Friday, August 17, 2007

ভূতেন হাজারিকা

সচলায়তনে পূর্বপ্রকাশিত। রচনাকাল মে, ২০০৪।




১.



‘বেশিদিন আগের কথা নয়, বুঝলি তো ---।’ আমরা ভালোভাবে কিছু বোঝার আগেই মামা একেবারে ক্ষেপে ওঠেন, লালনভক্ত সাধুর মতো বিড়ির গোড়ায় কষে দম দ্যান, আট কুঠুরি নয় দরজার প্রতিটি বর্গবিঘতে ধোঁয়া ছড়িয়ে দেবার লালসায়। তারপর তেমনি বাউলোচিত, রক্তিম ঢুলুঢুলু চোখে তাকান আমাদের দিকে। ‘বুঝলি কি না বল?’

আমাদের সন্দেহ হতে থাকে, নিশ্চয়ই সুরেশ কারিগরের সাথে মামার বিড়িবিনিময় ঘটেছে। সুরেশ ভর সন্ধ্যায় আর সিঙারা আলুপুরি ভাজে না, বরং উদ্ভট সব হিন্দুস্থানী সুর ভাঁজে, আর বড় তামাকের কল্কেতে প্রগাঢ় সব চুম্বন দেয়। তবে মামার গাঁজা খাওয়া-তে আমাদের আপত্তি নেই, গাঁজা ছাড়া গাঁজাগুরিগপ্পো না জমে ওঠে, না গেঁজে ওঠে। গাঁজার গুণে যদি গল্পে কিছু যোগ হয়, তাতে আমাদের কী ক্ষতি?
কিন্তু আমাদের বোধনের সম্মতি বা অসম্মতির পরোয়া না করে চারপাশ ঘোলা করে দিয়ে ধোঁয়া ছাড়েন মামা, তারপর দরদভরা গলায় ডাকেন, ‘জুম্মন রে, পুরি লাগা বাপ!’

এমন কাতর স্নেহভরা স্বরে জুম্মনের মতো ঘাঘু বেলেহাজ পিচ্চি পর্যন্ত কাবু হয়ে যায়, বিদঘুটে হিন্দি সিনেমার গানে খ্যামা দিয়ে সে পুরি আনতে ছুটে যায়। কিন্তু পুরির আগমনের অপেক্ষা করেন না মামা, বিড়িতে আরেকটি টান দিয়ে শুরু করে দেন, তাঁর গুলন্দাজি।

‘ধর, তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। পড়ি মানে কি, মাত্র ক্লাস এইট টপকে নাইনের ঘরে পা দিয়েছি।’ মামা নস্টালজিয়া-জরজর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, তার সাথে অনেক নষ্ট ধোঁয়া বেরিয়ে আসে। ‘ঈশশ, কিভাবে দিন কেটে যায় ---।’

আমি তাড়াতাড়ি বাগড়া দিই, নইলে গল্পটা কল্পলোকের চৌকাঠ পেরোতে পারবে না, সেই অখাদ্য নাইনের ঘরের চৌকাঠের ওপরই গোঁৎ খেয়ে পড়বে। ‘কী করলেন ক্লাস নাইনে উঠে?’

মামা আরো কাতর হয়ে পড়েন। ‘কত্তো কিছু ---।’

কিন্তু এবার শিবলি তেড়েফুঁড়ে ওঠে, ‘মামা, আমার টিউশানি ---।’

মামা শক্ত বেঞ্চে নেমে আসেন, অতীতচর্চায় ক্ষান্ত হয়ে। ‘তোরা বড় নিষ্ঠুর, বুঝলি? বুঝবি বুঝবি, আগে বড় হ, সুন্দর শৈশব পার হয়ে যাক?’

জুম্মন ঠকাস করে পুরির পেয়ালা টেবিলের ওপর রাখে, তারই একটা মুখে ঠুসে দিয়ে রেজা ফুঁসে ওঠে, ‘ক্লাস নাইনে ওঠার পরও আপনার শৈশব শেষ হয় নাই? আর কতো?’

মামা চটে ওঠেন, ‘চোপরাও! শিশুর জন্ম দেয়ার আগ পর্যন্ত সবাই শিশু, বুঝলি?  আর শৈশবের তোরা বুঝবি কী, জন্মেই তো বুড়ো হয়ে গিয়েছিস, এঁচড়ে পেকে গেছিস যতো সব গজা কাঁঠালের দল ---!’

কিন্তু শিবলি আবারো ডুকরে ওঠে শিশুর মতো, ‘আমার টিউশানি ...।’

অতএব, গল্পটাকে শুরু করতেই হয়। অবশিষ্টাংশ মামার নিজস্ব বচনামৃত।



২.



বেশিদিন আগের কথা নয়, আমি তখন মাত্র ক্লাস নাইনে উঠেছি। উঠেই আমি হতবাক। এ যেন যাদু সীমের গাছ বেয়ে মেঘের রাজ্যে দৈত্যের বাগানে গিয়ে উঠেছি। ক্লাস নাইন তো নয়, যেন ওয়ান্ডারল্যান্ড, ঘরভর্তি উটকো উটকো সব গোবদা সব ছেলে, সব আমার সিনিয়র ভাই। কেউ এক বছরের, কেউ দুবছরের, কয়েকজনের চেহারা ছবি গার্জিয়ানদের মতো ভারিক্কি ... কি গোঁপ কি দাড়ি, কোনটারই কমতি নেই তাদের। আমার ক্লাসএইট-পর্যন্ত মেরেকেটে উঠে আসা ক্লাসমেটগুলো অনেকেই ফাইন্যালে ফান্টুশ হয়ে গেছে, আমি অল্প কয়েকজন সৌভাগ্যবানের মধ্যে একজন।

একদিন পরই টের পেলাম, বরে শাপ হয়েছে, সৌভাগ্য নয়, দুর্ভাগ্যের দোলনায় চড়েই এই ক্লাসে এসে পড়েছি আমি। সিনিয়র ভাইগুলো সব বদ আর বখা, সবার পকেটে বিড়িসিগারেটের বিপুল মজুদ, দুবছুরে এক ফেলবিশারদ তো চুরূট খেতো --- তার চুরূট নাকি সব বার্মা থেকে সাম্পানে করে চট্টগ্রামে চোরাচালান হয়ে আসে, বলতো সে, সেই বর্মী মার্কার চুরূট ছাড়া অন্য কিছু রুচতো না তার। তবে বখা হলেও বেশির ভাগের সাথেই আমার খাতির ছিলো, তারা আমাকে মোটেও ঘাঁটাতো না। কিন্তু ক্লাস নাইনে যারা অভিজ্ঞ, অর্থাৎ কমপক্ষে দুবছর ধরে আছে, তারা ছিলো ভীষণ। একেবারে টাইরান্ট। সবচেয়ে সিনিয়ার ছিলেন মজনু ভাই, তাঁকে ডাকতে হতো মজনু ওস্তাদ বলে, কারণ তিনি বাজারের পাশে পোড়ো জমিটায় ভোরবেলা কুংফু শেখাতেন। বিভিন্ন ক্লাসেই একাধিকবছর কাটিয়ে এখন তিনি দুটি বছর জিরোচ্ছেন। ভয়ানক ঘাড়েগর্দানে চেহারা, একদিন শেভ না করলেই চম্বলদস্যু বীরাপ্পনের মতো লাগতো দেখতে, রদ্দা মেরে চেয়ারটেবিল ভেঙে ফেলা ছিলো তাঁর কাছে নস্যি, আমাদের পলকা ঘাড় দেখে তিনি তো হেসে লুটোপুটি, বলতেন টোকা মারলেই চুরমার হয়ে যাবে। আমরাও তা-ই ভাবতাম। যাকগে, ঠিক হলো, তার বিভিন্ন ফরমাশ আমাদের খেটে দিতে হবে। কাজেই দেখা গেলো, শফি তার চুল টেনে দিচ্ছে আর ঘাড় ম্যাসাজ করে দিচ্ছে  মজনু ওস্তাদ তাকে ডাকতেন ডলামাস্টার, খোরশেদ তার জন্যে বিরাট একটা ফ্লাস্কে পানি বয়ে বেড়াতো --- খোরশেদের নাম হয়ে গেলো পানিবর্দার, ভালো ছাত্র বিকাশ তার হোমওয়ার্ক করে দিতো ... সেজন্যে বিকাশ হলো কামেল-বান্দে, বড়লোকের বাছা ইসমাইল তার বিড়ি আর চায়ের পয়সা দিতো, দিতে হতো, কারণ মজনু ওস্তাদ, যে কি না বিড়ির চেয়ে হুঁকা টানতেই বেশি পছন্দ করতেন, প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েছিলেন, পয়সা না দিলে তিনি ঘর থেকে তাঁর পেতলের হুঁকামোবারকটিকে স্কুলে এনে দারোয়ানের ঘরে রেখে দেবেন, আর ইসমাইলকে ঐ জগদ্দল হুঁকায় রোজ পানি পাল্টাতে হবে, টিকে সাজাতে হবে, প্রয়োজনে কল্কে আর ডাব্বা দুটিকেই ছাই দিয়ে মেজেঘষে আয়নার মতো পরিষ্কার করতে হবে, সর্বোপরি হুঁকাখানা সেই সুদূর দারোয়ানের ঘর থেকে এই পালোয়ানের হাতে বয়ে এনে দিতে হবে, এবং এই কর্তব্যে অস্বীকৃতি তো দূরে থাক, তিলেকমাত্র অবহেলা প্রদর্শনের শাস্তি হবে কবরের আযাবের চেয়ে বীভৎস, বিশ্বাস না হলে বিগত পাঁচ বছরে মজনু ওস্তাদের হাতে প্রহৃত, কাম্পুচিয়ান মার্শাল আর্টের নৃশংস শিকার ব্যক্তিবর্গের নামধামের হৃষ্টপুষ্ট তালিকা অনুসরণ করে সরজমিন দেখে আসুক ইসমাইল, তারা কিভাবে বেঁচে আছে, তাদের বুকের মধ্যে হাওয়া ঘুরে ওঠে ---। কাজেই ইসমাইল বিনা বাক্যব্যয়ে, কেবল একটি ঢোঁককে সাফল্যের সাথে গিলে ফেলার মাধ্যমে আলাপগত সৌজন্য রক্ষা করে তৎক্ষণাৎ তার জন্যে প্রকৃষ্ট বিকল্প, অর্থাৎ তামাক ও চায়ের ব্যয়বহনে রাজি হয়ে গেলো, কারণ কবরের আযাব সম্পাদনের দায়িত্বও যে মজনু ওস্তাদ ভালোভাবেই পালন করতে পারবেন সে ব্যাপারে তার দ্বিমত ছিলো না। ইসমাইলের জন্যে একটা চলনসই ভালো নাম আমাকেই মজনু ওস্তাদ বেছে দিতে বলেছিলেন। অনেক নামই আমি দিয়েছিলাম, যেমন গৌরীসেন, চায়তৈয়ারি, টামুকখামু --- কিন্তু ওস্তাদ নিজেই আলগোছে স্নেহবশে ইসমাইলের নাম রাখলেন হুক্কু। হুঁকাবর্দারের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ আর কি।
তোরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছিস, আমি মজনু ওস্তাদের বিশেষ স্নেহের পাত্র ছিলাম। আমার নাম তিনি দিয়েছিলেন, গবুচন্দ্র, অনেক সুমন্ত্রণা আমি তাঁকে যুগিয়েছি। এই স্নেহের কারণ আর কিছুই না, আমার এক মামা ছিলেন তৎকালীন থানাদার, দোর্দন্ডপ্রতাপ দারোগা, এবং এই তথ্যটিকে আমি সুকৌশলে যথাক্রমে বাতেনী ও জাহেরী পন্থায় ব্যবহার করতাম। বেঁচে থাকতে হলে মানুষকে কতকিছু করতে হয়!

... দীর্ঘশ্বাস ...

যা বলছিলাম, পড়াশোনায় মজনু ওস্তাদ অত্যন্ত পশ্চাদপদ ছিলেন, ক্লাসে তার পদটিও ছিলো একেবারে পশ্চাতে, খেলাধূলাতেও তিনি খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি, কারণ খেলাধূলায় মারামারি অনিবার্য, এবং তাঁর সেই অজেয় কাম্পুচিয়ান কুংফুর ধার বা ভার সহ্য করার মতো লোকজন আদপেই স্কুলে ছিলো না, আর তিনিও নিজেকে অ্যাটেম্পট-টু-মার্ডারের মামলায় ফেঁসে যাওয়া থেকে বাঁচানোর জন্যে এসব এড়িয়ে চলতেন। কিন্তু মজনু ওস্তাদ ছিলেন একজন সুদক্ষ স্কাউট। তিনিই ছিলেন আমাদের সিনিয়ার প্যাট্রল লিডার।

আর, আমাদেরকেও বাধ্য হয়েই বুড়ো বয়সে স্কাউটিং শুরু করতে হয়েছিলো, কারণ স্কুলে যতক্ষণ মজনু ওস্তাদ থাকবেন, ততক্ষণ আমাদেরও তাঁর ডিউটি দিতে হবে। তাই আমরাও খাকি হাফপ্যান্ট পড়ে কুচকাওয়াজ করতাম।
আর শিগগীরই আমাদের বিপদ ঘনিয়ে এলো। ভারত-বাংলাদেশ যৌথ স্কাউট ক্যাম্প পড়লো করিমগঞ্জে। করিমগঞ্জ কোথায় জানিস? আসামে! হুমম!
... এতে বিপদের কী আছে বুঝিসনি? বুঝবি। স্কুল থেকে আমাদের পাঁচজনের একটা টীমকে সেই ক্যাম্পে অংশগ্রহণ করতে হবে। বাঘা বাঘা দু’জন স্কাউটের সাথে আমাকে আর শফিকেও টীমে ঢুকিয়ে দিলেন মজনু ওস্তাদ। কারণ আমার মন্ত্রণা তাঁর দরকার ছিলো, আর শফি তাঁর ডলামাস্টার ...। এখন সমস্যা হচ্ছে, শফিও পালোয়ান টাইপ ছেলে, আমাদের ফুটবল টীমের ব্যাকে খেলে। আর আমি নিতান্ত প্যাকাটি। নানা মন্ত্রণাদানে আমি যত সিদ্ধ, স্কাউটিঙের শ্রমবহুল কীর্তিকলাপে আমি ততটাই কাঁচা। কিন্তু মজনু ওস্তাদ পরিষ্কার হুমকি দিলেন, ক্যাম্পে না গেলে ফিরে এসে আমার কপালে পূর্বোক্ত আযাব প্রয়োগ করা হবে। কাজেই বাড়ি থেকে অনুমতি নিয়ে কম্পিতচিত্তে একদিন আমি দলের সাথে সিলেট সীমান্ত পার হয়ে করিমগঞ্জ পৌঁছলাম।

স্কাউট ক্যাম্পের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে আমি আর অযথা গল্পের পিঠে বোঝা চাপাতে চাই না, কিন্তু নানা রকম অমানুষিক খাটনি --- অন্তত আমার মতো মানুষের জন্যে --- করতে হলো। আমার টীম, এবং অন্যান্য টীমের ছেলেপেলে, তাদের মধ্যে ক্ষুদে কিছু বিচ্ছুও আছে, একেবারেই নির্বিকার। আর ওদিকে সন্ধ্যাবেলা আমার গায়ে তীব্র টনটনানি। শুতে হতো একটা শক্ত কম্বলগোছের জিনিসের ওপর, সেটাও আবার উঁচুনিচু বন্ধুর, কাজেই আরাম করে ঘুমানোও যেতো না। অন্ধকারের মধ্যে বিউগল বাজিয়ে জাগানো হতো আমাদের, বিচ্ছিরি সব অহমিয়া নাস্তা --- যেগুলো কেবল আসামীরাই হজম করতে পারে --- খেতে হতো, আর সেই খাটনি তো আছেই। তাঁবুতে ফিরে একেবারেই বেতাব হয়ে পড়তাম ঘুমানোর জন্য। আর তখন হেমন্তকাল, কিন্তু করিমগঞ্জের সেই মাঠে পড়তো হাড় কাঁপানো শীত, মাথাটাই জমে যেতো একেবারে! আমাদের ড্রিল টীচার জিল্লুর স্যার এসেছিলেন আমাদের সাথে, তিনি শুধু বসে বসে ঝিমুতেন, ফুড়–ৎ ফুড়–ৎ চা খেতেন আর আরাম করতেন।

তারপর একদিন শুনলাম, জঙ্গলের মধ্যে আমাদের একশো মাইল দৌড়াতে হবে। যে টীম সবার আগে পৌঁছুতে পারবে, তাদের জন্যে থাকবে বিশাল পুরস্কার!
এই ক্যাম্পে কেবল কয়েকটা বাছা বাছা টীমই অংশগ্রহণ করেছিলো, বাংলাদেশ থেকে গিয়েছিলো মাত্র চার পাঁচটা দল, যার জন্যে খুব একটা ভিড় হয়নি। কম দৌড়ে কর্তৃপক্ষকে দুগগি দেয়ারও উপায় ছিলো না, কারণ স্টার্টিং পয়েন্ট থেকে শুরু করে পঞ্চাশ মাইল দূরে দূরে একেকটা পোস্টে গিয়ে রিপোর্ট করে ফিরে আসতে হবে। আসার সময় নমুনা হিসেবে টোকেন নিয়ে আসতে হবে সাথে করে।
বড় হ্যাপা।

মজনু ওস্তাদ এসে হৃষ্ট গলায় বললেন, ‘ট্রফিটা অত্যন্ত জোশ। ওটা আমাদেরই জিততে হবে। আপসোস, অন্য দলের ছেলেপিলেগুলোকে রদ্দা মারা নিষেধ, মারলে ডিসকোয়ালিফায়েড হয়ে যাবো। কাজেই সৎ পথে দৌড়েই আমাদের এই ট্রফি হাসিল করতে হবে। বুঝলি তো সবাই?’
শফি খুব গম্ভীর হয়ে আমাকে দেখিয়ে বললো, ‘এই ছাগলটা হাঁপিয়ে পড়বে। পদে পদে ওর জন্য থামতে হবে। ওর জন্যেই হারবো আমরা।’

আমি প্রতিবাদ করলাম না। কথা সত্য। কিন্তু একটি ভীষণ ভ্র“কুটি দিতে কার্পণ্য করলাম না, ভুরু জোড়া নইলে আছে কী করতে?

মজনু ওস্তাদ দাঁত বের করে বললেন, ‘আমাদের ট্র্যাক পড়েছে নর্থ কাছাড়ের পাহাড় আর ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে। পিছিয়ে পড়লে ওকে সাপে কাটবে, নয়তো বাঘে খাবে। আর তাঁবু থাকবে আমার কাছে। কাজেই আমাদের কোন চিন্তা নেই, ও নিজের তাগিদেই আমাদের সাথে তাল মিলিয়ে চলবে।’

আমার সাথে মিশে মিশে মজনু ওস্তাদের বুদ্ধি কত ধারালো হয়েছে দেখে আমি হতবাক হয়ে যাই। আর নিজের তীক্ষ্ণ আক্ল এর ওপর আমার রাগ হতে থাকে।

যা বলছিলাম, আমাদেরকে বিশাল পথ বাসে চাপিয়ে উত্তর কাছাড়ের সেই বিদঘুটে ট্র্যাকের কাছে নিয়ে আসা হলো। মোট আটাশটা দল এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে, প্রতিটি দলের রুট আলাদা, প্রত্যেকের পোস্ট ও টোকেন নম্বর আলাদা, যাতে কোন ঝামেলা না হয। আর প্রতিটা রুটই রেললাইনের কাছে, যাতে কোন সমস্যা হলে রেল লাইন বরাবর গিয়ে নিকটস্থ স্টেশনে রিপোর্ট করা যায়। কিন্তু বিদঘুটে চেহারার পাহাড় আর ঘন জঙ্গল আছে এখানে, এবং জঙ্গলের মধ্যে যেসব জীবজন্তু থাকে তারা খুব একটা বন্ধুবৎসল নয়।

একশো মাইল টানা দৌড়ানো সম্ভব নয়। আমাদের কাঁধে আবার যৎকিঞ্চিৎ বোঝাও চাপানো আছে। কাজেই জোরে হাঁটাই আমাদের টার্গেট। কাজেই পরদিন ভোরে সেই কাছাড়ি ক্যাম্প থেকে দরূদ পড়তে পড়তে বের হলাম আমরা। সবার কাঁধে বোঝা, হাতে খাটো লাঠি।
সেই বিচ্ছিরি ট্র্যাকে চলার অভিজ্ঞতা নিয়েও বেশি কিছু বলবো না, শুধু বলবো যে এমন বিশ্রী ঘন জঙ্গল, আর এমন বিদঘুটে চেহারার পাহাড় আমি আগে কখনো দেখিনি। পিছিয়ে পড়া তো দূরের কথা, হাঁপাতে হাঁপাতে নিজের ফুসফুসটা জিভ দিয়ে ভেতরে ঠেলে রেখে আমি দলের বাকি চারজনের সাথে পা মিলিয়ে পঞ্চাশ মাইল পাড়ি দিলাম। আমাদের সময় লেগেছিলো দেড়দিন, এক রাত আমরা একটা গ্রামে থেকেছি, আগে থেকেই আমাদের ভালো করে ম্যাপ বুঝিয়ে দেয়া হয়েছিলো। ঐ গ্রামের লোকজনও খুবই ভালো, তাদের কল্যাণে আমরা নিখরচায় বেশ উমদা নিরামিষ জলযোগ করেছিলাম। আর আসামের মেয়েরাও বেশ রূপবতী, বুঝলি --- যাই হোক।

ফিরে আসার সময় মজনু ওস্তাদ এক কান্ড বাধিয়ে বসলেন। পোস্টে রিপোর্ট করে টোকেন নিয়ে আমরা বেশ সাঁটিয়ে বনমুরগির ঝোলঝাল দিয়ে ভাত খেয়েছিলাম, তাই পেটে ভালোমন্দ পড়ার পর মজনু ওস্তাদ স্বরূপে আবির্ভূত হলেন।

‘এদের দেখিয়ে দিতে হবে, যে আমরা বাঘের জাত। এই ট্রফি আমাদের জিততেই হবে। পোস্ট থেকে আমাদের বলা হয়েছে, আমরা গত বছরের টীমের তুলনায় বেশ জলদি জলদি এসে পৌঁছেছি। কাজেই যদি জলদি জলদি পা চালিয়ে যেতে পারি, এই ট্রফি আমাদেরই হবে। কাজেই বান্দারা, আমরা এখনই পা চালাবো, আর সারা রাত হাঁটবো!’

স্বাভাবিকভাবেই আমি প্রতিবাদ করলাম, আমার ভবিষ্যত ঘুমের বিপদ আঁচ করে, চিঁ চিঁ করে বললাম, ‘গত বছরের লেট লতিফ টীমটা যে বাংলাদেশ থেকে আসেনি, তার কী প্রমাণ?’

মজনু ওস্তাদ বললেন, ‘তাতে কিছু আসে যায় না।’
‘বাঘের জাতের লোক যদি রাতবিরাতে জঙ্গলের মধ্যে পা চালিয়ে যাবার সময় বাঘের পেটে যায়, সেটা কি ভালো দেখাবে?’ এবার শফি বলে।

বাকি দু’জন, ঘাগু ট্রেকার, তারা চুপ করে তর্ক শোনে।
কিন্তু মজনু ওস্তাদ হাসেন। ‘বাঘ? আসুক বাঘ, লাগাবো এক থাপ্পড়!’ বাঘকেও তিনি তাঁর পূর্বোক্ত আযাবভোগী লোকজনের লিস্টে ফেলতে চান।

কাজেই এরপর আর তর্ক চলে না, একটা ঢেঁকুর দিয়ে মজনু ওস্তাদ পা চালাতে বলেন।

এবার আমরা পাহাড় ধরে নামছি, কাজেই সবার চলার গতি আগের তুলনায় দ্রুত। বিকেল নাগাদ আমরা সেই গতরাতের গ্রামটাতে এসে পৌঁছলাম। আমি করুণ চোখে আমাদের তাঁবুর জায়গাটা একবার দেখে নিয়ে জোরসে পা চালালাম, কারণ দেরি হলে আমাকে ফেলেই বাকি চারজন ছুট লাগাবে।

সারারাত ধরে হাঁটার সেই বীভৎস অভিজ্ঞতা বিস্তারিত শুনলে তোরা ভয় পাবি, তাই অল্প কথায় বলছি, সে ছিলো এক আযাবের রাত! শবে আযাব বলতে পারিস। চাঁদের আলোয় পথ চলছি আমরা, কোথাও খাদের পাশ দিয়ে, কোথাও ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে চলেছে সে পথ। দূরে হাতি ডাকছে, শেয়াল ডাকছে, আর আমরা প্রায় ছুটছি। পেঁচার ডাক শুনে একবার গাছের দিকে তাকিয়ে তো আমার আত্মা ফুরুৎ হওয়ার শামিল, দেখি গোল গোল দুটো চোখ কাবাবের কয়লার মতো জ্বলছে!  ভয় পেলি? আচ্ছা থাক, আর বলবো না।

তবে যে কথাটা না বললেই নয়, সেটা হচ্ছে, ভোর হবার সাথে সাথে আমরা একটা পাহাড় থেকে খানিক সমতলে নামলাম, আর ওখানেই শফি পা মচকালো।

মজনু ওস্তাদ বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘ধ্যৎ, পা ভাঙার জায়গা পেলি না আর?’

‘ভেঙে গেছে? অ্যাঁ?’ শফি ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেললো।

‘চোপ! ভাঙেনি, মচকেছে। এখন এই খোঁড়া বলদটাকে নিয়ে কী করা যায়?’ বলে মজনু ওস্তাদ আমার দিকে ফেরেন। ‘গবুচন্দ্র, বুদ্ধি বাতলাও!’

আমি খুবই প্রতিশোধপরায়ণ বালক ছিলাম। গম্ভীর গলায় বললাম, ‘এই ছাগলটা হাঁপিয়ে পড়বে। পদে পদে ওর জন্য থামতে হবে। ওর জন্যেই হারবো আমরা।’

শফি চোখ মুছে সেটাকে খানিকটা করুণরসে সিক্ত করে আমার দিকে তাকালো, আমি মোটেও পাত্তা দিলাম না, আমার সেই আগের ভ্রুকুটি ভুরুজোড়ায় আমদানি করে আরেকদিকে তাকিয়ে রইলাম।

এতক্ষণে সেই বাকি দুই ঘাগু স্কাউট, যমজ ভাই, দিলদার আর গুলশান মুখ খুললো। ‘থোন এই হালারে এই গাছের বগলে ফালায়া। আগে জিতি, পরে আইসা অরে লয়া যামুগা।’

শফি একেবারে মিসেস সিরাজুদ্দৌলার মতো চেঁচিয়ে কাঁদতে থাকে, আর মজনু ওস্তাদ মোহাম্মদী বেগের মতো একটা মুচকি হাসি দ্যান।

‘ভালো বুদ্ধি!’ এই বলে তিনি শফিকে অনায়াসে বগলদাবা করে একটা গাছের নিচে নিয়ে যান। ‘এইখানে তোকে তাঁবু খাটিয়ে দিয়ে যাচ্ছি। চুপচাপ শুয়ে ঘুমিয়ে পড়। চেঁচামেচি করে বাঘভাল্লুক ডেকে আনিস না। আমরা আগে ট্রফিটা জিতে নিই, পরে তোকে নিয়ে যাবো। আর যদি দেখিস দেরি হচ্ছে, তাহলে পা চালিয়ে চলে আসবি। ভয়ের কিছু নেই, বিপদ দেখলেই গাছে উঠে পড়বি --- তবে দেখিস, ভালুক হলে ঝেড়ে দৌড় লাগানোটাই ভালো ---।’

শফি অনেক প্রতিবাদ করে, কিন্তু দিলদার আর গুলশান ততক্ষণে তাঁবু খাটানোর কঞ্চি কাটার জন্যে ভোজালি বের করে ফেলেছে। সেটা দেখেই শফি চুপ করে যায় বুদ্ধিমানের মতো, কারণ দিলদার এক বছর মজনু ওস্তাদের কাছে কুংফু শিখেছে, আর তার মেজাজটাও সুবিধার না। কোপটোপ বসিয়ে দিলে আরো ল্যাঠা।

কিন্তু আমাদের সব আয়োজন স্তব্ধ হয়ে যায় একটা দৃশ্য দেখে।

গাছের গোড়ায় পৌঁছুতেই আমরা দেখি, আমাদের দিকে পেছন ফিরে একটা ঝোপের দিকে ঝুঁকে আছে একজন মানুষ, পরনে একটা চাদর আর ধুতি। কী যেন খুঁজছেন তিনি। আর কী তাজ্জব, বাম হাতে নিজের পশ্চাদ্দেশ, অর্থাৎ ঠিক যে অংশটায় লাথি মেরে আরাম পাওয়া যায়, সেই মহার্ঘ্য স্থানটিকে পরম যত্নে মালিশ করে যাচ্ছেন ভদ্রলোক।

মজনু ওস্তাদ একটা কাশি দেন, আর লোকটা পেছন ফিরে তাকায়। তখন আমরা বুঝতে পারি, লোকটা বেশ বুড়ো। সারা মুখে পাকা দাড়ি, চোখে ঘোলা চশমা।

ঝামেলা হলো, অহমিয়া ভাষা আমরা কেউ বলতে পারি না, যদিও অল্প অল্প বোঝা যায়। তাই কী বলবো বুঝতে না পেরে আমরা একে অপরের দিকে তাকাই। মজনু ওস্তাদ ফিসফিসিয়ে বলেন, ‘গবুচন্দ্র, জিজ্ঞেস কর তো, এখানে আশেপাশে বাড়িঘর আছে কি না?’

আমি ঘাবড়ে গিয়ে বলি, ‘আমি কিভাবে বলবো?’
মজনু ওস্তাদ দাঁত খিঁচিয়ে একটা রদ্দার ভঙ্গি করেন, অর্থাৎ কিভাবে বলবো সেটা আমার হ্যাপা।

কিন্তু লোকটাই সব কাজ সহজ করে দেয়, কুঁজো হয়েই এগিয়ে এসে পরিষ্কার বাংলায় বলে, ‘গবুচন্দ্র? হুম, বাঙালি নাকি?’

আমরা খুশি হই, শুধু আমিই আমার মজনুদত্ত নামটিকে অপ্রমাণ করতে চাই। কিন্তু শফি বলে ওঠে, ‘হ্যাঁ! আপনিও বাঙালি?’

বুড়ো মাথা নাড়েন। ‘না। আমি আসামের লোক, তবে বুঝতেই পারছো, বাংলা জানি। আমার নাম ভূতেন হাজারিকা।’

--- কি হলো, এমন করছিস কেন? আসামের লোকজনের নাম এমনই হয়। --- উঁহু, ভূপেন নয়, ভূতেন। ভূতেন হাজারিকা। আমরাও প্রথমটায় একই ভুল করেছিলাম। যাই হোক, গল্পটা শোন। ---

আমি বিনীত গলায় বলি, ‘ইয়ে, আমরা স্কাউট। আমাদের একজন আহত। এখানে কি আশে পাশে ঘরবাড়ি আছে?’
বুড়ো খানিক ভেবে বলে, ‘অ্যাঁ? না বোধহয়, চোখে তো পড়েনি। আর ঠিক বলতে পারি না, বুঝলে, আমি তো আসলে এই এলাকার লোক না।’

আমার কৌতূহল মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। বলি, ‘তাহলে কী করছেন এখানে?’

‘খুঁজছি একটা জিনিস।’ মলিন গলায় বলে বুড়ো।

আমরা মুখ চাওয়াচাওয়ি করি। কী খুঁজছে বুড়ো, এই ভোরবেলায়? আশেপাশে কোন বাড়িঘর নেই, চারদিকে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। বুড়ো এলোই বা কোথা থেকে?

‘হুম! তোমাদের আগ্রহ টের পাচ্ছি। হাতে সময় থাকলে বসো, বলছি কী খুঁজছি। যেন তেন জিনিস তো নয়! তেমন হলে কি আর সেই বেয়াল্লিশ সাল থেকে খুঁজি?’

ও বাবা! প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে খুঁজছে বুড়ো? গুপ্তধন নাকি?

আমি প্রশ্নটা জোরেই করে ফেলি। বুড়ো হাসে। ‘হ্যাঁ, তা বলতে পারো। বেশ গুপ্তই ছিলো।’

আমরা সারারাত পাহাড় ভেঙে ভেঙে কাহিল হয়ে গিয়েছিলাম, তাই সবাই গাছতলায় বসে পড়ি, ট্রফির কথা ভুলে গিয়ে। গুপ্তধন যদি ইত্তেফাকন মিল ভি যায়ে, তাহলে তো কেল্লা ফতে!

বুড়ো দাঁড়িয়েই থাকে, আর আনমনে নিজে পেছনে হাত বোলাতে থাকে। তারপর উদাস গলায় বলে, ‘এইখানে, বুঝলে, সেই বেয়াল্লিশ সালের এক রাতে, আমি আর আমার বন্ধু ঐ পাহাড়টার ওপরের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম!’ বলে আঙুল তুলে আমাদের টপকে আসা পাহাড়টার উল্টোদিকের দানবমার্কা খাড়া পাহাড়টার দিকে দেখায় সে। ‘নিচ থেকে দেখলে বুঝবে না, কিন্তু ঐ পাহাড়টার চূড়ো থেকে একটু নিচে মোটর চলার রাস্তা আছে। তখনও ঐ রাস্তাটা ছিলো।’

শফি বলে, ‘আপনি আর আপনার বন্ধু মোটর চালিয়ে যাচ্ছিলেন?’

অমনি বুড়ো হেসে ফেলে। ‘হ্যা হ্যা হ্যা  ভারি মজার কথা বললে তো তুমি? আমার বন্ধু, মহেন্দ্র খিটকেলকে চিনলে আর এ কথা বলতে না। সে শুধু আমার বন্ধুই ছিলো না, সে ছিলো আমার একমাত্র বন্ধু, আমার ব্যবসার পার্টনার, এবং আমার ভায়রা। আমি তাকে হাড়ে হাড়ে চিনি। তার মতো বজ্জাত, কমবখত, উদখুল আমি আর দুটো দেখিনি। --- আর, সে ছিলো খুনী, এক নম্বরের মিথ্যাবাদী ও কঞ্জুষ। মোটর কেন, এরোপ্লেন কেনার সামর্থ্যও তার হতো, যদি না সব টাকা সে মদ আর মেয়েমানুষের পেছনে খরচ না করতো --- তবুও তার হাতে টাকা পয়সা কম ছিলো না, কিন্তু সে চলতো একটা একঘোড়ার গাড়িতে। সেটাতে চড়েই আমরা দুজন ঐ রাস্তা ধরে চলছিলাম।’

আমরা রোমাঞ্চিত হই এই গল্প শুনে। শফি বলে, ‘রাতের বেলা কেন যাচ্ছিলেন?’

বুড়ো মাথা নাড়ে। ‘বিপদে পড়ে। আমরা দুজনেই কাঠ আর মধুর ব্যবসা করতাম, সেই উত্তর কাছাড়-নগাঁও পেরিয়ে ব্রহ্মপুত্রের কাছে। ভয়ানক বিচ্ছিরি জঙ্গল ছিলো তখন এদিকটায়।’

‘কী বিপদে পড়েছিলেন?’ জানতে চান মজনু ওস্তাদ।

‘এক মাড়োয়ারির পোষা গুন্ডারা আমাদের খুন করার জন্যে খুঁজছিলো।’ বিমর্ষ গলায় বলে বুড়ো। ‘তাই ব্রক্ষপুত্র ধরে পালাতে না পেরে সেই ঘন জঙ্গলের মধ্যে করা নতুন রাস্তা ধরে আমরা পালাচ্ছিলাম। সিলেট হয়ে চট্টগ্রামে যাওয়ার ধান্ধা ছিলো আমাদের, করাচীর জাহাজ ধরার জন্যে।’

আমরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনি। কিন্তু মজনু ওস্তাদ সেই মারোয়াড়ির পোষা গুন্ডাদের ওপর চটে যান। ‘কেন আপনাদের খুন করতে চাইছিলো?’ জানতে চান তিনি, রীতিমতো বিরক্ত গলায়।

‘চাইবে না কেন? সেই মারোয়াড়ি ছিলো আমাদের ব্যবসার পার্টনার। কথা ছিলো, আমরা খাটবো, আর সে খাটবে না, বরং খাটাবে, টাকা খাটাবে আমাদের ব্যবসায়, লাভের তিনভাগের একভাগ সে নেবে। কিন্তু ব্যাটা বিবেকরাম তলে তলে অর্ধেকের বেশি গাপ করে নিতো। তাই আমার বন্ধু, মহেন্দ্র, একদিন ক্ষেপে গিয়ে, বুঝলে, গলা পর্যন্ত মদ গিলে --- পিপে পিপে মদ খেতে পারতো মহেন্দ্র --- একটা হাতি মারা বন্দুক নিয়ে গেলো বিবেকরামের বাড়িতে। মহেন্দ্র অবশ্য চুরি করে হাতিও মেরেছে বিস্তর, ওস্তাদ শিকারী ছিলো সে, সেগুলোর দাঁত আমরা চট্টগ্রামে পাচারও করতাম।’

আমরা একে অপরের মুখ দেখি। বুড়োর ব্যবসা খুব একটা সুবিধের ছিলো না তাহলে!

‘আমাদের ব্যবসাটাও,’ যেন আমাদের ভাবনা বুঝতে পেরেই বলে বুড়ো, ‘খুব একটা সুবিধের ছিলো না। যে কাঠ আর মধু আমরা চালান দিতাম, সেগুলো যেসব গাছ থেকে আসতো, সেই গাছগুলোই এর জন্যে দায়ী, বুঝলে? সেই গাছগুলো ছিলো ফিরিঙ্গি ফরেস্ট্রির জমিতে। কিন্তু ওরকম বাছা বাছা সেগুন আর মেহগনি, আর ওরকম চোস্ত মধু তো ফেলে রাখা ঠিক না। তাই আমরা লোক লাগিয়ে সেগুলো একটু চুপচাপ কেটে নিয়ে আসতাম --- কাঠ মধু সব --- হাঙ্গামা হলে দু’চারটে গলাও কাটতে হতো। তাই বিবেকরাম --- নামেই বিবেকরাম ছিলো ব্যাটা, কিন্তু বিবেক বলে ওর কিছু ছিলো না --- আমাদের মিষ্টি কথায় ভয় দেখিয়েছিলো, ট্যাঁফোঁ করলে সে আমাদের ইংরেজ পুলিশের হাতে ধরিয়ে দেবে। থানাদাররা সব ওর কথায় উঠবস করতো, জানোই তো পুলিশ কেমন ঘুষখোর, তাই আমরা লাভের ভাগ বাঁটোয়ারায় গোলমাল টের পেয়েও অনেকদিন চুপ করেছিলাম। কিন্তু মহেন্দ্র খিটকেল, বড় বিটকেল স্বভাবের লোক ছিলো। পেটে মদ পড়লে তারা মাথাটা গরম হয়ে যেতো। তাই একদিন, হাতি মারা বন্দুকটা বের করে আমাকে বললো, যাই, একটা হাতি মেরে আসি। দাঁতগুলো সোনার, বেশ লাভ হবে। --- তখন ওর কথা বুঝতে পারিনি, ভাবলাম মদের ঝোঁকে বলছে, আর ধারেকাছে শিয়ালের চেয়ে বড় কোন জন্তু ছিলো না। কিন্তু মাঝরাতে যখন আমার ঘরে এসে বললো, সে বিবেকরাম খোদাওয়ালাকে এই হাতি মারা বন্দুক দিয়ে শেষ করে এসেছে, বিবেকরামের সোনার এগারোটা দাঁত উপড়ে নিয়ে এসেছে, আর ওর গাড়ির জন্যে বিবেকরামের আরবী ঘোড়া সোহাগীকেও লুট করে এনেছে, তখন আমি খুব ঘাবড়ে গেলাম। মদের ঘোরে যে কী ভয়ানক বিপদে মহেন্দ্র নিজে পড়েছে, আর আমাকেও সেই গাড্ডায় টেনে নিয়ে ফেলেছে, তা সে জানে না। বিবেকরামের বড় ছেলে বন্দেগিরাম একটা আস্ত বদমাশ গুন্ডা, সে সোজা এসে আমাদের দুজনকে ধরবে। হোক মারোয়াড়ি ভেজিটারিয়ান, ঘাস তো আর সে খায় না।’

আমরা ঢোঁক গিলে শুনতে থাকি।

‘পরদিন বন্দেগিরাম আমাদের সেরেস্তায় এসে হাজির। সালাম করে সে বললো --- রাম রাম বাবুজী, সুনা হায় কেয়া হুয়া? কিসি পাগল আদমীনে পিতাজীকো গোলিসে মার ডালা, উনকা সোনে কা দাঁতোঁকো ভি আলগ করকে লুট লিয়া, উনকা যো আচ্ছে ঘোড়ে হ্যায় না, ও সোহাগী, উসকো ভি চুরা লিয়া। আচ্ছা কিয়া, মেরে কোয়ি এত্রাজ নাহি হ্যায়, কে ইস কাম কিয়া গায়া হ্যায়, কিঁউকি আজ সে ম্যায় পিতাজীকা হর কারবারকে মালিক বন গায়ে হুঁ, শুকর দেনা চাহিয়ে থা উস কামিনোঁকো। লেকিন ওহ সুয়ার কে আওলাদনে পিতাজীকা সিন্দুকভি তোড় ডালা, অওর না জানে কিতনে সোনে-জহরত-প্যয়সা লুট লিয়া। --- ম্যায় কেহতা হুঁ আপকো বাবুজী, ওহ জিয়েগা ন্যহি। আগার আপ উসকো পেহচানতেঁ, তো উসকো ইয়ে বোল সাকতেঁ কে মেরা হক্ক ছিন কর ওহ ইস দুনিয়া মে জিয়েগা ন্যহি!’

হিন্দি ছবির কল্যাণে আমরা তখন হিন্দুস্থানী ভাষা ভালোই বুঝি, সবাই বন্দেগিরামের হুমকির কৌশল দেখে ঢোঁক গিলি। কঠিন ভিলেন!

‘সেই রাতেই মহেন্দ্র এসে হাজির।’ বুড়ো বলতে থাকে, তার পেছনে হাত বোলানোতে বিরতি না দিয়ে। ‘আমি তাকে চেপে ধরলাম, বললাম, কী ব্যাপার মহেন্দ্র, তুমি টাকা পয়সা সোনা দানা লুটেছো নাকি? তাহলে তো আমাকেও ভাগ দিতে হচ্ছে!’

আমরা চমকে উঠি। বুড়োটা দেখছি মহা ধান্ধাবাজ!

‘কিন্তু মহেন্দ্র আদৌ স্বীকার করলো না। বরং হাসি হাসি মুখে বললো --- যা বললো, শুনে আমার হার্টফেল করার কথা --- বন্দেগিরামে গুন্ডারা এদিকেই আসছে, কারণ তারা টের পেয়ে গেছে যে ভূতেন হাজারিকাজীই নাকি খুনটা করেছে, কারণ বিবেকরামের শোবার ঘরে হাজারিকাজীর এক পাটি চপ্পল পাওয়া গেছে, আর সোহাগীর আস্তাবলে পাওয়া গেছে তাঁর টোপি, অতএব তাঁকে খতম করা হোক --- ভেবে দ্যাখো, কতবড় শয়তান এই মহেন্দ্র খিটকেল, সে আমার বাড়ি থেকে আমার টুপি চপ্পল চুরি করে বিবেকরামের ঘরে রেখে এসেছে আমাকে ফাঁসানোর মতলবে, যাতে আমি ওর কথা শুনতে বাধ্য হই। ভেগে যাওয়া ছাড়া কোন উপায় আমার ছিলো না। মহেন্দ্র আরো বললো, সে-ও নিরাপদ বোধ করছে না, কারণ নদীর ঘাটে বন্দেগিরামের লোক টহল দিচ্ছে, অতএব আমাদের উচিত নগাঁও উত্তর কাছাড় পেরিয়ে সিলেট হয়ে চট্টগ্রামে পৌঁছানো। তাহলে আমরা নিশ্চিন্তে করাচীর জাহাজ ধরতে পারবো। --- বিপদ আঁচ করে আমি তৎক্ষণাৎ বন্দুক টোটা আর টাকাপয়সা নিয়ে মহেন্দ্রর সাথে বেরিয়ে পড়লাম। মহেন্দ্রর সেই গাড়ির সাথে জুতে রাখা সোহাগী, অ্যাতোবড় একটা প্রমাণকে কিভাবে আমার ঘাড়ে চাপালো মহেন্দ্র, সেটা আমি ঠিক ধরতে পারলাম না।’

আমরা শুনে যাই।

‘যাই হোক, বন্দেগিরামের গুন্ডারা কল্পনাও করেনি, আমরা সেই আসামী জঙ্গল পেরিয়ে দক্ষিণ দিকে যাবো। তারা ভেবেছিলো, পূবে বা পশ্চিমে ব্রহ্মপুত্রের পার ধরে আমরা নৌকা ধরার তালে থাকবো। কিন্তু ধুুরন্ধর মহেন্দ্র তার এক ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে জঙ্গল ভেঙে এগোতে লাগলো নিচের দিকে। পেছন পেছন যখন ওরা তাড়া করে আসতে লাগলো, ততক্ষণে আমরা বেশ খানিকটা এগিয়ে গেছি।’
মহেন্দ্র খিটকেলের বিটকেল বুদ্ধির প্রশংসা না করে আমরা পারি না।

‘--- হ্যাঁ, খুবই চতুর ছিলো সে। যাই হোক, তার প্রশংসা করতে আমার ভালো লাগে না। কয়েকদিন ধরে চলতে চলতে একদিন রাতে আমরা এই পাহাড়ের গা বেয়ে যাওয়া রাস্তায় এসে হাজির হলাম। ঘুটঘুটে রাত, আশেপাশে থাকার কোন জায়গা নেই বলে আমরা অনেকক্ষণ ধরে ঘোড়া ছুটিয়ে তবে এখানে এসেছি, সোহাগী বড় ক্লান্ত হয়ে পড়েছে --- আর হবে না কেন, সে কালেভদ্রে সওয়ারী নিয়ে অভ্যস্ত, সারাটা জীবন তার কেটেছে আস্তাবলের আরামে, সহিসের দলাইমলাই খেয়ে, এমন বলদের মতো গাড়ি টেনে নয়, তার খানদানের কথা চিন্তা করে আমি মহেন্দ্রকে বলেছিলাম বেচারীকে একটু বিশ্রাম দিতে, তবে বিবেকরামের হাতির মতো গতর বয়ে যে অভ্যস্ত, তার অত অল্পতে কাহিল হলে পোষায় না, এই যুক্তি দেখিয়ে মহেন্দ্র তাকে ঘন্টার পর ঘন্টা ধরে ছুটিয়েই চলছে। তাই ঐ যে দেখতো পাচ্ছো,’ আঙুল তুলে আমাদের মাথা বরাবর পাহাড়ের চূড়োর দিকে দেখায় বুড়ো, ‘ওখানে এসে সোহাগী বেঁকে বসলো, থেমে গেলো সে।’

আমরা রূদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করি।

‘আর থামা মাত্রই, বুঝলে, অন্ধকার পাহাড়ী জঙ্গল থেকে হুড়মুড় করে চেঁচাতে চেঁচাতে নেমে এলো কয়েকটা লোক, তাদের সবার মুখে কাপড় বাঁধা, হাতে বন্দুক, ইয়া লম্বা চওড়া একেকজন। আমাদের গাড়িটাকে ঘিরে ফেললো তারা, আর একজন সোহাগীকে গাড়ি থেকে খুলে আলাদা করে ফেললো।’

আমাদের উত্তেজনা বেড়ে যায়।

‘মহেন্দ্র কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলো, কিন্তু তার আগেই তাকে কানে ধরে টেনে নামালো ওরা, তারপর কষে কয়েকটা লাথি হাঁকালো কাঁকালে। লাথি খেয়ে মহেন্দ্র গোঁ গোঁ করতে করতে পড়ে গেলো। আমাকে ওরা দেখলেও মারধোর করেনি, এমনকি গাড়ি থেকে টেনেও নামায়নি, মহেন্দ্রর ওপরই ওদের রাগ বেশি দেখা গেলো। --- তখন বুঝলাম, এরা আমাদের ধাওয়া করে আসা গুন্ডাদের কেউ নয়, বরং স্থানীয় ডাকাত। মহেন্দ্রকে যখন ওরা লাথি মারছিলো আর বন্দুক দিয়ে বাঁটিয়ে যাচ্ছিলো, শুনতে খারাপ শোনালেও, ভীষণ ভালো লাগছিলো আমার।’
আমরা চমকে উঠি।

‘হোক মহেন্দ্র খিটকেল আমার বন্ধু  আমার একমাত্র বন্ধু --- আমার পার্টনার, ভায়রা, ইত্যাদি, কিন্তু ওর জন্যেই এই গাড্ডায় এসে পড়েছি আমি, বেকার, ক্ষুধার্ত ও ক্লান্ত। কাজেই ওর ধোলাইভোগে আমি স্বাভাবিকভাবেই আনন্দিত হই, বলি, বহোত খুব, মারো শালেকো আওর দোতিন দফা।’

আমরা আঁতকে উঠি। ভূতেন হাজারিকাকে মহেন্দ্র খিটকেলের যোগ্য বন্ধু বলেই আমাদের ধারণা হয়। এই কারণেই বোধহয় বুড়োর একমাত্র বন্ধু, পার্টনার, ভায়রা ছিলো মহেন্দ্র খিটকেল। সে ছাড়া অন্য কেউ এই বুড়োর সাথে টিকতে পারতো বলে মনে হয় না।

‘আমার কথা শুনে ওদের একজন এগিয়ে আসে, চোস্ত হিন্দিতে বলে, কৌন হ্যায় আপ?  আমি বলি, আমি এক গরীব নাদান, আর এই কমবখত চাবাগানের কুলির দালাল, আমাকে বন্দুকের মুখে অপহরণ করে নিয়ে চলছে, ফিরিঙ্গিদের কুলি হিসেবে বিক্রি করে দেয়ার জন্য। প্রমাণ হিসেবে আমি মহেন্দ্রর বিলিতি পোশাক আর আমার বন্দুকটাও দেখাই। ওরা বন্দুকটা টোটাসহ বাজেয়াপ্ত করে, তারপর মহেন্দ্রকে কষে ঠ্যাঙায়। মহেন্দ্র কাতরাতে থাকে।’

আমাদের মায়াই লাগে বেচারা খিটকেল সাহেবের জন্যে।

‘তারপর ওরা গাড়িটা আঁতিপাতি করে সার্চ করে, কিন্তু তেমন কিছু পায় না। আমার টাকা পয়সা আমি আমার পাগড়িতে লুকিয়ে নিয়েছিলাম, ওরা আর সেখানে হাত দেয়নি। তারপর ওরা মহেন্দ্রকে সার্চ করলো, কিন্তু কিছুই পেলো না। --- আমি জানতাম কিছু লুকোতে চাইলে মহেন্দ্র ওর জুতো অথবা জাঙ্গিয়ার ভেতরে রাখে, তাই বললাম, উসকে জুতে কে অন্দর দেখখো, থোড়ে বহোত মিল যায়েগা। বাস্তবিক, মহেন্দ্রকে লুন্ঠিত হতে দেখে আমার প্রবল আনন্দ হচ্ছিলো। ওকে নিঃস্ব করে দেয়ার একটা হিংস্র বাসনা কাজ করছিলো মনের মধ্যে! --- এবং সত্যি! একতাড়া কোম্পানীর নোট পাওয়া গেলো মহেন্দ্রর উঁচু জুতোর ভেতরে। ডাকাতের দল সন্তুষ্ট চিত্তে সেগুলো গেরেফতার করে মহেন্দ্রকে সোজা দাঁড় করালো, তারপর আমি কিছু বলার আগেই এক লাথিতে তাকে এই খাড়া পাহাড়ের ওপর থেকে ফেলে দিলো! আর দেখতেই পাচ্ছো, পাহাড়টা প্রায় দেড় হাজার ফিট উঁচু!’

আমরা আঁতকে উঠি, আমাদের শিশু মন ঘাবড়ে যায়।

‘--- আমার তো তখন মাথার চুল ছেঁড়ার অবস্থা। আমি নিশ্চিত ছিলাম সোনাদানাহীরাজহরত সব মহেন্দ্রর জাঙ্গিয়ার ভেতরে লুকোনো আছে। সেগুলোর খোঁজ করেনি এই ইস্টুপিট গাঁওয়ারগুলো। ওরা তখন সোহাগীকে এনে আবার আমার গাড়িতে জুতে দিচ্ছে। কিন্তু আমার কী যে হলো, আমি বলে উঠলাম, তুমলোগোঁ জ্যায়সে নিকম্মেঁ অওর নাঠাল্লেঁ হাম কাভি নাহি দেখা। উসকো পাতলুনকে অন্দর কিঁউ নাহি ঢুনঢা? --- লোকগুলো একে অপরের মুখ দেখে। সেই হিন্দিঅলা আমাকে বলে, উসকা পাতলুনকে অন্দর কেয়া থা? আমি চটে গিয়ে বললাম, না জানে কেয়া হীরেজহরত থা! লোকগুলো এগিয়ে গিয়ে পাহাড়ের তলাটা দেখে নিজেদের মধ্যে আলাপ করে, কিন্তু ঐ পাহাড় বেয়ে নামতে গেলে গর্দান ভাঙা ছাড়া আর কোন ফল হবে না। তখন ওরা আমার ওপর চটে যায়। পেহলে কিউঁ নাহি বোলা, সালা বুডঢে? এই বলে প্রবল মারধর করে তারা আমাকে। সবশেষে যা করে, আর কহতব্য নয়!’ বুড়ো করুণ মুখ করে মাথা নাড়তে থাকে।

আমার কেমন একটা খটকা লাগে, আমি কিছু বলতে যাই, কিন্তু শফি রূদ্ধশ্বাসে বলে, ‘তারপর?’

বুড়ো পেছনে হাত বোলাতে বোলাতে বলে, ‘তারপর? এই তো। চেতনা হবার পর থেকে আমি মহেন্দ্র খিটকেলের ডেডবডি খুঁজে বেড়াচ্ছি, কারণ আমি জানি, খুঁজলে ওর জাঙ্গিয়ার নিচে বিবেকরাম খোদাওয়ালার হীরেজহরত পাওয়া যাবে। --- এইখানেই কোথাও ওর বডি পড়ার কথা, সেই বেয়াল্লিশ সাল থেকে খুঁজে আসছি, রোজ, কিন্তু পাচ্ছি না শালাকে ।’

আমার খটকা প্রবলতর হয়।

বুড়ো বলে, ‘শুনলে তো আমার গল্প। --- এবার তোমরা নিজেদের কাজে যাও।’

আমরা উঠে পড়ি, অনেক বিশ্রাম নেয়া হয়েছে। আর এই বুড়োটা মোটেও সুবিধার লোক নয়।

মজনু ওস্তাদ বলেন, ‘কিরে শফি, ভূপেনবাবুর কাছেই তোকে রেখে যাই তাহলে?’

কিন্তু আমার মতো বোধহয় শফিরও খটকা লেগেছে, সে রাজি হয় না, বরং খোঁড়াতে খোঁড়াতে উঠে দাঁড়ায়। তার মুখ তখন জন্ডিসের মতোই হলুদ।

‘--- ভূপেন নয় খোকা, ভূতেন। ভূতেন হাজারিকা।’ বুড়ো তার পশ্চাদভাগসেবা অক্ষুণ্ন রেখে বলে।

আমি আমতা আমতা করে বলি, ‘আপনি সেই বেয়াল্লিশ সাল থেকে রোজ খুঁজে বেড়াচ্ছেন?’

বুড়ো মাথা নাড়ে। ‘হ্যাঁ। এই গোটা পাহাড়টা চষে ফেলেছি বলতে পারো। --- কিন্তু বিলকুল ভ্যানিশ, কোথাও নেই সে।’

আমি শুকনো গলায় বলি, ‘তাহলে থাকেন কোথায়?’

বুড়ো মিটিমিটি হাসে, কিছু বলে না।

মজনু ওস্তাদ কাঁধে ব্যাগ তুলে নিয়ে হেসে বলেন, ‘বোধহয় আপনার বন্ধু ভূত হয়ে চট্টগ্রাম চলে গেছে।’

বুড়োও হাসে। ‘তা যেতে পারে। খুব সম্ভবত তা-ই সে গেছে। তবে ভূত হলেও সে আমার হাত থেকে নিস্তার পাবে না। আর ও ভূত হলেও, ডেডবডিটা তো থাকবে। কিংবা কঙ্কালটা। তাই না?’

আমরা সায় দিই। কিন্তু আমার কেন যেন মনের খটকা যায় না। আমি আবারো আমতা আমতা করে বলি, ‘আপনাকে ঐ ডাকাতগুলো কী বলে গালি দিয়েছিলো, সালে বুডঢে?’

‘হ্যাঁ।’ বুড়ো মাথা নাড়ে।

‘তখন আপনি জোয়ান ছিলেন না? সেই পঞ্চাশ বছর আগে?’

বুড়ো বিরক্ত মুখে মাথা নাড়ে। ‘তখন আমার বয়স ছিলো ষাট, আর মহেন্দ্রর পঞ্চাশ। বেয়াদবটা আমার চেয়ে ঝাড়া দশ বছরের ছোট ছিলো, কিন্তু সেজন্যে কোন সম্মান সে আমাকে দেখায়নি, রাসকেল ---।’

মজনু ওস্তাদ শুকনো মুখে বলেন, ‘তাহলে এখন আপনার বয়স কত?’

বুড়ো মাথা চুলকায়। ‘বলা মুশকিল, বুঝলে। বেঁচে থাকলে শ’ ছাড়িয়ে যেতাম, তাই না?’

আমি ঢোঁক গিলে বলি, ‘বেঁচে থাকলে মানে?’

বুড়ো মাথা নাড়ে, ‘--- ওহহো, বুঝতে পারছি। হয়েছে কি, আমি আর বেঁচে নেই। ঐ যে বললাম না, সেই গাঁওয়ারগুলো যা করেছে তা কহতব্য নয়? ব্যাটারা আমাকে, একজন ষাট বছরের বৃদ্ধকে পাহাড়ের কিনারা থেকে পাছায় লাথি মেরে সোজা নিচে ফেলে দিয়েছিলো, আর পড়ার সাথে সাথেই আমার দফা রফা হয়ে গেছে। দেখো না, কতক্ষণ ধরে মাজার নিচে মালিশ করছি? পঞ্চাশ বছর হয়ে গেলো, ব্যথাটা এখনো যায় নি। ভাবতে পারো ---?’

আমরা আর ভাবতে পারি না, সবাই ততক্ষণে চোঁ চাঁ দৌড় লাগিয়েছি। খোঁড়া শফি সবার আগে আগে বাঁই বাঁই করে ছুটছে স্টেরয়েডখাওয়া বেন জনসনের মতো। দিলদার আর গুলশান গল্প শুরু হওয়ার আগেই ঘুমিয়ে পড়েছিলো, তাই তারা কিছুই বোঝেনি, ভেবেছে এখন দৌড়াতে হবে, তাই দৌড়ুচ্ছে। তবে আমাদের মজনু ওস্তাদ আসলেই ঘাবড়ে গিয়েছিলেন, আমরা আমাদের বেসে পৌঁছানোর পর তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়ে গোঁ গোঁ করছিলেন, ‘বাপ রে --- ভূত, ভূতেন!’

তবে মজনু ওস্তাদের স্বপ্ন আমরা পূরণ করেছি। ওরকম ভূতের তাড়া খাওয়া দৌড় না দিলে আমাদের হয়তো সেকেন্ড হতে হতো। কিন্তু ক্যাম্প কর্তৃপক্ষ আমাদের পারফরম্যান্স দেখে হতবাক, তারা ট্যাঁফোঁ না করে চুপচাপ ট্রফিটা আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে, আমাদের পিঠ চাপড়ে সাবাস বলতেও ভুলে গেছে। আমাদের ঘুমকাতুরে জিল্লুর স্যার হাই তুলে শুধু বলেছিলেন, বেশ বেশ।

--- কী বললি? অ্যাই, কী বললি তুই? কিছু বলিসনি বলছিস? আমি যেন শুনলাম, তুই বলছিস, চাপা! অ্যাঁ? বলিসনি? বলিসনি তো? বলিস না!



[]

1 comment:

  1. আপনার লেখা পড়ে ভাল লাগলো। সেই সঙ্গে রইলো আমার ব্লগ দেখার আমন্ত্রণ। http://gmedia.net.ms
    ধন্যবাদ।
    ওয়াহিদ রুম্মন।

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।