Thursday, July 19, 2007

মোবিলিনির উৎপাত


আমি খুব মনোযোগ দিয়ে একটা কাজ করছিলাম। অফিসের কাজ আর কি।

হঠাৎ ফোন বাজলো। মানে, আমার মোবাইল ফোনটা।

মিসড কল।

আমার কাজের মনোযোগ কিছুটা নষ্ট হলো। ধরেন, ১০০ থেকে কমে ৭০?

আমি মোবাইল ফোনটা সাবধানে তুলে ডায়ালে নাম্বারটা দেখলাম। অচেনা নাম্বার।

আমি অস্ফূটে বললাম, এই সস্তার দিনে মিসড কল দেয় কোন শালার ভাই?

ঘরে কেউ নাই। ভরসা করে আবার গালি দেই, বোকাচো!

জবাবে আবার মিসড কল আসে।

কাজে ফিরতে গিয়েও ফেরা হয় না। নামাজ আমার হইলো না আদায়।

কিছুক্ষণ রোষকষায়িতলোচনে তাকিয়ে থাকি মোবাইল ফোনটার দিকে। যারা রোষকষায়িতলোচন বোঝেন না, তাঁদের জীবনের চার আনাই মিছে।

কাজে ফিরে যাই খানিক বাদে। মনোযোগের পারদ আবার চড়তে থাকে একটু একটু করে। ধরেন, ৮৫।

আবার মিসড কল আসে।

এইবার ফোনটাকে পাকড়াও করি ডি মেজরে। কল দিয়ে বলি, "হ্যালো?"

এক বিদঘুটে, ঘড়ঘড়ে নারীকণ্ঠ বলে, "হ্যাল'।"

আমার মেজাজটা বিষিয়ে যায়। বলি, "কাকে চাইছেন?"

ঐপ্রান্ত থেকে এক পাশবিক আহ্লাদী আবেগ ফুটে ওঠে, "আমি ত আপনারেই চাই!"

আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত জ্বলে যায় রাগে, ক্ষোভে। বলি, "দুঃখিত, আপনি রং নাম্বারে ফোন করেছেন। আমি আপনা নই। আমি অন্য কেউ।"

ফোন কেটে দিই তারপর।

কিন্তু কাজে আর মন বসানোর সুযোগ হয় না। আবার আসে মিসড কল। আবার। আবার। আবার।

আবার ফোন করি, বলি, "আপনি মিসড কল দিচ্ছেন কেন বারবার?"

এবার এক জঘন্য হেঁড়ে স্টেটমেন্ট ভেসে আসে, "আপনারে আমার খুব ভাল লাগে!"

ক্ষোভে দুঃখে ইচ্ছা করে মাটিতে মিশে যাই। কেন এই ক্ষ্যাত মাগীর কবলে পড়তে হলো আমাকে? কেন? কেন? অ্যায় দুনিয়া, কেয়া তুঝসে কাহেঁ?

বলি, "উত্তম! খুবই ভালো লাগলো জেনে। কিন্তু আমি একটা জরুরি কাজে ব্যস্ত। অনুগ্রহ করে আর মিসড কল না দিলে বাধিত হই। ধন্যবাদ।"

কিন্তু চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনী। আবার মিসড কল আসে, আবার।

আমার মোবাইল সেটখানা সুপ্রাচীন। লোকচক্ষুর সামনে সাধারণত বার করিনা। অফিসদত্ত সেট হারিয়ে ফেলেছি (এটা নিয়ে অন্য পোস্টে ফ্যানাবো), নতুন সেট কেনা হচ্ছে না কার্পণ্য ও আলস্যবশত। পুরনো সেটে কল বার করার অপশন খুঁজতে গিয়ে দেখি নানারকম ধুনফুন কথাবার্তা বলে। বিরক্ত হয়ে ফোনের কম্পন আর ঘন্টন বন্ধ করে ফোন করি বন্ধুবর বগাকে।

বগা ফোন ধরে উৎফুল্ল গলায়, "কে, ইয়ে নাকি?"

আমি বলি, "বোগ্লু, ইয়ে বলছি। আচ্ছা, আমি অমুক ফোন কোম্পানিতে অভিযোগ করবো ভাবছি। নাম্বার আছে তোর কাছে?"

বগা একটু বিরতি নেয়। বলে, "কী অভিযোগ?"

আমি কাঁচা ভাষায় বলি, "আর বলিস না, এক আবাল ফোন করে বিরক্ত করছে। এদিকে এক বস্তা কাজ।"

বগা বলে, "ছেলে না মেয়ে?"

আমি বলি, "মেয়ে বললে মেয়েদের অপমান হয়। যা ঘড়ঘড়ে গলা!"

বগা উৎফুল্লতর হয়ে ওঠে, বলে, "আরে এ নিয়ে অভিযোগের কী আছে? একটা মেয়ে ফোন করে জ্বালাচ্ছে, এ তো এক পরম সাফল্য!"

আমি আরো কাঁচা ভাষায় চলে যাই,বলি, "তোর সাফল্যের জননীকে আমি রমণ করি। নাম্বার দে ভগ্নিধর্ষক।"

বগা পিছিয়ে যায়, বলে, "আমি তো এসব নাম্বার জানি না। আমার কাছে মেয়েরা ফোন করলে আমি মহানন্দে কথা বলি।"

আমি ভাবি, বগার নাম্বার এ মাগীকে গছিয়ে দিলে কেমন হয়?

বগা কাজের অজুহাত দেখিয়ে ঘ্যানঘ্যান করতে থাকে। আমি বিদায় নিই।

ওদিকে বহু বহু মিসড কলে ফোন পূর্ণ। বাধ্য হয়ে ফোন ধামাচাপা দিয়ে হাগনকোঠিতে চলে যাই।

ফিরে এসে হাতের কাজ গুছিয়ে ধামার নিচ থেকে ফোন বার করি। সেই ঘড়ঘড়ে লালিমা পাল গঙ্গারামের মতোই অধ্যবসায়িনী, ঊনিশটি বার মিসড কল দিয়েছে এর মধ্যে।

ফোন পকেটস্থ করে বেরিয়ে পড়ি অফিস ছেড়ে। পাকড়াও করি এক লুপ্তপ্রায় সহৃদয় সিয়েনজিয়েরোকে, যে আমাকে বিনা বাক্যব্যয়ে বাড়ি পৌঁছে দিতে রাজি হয়ে যায়।

বাড়ি ফেরার পথে ফোন করতে গিয়ে ফোন বার করে দেখি, নিঃশব্দে কল এসেই চলছে। এবার পাকড়াও করে কিছু কর্কশ গালমন্দ করি বেটিকে। বলি, আপনার খেয়েদেয়ে কাজ না থাকলে ঘর ধোয়ামোছা করেনগা।

অপরপ্রান্ত থেকে লালসাজর্জরিত হুমকি ভেসে আসে, "আমি তো আপনারেই ধোয়ামোছা কইরা দিতে চাই!"

কথাটা ভালো লাগে আমার কাছে, কিন্তু কথার উৎপত্তিস্থলে আক্রমণ শাণিত করি। মিনিট দুয়েক প্রমিত ভাষায় বকাবকি করার পর আবার ফোন পকেটস্থ করি।

সিয়েনজিয়েরো ক্ষেপে যায়। বলে, ভাই, এই মবাইলই দ্যাশটারে খাইল। দিন নাই রাত নাই খালি ধুনফুন।

আমি কী আর বলবো।

বাড়ি ফিরে মোবাইল বার করে দেখি কল এসেই চলছে, এসেই চলছে। এবার কলধারিণী তার ঘড়ঘড়ে গলায় কিছুটা আবেগ সঞ্চারিত করে। বলে, আমার কথাটা তো একটু শুনবেন?

আমি বলি, জ্বি বলেন?

সে আবারও পৈশাচিক হাসে। বলে, আপনারে আমার খুবোই ভাল লাগে।

আমি বলি, আপনাকে আমার ভালো লাগছে না। আপনি লোক খারাপ। বেহায়া আওরাত। ধুয়েমুছে দিতে চান ভালো কথা, কিন্তু তার আগে লব্জ ঠিক করেন। আবার যদি ফোন করেন তাহলে কিন্তু ...।

মাগী হেসে ওঠে শ্মশানের হাঁকিনীর মতো। বলে, কী করবেন? এক সিম বন্ধ হইয়া গেলে আরেক সিম দিয়া গুতামু!

আমি এবার বিরক্ত হয়ে বলি, ড়্যাবের কাছে নাম্বার দিয়ে দিবো কিন্তু।

এবার কাজ হয়। ঘড়ঘড়ে গলা আঁতকে ওঠে, বলে, ছি, আপনি ভীতু পুরুষ!

আমি সানন্দে সায় দিই। বলি, হ্যাঁ, ক্ষ্যাতদের সাথে ধোয়ামোছা মারপিট করার সাহস আমার নাই। আলবিদা!

অনেকক্ষণ হলো আর কোন মিসড কল হচ্ছে না। হে ড়্যাব, তুমি মহান।


1 comment:

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।