেজকাটা মোস্তফা একই হাসপাতালে একেবারে পাশাপাশি বেডে চিকিৎসাধীন --- তবে লেজকাটা মোস্তফা যদি বাকি দু’জনের আগে স্মৃতি ফিরে পায়, এবং কেন সে হাসপাতালে এলো, এ ব্যাপারে তদন্ত করে, তাহলে মনু মিয়া ও তার সহকারীর আর তেমন সুস্থ হবার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তাদের সবাইকে কড়া পুলিশপ্রহরায় রাখা হয়েছে, মনু মিয়া ও তার সহকারী যাতে কোনভাবেই কানুনের চোখহাতলাঠি এড়িয়ে বেরোতে না পারে, আর লেজকাটা মোস্তফা যাতে কোনভাবেই বেহুদা ঝামেলায় না ভুগে আবার নিরাপদে এই মুক্তআকাশমিষ্টিবাতাসে একটু বেরিয়ে, একটু বেড়িয়ে আসতে পারেন। আর সাংবাদিকগুলোও আজকাল বখে গেছে, তিলকে তাল করা তো তাদের কাজই, কখন কী না কী ছাপিয়ে বসে ব্যাটারা --- তাই সাংবাদিক ঠেকানোর জন্যেও বিশেষ গুন্ডাপুলিশ নিয়োগ করা হয়েছে, সাংবাদিকসুলভ চেহারা দেখলেই তারা নির্বিচারে ঠ্যাঙাবে।

তবে এ ঘটনা সর্বজনবিদিত হয়ে পড়লে নগরীর নাপিতসমাজ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। নরসুন্দরদের ওপর নরপশুদের হামলা অবিলম্বে প্রতিরূদ্ধ হোক --- এই মর্মে তাঁরা প্রেসক্লাবের সামনে একটি সমাবেশ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পুলিশ তাদের বাধা দেয়। তাঁরা অনশনের পথে আর যাননি, না খেয়ে থেকে খামাখা দেহক্ষয় করার কোন মানে খুঁজে পাননি তাঁরা, বরং ঠিক করেছেন, অসহযোগ আন্দোলন করবেন, দোষী দারোগার শাস্তি দাবী করে তাঁরা বলেছেন, অমুক তারিখ নগরীর সব সেলুনে কার্যক্রম বন্ধ থাকবে, তাঁদের দাবি মেনে নেয়া না হলে তাঁরা পরবর্তীতে কঠোরতর কর্মসূচী দেবেন। আর অমুক তারিখটা নাকি গতকাল ছিলো।
আমাদের পাড়ার নাপিত দিল্লু ভাই অবশ্য দোকান বন্ধ করেননি, তিনি দোকানেই সারাক্ষণ নাকি বসেছিলেন, আর কেউ চুল কাটাতে এলেই একটা পোস্টার দেখিয়ে দিয়েছেন আঙুল তুলে। সেই পোস্টারে লেখা: নাপিত মনু মিয়া ভাইয়ের ওপর সন্ত্রাসীদের দোসর পুলিশের নির্যাতনের বিচার চাই, অনির্দিষ্ট কালের জন্যে পরামাণিকবৃন্দের ধর্মঘট!!! তার পাশে আরেকটা পোস্টার --- লেজকাটা মোস্তফা নিপাত যাক, মনু মিয়া ভাই মুক্তি পাক। তারপাশে আরেকটা --- ঠোলাতন্ত্রের অবসান চাই, দিলদু দারোগার ফাঁসি চাই, ইত্যাদি ইত্যাদি।

মুশকিল হয়েছিলো এখানেই। ইজ্জত আব্রাহাম আবার ঠিক সেদিন দুপুরেই গোসল করতে গিয়ে হঠাৎ আয়নায় দেখলেন, তাঁর জুলফি দুটো বেখাপ্পা বড় হয়ে গেছে; মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি রাখার অভ্যেস তাঁর, সেগুলোও বেড়ে গিয়ে লাদেনপ্রতিম দেখাচ্ছে তাঁকে --- আর চুলগুলো তো জটা পাকিয়ে শেষ। তিনি ঠিক করলেন, আজ তিনি চুল ছাঁটাবেন আর শেভ করাবেন, তাতে যত খরচা লাগে লাগুক। তিনি শীর্ষ সন্ত্রাসী নন, কিন্তু তাই বলে কি বেচারার চুলদাড়ি নিয়ে সামান্য সাধআহ্লাদ থাকতে নেই? তাছাড়া সেদিন বিকেলেই তাঁর নারীর ন্যায্য অধিকার আদায়ের লক্ষে বদ্ধপরিকর এক মহিলা সংগঠনের দুই তরুণী উপনেত্রীর সাথে মিটিং আছে --- সঙ্গত কারণেই তিনি একটু ফিটফাট হয়ে যেতে চান।

এই শুভ নিয়ত নিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত গিয়েছিলেন দিল্লু ভাইয়ের সেলুনে, যার নাম পরিপাটি হেয়ার ড্রেসার। আসলেই দিল্লু ভাই খুব পরিপাটি করে চুল ছাঁটেন, মাঝে মাঝে পকেটটাও পরিপাটি করে ছেঁটে দেন। এদিকে ওদিকে খুচখাচ করে কাঁচি চালিয়ে পাঁচ মিনিট পর পঞ্চাশ টাকা দাবি করে বসেন, তার মধ্যে তিন মিনিটই হয়তো তিনি ব্যয় করেন থুতনি ধরে মাথার অক্ষরেখাগুলোকে ঠিকমতো স্থাপন করার কাজে, কাল্পনিক কিছু অক্ষের বরাবরে মিলিয়ে, এক চুলও এদিকওদিক হতে দেন না --- সম্ভবত পৃথিবীর চৌম্বকরেখার সাথে তাঁর চুলছাঁটার কোন সম্পর্ক আছে, নইলে চুল ছাঁটতে গিয়ে অমন চুলচেরা টিউনিং করতে যাওয়া কেন? ওঁর সাথে টাকা পয়সা নিয়ে খ্যাচখ্যাচ করাও খুব বিপদজনক, সেক্ষেত্রে পরবর্তী ছাঁটটা --- যা হয়তো অত্যন্ত গুরুত্ববহ, হয়তো কোন সুন্দরী বালিকার বড় ভাইবোনের বিয়েতে আমন্ত্রিত হবার উপলক্ষেই সেই ছাঁটের কাছে মস্তকসমর্পণ, যে ছাঁট আপাত বদখদ চেহারার ছদ্মাবরণকে এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিয়ে অন্তরালের দুর্ধর্ষ রূপকে উন্মোচিত করে তুলবে, যেভাবে পাথর থেকে ভাস্কর্য বেরিয়ে আসে --- অতি বিতিকিচ্ছিরি হবার সমুহ আশঙ্কা থাকে, চেহারার ধাঁচটা হয়তো তখন হয়তো সুদূর অতীতের কোন পূর্বপুরুষের সাথে মিলে যেতে থাকে, ডারউইন সাহেবের প্রতি বাহবা দিতে ইচ্ছে হয়, কাজেই হুঁশিয়ার! এ তথ্য সম্পর্কে ইজ্জত আব্রাহামের অনবগত নন, কিন্তু তার পরও তাঁর মতো কঞ্জুষ যখন খোদ দিল্লু ভাইয়ের মতো পকেটপরায়ণ পরামাণিকের কাছে গিয়েছেন, তখন বোঝাই যায়, কী গভীর চুলছাঁটানোরবাসনা তাঁর অন্তর্গতে রক্তে ক্রীড়া করছিলো।

কিন্তু ইজ্জত আব্রাহামের কৃপণতা সম্পর্কে দিল্লু ভাইও অনবগত নন। প্রায়ই ইজ্জত ভাই হুটহাট করে হাজির হয়ে এখানে এক চিমটি ওখানে এক খাবলা চুল ছাঁটিয়ে নেন, যার জন্যে পয়সা চাইতে দিল্লু ভাইয়ের পর্যন্ত লজ্জা লাগে, হাজার হোক, পাড়ার লোক, উঠতে বসতে তো আর তাদের কাছে পয়সা দাবি করা যায় না। আর বিপদে আপদে পাশে এসে দাঁড়াবেন, এমন আশ্বাস ইজ্জত আব্রাহাম প্রায়ই দিয়ে থাকেন, অতএব আলতু ফালতু একটা বহুলচর্চিত শাস্তিসুলভ বাঁদুরে ছাঁটে তাকে শায়েস্তা করাও মুশকিল, তাঁকে চটিয়ে দিয়ে বিপদের বোঝার ওপর শাকের একটি আঁটি যোগ করার বাসনাও দিল্লু ভাইয়ের নেই। কিন্তু তাই বলে গণিতে তিনি কাঁচা নন, রীতিমতো ক্যাল্কুলেটরে হিসেব কষে দেখেছেন, সেই তুচ্ছাতিতুচ্ছ ছাঁটের বিলও তাঁর দরে আড়াই টাকার মতো আসে। আড়াই টাকায় একটি শখের সিগারেট হয়ে যায়, এক কাপ চা অথবা দু’টা আলুপুরি খাওয়া যায়, তারপর ফকিরকে পঞ্চাশ পয়সা দান করে অশেষ নেকি হাসিল করাও সম্ভব। কাজেই ঘন ঘন ইজ্জত আব্রাহামসৃষ্ট এই হুজ্জত পোয়ানোর খরচ নেহায়েত কম নয়। হপ্তায় এমন দু’তিনটা সিগারেট, দু’তিনকাপ চা, অগণন আলুপুরি আর বিশাল সোয়াব এভাবে গচ্চা দিতে কার ভালো লাগে বলুন?

কাজেই দিল্লু ভাই যে ইজ্জত আব্রাহামের ওপর কিছুটা ক্ষিপ্ত, তা সহজেই অনুমেয়।

ইজ্জত আব্রাহামের চুল ছেঁটে দেয়ার আহ্বানে যে দিল্লু ভাই সাড়া দেননি, তা বুঝতে আইনস্টাইন হওয়া লাগে না। যদিও এই বিশেষ ঘটনাটির সার্থকতার প্রতি ইজ্জত ভাই একটা আবছা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, অর্থাৎ অর্থের একটি ভূমিকা থাকবে এতে, যত অর্থ লাগে লাগুক, চুল তিনি ছাঁটাবেন, পয়সা নিয়ে কিপটেমো করবেন না। কিন্তু ঘরপোড়া গরু দিল্লু ভাই তাতে কর্ণপাত করেননি, পাত করার মতো কর্ণ তাঁর দু’টির বেশি নেই বলেই বোধহয়। তিনি একটি পুরনো পত্রিকার বহুলপঠিত চলচ্চিত্রাভিনেত্রীর সাক্ষাৎকারে পুনরায় মনোনিবেশ করার আগে আঙুল তুলে দেয়ালে শোভিত পোস্টারের বাণীগুলো ইজ্জত ভাইকে দেখিয়ে দিয়েছেন। নাপিতের অধিকার আজ ভুলুন্ঠিত, এর পুনরূদ্ধারে সংগ্রামে রত পরামাণিক কাউন্সিলের সিনিয়র সদস্য তিনি, তিনিই যদি সামান্য অর্থের মোহে, পয়সার লোভে নীতি, আদর্শ, বিশ্বস্ততা সব জলাঞ্জলি দিয়ে বসেন, তাহলে দেশটা চলবে কিভাবে? আর ইজ্জত আব্রাহাম নিজে মানবাধিকার কর্মী হয়ে কিভাবে আরেকজন কমরেডকে আন্দোলনে খ্যামা দেয়ার আহ্বান জানান?

কিন্তু এসব ভালো কথা কানে নিতে চান না ইজ্জত আব্রাহাম, ক্রমাগত ঘ্যানঘ্যান করতে থাকেন। তিনি নাকি তাঁর চুল ছাঁটানোকে একটি ব্যতিক্রমধর্মী, বিপ্লবী প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিপন্ন করার জন্যে নানা দেশের রাজনৈতিক আন্দোলন নিয়ে একটা ফাঁদালো গল্প জুড়ে দেন। তারপর হাজারো উদাহরণ টেনে একে একে প্রমাণ করেন যে পুঁজিবাদ, সমাজতন্ত্র, রাজতন্ত্র, সামন্ততন্ত্র --- এক মোল্লাতন্ত্র বাদে সব তন্ত্রই তাঁর চুলদাড়ির ছাঁটাই হওয়ার অধিকারকে সংরক্ষণ করে। আর তাঁর চুল ছাঁটা নাকি পুলিশের বিরূদ্ধে নাপিতদের এক সংগ্রামী ভূমিকা রাখতে সহায়তা করবে --- সেটা ঠিক কিভাবে তা ইজ্জত আব্রাহাম মামাকে বলেননি।

কিন্তু দিল্লু ভাই অত ভ্যাবা আবেগালু টাইপ লোক নন, তাছাড়া সিনেম্যাগাজিনে সেই চলচ্চিত্রাভিনেত্রীর সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে রসঘন পর্যায়ে তিনি তখন সবে পৌঁছেছেন, যেখানে সেই অভিনেত্রী সাংবাদিকের কাছে অকপটে বিভিন্ন নামজাদা সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, অধ্যাপক ও আমলাদের সাথে তাঁর আবাল্য ঘনিষ্ঠতার নানা বিশদ বিবরণ দেয়া শুরু করেছেন, কে তাকে কোলে নিয়েছিলেন, কে তাকে কোল থেকে নামাতেই চাইতেন না, কে তাকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়েছিলেন বলে পরবর্তী জীবন দমে দমে আপসোস করে গেছেন, আর এখন কারা কারা তাঁকে কোলে নিতে লালায়িত। কাজেই তিনি ইজ্জত ভাইকে সাফ সাফ জানিয়ে দেন, এমন আজগুবি কথা তিনি জীবনে শোনেননি, আর এসব চাপাবাজি দিয়ে তাঁকে টলানো যাবে না। তবে যেহেতু এতগুলো সমাজব্যবস্থায় ইজ্জত ভাইয়ের চুলকে ছাঁটাই হবার অধিকার দিয়েছে, তবে তা-ই হোক, ঐ দিকের কোণের ড্রয়ারে চিরুনি, কাঁচি আর ক্ষুর আছে, তিনি যেন আজ নিজেই নিজের সেবাটুকু করে নেন, যন্ত্রপাতির ভাড়ার জন্যে কোন পয়সা দিল্লু ভাই চার্জ করবেন না।

নাপিতেরা হরদম চাঁছে, মাঝে মাঝে ছুলে দেয়, কিন্তু এমন চাঁছাছোলা পরামর্শ শুনে ইজ্জত আব্রাহাম যেন নভোবন্দর মির থেকে মাটিতে পতিত হন একেবারে। চিরুনি, কাঁচি বা ক্ষুর চালনায় তিনি একেবারে অদক্ষ নন, কিন্তু আয়না দেখে দেখে নিজের চুল কে কবে ছাঁটতে পেরেছে? ক্ষুর কেন, তলোয়ার দিয়েও তো এই দুরূহ কর্ম সম্পাদন সম্ভব নয় --- আলেকজান্ডার কি জুলিয়াস সিজার, কেউ পারেনি। হ্যাঁ, গোঁফ বা দাড়ি বেশ ছাঁটা চলে এ পদ্ধতিতে, দাড়ির সীমান্তপ্রদেশ, কিংবা গোঁফের বাগ-না-মানা অন্তরীপগুলোকে তো সাইজে আনা সম্ভব, কিন্তু তাই বলে এই আলুথালু কেশদাম, যার আসন খোদ মস্তক? তাছাড়া আয়নায় ডানবামের কী একটা গন্ডগোলের কথা তিনি পড়েছিলেন যেন উচ্চমাধ্যমিক পদার্থবিদ্যায়, সে কথা স্মরণ করে এই জটিল দায়িত্বের হাত থেকে অব্যাহতি প্রার্থনা করেন ইজ্জত ভাই, দিল্লু ভাইকে আবারো কাতর সনির্বন্ধ অনুরোধ করেন আজকের মতো তাঁর চুল ছেঁটে দিতে।

কিন্তু কাকুতিমিনতি করে কে কবে বাঙালির মন জয় করতে পেরেছে? দিল্লু ভাই নিজের মনকে বিজিত হতে দিলেন না, মুচকি হেসে শুধু বললেন, চেষ্টায় কী না হয়? চেষ্টা না করেই হাল ছেড়ে দেয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। রবার্ট ব্রুস যেখানে সপ্তম বারের চেষ্টায় --- ইত্যাদি ইত্যাদি। উল্লেখ্য, এই উত্তরও কিন্তু তাঁর নিজ^ মস্তিষ্কপ্রসূত নয়, অশ্লীল চলচ্চিত্রে অভিনয় করে অস্কার পুরস্কারলাভের সম্ভাব্যতা সংক্রান্ত সিনেসাংবাদিকের কি একটা বেফাঁস প্রশ্নের উত্তর এমনি মুচকি হেসে দিতে গিয়ে প্রতিভাবানদের ক্রোড়চারিণী সেই অভিনেত্রীর জবাবটাই হুবহু তুলে দিয়েছেন তিনি।

ইজ্জত ভাই কিছু একটা যুক্তি বা প্রলোভন দেখানোর চেষ্টা করছিলেন, যুক্তি দিয়ে বাঙালিকে টলানো মুশকিল হলেও মুলা দিয়ে গাধা নড়ানো সর্বকালে সর্বদেশে সম্ভব, আর সেটাই তো দস্তুর। কিন্তু এর মধ্যে দিলু ভাইয়ের মোবাইলে করুণ সুর বেজে ওঠে, সেটা কানে দিয়ে দুয়েকবার হুঁ-হাঁ করেই দিল্লু ভাই খুব উত্তেজিত হয়ে ওঠেন, সেই ম্যাগাজিনটা ফেলে রেখেই তিনি চোঁচাঁ করে দৌড়ে দোকান থেকে বেরিয়ে যান, যাওয়ার আগে ইজ্জত আব্রাহামকে দোকানে খানিকটা বসতে বলেন তিনি, দোকান সামলাতে কাউকে পাঠানোর আগে তিনি যেন চলে না যান, গেলে খুব খারাপ হবে, এমন গোছের একটা হুমকি দিয়ে একটা রিকশায় চেপে বসেন। সেই রিকশা উল্কাবেগে পাড়া ছেড়ে ছোটে। কেন কে জানে।

ইজ্জত আব্রাহাম আর কী করবেন, নিজের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করা ছাড়া? তাছাড়া, ঠ্যাকাটা তো তাঁরই, মহিলা সংগঠনের উপনেত্রীদের সাথে তো তাঁরই সাক্ষাৎ করতে হবে। তিনি ড্রয়ার হাঁটকেমাটকে একটা ফোকলা চিরুনি, একটা লৌহজং কাঁচি আর একটা টুথব্রাশের মতো ভোঁতা ক্ষুর খুঁজে পান। এগুলো সম্ভবত তাঁর মতো ত্যাঁদর খদ্দেরদের সেবায়, সুয়োমটো বা স্বতপ্রণোদিত হয়ে একটা কিছু করার জন্যেই রাখা হয়েছে। মূল ড্রয়ারগুলোতে জাম্বো সাইজ তালা মারা, সেগুলোতে যে অনেক আধুনিক, যুগোপযোগী এবং একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্যে প্রস্তুত অনেক সরঞ্জামাদি রয়েছে, তাতে ইজ্জত ভাইয়ের কোন সন্দেহ থাকে না। কিন্তু সেগুলোতে হাত দেয়ার সাহস, সত্যি বলতে কি, ইজ্জত ভাইয়ের নেই, কারণ দিল্লু ভাই ফিরে এসে কোনরকম ঊনিশবিশ দেখলে কী করবেন, তা বলা মুশকিল। গুন্ডা লাগিয়ে তাঁকে মার খাওয়াতে পারেন, কিংবা কে জানে, নিজেই হয়তো উদ্যোগী হয়ে এগিয়ে আসতে পারেন।

৪.
আমরা ব্যাপারটা বুঝে ফেলি।

‘ঠিকই তো,’ চায়ে চুমুক দিয়ে বলি আমি, ‘ঠিকই করেছেন দিল্লু ভাই।’

‘হক কাজ!’ শিবলি বলে, এক চুমুকে সবটুকু চা সাবড়ে দেয় সে।

রেজা শুধু শ্যেন দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায়। ‘আমার মাল্টিমিটারটা পুড়িয়ে দিয়েছিস তুই!’ কেমন যেন ঘড়ঘড়ে গলায় বলে সে, রীতিমতো ভয় করে আমার।

‘দিল্লু ভাই আবার কী করবে?’ মামা চটে যান, গল্পের মাঝে বাধা পড়ায়।

‘এই যে  গুন্ডা লাগিয়ে ইজ্জত ভাইকে প্যাঁদানি খাওয়ালো?’ রেজা বলে, আর আড়চোখে আমার দিকে তাকায়।

মামা বিরক্ত হয়ে বলেন, ‘আরে ধুর, কথা শেষ করতে দে! দিল্লু ভাই আবার গুন্ডা লাগাতে যাবে কোন দুঃখে? গল্পের আসলটাই তো শুরু হয়নি !’

৫.

গল্পের আসলটা হচ্ছে, ইজ্জত ভাই বাস্তবপ্রেমিক মানুষ, নগদ যা পাও হাত পেতে নাও নীতিতে বিশ্বাসী তিনি, তাই উপযুক্ত অস্ত্রের বৃথা সন্ধানে কালাতিপাত না করে সেই আদি লৌহযুগের আমলের শস্ত্র দিয়েই আয়নার সামনে বসে প্রায় পনেরো মিনিট খুচখাচের পর নিজের গোঁফ, দাড়ি ও সংলগ্ন কেশরাজিকে একটি বিপ্লবী, সংগ্রামী তথা মানবাধিকারসচেতন রূপ দিতে সমর্থ হন। হ্যাঁ, এমন গোঁফদাড়ি নিয়ে মহিলা সংগঠনের যুবতী উপনেত্রীদের সাথে সাক্ষাৎ করা যায় বটে, প্রেস্টিজে চিড় ধরে না।

কিন্তু নিজের বখামার্কা চুলগুলোকে কিভাবে বাগে আনা যায়, এ নিয়ে যখন ইজ্জত আব্রাহাম গভীর চিন্তায় মগ্ন, তখনই দোকানে হুড়মুড়িয়ে ঢোকে এক ছোকরা। হিলহিলে শুকনো চেহারা, গাঁজাখাওয়া চাপাভাঙা মুখ, মাথায় উশকোখুশকো চুল, চক্ষুদুটি করমচারক্তিম, পরনে বাদামী রঙের ছিটছিট কুর্তা, লাল রঙের জিন্স, কাঁধে ঝোলানো মডিফায়েড, অর্থাৎ জিপার লাগানো শান্তিনিকেতনী ঝোলা। চেহারায় কেমন একটা দিশেহারা ভাব, কেমন এক আকুতি --- দেখেই বুঝে ফেলেন তিনি, এ ছোকরা নির্ঘাৎ চুল ছাঁটাতে এসেছে। এরও হয়তো কোন মহিলা সংগঠনের পান্ডীদের সাথে মুলাকাৎ করার গুরুতর তাড়া আছে।

ছোকরা মুখ খুলতেই ইজ্জত ভাই দেখেন যে তাঁর অনুমান নির্ভুল। ‘শুনুন, আমি জানি যে আজ দিনভর আপনাদের ধর্মঘট চলছে। কিন্তু  কিন্তু আমার চুল আপনাকে ছেঁটে দিতেই হবে!’ কেমন এক বেপরোয়া, আমারআরকোথাওযাবারনেই ভাব করে বলে সে, ভারি মিহি সুরে। ‘চুল না ছাঁটালে কিন্তু আমি ভারি সমস্যাতে পড়বো!’

ছেলেটার বিশুদ্ধ রাবীন্দ্রিক সংলাপ, বেশভূষা আর স্কন্ধলগ্ন ঝোলার ভেতর থেকে কয়েকটা লিটল ম্যাগাজিন আর একটা কবিতার বইয়ের কোণা উঁকি মারতে দেখেই ইজ্জত ভাই বুঝে ফেলেন, এ ব্যাটা নিশ্চয় কোন সাংস্কৃতিক কর্মী। কিংবা, হয়তো কোন কবি। মোটকথা, প্রয়োজনের চেয়ে ন্যূন আক্কলপসন্দসম্পন্ন কেউ একজন। নইলে, স্রেফ কাঁচি হাতে তাঁকে চুল কাটার সেলুনে একা বসে থাকতে দেখেই নাপিত বলে ধরে নেবে কেন?

তাঁর এ অনুমানকেও নির্ভুল প্রতিপন্ন করে ছোঁড়াটা ফুঁপিয়ে ওঠে, ‘আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কবিতা মঞ্চে আমার কবিতা আবৃত্তি করার কথা, কিন্তু --- কিন্তু দেখুন তো, এমন মোচ, এমন দাড়ি আর এমন চুল নিয়ে মঞ্চে ওঠা কারো পক্ষে সম্ভব? আমি কবি হতে পারি, কিন্তু হটেনটট তো নই! --- তাছাড়া কত স্কুলকলেজের মেয়েরাও আসবে কবিতা শুনতে, আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েবন্ধুরা তো আছেই, একটু ছাঁটিয়ে না গেলে কী একটা বিতিকিচ্ছিরি কান্ডের মধ্যে গিয়ে পড়বো বলুন তো?’

ইজ্জত আব্রাহাম সমবেদনার সাথে মাথা দোলান। তাঁর ভাবভঙ্গিতে ভরসা পেয়ে ছোকরা বকে চলে, ‘আমি জানি, আজ আপনাদের খুব কড়া ধর্মঘট চলছে। শহরজুড়ে নাপিতের কাঁচি বন্ধ। গবাদিপশু আর মৌলবাদী ছাত্র সংগঠনের পান্ডা ছাড়া কারো কাছে কোন উন্মুক্ত ক্ষুর নেই, জানি আমি। আজ ভোর থেকে সব সেলুনের দ্বারে দ্বারে আমি ফ্যা ফ্যা করে ঘুরছি পথভোলা ফড়িঙের মতো  চুল ছাঁটাতে গিয়ে চোখেমুখে দেখছি কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা, ওফফ, সে আর কহতব্য নয়! সব নাপিতের মুখেই এক রা, ভাইসব, কাজকামে যেও নাকো তুমি, দিওনাকো কাঁচি ঐ যুবকের চুলে  কিন্তু চুল না ছাঁটালে আমার কী সমূহ বিপত্তি হতে পারে তা কি আপনি উপলব্ধি করতে পারেন না? নারীর চোখের বিবশ চাহনিই যদি লব্ধ না হলাম, তাহলে কবি হয়ে কী ছাতাটা লাভ হলো মোর --- ?’ উদ্গত অশ্রু সামলাতে সামলাতে বলে চলে সে।

ইজ্জত আব্রাহামের চোখ ছলছল করে ওঠে। তিনি মনে মনে বলেন, জানি রে ভাই, জানি। তোমার দুঃখ কি আমি বুঝি না ভেবেছো? দিল্লু হারামজাদাটাকে পরবর্তীতে যদি ইসকুরু টাইট না করি তাহলে আমার নাম ফিরিয়ে রাখবো ---।

ওদিকে বকতে বকতে বেশ একটা বক্তৃতার ঝোঁক এসে যায় কবিটার --- শাশ্বত বাঙালি অভ্যেস --- সে বকে যায়, ‘ধর্মঘট পালন করবেন, সে আপনার নাগরিক অধিকার ---,’ “অধিকার” শব্দটা শুনেই এদিকে ইজ্জত ভাইয়ের মাথায় ঝাঁ করে রক্ত চড়ে যায়, ‘কিন্তু হে নরসুন্দর ভাই মোর, ধর্মকে ঘটে পুরে রাখবেন না! নরগণকে ছেঁটে, কামিয়ে সুন্দর করে তোলাই তো নরসুন্দরের ধর্ম, সেই ধর্মচ্যুত হয়ে দেশ ও দশের সর্বনাশ ডেকে আনবেন না! যে ধর্মঘট নরের কল্যাণ সাধন করে না, তা আদপে ধর্মঘটই নয়, ধর্মঘাত!’

ইজ্জত আব্রাহাম আবেগকম্পিত গলায় বলেন, ‘নিশ্চয় নিশ্চয়, সবার আগে মানুষের অধিকার! --- বসে পড়ুন ভাইটু, বসে পড়ুন!’

এবার ছোকরা পট করে বসে পড়ে, নিজেই সীটের পিঠে ঝুলন্ত চাদরটা মুড়ি দিয়ে বসে, চুলে একবার হাত চালিয়ে বলে, ‘একটা পাভারোত্তি ছাঁট দিয়ে দেন ভাই!’

আবেগতাড়িত হয়ে যা তাঁকে মানায় না, তাতেই হাত দিয়ে বসেন ইজ্জত ভাই, ধর্মঘট চলাকালীন কাঁচি হাতে এক কেশবিব্রত খরিদ্দারের চুলে কাঁচি চালিয়ে বসেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি তো নাপিত নন, তিনি একজন মানবাধিকার কর্মী, চুল তিনি জীবনে আগে কখনো নিজের হাতে ছাঁটেননি, হোক সে নিজের চুল বা পরের চুল। আর এই চুল ছাঁটাই করতে পারাও যে মানুষের একটি খুচরা মৌলিক অধিকার, এই উপলব্ধিই তাঁকে পরোপকারের এই বিপদজনক পথে ঠেলে দিলো।

কিন্তু এই অধিকার ও অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তাঁর দীর্ঘ সংগ্রাম নিয়ে ভাবতে ভাবতে পাভারোত্তি ছাঁটের কথাটা যেন তাঁর কানেই যায় না। পরোপকারের একটা উচ্ছ্বসিত বাসনার ঠ্যালায় ছাঁটের ধরন সম্পর্কে ভাবতে ভুলে যান তিনি, চিরুনি দিয়ে টেনে ধরে এদিকে ওদিকে যথেচ্ছা ঘ্যাঁচাঘ্যাঁচ কেটে চলেন। আবেগের তাড়নায় ভেবেছিলেন, কাজটা বুঝি জটিল কিছু নয়, কিন্তু মিনিট খানেক কাঁচি চালানোর পর তিনি আচমকা আয়নার দিকে চেয়ে দেখলেন, বেশ গুরুতর একটা গলদ হয়ে গেছে।

এই একটি মিনিট ছোকরা মুখ বুঁজে সয়ে ছিলো, কারণ ভিক্ষার চাল কাঁড়া আর আকাঁড়া, যেখানে শহরময় নাপিতরা অসহযোগে মত্ত, সেখানে একজনকে ভুলিয়ে ভালিয়ে ধর্মঘটচ্যুত করে কার্যোদ্ধারের আনন্দেই সে মশগুল ছিলো। কিন্তু মিনিটখানেক পর আয়নায় যখন তার চোখ পড়লো, চমকে সটান দাঁড়িয়ে পড়লো সে।

‘এ কী?’ আর্তনাদ করে ওঠে ছোকরা।

‘ইশশ, এ কী হলো?’ মুখে হাত চাপা দিয়ে অস্ফূট স্বরে বলেন ইজ্জত আব্রাহাম।

কাঁচি চালানোর অনেক হিসেব নিকেশ আছে। আঙুল দিয়ে চার আনা আট আনা মেপে চুল ছাঁটতে হয়, এ তো আর ঘাসছাঁটা নয় যে একরকম ছেঁটে দিলেই হলো। আবেগতাড়িত হয়ে এদিকে সেদিকে খানিকটা জোরেই কাঁচি বুলিয়ে গিয়েছিলেন, তাতে করে ছোকরার এলোমেলো চুলের কিছু জায়গায় প্রায় তালু উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে, আর কিছু জায়গায় তেরছাভাবে কিছু চুল দাঁড়িয়ে আছে। এ চুলে আর যা-ই হোক, পাভারোত্তি ছাঁট দেয়া সম্ভব নয়, পাভারোত্তির চুল যেমনই হোক না কেন।

‘এ কী করলেন আপনি?’ ফুঁপিয়ে ওঠে ছোকরা।

‘ইশশ --- এ কী করলাম আমি?’ হাহাকার করে ওঠেন ইজ্জত ভাই।

‘আমার কবিতামঞ্চে কবিতাপাঠ আপনি পন্ড করে দিলেন?’ ছোকরা ডুকরে ওঠে।

‘ইশশ --- আপনার কবিতাপাঠটাই পন্ড হয়ে গেলো!’ আত্মধিক্কারের সুরে বলেন ইজ্জত ভাই।
ছোকরা এবার হঠাৎ রাগে গনগন মুখ তুলে তাকায় ইজ্জত ভাইয়ের দিকে। ‘আবার ভ্যাঙাচ্ছেন আমাকে?’ চিবিয়ে চিবিয়ে বলে সে। ‘আপনাকে পটিয়েপাটিয়ে ধর্মঘট ভাঙিয়ে চুল ছাঁটাতে রাজি করিয়েছি  তার শোধ নিলেন আমাকে এভাবে বরবাদ করে দিয়ে? উদ্ভট উটের মতো চুলছাঁট দিয়ে আমার সব স্বপ্নকে বৃথা করে বিরানায় পাঠিয়ে দিলেন?’ গর্জে ওঠে সে আহত খ্যাঁকশেয়ালের মতো। ‘সব নাপিতের জাতক্রোধ আমার ওপরে ঝাড়লেন? এভাবে নলখাগড়ার ঝোপের মতো বিচ্ছিরি করে দিলেন আমার মাথাটাকে?’

ইজ্জত আব্রাহাম আমতা আমতা করেন তখন। কিন্তু ছোকরা তাঁর কথায় কান না দিয়ে কাঁধ থেকে সেই ঝোলাটা নামিয়ে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে আসে তাঁর দিকে।

৬.

আমরা সেই ছোকরাকবির প্রতিই সহানুভূতি প্রকাশ করি। বেচারা, হয়তো কত পরিকল্পনা তার ছিলো, কিভাবে ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দুলিয়ে, কবিতার পংক্তির ফাঁকে ফাঁকে মুখ থেকে চুল সরিয়ে ডানেবামে আসীন রূপসী কিশোরী আর তরুণীদের দিকে মৃদু মৃদু কবিজনোচিত কটাক্ষ ঝাড়বে, নারীর বিবশ দৃষ্টি লাভের ব্যাপারটা ষোলো আনা উসুল করে ছাড়বে --- সব মাঠে মারা গেলো।

নতুন করে চায়ের অর্ডার দেন মামা, আমি জানতে চাই, ‘সেই ছোকরাই তাহলে ইজ্জত আব্রাহামকে ওভাবে উস্তমকুস্তম পেঁদিয়ে ফেলে গেলো রাস্তার ওপর?’

মামা স্নেহের হাসি হাসেন, ‘পাগল? ঐ ছোকরা কবি না? কবিরা কোনদিন কোন কাজের কাজ করতে পারে? পেরেছে কখনো?’

আমরা এদিকে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছে গিয়েছিলাম, যে এই শুঁটকো মর্কট কবিমার্কা ছোকরাটাই তবে ইজ্জত আব্রাহামকে ধোলাইদানের কর্তৃকারক, কিন্তু মামার কথা শুনে আমরা সোৎসাহে জানতে চাই, ‘তারপর তারপর ---?’

৭.

ইজ্জত আব্রাহাম বলেন, ‘শান্ত হোন, প্লিজ! দুঃখ করবেন না!’

ছোকরা একেবারেই ভেঙে পড়ে, চেয়ারে ধপ করে বসে হাতে মুখ গুঁজে বলে, ‘দুঃখ করবো না মানে? আমার এই এতদিনের সাধনা ঝাঁকড়া চুল আপনি বেল্লিকের মতো কাঁচি মেরে ছারখার করে দিলেন, আবার বলছেন শান্ত হতে? --- জানেন, আপনি একজন কবিকে দুঃখ দিয়েছেন, আমি এখন কলম ধরলে আকাশে বাতাসে দুঃখ ছড়িয়ে দেবো?’

ইজ্জত আব্রাহাম বিপাকে পড়ে বলেন, ‘দেখুন, যা হবার হয়ে গেছে, অতীত নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করাটা ভালো কাজ নয়। আসুন আমরা ভবিষ্যতের কথা ভেবে সামনে এগোবার চেষ্টা করি!’

এবার কবি একেবারে তুর্কি লাফ দিয়ে ঘুরে দাঁড়ায়। ‘বটে?’ চেঁচিয়ে ওঠে সে। ‘সামনে এগিয়ে মেয়েগুলোকে কী দেখাবো বলুন তো? আমার এই ইঁদুরে খেয়ে যাওয়া চুল?’ দু’হাত দিয়ে টেনে নিজের চুল দেখে সে আয়নায়, তারপর আবার ভেঙে পড়ে, হু হু শব্দ করতে থাকে সঙ্গীতানুরাগী শেয়ালের মতো।

নিজের অপকর্মের কথা ভেবে লজ্জায় তাঁর মাথা কাটা পড়ে, আর মাথা কাটা পড়ার কথা মনে পড়তেই ইজ্জত আব্রাহামের চোখ পড়ে এবার ভোঁতা ক্ষুরটার দিকে, তিনি মনে মনে একটা সমাধান খুঁজে পান। তিনি যে নাপিত নন, এ কথা স্বীকার করার মতো বোকামি করলে এই ছোকরা তাঁকে এখানেই ছাল ছাড়িয়ে রেখে যাবে। তারচেয়ে বরং এর দিকে সহযোগিতার হাতই প্রসারিত করা যাক।

‘ঠিক কী ধরনের কবিতা আবৃত্তি করতে চাইছিলেন আপনি?’ জানতে চান তিনি।

এবার ছেলেটা ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকায়।

‘শুনবেন? শুনবেন কী কবিতা? শুনতে চান, কী কবিতাকে এতদিন নিজের ভেতরে পেলে পেলে বড় করেছি, কী চীজ নিজের ভেতর ধারণ করে অগ্নিগর্ভ শমীবৃক্ষ সেজেছি এই অধম? --- সুনীল গাঙ্গুলির কবির মৃত্যু: লোরকা স্মরণে! কত চেষ্টায় মাসের পর মাস ধরে, খুশকি-জট আর উকুনের উৎপাত সয়ে নিজের চুলগুলোকে লোরকার মতোই উলোঝুলো করেছিলাম, কেবল আজ বিকেলে ঐ কবিতাটা পড়বো বলে, কিন্তু নাআহা, সব বৃথা! সব পন্ড! সব আউলায় গ্যালো! সব কিছু নষ্টদের অধিকারে গ্যালো! --- হায় ফেদেরিকো গার্সিয়া, ক্ষমা করে দিও আমায়!’ কাতরে ওঠে সে, তারপর স্প্যানিশ ভাষায় কী কী সব বকতে থাকে।

ইজ্জত আব্রাহাম বিব্রত হন ভারি, তাঁর জন্যেই এই ব্যাটার মাথাটা এখন শর্টসার্কিটের পথে। ক্ষুরটা হাতে নিয়ে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছোন তিনি, তারপর বলেন, ‘এক কাজ করা যাক। আসুন আপনার মাথাটা কামিয়ে দিই!’

কবি ছেলেটা শুধু জ্বলন্ত গনগনে চোখ তুলে তাকায়, আর বলে, ‘বটে? তাংফাং করার আর জায়গা পান না আপনি, কুলাঙ্গার কোথাকার! অলম্বুষ, নরাধম, পোংটা শালা ---!’

এসব কটুভাষণে ইজ্জত আব্রাহাম দমিত হন না, এসব শুনে শুনে তাঁর কানমন তৈরি হয়ে গ্যাছে কঅবে --- তিনি বলেন, ‘কিন্তু আপনি সুনীল গাঙ্গুলির “কেউ কথা রাখে নি” কবিতাটা আবৃত্তি করছেন না কেন? লোরকাকে নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া না করাই ভালো। একবার মাথা ঠান্ডা করে ভেবে দেখুন, ন্যাড়া মাথায় ভালো মানাবে ওটা। সবাই দেখবে যে আপনি হৃদয়ের ক্ষোভ, বঞ্চনা আর দুঃখের রূপ ফুটিয়ে তোলার জন্যে রীতিমতো মাথাটাকেই কামিয়ে গেছেন --- আপনার টাক্কুবেলটাই তখন একটা সিম্বল হিসেবে কাজ করবে! আপনার শ্রোত্রীরা দেখবে, আপনি কতো সিরিয়াস একজন কবি, কতো নিবেদিতকেশ একজন আবৃত্তিকার, যে কিনা নিজের মাথা কামিয়ে ফেলে কবিতার সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্যে! দেখবেন মেয়ের দল বিবশ দৃষ্টি মেরে মেরে আপনাকে ঘায়েল করে দিচ্ছে একেবারে!’

ছোঁড়াটা গালে হাত দিয়ে খানিকক্ষণ ভাবে, বিড়বিড় করে কী কী সব বলে, তারপর অভিভূত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ইজ্জত আব্রাহামের দু’হাত চেপে ধরে কেমন এক আবেগে আপ্লুত, অশ্র“মথিত গলায় বলে, ‘বলছেন, আপনি বলছেন তাহলে? ঘায়েল করবে তো?’

ইজ্জত আব্রাহাম সম্মতি দেন, ‘আলবাৎ! একেবারে ইয়ে হয়ে যাবেন, দেখবেন!’

এমন একটা সংস্কৃতিসই, কাব্যময় সমাধানে ছেলেটা উলু দিয়ে ওঠে একেবারে। ‘দেন তাহলে শালার বাকি চুলগুলো অফ করে! বেহুদা অ্যাদ্দিন উকুনের জ্বালায় ভুগলাম!’

ইজ্জত আব্রাহাম স্বস্তির শ্বাস গোপন করে খুব সাবধানে এবার মাথা কামাতে বসেন।

৮.

আমরা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে একে অপরের দিকে তাকাই।

শিবলি বলে, ‘তাহলে মারটা দিলো কে?’

মামা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, ‘কপাল, বুঝলি, কপাল। --- সেই ছোকরা মাথা কামিয়ে, তাতে ফিটকিরি মেখে সেলুন থেকে বেরিয়েছে, মোড়ের মাথায় এসে একটা ইয়া মুশকো লোক, মোষের মতো ষন্ডা, গা থেকে একটা বোঁটকা মোষালো গন্ধও বেরোচ্ছিলো তার, কবিটার পথ আটক করে জানতে চাইলো, ব্যাপারটা কী, মাথা সে কোত্থেকে কামিয়ে এলো? ছোকরা আর অতশত বাছে নি, আঙুল তুলে দেখিয়ে দিয়েছে, দিল্লু ভাইয়ের সেলুন, পরিপাটি হেয়ার ড্রেসার, ওখানে মাথা কামানো হয়। ব্যস, লোকটা তখন সোজা সেলুনে ঢুকে ইজ্জত ভাইয়ের ওপর হামলা করলো। ইজ্জত ভাই তখনও দিল্লু ভাইয়ের জন্যে অপেক্ষা করছিলেন, আর বসে বসে সেই সিনেম্যাগাজিনটা পড়ছিলেন, এই অবস্থাতেই তাকে ধরে প্যাঁদানো শুরু করলো ব্যাটা! --- খুব স্বাভাবিক, সেলুনে একা বসে হাঁ করে সিনেম্যাগাজিন পড়ছে যে লোক, তাকে নাপিত ছাড়া আর কীই বা মনে হবে?’

‘কেন?’ আমরা আঁতকে উঠি।

‘ঐ লোকটা হচ্ছে নিখিল নগরী নরসুন্দর সংঘের একজন ধর্মঘট ইন্সপেক্টর।’ মামা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলেন। ‘সব পাড়ায় সেলুনগুলো ঠিকমতো নিয়মকানুন মেনে ধর্মঘট করছে কি না, তা দেখার দায়িত্ব এই ধর্মঘট পরিদর্শকের। পাড়ায় ঢুকেই সে দেখেছে, সদ্য কামানো ফিটকিরিমাখা মাথা নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে একজন, অমনি সে বুঝে ফেলেছে, ধর্মঘট ভঙ্গ করেছে কেউ। ব্যস, অকুস্থলে গিয়ে যাকে পেয়েছে তাকেই দিয়েছে ধোলাই! শুধু তাই না, সেলুনটাকেও ব্ল্যাকলিস্টে ঢুকিয়েছে নাকি। দিল্লু ভাইয়ের পকেট থেকে এখন সমিতির ফান্ডে জরিমানা যাবে আর কি!’

আমরা তাজ্জব হয়ে শুনি।

‘ইজ্জত ভাই তো মার খেয়ে টলতে টলতে দোকান থেকে বেরিয়ে কোনমতে রাস্তা পর্যন্ত এসেছে, এমন সময় ঐ ফাজিল বদিউল হুদাটা এসে হাজির। ইজ্জত ভাইয়ের এই হাল দেখে সে জোরজার করে একটা হাসপাতালে নিয়ে গেছে। ইজ্জত ভাই প্রথমটায় রাজি হয়নি, কিন্তু বদিউল হুদা পটিয়ে পাটিয়ে শেষ পর্যন্ত নিয়ে গেছে। এক ঢিলে তিন পাখি মেরেছে ব্যাটা।’ বিড়ির ধোঁয়া ছাড়েন মামা।

‘কীরকম?’ জানতে চায় রেজা।

‘প্রথমত একটা স্টোরি করতে পারলো ছাগলটা, দু’তিনটা পত্রিকায় দু’তিন ছদ্মনামে দু’তিন কিসিমের নিউজ পাঠালো।’ মামা হাসেন মিটিমিটি। ‘দ্বিতীয়ত, ঐ হাসপাতালের সাথে দালালির চুক্তি আছে তার, রোগী এনে ভর্তি করালে পয়সা পাবে। আর তৃতীয়ত, আশেপাশেই ব্যাটার কী একটা কাজ বোধহয় ছিলো, তাই ইজ্জত ভাইয়ের পকেট থেকে স্কুটার ভাড়াটা গেছে, হে হে!’

বদিউল হুদার আশ্চর্য মারোয়াড়ি বুদ্ধি দেখে আমরা তাজ্জব হয়ে যাই।

‘অবশ্য ---,’ মামা চায়ের কাপে তলানিটুকু দেখতে দেখতে বলেন, ‘ইজ্জত ভাইয়ের লাভই হয়েছে মার খেয়ে, যা-ই বলিস না কেন। পত্রিকায় নামধামছবি ছাপা হলো, সেই নারী সংগঠনের দুই উপনেত্রী আলাদা আলাদা ফুল নিয়ে তাঁকে দেখতে এসেছে, সর্বোপরি দিল্লু ভাইও এ অবস্থায় তাঁকে ঘাঁটাচ্ছে না --- নইলে কী হতো বলা যায় না!’

[অগাস্ট ২৬, ২০০৪]


[]

1 comment:

  1. Bohudin por ekta sheirokom lekha likhsen boss :D
    Joy castle/casel er torunigon!

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।