Saturday, July 28, 2007

ল্যাটিন শেখা সহজ নয়

সচলায়তনে ইতোপূর্বে প্রকাশিত।


বন্ধু সগীর কালেভদ্রে এমএসএনে আমার কুশল জিজ্ঞাসা করে। সামনাসামনি দেখা হওয়ার ব্যাপারটা তো বছর দেড়েক ধরে হয় না। সগীর কোথায় যেন কী একটা ধান্ধা করে, আমিও অন্য কোথায় যেন কী আরেকটা ধান্ধা করি। দেখাসাক্ষাতের ব্যাপারটা পরস্পরের অনলাইনে থাকার প্রোবাবিলিটির অঙ্কে চলে গেছে তাই। আমার নেট সংযোগ সক্রিয় থাকার সম্ভাবনাকে সগীরের নেট সংযোগ সক্রিয় থাকার সম্ভাবনা দিয়ে গুণ করলে একটা কাঁচা সম্ভাবনা পাওয়া যায়, তাকে আবার নানা সম্ভাবনা দিয়ে গুণ করার খাটনির কথা বাদই দিলাম। যেমন, আমার এখন সগীরের সাথে যেচে পড়ে কথা বলার সম্ভাবনা প্রায়শই শূন্যের কাছাকাছি থাকে। সগীরেরও আমার সাথে যেচে পড়ে কথা বলার সম্ভাবনাটা বড় গলায় বলার মতো কিছু না। তাই, এই প্রোবাবিলিটির গণিতই আমাদের দূরে ঠেলে রাখে।

বস্তুত সগীরের চেহারাটাই ভুলে গিয়েছিলাম, হঠাৎ দেখি ধাম করে একটা উইন্ডো এসে হাজির, তাতে এক অচেনা লোকের ছবি, চোখে মিহি চশমা, পরনে কুর্তা, ভাবুক দৃষ্টি, হাতে একটি কলম, গালে একটি হাত। হাতটি সম্ভবত তার নিজের নয়। আমি বিস্মিত হয়ে ভাবি, কে এই আদম?

ভালো করে পাঠ করে দেখি, সে লিখেছে, দোস্ত, আসোস?

ঠিকানাটি পড়ে আমি মাথামুন্ডু কিছু বুঝি না, জটিল কোন একটি ম্লেচ্ছ শব্দ@হটমেইল.কম লেখা। তবুও দোস্ত সম্ভাষণের মর্যাদা রেখে আমি বলি, "কীরে ইয়েরভাই, কেমন আসোস?"

সগীর অবশ্য মনক্ষুণ্ন হয়। সে হয়তো ভাবে, আমি তাকে চিনতে পারিনি (ঠিকই ভাবে), বলে, "দোস্ত চিনসোস? আমি সগীর।"

আমি উচ্ছ্বসিত হয়ে লাজ আবরণ খুলে ফেলে বলি, "আব্বে চোটনা কেমন আসোস?"

সগীর বোধ করি বিষণ্ন হয়ে যায় ওপাশে, বলে, "তুই দেখি আগের মতোই খচ্চর আসোস!"

আমি হাসি। আমি আগের চেয়ে ভদ্র হবার মতো কি কিছু ঘটেছে এ পৃথিবীতে? বা আগের চেয়ে খচ্চরতর হবার? বলি, "মায়রে বাপ, তোর খবর ক।"

সগীর হাল ছেড়ে দেয়, বলে, "দোস্ত, সাহায্য লাগবো।"

আমি একটু মনমরা হয়ে যাই। অবশ্য সাহায্য না লাগলে কেন সেই অমোঘ প্রোবাবিলিটির গণিতের দেয়াল ভেঙে সগীর টোকা দেবে আমাকে?

তবু দোমনা হয়ে লিখি, "হ দোস্ত, ক। কী সাহায্য লাগবো খালি ক একবার।"

সগীর কিছুক্ষণ গুম মেরে থাকে। বোধহয় ভাবে, এ বুঝি তাকে দেয়া আরেকটা গালি। সতর্কভাবে আমার নিরীহ বাক্যটিকে বার কয়েক ওজন করেই বুঝি সে বলে, "FONDODUS মানে কী?"

আমি আকাশ থেকে পড়ি। ফন্ডোডাস আবার কী? বলি, "আমি কী জানি?"

সগীর ক্ষেপে যায়। বলে, "আরে বল না। এইটুকু হেল্প করতে পারবি না?"

আমি বিপাকেই পড়ি। বলি, "গুগুল মার না। গুগুলে কী কয় দেখ।"

সগীর আবারো গুম হয়ে যায়। আমিও গুগুল করি, এফ ও এন ডি ও ডি ইউ এস। কিন্তু না। গুগুল হতাশ করে আমাকে, বলে য়োর সার্চ ফনডোডাস ডিড নট ম্যাচ এনি ডকুমেন্টস।

সগীরও একই অভিযোগ হানে চ্যাটবাক্সে। "কিছু পাওয়া যায় না। তুই খুইজ্যা বাইর কর।"

আমি আবারও আকাশ থেকে পতিত হই। যা গুগুল খুঁজে বার করতে পারে না, তা আমাকে খুঁজে বার করতে হবে, ভেবেই ব্যাপারটাকে সগীরের অন্যায় আব্দার ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। বছরখানেক পর কী দোস্ত কেমন আসোস এর বিনিময়ে এমন হারকিউলিয় খাটনি আমাকে ধরিয়ে দেয়াটাকে আমি কিছুতেই মেনে নিতে পারি না।

বলি, "সব খুইলা ক। ঘটনা কী? কী ফন্ডোডাস কে ফন্ডোডাস?"

সগীর বলতে চায় না। গাঁইগুঁই করে। আমিও চেপে ধরি।

শেষ পর্যন্ত কিছু বাজে গালি বিনিময়ের পর সগীর হার মানে। জানায় এক আশ্চর্য কাহিনী। কোন এক সুন্দরীর সাথে তার সম্প্রতি নেটে খাতির জমে উঠেছে। অফলাইনেও সগীরের সাথে তার দুয়েকবার কথাবার্তা হয়েছে। সগীর তাকে দেখে মোহিত। সে নানা ছলে এখন কুপ্রস্তাব দিচ্ছে। মেয়েও তাকে লেজে খেলাচ্ছে।

লেজে খেলানোর ধরনটা শুনতে চাই আমি। বলি, "মেয়ের লেজে খেলছিস? কীরকম? মেয়েটার ছবি সেন্ড কর। ভিডিও থাকলে ভিডিও-ও পাঠাতে পারিস!"

সগীর ক্ষেপে ওঠে, বলে, "খালি ঘুরায়। প্রবাদ প্রবচন বলে, কী কী সব ভারি ভারি সাহিত্য থিকা কোট করে, অহন ধরছে ল্যাটিন!"

আমি বিষম খাই। বলি, "কস কী?"

সগীর বলে, "হ! ঐদিন কইলাম চলো লং ড্রাইভে যাই। কয়, লাইফ ইজ শর্ট। আমি কইলাম, আরে না, আমি ভালো ড্রাইভ করি, ডরানোর কিছু নাই। কয়, খালি ড্রাইভই করবা? আমি কইলাম, দেখি আর কী করা যায়। কয়, তাহলে তো লাইফ ইজ শর্ট। আমি তো ঠেইকা গেলাম, কইলাম, আরে না, আমি অন্য অনেক কিছুর পাশাপাশি ড্রাইভ ভালো করি। কয়, তোমার মতো লোক ক্যান যে ঢাকা-ময়মনসিং রুটে বাস চালায় না, জানো, ঐ রুটের বাস ড্রাইভার গুলি কত শয়তান! কী কমু ক? কইলাম, ফাউল কথা রাখো,গেলে চলো। কয়, লাইফ ইজ শর্ট, বাট আর্ট ইজ লং। তুমি কি লঙের আর্ট ঠিকমতো পারো? ... চিন্তা কর, কত বড় বদমাইশ মাইয়া, সাইজ তুইলা কথা কয়! আমি অরে সাইজ কইরা ছাড়ুম!"

আমি তো সগীরের দুঃখের কাহিনী শুনে ঘায়েল হয়ে পড়ি। আসলেই তো, সগীর তো অসাধ্য সাধনে নেমেছে। সে আসলেই লেজে খেলছে। খেলছে আবার হাবলাবুলের মতো। পদে পদে আউট হবার শিহরণ।

আমি বলি, "কস কী? তারপর?"

সগীর জানায়, লং ড্রাইভে নিতে না পেরে সে একদিন একসাথে নিরিবিলি কান্দাহারি কোরমা রান্নায় অংশগ্রহণের প্রস্তাব দেয়। কান্দাহারি কোরমা রান্নার রেসিপিতেই লেখা আছে এ রান্না নিরিবিলি করতে হয়, সবচে ভালো হয় যদি একটি পুরুষ ও একটি নারী মিলে খালিবাড়িতে এটি রাঁধে। মেয়ে আবারও লেজ সাপটায়, বলে, কান্দাহার! সৈয়দ মুজতবা আলীর কথা মনে পড়ে যায়। আপনি শবনম পড়েছেন? সগীর শবনম পড়েনি, সে এ কথা কিভাবে বলে। হুঁ হাঁ করে কাজ চালাতে পারে না সে, মেয়ে তাকে চেপে ধরে শবনমের কাহিনী আলোচনায়। যতই সগীর কান্দাহারি কোর্মার দিকে যায়, ততই মেয়ে শবনম শবনম করে। শেষমেশ সগীর হার মানে, মেয়ে বলে, তাহলে দ্য বুকসেলার অব কাবুল পড়েছেন নিশ্চয়ই? সগীর কাবুল থেকে আর কান্দাহারে ফিরতে পারে না, কারণ মেয়ে বুকসেলারকে ছেড়ে দিয়ে ধরে বাচা সাক্কোকে, তারপর জহির শাহ, বারবাক কামাল হয়ে কামাল আতাতুর্ক এভিনিউয়ে কী একটা কাজের কথা বলে নেট ছেড়ে বিদায় নেয়।

আমি সানন্দে শুনি। সগীরের ব্যর্থ লাম্পট্য কেন যেন আমাকে আনন্দ দেয়।

"আজকে", আমি যেন সগীরের কাঁদো কাঁদো কণ্ঠই শুনতে পাই, "শুরু করছে ল্যাটিন। একটা কিস সাইন পাঠাইসিলাম, জবাবে এই ঢং শুরু করছে। বদ মাগী। কয়, এরারে হুমানুম এস্ত। এইটার মানে কী, জিগাইলাম, কয় না না, হনুমান না, হিউম্যান নিয়েই কথা হচ্ছে। এই কথা সেই কথার পর বললাম, তোমার কথা ভাইবা মনে কেমন জানি লাগে, চলো বেড়াইতে যাই নিরিবিলি কোথাও, তখন কয়, মেন্স সানা ইন কর্পোরে সানো। কইলাম, এইটা আবার কী? কয়, ব্যায়াম করো, সুস্থ দেহে সুস্থ মন। দেহ ঠিক থাকলেই মন ঠিক হয়ে যাবে।"

আমি হাসি। একটা স্মাইলি পাঠাই। সগীরটা ক্ষেপে ওঠে, বলে, "ঐ ঐ, হাসস ক্যা?"

আমি বলি, "তারপর?"

সগীর বলে, "এখন কইলাম, ওরে আমার খুব আদর করতে ইচ্ছা করতাছে। আরেকটা ল্যাটিন ছাড়ছে। ক ফন্ডোডাস মানে কী?"

আমি বললাম, "আমি কেন? মেয়েকে জিগেস কর।"

সগীর গোঁ ধরে, বলে, "না, কমবেশি ল্যাটিন আমিও পড়ছি বায়োলজিতে। ক ফন্ডোডাস মানে কী?"

আমি হার মানি,বলি, "আমিও জানি না।"

সগীর বলে, "GOLA মানে কী?"

আমি আবারও নিঃশঙ্কচিত্তে অজ্ঞানতা জ্ঞাপন করি। সগীর বলে, "তাইলে ক DIUM মানে কী?

এটা আমার কাছে চেনা চেনা লাগে, বলি, "ডিউম? ডিউম মানে মনে হয় দিন! ঐ যে, কারপে ডিয়েম! সিজ দ্য ডে! দিবসকে পাকড়াও করো।"

সগীর গোঁ গোঁ করে বোধহয় ওপাশে, লেখে, "প্যাচ লাগাইয়া দিলি তো। ফন্ডোডাসের প্লুরাল হইতাছেস ফন্ডোডাই, গোলা-র প্লুরাল হইতাসে গোলায়ে, আর ডিউম মানে কইতাসস দিন? কী হইলো তাইলে?"

আমি বলি, "কী আপদ, আমি কী আর তোগো মতো ল্যাটিনে খাচরামি করি নাকি? সহজ সরল বাঙগালি পোলা, যা মনে আসে বাংলায় বলি। আমি বাংলায় গান গাই ...।"

সগীর কয়, "ধুর, দ্যাখ না কী হয়?"

আমি বলি, "জিগা অরে।"

সগীর কয়, "নাই এখন, অফলাইনে গেছেগা।"

আমি বলি, "আচ্ছা কী লিখছে কপি কইরা পেস্ট মার দেখি, কী করা যায়। তোর গবেষণায় কাম দিতাসে না।"

সগীর লেখে, "FONDODI GOLAE DIUM!"

আমি মন দিয়ে পড়ি। ফন্ডোডাই গোলায়ে দিউম। কঠিন ল্যাটিন।

সগীর ঘ্যানাতে থাকে, "পাইলি, কিসু পাইলি?"

আমি হঠাৎ কী ভেবে জিজ্ঞেস করি, "মেয়ে কি চিটাগোনিয়ান নাকি? চট্টলার চটুলা?"

সগীর লেখে, "হ, তুই জানলি ক্যামনে???"



(একেবারেই কাল্পনিক।)


.

4 comments:

  1. Anonymous29 July, 2007

    vai apni oshadharon lekhen, apnar sense of humor ta vai ektu dhar deya jai?

    ReplyDelete
  2. Anonymous30 July, 2007

    সেন্স অফ হিউমারটা ধার দিতে বলছেন??

    সে কী!!!

    আমার সেন্স অব হিউমার কি তবে ভোঁতা???

    :) ...

    ধার দেয়ার জন্য সেন্স অব হিউমারটা বার করেছিলাম, ধূলাটুলা ঝেড়ে দেখি আপনার ঠিকানা জানি না, তাই দেয়া গেলো না।

    ReplyDelete
  3. haha
    jotil hoise.
    andaje ja buchhi tao jotil.
    cherir add ta dibar kow na taili to letha chukan jay.

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।