Tuesday, September 18, 2007

প্রবাসে দৈবের বশে ০০১

১.

ধরা যাক, এয়ারলাইন্সের নাম "ল যাইগা"। একটু অশ্লীল, তবে ঠিকাছে।

তাঁরা আমাকে আমার গোদা স্যুটকেস আর রুকস্যাক ওজন মাপার বেল্টে রাখতে বললেন। আমি আমার সুদূর অতীতের বোঝা কাঁধে পাহাড় বাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে আন্দাজ করেছিলাম, সব মিলিয়ে ওজন আটাশ কেজির বেশি হবে না। আমার পেহলওয়ান ভাই কিছুক্ষণ স্যুটকেস নিয়ে লোফালুফি করে বলেছিলেন সব মিলিয়ে চব্বিশ কেজির বেশি হতেই পারে না। কিন্তু দেখা গেলো চৌতিরিশ কেজি পার হয়েও হিজিবিজি অঙ্ক ফুটে উঠেছে কাউন্টারে।

"হয় আপনাকে ওজন কমাতে হবে, অথবা ডিউটি দিতে হবে।" হাসিমুখে জানালেন ভদ্রলোক।

পকেটে টাকা ছিলো কিছু। যে অঙ্কটার কথা বলা হয়েছে, টায়ে টায়ে সেটাই ছিলো। ওজন কমানোর প্রশ্নই আসে না, একেবারেই যা নিলে নয় তা-ই নিয়েছি। কড়ি খরচ করবো।

কড়ি খরচ করার জন্যে আমাকে আবার গরীবগুর্বোদের কাউন্টার ছেড়ে বেওসাদারদের কাউন্টারে যেতে হলো। সেখানে এক শ্যামাঙ্গীসুন্দরী খুব গম্ভীর মুখে কাজ করে যাচ্ছেন। ফট করে উদয় হলেন তাদের সবার বস, হাতে ওয়াকি টকি। তিনি এসে একটা হুলুস্থুলু করলেন। জানলাম, ঢাকা-ফ্রাঙ্কফুর্টে অতিরিক্ত ওজনের জন্য আমাকে আরো মাল ছাড়তে হবে (এ মাল সে মাল নয়)। ঊনিশ নয়, প্রতি কেজি চব্বিশ ডলার। "যান, ডলার ভাঙিয়ে আনুন।" জানানো হলো আমাকে।

ডিপারচারের যাত্রী অ্যারাইভালে যেতে পারবে না, এ-ও যথাসময় জানানো হলো আমাকে। ডিপারচারের যাত্রীদের জন্যে টাকাপয়সার লেনদেনের কোন ব্যবস্থা নেই, এটিএম ও নেই। আমি খোঁজখবর নিয়ে এসে বিষণ্নবদনে বললাম, আমি পুরোটা ডলারে পরিশোধ করতে চাই।

কিন্তু না, ডলারে তাঁরা নেবেন না, আমার উপকার করতে তাঁরা বদ্ধ পরিকর। অবশেষে ঘন্টাখানেক পর তাঁরা কৃপা করলেন, ডলারেই যা নেয়ার নিলেন। ঝকঝকে রিসিট লিখে দিলেন অবশ্য, ছিয়ানব্বই ডলার পরিশোধের গর্ব নিয়ে আমি বিষণ্নতর হয়ে ইমিগ্রেশনের কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেলাম।

এক ঘন্টা ডিলে হলো ফ্লাইট। খানিক দাঁড়িয়ে খানিক বসে সহ্য করে গেলাম। পাশে এক ভদ্রলোক কেবল রসমালাইয়ের প্যাকেট হাতে হাসি হাসি মুখে মোবাইলে গল্প করে যাচ্ছেন মধ্যপ্রাচ্যবাসী কারো সাথে, বিকেলেই দেখা হবে এ কথাটা মিনিটে কয়েকবার জানাচ্ছেন। আমি কয়েকটা হাতব্যাগ সামলাতে সামলাতে তাঁর পরিতৃপ্ত হালকা চেহারা দেখতে দেখতে ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠলাম।

যা হোক, সব পাখি ঘরে ফেরে, সব নদী ... আর এটা তো ল যাইগার বিমান। একসময় দেখলাম বসে পড়েছি জানালার পাশে একটা সীটে। একসময় সাঁ করে আকাশে উঠে পড়লো বোয়িং ৭৭৭, নিচে ঢাকা শহরটা ছোট হতে হতে একসময় অচেনা আর সুন্দর হয়ে গেলো। আমি একটা ছোট শ্বাস ফেললাম শুধু।


২.

ল যাইগা ঢাকা-মধ্যপ্রাচ্যেরসেইশহর রুটে সম্ভবত আদবদুরস্ত স্টুয়ার্ডিঙের কোন প্রয়োজনবোধ করেনি। জনৈক রুমানিয়ান স্টুয়ার্ড একটু পর পর এসে বিনা বাক্যব্যয়ে আমার সীটবেল্ট ধরে টানাটানি করে, সীট সোজা করে দেয়, ফুটরেস্ট নামিয়ে দেয়, কী করে না করে ... সর্বোপরি আমার দিকে বিষদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চলে যায় হনহন করে। আমি যেন কেমন, এমন খাতির পেয়ে কিছুতেই ভালো বোধ করিনা।

তবে প্রচুর সিনেমা চলছে সমানে, আমি কিছুক্ষণ গুঁতাগুঁতি করে পেয়ে যাই ইয়াং ফ্রাঙ্কেনশ্টাইন, আমার খুবই প্রিয় কমেডি। বহু বহুদিন পর দেখতে দেখতে আর হাসতে হাসতে কিছু সময় পার করা গেলো।

মধ্যপ্রাচ্যের সেই শহরে ট্রানজিটের সময় ছিলো এক ঘন্টা পঁচিশ মিনিট, কিন্তু অলটিচ্যুড বাড়িয়ে হারানো এক ঘন্টার অনেকখানি পুষিয়ে দেয়া হয়েছে, কাজেই ট্রানজিট ফ্লাইট মিস করার আশঙ্কার কোন কারণ নাই, জানালেন ক্যাপ্টেন। বিমান থেকে নেমেই ঝেড়ে দৌড় লাগালাম, ল যাইগার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছি।

জুতা-ঘড়ি-বেল্ট খুলে আরেকদফা সিকিউরিটি চেক হবার পর দিলাম আরেক দৌড়। বেশ বড়সড় এয়ারপোর্ট, একেবারে এক প্রান্তের গেটে আমার গন্তব্য। পৌঁছে বুঝলাম দৌড় দিয়ে ভালোই করেছি।


৩.

পাকা চল্লিশ মিনিট রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে রইলো বিমান। দরদর করে ঘামছি। আশেপাশে সবাই ধলা, তারা কোঁ-কোঁ করছে নানা ভাষায়।

বহুৎ ভুগিয়ে অবশেষে আবার উড্ডীন হওয়া গেলো। এবার লম্বা যাত্রা ফ্রাঙ্কফুর্টের উদ্দেশ্যে। আমি দিলাম ঘুম।

অচিরেই পড়শী বিচ্ছুদের উৎপাতে ঘুম ভাঙলো। তাদের বাপ এক মুশকো দক্ষিণ ভারতীয়, মা মুশকোতর জার্মান, বাচ্চাগুলি অবশ্য বেশ ফুটফুটে, কিন্তু সব কয়টাই বুথ সাহেবের বাচ্চা। একটু পর পর তারা বিকট কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। বাচ্চাদের জন্য মধ্যপ্রাচ্যেরসেইশহর-ফ্রাঙ্কফুর্ট রুটে দেখলাম ভাবসাব আলাদা, একটু পর পর পুতুল, ব্যাগ, এটাসেটা দিয়ে যাওয়া হয়। প্রকান্ড এক এয়ারহোস্টেস এসে মিষ্টি গলায় স্তোকবাক্য শুনিয়ে যায় তাদের, কিন্তু বুথ সাহেবের বাচ্চা বলে কথা। আমার ইচ্ছা হলো আমিও গলা ছেড়ে কেঁদে উঠি।

কাঁদতে না পেরে ভাবলাম বিয়ার খাই। কয়েকটা বিয়ার খাওয়ার পর মনটা কিঞ্চিৎ শান্ত আর ভ্যাবদা হয়ে উঠলো। একটা অ্যানিমেশন ফিল্ম দেখা শুরু করলাম, সেখানে এক পেঙ্গুইন সার্ফিং প্রতিযোগিতা করতে আসে এক দ্বীপে, আরো নানা কাহিনী। খেতে খেতে আর দেখতে দেখতে আবার ঘুম দিলাম।

ফ্রাঙ্কফুর্টে নামার সময় শুনলাম বিশেষ পাসপোর্ট চেক করা হচ্ছে। অবশ্য কোন ঝামেলার মুখে পড়তে হলো না, শ্প্রেখেন জি ডয়েচ এর ইতিবাচক উত্তর পেয়ে টুকটাক প্রশ্ন করে ছেড়ে দিলো পাহাড়প্রমাণ জার্মান পুলিশ। ইমিগ্রেশন পুলিশ এক ভুরু উপরে তুলে জিজ্ঞাসা করলো, ভো হাবেন জি ডয়েচ গেলের্ন্ট, আন ডের শুলে? স্কুলে নয়, গোয়েটে ইনস্টিটুটে শিখেছি শুনে সে ঠোঁট উল্টে মাথা ঝাঁকালো। ইউনিভার্সিটির নাম শুনে এবার তার মুখে হাসি ফুটলো, জানলাম সে-ও একই বিশ্ববিদ্যালয়ের মাল। আর কোন প্রশ্নের মুখোমুখি হলাম না, আইনেন শোয়েনেন আউফএন্টহাল্টের শুভকামনা নিয়ে বেরোলাম পোঁটলাপাঁটলি খুঁজতে।

সবকিছু খুঁজে পেতে বার করে ঠ্যালার ওপর চাপিয়ে বের হয়ে দেখি এক বিশাল শ্মশ্রুধারীগুম্ফমান ঝুঁটিয়াল হাসিমুখে দাঁড়িয়ে। চুলদাড়ি মাইনাস করলেই লোকটাকে সুমন চৌধুরী বলে চালিয়ে দেয়া যায়।


[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।