Saturday, September 22, 2007

প্রবাসে দৈবের বশে ০০৩

বাংলাদেশ থেকে জার্মানীর কোন শহরে গেলে শহরের নতুন যে ব্যাপারটা চোখে পড়বে তা হচ্ছে প্লাৎস। বড়সড় চত্বর। ঢাকায় এমন চত্বর বলতে শহীদ মিনার আর মুক্তমঞ্চ ছাড়া আর কিছু এ মূহুর্তে মনে পড়ছে না। ইঁট বা পাথর দিয়ে বাঁধাই করা এ চত্বরগুলোতে পায়ে হেঁটে বা বাইসাইকেল নিয়ে ঘোরাফেরা করা যায়। বিভিন্ন ছুটির দিনে এ চত্বরগুলিতে সমাবেশ বা মেলা বসে। বড়সড় চত্বরগুলি সাধারণত রাজাগজাদের নামে হয়ে থাকে।

শনিবারে শ্ট্রাসেনমুজিকান্টদের ভিড় বসে সেসব সড়কের পাশে, যেখানে ছুটির দিনে হাঁটতে বের হওয়া লোকজনের সমাগম বেশি। হার্প, বেহালা বা বাঁশি নিয়ে একেকজন বাজিয়ে চলেন, সামনে একটা বাক্স থাকে। এঁদের অনেকের নিজস্ব মিউজিক অ্যালবাম আছে, সেটা বাক্সে রেখে বিক্রি করেন তাঁরা। যাদের অ্যালবাম নেই তাঁদের বাক্সে শ্রোতারা কিছু রেখে যান। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আগত গীটারিস্টদের দেখা যায় অ্যালবামহারাদের দলে।

ট্রামের বহুলব্যবহারের জন্য শহরে বায়ুদূষণ কম। কাজের সূত্রে প্রায়ই ঢাকার বাইরে যেতে হয়েছে আমাকে, ঢাকার বাইরে বাতাস চমৎকার, আর ঢাকায় কখন চলে এসেছি তা বোঝা যায় নিঃশ্বাস ফেলেই। ঢাকায় ট্রাম চালু করতে পারলে হয়তো খারাপ হতো না, কিন্তু সে সুযোগ বোধহয় এখন আর নেই। নতুন যেসব রাস্তা তৈরি হচ্ছে ঢাকায়, সেখানে পরীক্ষামূলকভাবে ট্রাম চালু করে দেখা যেতে পারে অবশ্য।

রিকশার কারণেই বোধহয়, হাঁটা ব্যাপারটা অনেকটা ইচ্ছানির্ভর হয়ে গেছে ঢাকায়। আর হাঁটবোই বা কোনদিক দিয়ে, ফুটপাথগুলি তো আর আমার জন্য ফাঁকা রেখে দেয়নি কেউ। অনেক রাস্তায় ফুটপাথও নেই। জার্মানরা প্রচুর হাঁটে, নয়তো সাইকেল চালায়। কাসেল পাহাড়ি শহর, চড়াই উৎরাই ভরা গোটা শহরের রাস্তায়, ফুটপাথে হনহন করে হাঁটছে লোকজন।

এখানে বাসের ভেতরে পরিষ্কার লেখা দেখলাম, জিৎসপ্লেৎসে ৪১, শ্টেপ্লেৎসে ৬০। ৪১ জন বসে আর ৬০ জন দাঁড়িয়ে যেতে পারবে। অনেক বিশালদেহী জার্মান নির্বিকারচিত্তে দু'টি সীট দখল করে আনমনে রাস্তা দেখতে দেখতে যায়, লোকজনেরও দাঁড়িয়ে যাতায়াতে কোন আপত্তি নেই। সীটে বসা নিয়ে কোন প্রতিযোগিতা এখনও চোখে পড়েনি। খুব বয়স্ক হলে কেউ না কেউ উঠে দাঁড়িয়ে তাকে বসতে দেয়, তবে মেয়েদের প্রতি আলাদা কোন শিভালরি প্রদর্শনের নমুনা দেখিনি। দেশে কোন মহিলা বাসে দাঁড়িয়ে যাবেন, এমনটা সাধারণত সহ্য করেন না অনেকে, আপা বসেন এইখানে বলে জায়গা ছেড়ে দেন। এখানে আপাদের তেমন খাতির নাই। তবে বাচ্চাদের প্যারামবুলেটর, কিন্ডারভাগেন যাকে বলে, সেটার জন্য আলাদা কানুন আছে, কিন্ডারভাগেনের জন্য নির্ধারিত জায়গা আর সীট আছে বাসে আর ট্রামে। একবার মিউনিখে এক বয়স্কা মহিলাকে সীট ছেড়ে জায়গা করে দিয়েছিলাম, তিনি আমার দিকে রোষকষায়িত চোখে তাকিয়ে "মাদাম, মাদাম, জি হাবেন আইনেন প্লাৎস" বলে কোত্থেকে তারচেয়েও বেশি বয়স্ক এক বৃদ্ধাকে যোগাড় করে এনে সেখানে বসালেন, নিজে দাঁড়িয়ে রইলেন বীরের মতো। এরপর থেকে ছড়ি ছাড়া হাঁটছেন এমন কোন বৃদ্ধাকে সীট ছেড়ে জায়গা করে দেবো না ঠিক করেছি।

বাসে ড্রাইভারই টিকেট চেকার, তাকে টিকেট বা মাসিক/সাপ্তাহিক কার্ড দেখিয়ে চড়ছে লোকজন, অথবা উঠে টিকেট কাটছে, তবে ট্রামে সাধারণত চেকিং হয় না। ট্রামে হঠাৎ একদিন সাদা পোশাকের লোক, যে হয়তোবা কোন সীটে বসে ঢুলছিলো, গা ঝাড়া দিয়ে উঠে একটা পরিচয়পত্র দেখিয়ে লোকজনের টিকেট বা কার্ড দেখতে চায়। তখন যদি বিনা টিকেটে ভ্রমণের দায়ে কাউকে পাকড়াতে পারা যায়, তাহলে ৪০ ইউরো খসাতে হয় সেই বেচারাকে। জার্মান নাগরিক হলে তার নাগরিক সংকেত নোট করে নিয়ে যাওয়া হয়, আপনাআপনি তার ব্যাঙ্ক থেকে জরিমানার টাকা কেটে রাখা হবে। দীর্ঘ যাত্রার ট্রেনে কামরায় কামরায় পরিষ্কার লেখা থাকে বিনা টিকেটে ভ্রমণ করলে কী কী হুড়কো তাকে দেয়া হতে পারে। এরকম অনুসন্ধান ঘটতে শুরু করলে কিছু লোক সবসময়ই ব্যস্তসমস্ত হয়ে পরের স্টপেজে নেমে পড়ে।

এখানে যাতায়াত ব্যবস্থার মসৃণ দিকটা দেখে খুব ঈর্ষা হয়। ব্যক্তিগতভাবে আমি ঢাকায় যানবাহন নিয়ে ভুক্তভোগী, এমন একটা চলাচলব্যবস্থা সেখানে কোন আশরাফুল মখলুকাত চালু করতে পারলে আমি তাকে এক বেলা বিরিয়ানি খাওয়াবো, ঘোষণা দিলাম।


[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।