Monday, September 10, 2007

সাংস্কৃতিক স্পেসিয়েশন

১.
আমি বিবর্তনবাদের একজন আগ্রহী শিক্ষার্থী। এই তত্ত্বটি নানা সময়ে আক্রান্ত হয়েছে বিভিন্ন মহল থেকে, তবে হামলাবাজরা আক্রমণেই আনন্দ পেয়েছেন বেশি, ব্যাপারটা নিয়ে লেখাপড়ার বা পড়াশোনার উদ্যোগ তেমন নেননি। ডারউইন, জীবজগতে বিবর্তনবাদের অনেক প্রবক্তার মধ্যে প্রথমেই তাঁর নাম আসা উচিত, তাঁর আমলে এর বিরুদ্ধে ঢালতলোয়ার তুলেছিলেন যাজকগোষ্ঠী, ডারউইনের হয়ে লড়েছিলেন টমাস হেনরি হাক্সলি।

বিবর্তন শুধু প্রাণীজগতেই হয় না, ভাবজগতেও হতে পারে, এমন একটি প্রস্তাবনা থেকে রিচার্ড ডকিন্স (ডকিন্স নিওডারউইনিজম বলে একটি ভাবনার ঘরানার প্রবক্তাদের একজন, যাঁরা বিবর্তনবাদের প্রয়োগে প্রাণীজগতে বিভিন্ন আচরণের ব্যাখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেন, তাঁদের বিদ্যাচর্চার দিকটি এথোলজি বা আচরণবিদ্যা নামেই পরিচিত) মিম বলে একটি শব্দের প্রবর্তন করেন তাঁর সেলফিশ জিন বইটিতে। প্রাণীজগতে বিবর্তনের পেছনে প্রধান বিনিময়যোগ্য উপাদান জিন যেমন, ভাবজগতে তেমনি উপাদান হচ্ছে মিম, এ হচ্ছে একটি ভাবনার একক, যা ছড়িয়ে পড়ে মন থেকে মনে।

প্রাণীজগতে বিবর্তনবাদের মূল মডেলটি অনেকটা এমন। ধরা যাক কোন একটি প্রাণী কুমড়োপটাশ কোন একটি পরিবেশ খিলখিল্লির মুল্লুকে বাস করছে, তারই ভাই ঝিঙ্গাপটাশ বাস করে দূরে টাকচূড়ো নগরে। আমরা ঝিঙ্গাপটাশের কথা আবার পরে শুনবো, এখন কুমড়োপটাশই নায়ক। কুমড়োপটাশের দৈহিক আকৃতি, আচরণ, সবই খিলখিল্লির মুল্লুকের সাথে খাপ খাওয়ানো। খিলখিল্লির মুল্লুকের নানা প্যারামিটারের সাথে একই মেজাজে কুমড়োপটাশের সব কিছু বাঁধা। এখন কোন কারণে যদি খিলখিল্লির মুল্লুকে কোন একটি বা একাধিক প্যারামিটারে পরিবর্তন ঘটে, তাহলে কুমড়োপটাশের দিক থেকে চেষ্টা থাকবে সে পরিবর্তনের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেবার।

এখন প্রসঙ্গ আসে খাপ খাইয়ে নেবার পদ্ধতির সাথে। প্রাণীর দেহে অনিয়মিত হারে তার জিনতথ্যে পরিবর্তন ঘটে, যাকে মিউটেশন বলা হয়। এই পরিবর্তিত জিনের স্থায়িত্ব নির্ভর করে প্রাণীদেহে সে জিনের প্রভাব প্রাণীর টিকে থাকা ও বংশবিস্তারের উপযোগী কি না তার ওপর। কাজেই, এই পরিবর্তিত জিনের প্রভাব যদি কোনভাবে খিলখিল্লির মুল্লুকের পরিবেশের পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তাহলে কুমড়োপটাশ খিলখিল্লির মুল্লুকের পরিবর্তিত পরিবেশের সাথেও টিকে থাকতে পারবে।

পরিবেশের পরিবর্তন অনুযায়ী মিউটেশন না-ও হতে পারে, বরং না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি, এবং অতীতে খিলখিল্লির মুল্লুকের মতো আরো আরো মুল্লুক থেকে কুমড়োপটাশের মতো অসংখ্যা প্রাণী লোপ পেয়েছে, একেবারে নির্বংশ হয়ে গেছে। আমাদের কুমড়োপটাশ আলোচনার খাতিরে সৌভাগ্যবান, সে টিকে যাক।

তো এভাবে বছরের পর বছর চলতে থাকলো, খিলখিল্লির মুল্লুকের বিভিন্ন পরিবেশগত প্যারামিটার পাল্টাতেই থাকলো, আর সৌভাগ্যবান কুমড়োপটাশের বংশধরেরা তার সাথে তাল মিলিয়ে নিজের জিনতথ্যে পরিবর্তন ঘটিয়ে চললো।

এভাবে কয়েক মিলিয়ন বছর চলার পর কুমড়োপটাশের এক দূর বংশধরের সাথে সেই ঝিঙ্গাপটাশের এক দূর বংশধারিণীর দেখা হলো। একজন তো আরেকজনকে দেখে অবাক। চেহারায় কত তফাৎ, কত তফাৎ আচরণে! এ যা খায় ও তা ছুঁয়েও দেখে না। এর দাঁত মস্তো, ওর দাঁত খুদে। এ ছোটে ধীরেসুস্থে, ও ছোটে বিদ্যুতের মতো। ব্যাপারটা কী?

যা-ই হোক, অসভ্য এই নতুন প্রজন্ম একজন আরেকজনের প্রেমে পড়ে গেলো। নিরোধ ছাড়াই শুরু করে দিলো উদ্দাম প্রেম। কিন্তু না, অনেক নষ্টামোর পরও ঝিঙ্গাপটাশের বংশধারিণী গর্ভবতী হলো না। হতাশ হয়ে তারা গেলো এক পশুচিকিৎসকের কাছে। তিনি সব দেখে শুনে বললেন, বাচ্চা হবে না, আর হলেও হবে নপুংসক। কারণটা কী? ডাক্তার বললেন, স্পেসিয়েশন হয়ে গেছে। দু'জনের জিনে এখন অনেক তফাৎ।

চাকচূড়ো নগরেও তো অনেক পরিবেশগত পরিবর্তন হয়েছে, তার সাথে খাপ খাইয়ে পরিবর্তিত হয়েছে ঝিঙ্গাপটাশের বংশধরদের জিন। তাই ইবনে কুমড়োপটাশ আর বিনতে ঝিঙ্গাপটাশের শরীরে এখন দু'রকম জিন, একটা আরেকটার সাথে মেশে না।

যেমনটা হয়েছে মানুষের আর গোরিলায়, বাঘে আর বেড়ালে।

মোদ্দা কথা হলো, প্রাণী টিকে থাকবে তার পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে। যদি দু'রকম পরিবেশে একই প্রাণীর দু'রকম প্রজাতি নিজেদের মধ্যে কোন রকম "যোগাযোগ" ছাড়া বহুবছর বাস করে, এবং এই দুই পরিবেশের উপাদান দু'রকমভাবে পরিবর্তিত হয়, তবে সম্ভাবনা আছে তারা দু'জনে দু'টি প্রজাতিতে বিভক্ত হয়ে পড়বে। যেমন কুমড়ো আর ঝিঙ্গার দুই দূর-নাতিনাতনী পটাশদ্বয়।

ডারউইনের সময় বিবর্তনের ব্যাখ্যায় জিনপ্রবাহের কথাটি ছিলো না (কারণ জিন আবিষ্কৃত হয়েছে গত শতকের ষাটের দশকে), নিওডারউইনবাদে এটি সংযুক্ত হয়েছে।

প্রাণীজগতে বিবর্তনবাদের হামলাবাজরা যে একটি ব্যাপারে মনোযোগ দেন না, তা হচ্ছে সময়। প্রাণীজগতে বিবর্তন একটি শ্লথ প্রক্রিয়া, এক পুরুষে দেখার নয়। কয়েক লক্ষ পুরুষে গিয়ে এই প্রজাতিতে ভাগ হয়ে যাওয়া বা স্পেসিয়েশন১. ব্যাপারটি চোখে দেখে ঠাহর করা যায়। তবে তেজস্ক্রিয়তার পাল্লায় পড়লে জিনে মিউটেশন ঘটে দ্রুত, চেরনোবিল এলাকার লতাগুল্ম দেখলে ব্যাপারটা বোঝা যাবে।

২.
সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে বিবর্তনবাদ আরো দ্রুত ক্রিয়াশীল। সাধারণত উচ্চস্তরের প্রাণীদেহে জিনপ্রবাহ ঘটে যৌন প্রজননের ধারায়, তাই এটির পর্যায়কাল ন্যূনতম এক পুরুষ। মিমপ্রবাহ ঘটে আরো অনেক অল্প সময়ে, হয়তো একটি বই পাঠ করে, কিংবা একটা ফুলের ঘ্রাণ নিয়ে।

আমি কথা বলতে চাই বিস্তৃত অর্থে বাঙালি সমাজের স্পেসিয়েশন নিয়ে।

১৯৪৭ সালে ভারতবিভাগের সময় বাঙালি সমাজ একটি বড় দাগে বিভক্ত হয়েছে, ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাপে ভৌগলিক সীমারোপের মধ্য দিয়ে (ব্যতিক্রম খুলনা ও মুর্শিদাবাদ)। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিমবঙ্গ নামে দু'টি ভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিবেশে বিভক্ত বাঙালি সমাজে তার পরও দীর্ঘদিন মিম বিনিময় ঘটেছে নানা ঘটনার প্রেক্ষিতে।

১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান পরিচয় লোপের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্মের পর আরো একটি বিভাজন ঘটে, পশ্চিম পাকিস্তান ওরফে পাকিস্তানে মূলছিন্ন হয়ে রয়ে যান অনেক বাঙালি। তাঁদের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়।

পরবর্তীতে বিভিন্ন কারণে এই পরিবেশের মধ্যে মিমি বিনিময় সংকুচিত হয়ে এসেছে। পাশাপাশি প্রবাসে বেড়ে ওঠা একটি "তৃতীয় বাংলা" বিবর্তিত হয়েছে নিজের ভিন্ন পরিবেশে। আমার ব্যক্তিগত মত, সাংস্কৃতিক স্পেসিয়েশন ঘটে গেছে এবং আরো ঘটছে এই সমাজগুলোর মধ্যে।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, ল্যাটিন আমেরিকায় সেটলার ইয়োরোপীয়রা, যাদের পূর্বপুরুষ কয়েকশো বছর আগে সেখানে আড্ডা গেড়েছে, এবং যারা পরবর্তীতে ইয়োরোপের চিন্তার বিবর্তনের সাথে পরিচিত নন, তারা প্রাচীন ইয়োরোপের গোঁড়ামিগুলো প্রায় পূর্ণমাত্রায় বহন করেন। সাংস্কৃতিক স্পেসিয়েশনের এটি একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। তাছাড়া শুনেছি এবং পড়েছি যে অস্ট্রেলিয়ানরা নাকি ব্রিটিশদের চেয়েও অধিকমাত্রায় ব্রিটিশ। এখানেও সেই স্পেসিয়েশন, আদিভূমিপুত্ররা বিবর্তিত হয়েছে, দখলভূমিপুত্ররা হয়নি।

৩.
আমি সাংস্কৃতিক স্পেসিয়েশনের পক্ষে বা বিপক্ষে নই। আমি আগ্রহী এই স্পেসিয়েশনের বিভিন্ন মাত্রা সম্পর্কে জানতে। আমার এই জিজ্ঞাসা মেটাতে পারে ব্লগ, আরো ভালোভাবে বলতে, সচলায়তন।

পশ্চিমবঙ্গ ও পাকিস্তানবাসী বাঙালিরা ব্লগিঙের মাধ্যমে তাঁদের সাংস্কৃতিক মন্ডলসম্পর্কে আমাদের আরো অবহিত করবেন, এমন আশাই করছি। প্রবাসী বাঙালি গোষ্ঠী ব্লগে অনেক সক্রিয়, তাই তাঁদের কথা আর নতুন করে বলছি না।

৪.
উৎস ভাই, আপনার ব্যস্ততা বা অবসাদ জলদি কাটুক। মিস করছি আপনাকে, ভাই।






১. স্পেসিয়েশন কথাটির যুৎসই পরিভাষা প্রয়োজন। তার গায়ের রং শ্যামলা, দৈর্ঘ্য বেশি নয়। যদি কোন সহৃদয় ব্যক্তি উহার সন্ধান পাইয়া থাকেন ...। আপাতত প্রজাতিভবন দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে।


[]

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।