Sunday, July 15, 2007

যৌথবাহিনীকাহিনী


উঁহু, আমাকে এখনও তাঁরা কারণে বা অকারণে পাকড়াও করেননি। মাঝে মাঝে অফিসে যাবার পথে রাস্তায় নামিয়ে ভুরু কুঁচকে আগাপাস্তলা দেখে অবশ্য ড়্যাবের সদস্যরা নানা প্রশ্ন করেন। তাঁদের কেউ কেউ বিনয়ের অবতার, সালাম দিয়ে বিনম্র কণ্ঠে প্রশ্ন করেন কী করি না করি; কেউ শুরুতেই ধরে নেন আমি বনসংরক্ষক বা হাওয়াভবনেরপান্ডা, কর্কশ রুক্ষ গলায় জানতে চান কী করা হয়। আমি ঘুম ঘুম গলায় ঘাম মুছতে মুছতে সদুত্তর দিয়ে তাঁদের সন্তুষ্ট করতে চাই, তাঁরা রোষকষায়িতলোচনে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে ইশারা করেন আবার বাহনারোহণের, তারপর পরের আটককৃত বাহনের যাত্রীকে হুহুঙ্কারে শঙ্কিত করে তোলেন।

আমার বন্ধুদের সাথে দীর্ঘদিন পর সেদিন আড্ডা হলো, একজন জানালো যৌথবাহিনী তাকে আরেকটু হলেই পাকড়াও করে ফেলেছিলো আর কি। আমরা জানতে চাইলাম, এর মানে কী, যৌথবাহিনী তাকে কেন তাড়া করলো? তারপর সে জানায় এক আজব কাহিনী।

আমার সেই বন্ধু, ধরা যাক তার নাম তারেক, সে চাকরি করে এক কুখ্যাত লোকের গৃহনির্মাণ সংস্থায়। একদিন সে দুপুরে পেটপুরে ভাত খেয়ে বাইরে একটু ধোঁয়া টানার জন্য নিচে নামে, দেখতে পায় বাইরের দরজায় দারোয়ান তালা মেরে দন্ডায়মান। সে হেঁকে ওঠে, "অ্যাই দরজা খোলো।"

দারোয়ান জানায়, "না স্যার, স্যারের হুকুম, দরজা খোলন যাইবো না।"

তারেক আরো হেঁকে ওঠে, "আরে বলে কী? সিগারেট খাবো, দরওয়াজা খোলো!" রীতিমতো উর্দু উর্দু ভাব এনে, দরওয়াজা ...।

দরওয়ান দরওয়াজা খোলার আগেই বাইরে থেকে দরজার ফোঁকর দিয়ে উঁকি দেয় এক মুখ। "ভাই, দরজাটা খোলেন না একটু, ভেতরে আসবো।"

তারেক বলে, "কে, কে আপনি?"

এবার সেই মুখ বলে, "এত কথার কী আছে ভাই? ম্যানেজারের কাছে যাবো, দরজাটা খোলেন।"

তারেক বলে, "উঁহু, আপনি ওনাকে ফোন করেন।"

মুখটা বলে, "আরে ভাই দরজা খোলেন।"

তারেক হেঁকে ওঠে, "অ্যাই দরওয়াজা খুইলো না।"

এমন সময় বাইরে একটা গাড়ি এসে থামে। গাড়ি থেকে নামেন দুই স্বাস্থ্যবান মানুষ, একজন টাই পরা, আরেকজন টাই ছাড়া। দু'জনেরই কেশ ফৌজি ঢঙে ছাঁটা। টাইধারী বলেন, "ভাই দরজাটা একটু খুলুন তো।"

তারেক বলে, "দরজা তো খোলা যাবে না।"

টাইধারী কথা বেশি বাড়ান না, বলেন, "কেন যাবে না ভাই?" বলতে বলতেই সেই ফোকর দিয়ে খপ করে তারেকের হাত পাকড়ে ধরেন। তারেক ঘাবড়ে গিয়ে আঁচড়েকামড়ে সেই হাত ছাড়িয়ে নেয়।

ও মা, হাত ছাড়িয়ে নিয়ে সে দ্যাখে, টাইহারা সেই অপর ভদ্রলোক, যে কি না রীতিমতো ধোপদুরস্ত জামাকাপড় পরা, সে দেয়াল বেয়ে ওঠা শুরু করেছে! তারেকের মনে হয়, আজ আর তার রক্ষা নাই! দরওয়ান এবার তার হাত চেপে ধরে, ব্যাকুল কণ্ঠে বলে, "স্যার স্যার স্যার কী করুম স্যার?"

টাইধারী বিরক্ত হন। বলেন, "অ্যাই তুমি সিনক্রিয়েট করো না তো। নামো দেয়াল থেকে, নামো! ওনারা এমনিতেই দরজা খুলে দেবেন।" বলতে বলতে আবার সে ফোকর গলিয়ে হাত বাড়ায়, দরওয়ানের কলারখানা চেপে ধরে সাপটে, তারপর নিজের দিকে সজোরে টানে। দরওয়াজায় বাড়ি খেয়ে দরওয়ানের মুখ থেঁতলে যায়, সে প্রায় অচেতন হয়ে ঝুলতে থাকে টাইধারীর হাতে, তার হাতে ধরা চাবিটা নিয়ে তালা খুলে টাইধারী ধীরেসুস্থে ভেতরে ঢোকেন। তারপর তারেকের বাহু পাকড়াও করে বলে, "আসুন দেখি আমার সাথে। কথা কম।"

তারেক ভেজা বেড়ালের মতো আবার উঠতে থাকে সিঁড়ি বেয়ে। অফিসের বেয়াড়া বেয়ারাটা হাসিমুখে এসে জিজ্ঞেস করে, "কী ব্যাপার স্যার?"

অমনি বিকট এক চড় তার গালে। সে চোখ মিটমিট করে কোনমতে বলে, "মারেন ক্যান?"

এবার বিকট এক লাথি। তারপর মোটামুটি তান্ডব বয়ে যায়। অফিসের লোকজন একেবারে অ্যাটেনশন হয়ে থাকে।

ম্যানেজার নিখোঁজ। তারেকের কিউবিকল ম্যানেজারের রুমে যাবার পথেই পড়ে। টাইধারী তারেককে শুধান, "আপনি জানেন না উনি কখন বেরিয়ে গেলো? দেখেন নাই?"

তারেক দেখে নাই তার ম্যানেজারকে, সে মাথা নাড়ে। টাইধারী এবার ক্ষেপে ওঠে। বলে, "আপনি কিন্তু সহযোগিতা করছেন না। এর পরিণতিও বুঝতে পারছেন না। চিন্তা করতে থাকেন।"

তারপর তাঁরা, মানে টাইধারী আর টাইহারা, পাকড়াও করেন আরো উঁচু হর্তাকর্তাদের। একজনই উপস্থিত ছিলেন, এককালের সচিব, এখন পরামর্শদাতা, তিনি কিছু আমলাতান্ত্রিক বোলচাল ঝাড়েন। টাইধারী বিনয়ের সাথে বলেন, "স্যার, আসলে আমরা এখানে আমাদের কাজ ঠিকমতো করছি না। কোথাও গিয়ে আমরা প্রথমেই পাঁচ মিনিট করে পিটাই সবাইকে। আপনাকে কিন্তু স্যার মিনিট পাঁচেক পিটালে আপনি গড়গড়িয়ে সব বলে দিতেন, ঐ লোক কোথায় কখন গেছে, সঅব।"

আমরা রুদ্ধশ্বাসে শুনি, বলি, তারপর?

তারেক বলে, তারপর আর কী? নামধাম লিখে নিয়ে গেলো। ভয়ে ভয়ে আছি। চাকরি ছেড়ে দেবো ভাবছি। গ্যানজাইমা লোকের চাকরি করে শেষে বেহুদা মাইর খেয়ে মরি আর কি!


এই গল্পের সকল চরিত্র কাল্পনিক, আমি বাদে। কারণ আমি কাল্পনিক হলে কল্পনাটা করলাম কখন?


No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।