Friday, August 03, 2007

রেইনকোট



রেইনকোট দু'ধরনের হয়। একটা হচ্ছে আলখাল্লার মতো, রেইনকোটের ঝুল হাঁটুমাটু ছাড়িয়ে একেবারে তাখনুর কাছে চলে যাবে। তাখনু কী জিনিস, তা যদি না চেনেন, তাহলে ও ধরনের রেইনকোট না-ই বা পড়লেন, অন্য কিসিমেরটা পড়ুন। এই কিসিমের রেইনকোট হচ্ছে পায়জামা-জ্যাকেট কোয়ালিশনের মাল।

আমি দীর্ঘসময় প্রথম প্রজাতির রেইনকোট পরে চলাফেরা করেছি। আমার পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, ওতে তেমন একটা লাভ হয় না। প্যান্টের নিচের অংশটা ভিজে গিয়ে খুব বিশ্রি একটা ব্যাপার হয়। অবশ্য ঢাকায় বৃষ্টি হলে রাস্তায় দন্ডায়মান জলসীমা যেভাবে পা বেয়ে উঠে পড়ে, তাতে প্যান্ট গোটাতেই হয়। প্যান্ট যদি গুটিয়েই ফেলবেন বলে স্থির করেন, তাহলে ক্যাটেগরি ক, অর্থাৎ আলখাল্লা রেইনকোট আপনার জন্যে ভালো হবে।

ক্যাটেগরি খ, অর্থাৎ পায়জামা জ্যাকেটের জোটবদ্ধ রেইনকোট ভেজালের জিনিস। আপনাকে প্যান্টের ওপর আবার আরেকটা জিনিস চড়াতে হবে, এবং তা করতে হতে পারে জুতো খুলে। গেরো।

আমি তাই পাজামাটা স্যুভেনির হিসেবে তুলে রেখেছি। জ্যাকেটটা ব্যবহার করি। এতে করা যা হয়, আমার ঊর্ধ্বাঙ্গ মোটামুটি শুষ্ক থাকলেও নিম্নাঙ্গ ভিজে জবজব হয়ে থাকে। ভেজা নিম্নাঙ্গ ব্যাপারটা শুনতে যেমন অশ্লীল শোনায়, তেমনি অশ্লীল। খুবই বাজে একটা ব্যাপার, ভেজা প্যান্ট নিয়ে হাঁটা।

তবে হাঁটা নয়, ঢাকায় তেমন বৃষ্টি হলে আপনার ভরসা রিকশা। কারণ বেশির ভাগ গাড়ির এনজিন এগজস্ট পানির নিচে তলিয়ে যায়।

রিকশায় বসলে আপনি আরেকটু নিরাপদ, কারণ রিকশাওয়ালা আপনাকে একটা পাতলা প্লাস্টিকের চাদর দেবে ঢেকেঢুকে বসার জন্য। ইদানীং এ চাদরের আকার ছোট হয়ে এসেছে, আগে বেশ বড়সড় চাদর পাওয়া যেতো। যারা বৃষ্টির দিনে বান্ধবীকে নিয়ে ঘোরেন, তাদের উচিত এই চাদর দেখে রিকশা ঠিক করা।

তবে আপনি রেইনকোট পরে, চাদর এঁটে বসলে কী হবে, রিকশাওয়ালা বেচারা কিন্তু কোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে পড়ে। মাঝে মাঝে ভয়ঙ্কর হিমেল বৃষ্টি হয় ঢাকায়, বোধ করি মেঘগুলি বায়ুমন্ডলে কিছুটা বেশি উঁচুতে চললেই, ঠুসঠাস করে বড়সড় বৃষ্টির রামফোঁটা পড়ে। একটু খেয়াল করলে দেখবেন রিকশাওয়ালা বেচারা হি হি করে কাঁপছে, ফোঁপাচ্ছে প্যাডেল দিতে গিয়ে।

এমন পরিস্থিতিতে আপনি প্রথমেই যা দান করতে পারেন, সেটি হচ্ছে উপদেশ। রেইনকোটের উপকারিতা নিয়ে এক পশলা নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা হয়ে যেতে পারে। তবে রিকশাওয়ালা এর উত্তরে আপনাকে রেইনকোটের দাম ও তার আয় নিয়ে কিছু হতাশাব্যঞ্জক তথ্য দিতে পারে, যা বিচার করে আপনি বুঝতে পারবেন, রিকশাওয়ালার পক্ষে নিজের আয়ে একটি রেইনকোট কেনা সম্ভব না। রিকশাওয়ালাকে একটা রেইনকোটের পয়সা দান করার মতো ঔদার্য আপনার না-ও হতে পারে, এবং নিজেকে অনুদার ভাবতে চান না বলে আপনি একটা যুক্তি দাঁড় করিয়ে ফেলবেন, পয়সা দিলে তো লোকটা রেইনকোট কিনবে না, অন্য কাজে খরচ করে ফেলবে।

এখন আপনি তো আর রিকশাওয়ালাকে দান করার জন্য রেইনকোট সাথে নিয়ে ঘুরছেন না। কাজেই চার-পাঁচটাকা অতিরিক্ত রিকশাভাড়া দিয়ে নিজে শুকনো থাকার গ্লানি থেকে বাঁচার জন্যে আপনি প্রাণপণে ভাবতে থাকেন, কী করা যেতে পারে এই মানুষগুলির জন্য। এরা কি রোজ এভাবে ভিজে ভিজে রিকশা চালাবে? যদি জ্বর হয়? যদি জ্বর হয়ে একদিন রিকশা চালাতে না পারে, তাহলে ও খাবে কী? আরো নানা চিন্তা আসে আপনার মনে, কিন্তু অতখানি গভীরে খুঁড়তেও চান না আপনি। তখন আপনার কাছে মনে হয়, সকল সমস্যার সমাধান সম্ভব যদি প্রতিটি রিকশাওয়ালার একটা করে রেইনকোট থাকে।

আপনি তখন ঠিক করেন, ব্লগে একটা পোস্ট দেবেন এটা নিয়ে। বড় বড় কর্পোরেট কর্তারা যাতে বিজ্ঞাপনের একটা তরিকা গ্রহণ করেন, নিজেদের পণ্যের ছাপ্পা মুদ্রিত কিছু সস্তা খসখসে রেইনকোট কিছু রিকশাওয়ালাকে বিনামূল্যে উপহার দেয়া হয়। মুঠোফোন হোক, কন্ডম হোক, ফর্সা-হবার-আশ্চর্য-মলম হোক, হোক যা কিছু, যা কিছু চিহ্ন ব্যাটারা বহন করে চলুক এই গম্ভীর মৌসুমী বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে, কিন্তু মানুষগুলো শুকনো থাকুক, বাঁচুক, আপনাকে রেহাই দিক অর্থহীন বিবেক দংশন থেকে।



[]

2 comments:

  1. hmm korta bektider kane pouchale hoy...

    ReplyDelete
  2. কি সর্বনাশ !

    আপনি দেখি পুরা আমার মনের কথা লিখে ফেলসেন।

    আমি বছরখানেক আগেও রিকশাওয়ালাদের জন্য রেইনকোট ব্যাবস্থা করা যায় কিনা, তা নিয়ে ভাবছিলাম ।

    পরে কিছু না করতে পেরে, কই যেন ২-৪ লাইন লিখে গায়ের ঝাল মিটিয়েছিলাম।


    আপনি দেখি আমার নাড়ী নক্ষত্র জেনে বসে আছেন।

    গুরুতর ব্যাপার।

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।