Monday, September 24, 2007

প্রবাসে দৈবের বশে ০০৪

কাসেলে আসা ইস্তক সুমন চৌধুরীকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখছি। চৌধুরী সাহেব ভোজনরসিক মানুষ, তাই তাঁর ল্যাংবোট হয়ে আমিও মাঝেসাঝে চর্ব্যচোষ্যলেহ্যপেয় সাঁটিয়ে চলছি। শুরুতে দু'দিন খান সাহেবের বাড়িতে অতিথি হয়ে বিস্তর খানদানি খোরাকি কুক্ষিগত করেছি, সে কাহিনী খান সাহেবের ইজাজৎ ছাড়া বয়ান করা ঠিক হবে না। তবে খান সাহেবের রান্না করা মুসুরির ডাল যে খায়নি সে নিতান্তই হতভাগ্য।

কাসেলে গরুর মাংস কেনা হয় সাধারণত তুর্কি দোকান থেকে। তারা মাপমতো টুকরা করে রাখে, দেখে শুনে কিনে আনতে পারলেই হলো। ঘরে ফিরে সেই গবাংশকে নিজস্ব ছুরি দিয়ে নিজস্ব ছাঁটে নিজস্ব ঢঙে টুকরাটাকরা করে বিভিন্নভাবে রান্না করা যেতে পারে। সুমন চৌধুরী ফিকির খোঁজেন ল্যাটকা খিচুড়ি বা তেহরানি (বিরিয়ানির মশলাযোগে তেহারি) রান্না করার জন্য। সাথে খাওয়ার সময় সহপেয় হিসেবে শুকনো ওয়াইন। ওয়াইন সম্পর্কে আমার আকল নিতান্তই কচি ও কাঁচা পর্যায়ে ছিলো, চৌধুরী সাহেব শুরুতেই গেট্রেঙ্কেমার্কটে নিয়ে গিয়ে তিন মিনিটের একটি মনোজ্ঞ বক্তৃতা দিয়ে আমাকে তালিম দিলেন। খাওয়ার ফাঁকে গিলতে হলে শুকনো (ট্রকেন) ওয়াইন, আর খাওয়ার পর রয়েসয়ে গিলতে হলে লিবলিখ। মাংসের সাথে যাবে লাল ওয়াইন, মাছের সাথে যাবে সাদা ওয়াইন। আরো নানা ব্যকরণ আছে ওয়াইন পানের, সেগুলিও ধীরেসুস্থে শিখে ফেলবো মনে হচ্ছে। ঘরদোরের জিনিসপাতি কেনার সময় ওয়াইনের ছিপিউদঘাটক রীতিমতো তালিকার শীর্ষে চলে এসেছে শিক্ষা ও স্বাদ লাভের পর পর।

কাসেলে এসে নতুন যে খাদ্যদ্রব্যটি আমার মনহরণ করেছে, তা হচ্ছে ফোরেলে (ট্রাউট)। মন হরণ করার অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে ফোরেলে খাওয়ার উপযোগী করার জন্য বেশি খাটতে হয় না, প্যাকেট থেকে খুলে গরম পানিতে বরফ গলিয়ে পেঁয়াজরসুনআদাকাঁচামরিচ লেবুর রসে মাখিয়ে তার আগে থেকে চিরে রাখা পেটে গুঁজে লবণ ছিটিয়ে ফয়েলে মুড়ে চুলায় বেক করতে দিয়ে দিলেই মিনিট চল্লিশেক পর দারুণ সুস্বাদু এক মাল বেরিয়ে আসে। জার্মানির আরেক মাছ, লাখস (ফোরেলেরই জাতভাই, এরা সব স্যামন জাতীয়) আগে চেখে দেখেছিলাম, খুব একটা ভালো লাগেনি, ফোরেলে তার তুলনায় অমৃত।

প্রথম যখন জার্মানিতে আসি, তখন দারুণ উল্লসিত ছিলাম বিয়ার নিয়ে। জার্মান বিয়ারের গুণগান না করা আসলেই মুশকিল, আর মিউনিখে এক বোতল পানির দাম আর সম পরিমাণ এক বোতল বিয়ারের দামের প্রায় সমান। বিভিন্ন পাবে কাঠের ব্যারেল থেকে পরিবেশন করা হয় ফেনায়িত বিয়ার, বোতলের বিয়ারের চেয়ে দাম বেশি হলেও স্বাদে পরিস্কার পার্থক্য আছে। বিয়ারকে মোটা দাগে দু'ভাগে ভাগ করা যায়, সাদা (হেল) আর গাঢ় (ডুঙ্কেল), অথবা উৎস অনুযায়ী কয়েকভাগে, গম, ঈস্ট, ছত্রাক ইত্যাদি। এরডিঙ্গার, আউগুস্টিনার, পাউলানার, ফ্রানৎসিসকানার, লোয়ভেনব্রয়, হাকার-প্শর, বাঘা বাঘা সব ব্র্যান্ড। বিয়ারের বোতলে সাধারণত সাত-আট সেন্ট ফান্ড থাকে, বোতল ফিরিয়ে দিলে সে পয়সা ফেরত পাওয়া যায়।

কাসেলে মেদবহুলা ফ্লাইশহেনশেন না খেয়ে স্বল্পমেদিনী জুপেনহেনশেন খাওয়াটাই স্থির করেছি। মুরগির দাম এখানে ঢাকার মতোই, একেবারে তৈরি মুরগির দাম কেজিপ্রতি এক ইউরোর কাছাকাছি। নয়শোগ্রামের "দেশি" মুরগি আর তেরোশোগ্রামের "দেশি" মুরগির দাম সমান। যে দেশে মুড়ি আর মিছরির সমান দর, সে দেশে নাকি বেশিদিন থাকতে নেই, কথাটা মনে পড়ে গেলো। জন্টাগহান বলে এক বস্তু মেলে এখানে, তার আকার সেইরকম ঢাকাই সিনেমার নায়িকার মতো, রোববার ছুটির দিনে সবাই মিলে খাবার জন্য বড় করা খাসি মোরগ, তার দাম আম মুরগির চেয়ে পাঁচগুণ বেশি। টার্কি বা পুটেনের মাংস স্বাদশূন্য প্লাস্টিকের মতো, রান্না করে না খাওয়াই ভালো, তবে পুটেনভুর্স্ট বা টার্কি সসেজ ভাজলে বেশ ভালো লাগে খেতে।

জার্মান চকলেট, দুধ বা আইসক্রীম অতীব স্বাদু জিনিস, ফলমূলও খারাপ না। আফগান এক দোকানের সুবাদে কাসেলে যাবতীয় দেশি মশলা পাওয়া যায়, যদিও আমি দেশ থেকে গরম মশলা কিছু নিয়ে এসেছিলাম সাথে। সব্জির দাম দেশের অনুপাতে বেশ চড়া, গোল বেগুনের দাম রীতিমতো ঢাকাই রমজান মৌসুমের কথা মনে করিয়ে দেয়। এক কেজি আলুর দাম একতিরিশ সেন্ট, সে তো কিছুদিন অপেক্ষা করলে বাংলাদেশেও দেখা যেতে পারে। জার্মানরা সূর্যমুখী আর বাদাম তেল খায় বেশি, তবে সয়াবীন আর সরিষার তেলও মেলে। ঘি এর কাজ মাখন গলিয়ে চালানো হচ্ছে, এখানকার মাখন বেশ। তবে ডিমের আকার রীতিমতো ছোট, মুরগিগুলি বোধহয় এখনও উপলব্ধি করতে পারেনি যে তারা জার্মান। কিংবা কে জানে কোন শুকনোপটকা বাঙালি মোরগ উড়ে এসে জুড়ে বসেছিলো কি না!

আমার বিগত প্রবাস জীবনে উপলব্ধি করেছিলাম, আমি একজন খাঁটি ভেতো। ভাতের প্রতি আমার উদরের টান শুধু রজকিনীপ্রেম নিকষিত হেমের সাথে তুলনীয়। বিয়োগান্তক নয়, এ প্রেমের কাহিনী মিলনান্তক, যেখানে শেষমেশ পেটের সাথে ভাতের দেখা মেলে, জাবড়াজাবড়ি হয়। কাসেলে কয়েক পদের চাল পাওয়া যায়, বাসমতি চালেরই কয়েক কিসিমের দেখা মেলে, কমদামিটা রেঁধে খাচ্ছি। ভাত রান্নার সময় কয়েক দফা স্যাম্পলিং করি, তাই চাল বা জাউ কোনটাই না খেয়ে খাঁটি ভাতই চিবাই। জীবনে প্রথম ডাল রান্না করে আমি আমার রন্ধনপ্রতিভায় মুগ্ধ। তবে খাওয়াদাওয়ার পর মনে পড়লো হলুদ বা ধনিয়া বা ঐ গোছের গরম মশলা ছাড়াই ডাল রান্না করেছি। হাঙ্গার ইজ দ্য বেস্ট সস কথাটাকে আপ্তবাক্য ধরে নিয়ে চরম খিদের মুখে নিজের রান্না খেতে বসলে কোন সমস্যা দেখা দেয় না বলে আমার বিশ্বাস। আমার প্রতিবেশী জামুয়েল ডালে আদা-রসুন-পেঁয়াজের ফোড়নের ঘ্রাণ ও শব্দে রীতিমতো বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছে। তার বাপ-মা থাকে অজনাব্রুয়কে, সেপ্টেম্বর মাস ফুরোলে তবে সে আবার ভোওনহাইমে ফিরবে। যদিও সে বলে গেছে, পরীক্ষা শেষ বলে ক'টা দিন সে বাড়ি থেকে কাটিয়ে আসবে, কিন্তু আমার ধারণা আমার ডাল রান্নার শুভ মহরতই তাকে ঘরছাড়া করেছে। আকলমন্দের জন্য ইশারাই কাফি।


[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।