Sunday, July 08, 2007

রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনে মন খারাপ



আমার বাবা আমাকে নিয়ে বাইরে বেরোলে সবসময় আমার হাত ধরে থাকতেন। আমি এ ব্যাপারে খুব সংবেদনশীল ছিলাম, মাঝে মাঝে মোচড়ামুচড়ি করে নিজের মতো করে হাঁটার চেষ্টা করতাম, তিনি অসন্তুষ্ট হয়ে তাকাতেন আমার দিকে। আমি তখন অনেক ছোট, বাবার দিকে তাকাতে হলে আমাকে প্রায় আকাশের দিকে তাকাতে হয়, আমি আবার শান্ত হয়ে তাঁর হাতে একরকম বন্দী হয়ে চলতাম।

সময়ের সাথে আমি একটু একটু করে বেড়েছি, কিন্তু আমার বাবা আমার হাত ছাড়েননি। তিনি আমাকে স্কুলে নিয়ে যান হাত ধরে, দোকানে নিয়ে যান হাত ধরে, মাঝে মাঝে নিজের অফিসে নিয়ে যান হাত ধরে, বাজারে নিয়ে যান হাত ধরে, চুল কাটানোর জন্য নাপিতের কাছে নিয়ে যান, আর আমি ফুঁসতে থাকি। আমি কি একটা ছাতা? আমি কি একটা ব্যাগ? কেন আমাকে ধরে থাকতে হবে?

আমি প্রাইমারি স্কুল থেকে হাই স্কুলে উঠি, আমার বাবা ভর্তির পর আমার হাত ধরে আমাকে ক্লাসে পৌঁছে দেন, নিচু স্বরে কী সব আলাপ করেন আমার ক্লাস টীচারের সাথে, আমি গম্ভীর মুখে বসে থাকি। আমাকে ক্ষেপাতে এসে বন্ধু হয়ে যায় আমার পাশে বসা ছেলেগুলি।

আমি আরো বাড়ি, আরো বড় হয়ে উঠি, আমার বাবার কাঁধ ছাড়িয়ে যেতে থাকি, কিন্তু তিনি আমার হাত আর ছাড়েন না। বাজারে যেতে ভালো লাগে না আমার, তিনি গম্ভীর মুখে আমাকে হাত ধরে নিয়ে যান বাজারে, আমার হাত ধরে রেখেই মাছ দরদাম করেন, আমি বাজারের ব্যাগ আরেক হাতে ধরে আমার কালচে মুখ লাল করে দাঁড়িয়ে থাকি। শুক্রবারে মসজিদে তিনি নামাজ পড়তে যাবেন, আমি বারান্দায় রোদে বসে পড়ছি "উভচর মানুষ", তিনি গম্ভীর মুখে একাই চলে যান। আমি ক্রিকেট খেলে ফিরছি ঘর্মাক্ত চেহারা নিয়ে, বাড়ি ফেরার কিছু আগেই পথে তাঁর সাথে দেখা হয়, অফিস থেকে ফিরছেন। কিছু না বলে নিঃশব্দে তিনি শুধু আমার হাতটা ধরে ফেলেন। এসএসসি পরীক্ষার সময় আমার সুতীব্র টাইফয়েড, পৃথিবী এলোমেলো লাগে আমার চোখের সামনে, আমার বাবা আমাকে কোলে করে পরীক্ষার হলে নিয়ে যান, কোলে করে নিয়ে আসেন, হাত ছাড়েন না।

আমার বাবা খুব বেশিদিন আমার হাত ধরে রাখতে পারেননি। নাকি আমিই বেশিদিন তাঁকে ধরে রাখতে পারলাম না? আমাদের সবার হাত ছাড়িয়েই তিনি খুব নিঃশব্দে মারা গেলেন। মৃত্যুর সময় তিনি কারো হাত ধরেননি, আমি ছিলাম না তখন তাঁর কাছে হাত ধরার জন্য, বা ধরতে দেবো বলে বাড়িয়ে দেবার জন্য।

আমি এরপর আরো বড় হয়েছি, আমি বাজার করি, আমি চুল ছাঁটাই, আমি কলেজে-বিশ্ববিদ্যালয়ে-অফিসে যাই, আমি পাহাড়ে চড়ি, সাগরে নামি, দূরদেশের অচেনা পথে হাঁটি গভীর রাতে, কেউ আমার হাত ধরে না। আমি বড় হয়ে গেছি অনেক।

আমাদের বাবাকে আমরা সহজে স্মরণ করি না। আমি স্বপ্নেও দেখি না তাঁকে। আমি কবরস্থান অপছন্দ করি, তাঁকে কবর দিয়ে আসার পর একদিনও যাইনি সেখানে। তাঁর মৃত্যুদিবসেও তেমন কোন হেরফের ঘটে না আমার প্রাত্যহিক আচরণে। শুধু মাঝে মাঝে রাতের বেলা বাথরুমে মুখ ধুতে গিয়ে আয়নায় নিজের মধ্যে তাঁকে দেখতে পাই, বিষণ্ন, গম্ভীর চোখে তিনি আমার ভেতর থেকে আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন। আমি সেই চোখের দিকে তাকিয়ে মাঝে মাঝে লজ্জিত হয়ে পড়ি নিজের করা কোন অতীত অপকর্মের জন্য, চোখ নামিয়ে আবার বেসিনের মধ্যে ঘড়ির কাঁটার উল্টোদিকে ঘুরে হারিয়ে যাওয়া পানির স্রোতের দিকে তাকাই। খুব ছোট আর অসহায় লাগে তখন নিজেকে, মনে হয় আমার আর কোন ছায়া নেই রোদ থেকে বাঁচবার।


1 comment:

  1. Anonymous09 July, 2007

    apnar baba'r ki death anniversary silo gotokal?

    hmm... baba-ma na thakle to sobai miss kore but apnar moto guchie prokash korte pare koijon....

    valo thakun...

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।