Saturday, July 07, 2007

পাকিস্তানে লাল মসজিদ সংকট



ইসলামাবাদের অদূরেই বাজার এলাকায় এই লাল মসজিদ ইসলামাবাদের হোমড়াচোমড়াদের মনপসন্দ; প্রেসিডেন্ট, সেনাপতি, প্রধানমন্ত্রীরা সেখানে যাওয়াআসা করতেন। পাকিস্তানের স্বৈরশাসক সেনানায়ক জিয়াউল হক লাল মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ, মুখে জিহাদের তুবড়ি ছোটানো মাওলানা আবদুল্লাহর সাথে বেশ ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলে জানা যায়। আশির দশকের মাঝামাঝি সময় তখন, আফগানিস্তানে মুজাহিদিনদের সাথে দখলদার সোভিয়েত সেনাদের সংঘর্ষ তখন তুঙ্গে, জিহাদের বাণী ও বুলি তখন জনপ্রিয় এবং স্বীকৃত। লাল মসজিদের কাছেই অবস্থিত পাকিস্তানের আইএসআই সদর, আইএসআইয়ের লোকজন সেখানে যাতায়াত করেন বলেও জানা যায়। সেই সময় থেকেই লাল মসজিদ কড়া শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে নাম করেছে। আশেপাশের মাদ্রাসায় কয়েক হাজার নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থী প্রতিপালন করে এই মসজিদ।

নব্বই এর দশকের শেষের দিকে মাওলানা আবদুল্লাহ এই মসজিদেই নিহত হয়। তার দুই পুত্র, মাওলানা আব্দুল আজিজ ও মাওলানা আব্দুল রশিদ গাজি তার পর থেকে লাল মসজিদের সবকিছুর দায়িত্ব গ্রহণ করে। আল কায়দার অনেক বাঘা নেতার সাথে যোগাযোগের কথা এই দুই ভাই স্বীকার করেছে। এ সবই সেপ্টেম্বর ১১, ২০০১ এর আগের কথা, যখন জিহাদ পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে স্বীকৃত একটি কৌশল ছিলো।

৯/১১ এর পর লাল মসজিদ সুর পাল্টে ফেলে, উগ্রপন্তী ইসলামী দলগুলির সাথে কোন যোগসূত্রের কথা অস্বীকার করে কর্তৃপক্ষ। তবে আমেরিকার বিরুদ্ধে জিহাদের ব্যাপারে তারা সোচ্চার এবং পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মুশাররফকে তারা খোলাখুলি নিন্দা জানিয়ে আসছে। পারভেজ মুশাররফ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দেয়ার পর লাল মসজিদ মুশাররফকে হত্যার ব্যাপারে কথাবার্তার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এসব বক্তিমাদাতাদের মধ্যে জৈশ-এ-মুহাম্মদ নেতা মাওলানা মাসুদ আজহারও রয়েছে, যার দলের অনেকে পরবর্তীতে মুশাররফের ওপর হামলার সাথে জড়িত ছিলো বলে প্রমাণিত হয়েছে। লাল মসজিদের ছাত্ররা বেশিরভাগই উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের উপজাতীয় গোষ্ঠীগুলি থেকে আগত, আব্দুল রশিদ গাজি প্রকাশ্যে জানিয়েছে, মসজিদের বিরুদ্ধে কিছু করা হলে ওয়াজিরিস্তান তালেবান তাদের হয়ে উপযুক্ত জবাব দেবে।

২০০৫ সালে লন্ডনে আত্মঘাতী বোমা হামলার সাথে জড়িত শেহজাদ তানভীরের সাথে লাল মসজিদের যোগসূত্র নিয়ে তদন্ত করতে গেলে মসজিদ সংলগ্ন জামেয়া হাফসা মাদ্রাসার ছাত্রীরা লাঠি হাতে নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যদের মসজিদে প্রবেশে বাধা দেয়।

এদিকে মসজিদের সাথে সংশ্লিষ্টরা পাকিস্তানে রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ উগ্রপন্থীদের ব্যাপারে সক্রিয়কণ্ঠ, ধারণা করা হয় এসব উগ্রপন্থীদের গোপনে কোথাও বন্দী করে রেখেছে পাক আইনপ্রয়োগকারীবাহিনী। মুহাম্মদ (সাঃ) কে ব্যঙ্গ করে আঁকা কার্টুন প্রসঙ্গে ড্যানিশদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভেও লাল মসজিদ অগ্রণী ভূমিকা প্রদর্শন করে।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ অবৈধভাবে নির্মিত বিভিন্ন মসজিদের অংশবিশেষ ভাঙা শুরু করলে লাল মসজিদ ও জামেয়া হাফসা মাদ্রাসা সর্বাত্মক প্রতিরোধের ডাক দেয়। তারা কর্তৃপক্ষকে মসজিদ এলাকায় প্রবেশে বাধা দেয় এবং একটি পার্শ্ববর্তী শিশু পাঠাগার দখল করে নেয়। এ কাজে জামেয় হাফসা মাদ্রাসার ছাত্রীদের কালাশনিকভ হাতে সক্রিয় হতে দেখা যায়। ২৪ ঘন্টা সশস্ত্র প্রহরার মাধ্যমে তারা কর্তৃপক্ষকে মোকাবেলা করার ঘোষণা দিলে কর্তৃপক্ষ তাদের সাথে আলোচনার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু চাপের মুখে কর্তৃপক্ষ মসজিদের ভেঙে দেয়া অংশ পুনর্নির্মাণ করে, এবং লাল মসজিদ কর্তৃপক্ষ শহরের আরো ছ'টি মসজিদের ভেঙে দেয়া অংশও পুনর্নির্মাণের দাবি জানায়।

এপ্রিল মাসে মাওলানা আব্দুল আজিজ লাল মসজিদের ভেতরে একটি আদালত বসায় এবং ইসলামাবাদকে ইসলামী শাসনের আওতায় নিয়ে আসতে ঘোষণা দেয়।

জুন মাসে মাদ্রাসার ছাত্ররা একটি আকুপাংচার ক্লিনিক থেকে সাত চীনাকে অপহরণ করে নিয়ে যায়, তাদের মতে এ চীনারা পতিতাবৃত্তিতে নিয়োজিত ছিলো। জুনের ১৪ তারিখে মাওলানা আজিজ মুশাররফ সরকারকে উৎখাত করে পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ব্যাপারে লাল মসজিদের উদ্যোগের কথা টেলিভিশনকে দৃঢ়কণ্ঠে জানায়।

জুলাইয়ের ৩ তারিখে প্রায় দেড়শো ছাত্রছাত্রী আগ্নেয়াস্ত্র ও লাঠি হাতে পার্শ্ববর্তী পুলিশ চেকপোস্টে হামলা করে, এবং বেশ কিছু অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে চার সরকারী কর্মচারীকে অপহরণ করে।
ঘটনার মধ্যে দিয়ে সশস্ত্র নিরাপত্তারক্ষীদের সাথে মাদ্রাসা ছাত্রদের সংঘর্ষ শুরু হয়। কালাশনিকভ হাতে এবং গ্যাসমুখোশ মুখে ছাত্ররা নিরাপত্তারক্ষীদের সাথে গুলি বিনিময় শুরু করে এবং আশেপাশের সরকারী ভবন ও রাস্তার গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। লাউডস্পীকারে নিরাপত্তারক্ষীদের ওপর আত্মঘাতী হামলার জন্য আহ্বান জানানো হয়। সেদিন এ সংঘর্ষে একজন সৈন্য, একজন টিভিক্যামেরাম্যান ও একজন পথচারী সহ ১১ জন নিহত হয়। মসজিদ এলাকায় বালির বস্তার আড়ালে সশস্ত্র ছাত্রদের "জিহাদ!" বলে হুঙ্কার দিতে শোনা গেছে।

পরদিন লাল মসজিদ এলাকায় কারফিউ জারি করা হয়, এবং গুলি বিনিময় চলতে থাকে। পরে এক পর্যায়ে বোরখা পরে মেয়ে সেজে পলায়নের সময় অধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল আজিজ নিরাপত্তারক্ষীদের হাতে ধরা পড়ে। তার ভাই উপাধ্যক্ষ মাওলানা আব্দুল রশিদ গাজি এখনো মসজিদের ভেতরে প্রতিরোধের নেতৃত্ব দিচ্ছে। ১২২১ জন ছাত্রছাত্রী সেদিন আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু পরবর্তীতে ৬০ জনের মতো গোঁড়া জিহাদী বাকি ছাত্রদের আত্মসমর্পণ করতে বাধা দেয় এবং প্রতিরোধ চালিয়ে যেতে বলে। স্বরাষ্ট্র সচিব কামাল শাহ অভিযোগ করেছে, উগ্রপন্থী ছাত্ররা নারী ও শিশুদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। শাহ আরো জানায়, জঙ্গিরা মসজিদের ভেতরে মাইন পুঁতে রেখেছে।

ওদিকে মাওলানা আজিজের স্ত্রী উমে হাসান জানিয়েছে, ৩০ জন নারী সহ প্রায় ৮০ জন মারা গেছে মসজিদের ভেতরে। উমে হাসান আরো জানায়, ছাত্রীরা মসজিদের ভেতরে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারী ভাষ্যমতে, মসজিদের ভেতরে কতজন মারা গেছে তা তাদের জানা নেই। কামাল শাহ জানিয়েছে,নিরীহ ছাত্ররা আত্মসমর্পণ করলে তাদের চলে যেতে দেয়া হবে, কিন্তু মোল্লা এবং তার জঙ্গি স্যাঙ্গাৎদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জুলাই ৫ তারিখ আজিজকে আদালতের সামনে হাজির করা হয় হত্যা ও উগ্রপন্থার অভিযোগসহ, আদালত তাকে সাতদিনের জন্যে আটকাদেশ দেন। আজিজ জানিয়েছে, ৬০০ নারী ও শিশু সহ প্রায় ৮৫০ জন এখনো মসজিদের ভেতরে রয়েছে।

আজ মসজিদ থেকে পালানোর জন্য কিছু ছাত্র সংঘবদ্ধ আক্রমণ শুরু করলে ঘিরে থাকা সৈন্য ও রেঞ্জারদের সাথে আবারও সংঘর্ষ শুরু হলে মৃতের সংখ্যা ২১ এ পৌঁছায়। উপাধ্যক্ষ মাওলানা গাজি জানিয়েছে, তাকে গ্রেফতার বা হয়রানি না করলে সে মসজিদ এলাকা ত্যাগ করতে রাজি আছে, অন্যথায় আমৃত্যু এ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সে বদ্ধপরিকর। সরকারী দূত চৌধরী সুজাত হোসেইনকে মাওলানা গাজি জানিয়েছে, তারা আত্মসমর্পণ করবে যদি গাজিকে সপরিবারে নিরাপত্তা দেয়া হয়, এবং গাজি তার অসুস্থ মায়ের সেবা করার জন্য থেকে যেতে চায়। তথ্য উপমন্ত্রী তারিক আজিম খান বলেছে, নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে হবে গাজিকে।




সূত্রঃ


০১. সৈয়দ শোয়েব হাসান, বিবিসি নিউজ

০২. পিটার ওয়াকার, গার্ডিয়ান আনলিমিটেড

০৩. খালিদ কাইয়ুম ও খালিক আহমেদ, ব্লুমবার্গ.কম

ছবিসূত্রঃ বিবিসি।


No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।