Thursday, June 21, 2007

নাম রাখার বিপদ

জানুয়ারি ২০, ২০০৪ তারিখ লেখা গল্পের নিচে। তখন আমাদের লাস্ট সেমেস্টার ফাইন্যাল চলছে বুয়েটে। এ গল্পটা পরীক্ষার ডামাডোলের মধ্যে বাঙ্কারে বসে লেখা, একটানে। নতুন লেখার পেছনে স্বাস্থ্য-সময় দিতে পারছি না, তাই এই গল্পটাই লোড করছি, সচলায়তনের আগে কোথাও প্রকাশিত হয়নি, তবে যতদূর মনে পড়ে কালের খেয়াতে পাঠানোর একটা উদ্যোগ নিয়েছিলাম।


১.

সাহিত্যিকরা পদে পদে বিপদগ্রস্ত।

মোফাকে দেখে আমাদের খুবই খারাপ লাগে। বেচারা নিতান্ত নিরীহ কিসিমের মানুষ। কারো কোন ক্ষতি করা দূরে থাক, সাহিত্যের প্রসঙ্গ না উঠলে কারো সাথে তর্কাতর্কিতেও যায় না সে। এমন একটা লোককে কে এমন নৃশংসভাবে পেটাতে পারে? মোফার কালো হয়ে থাকা ডান চোখ, আর ফুলে থাকা বাম চোয়াল দেখে আমরা রাগে মুখ কালো করে ফুলতে থাকি। সেই পাতক ঘাতককে হাতের কাছে পেলে মোফার আদলেই তার মুখে আলু তুলে দেবার কঠিন সংকল্প আঁটি আমরা।

তবে হ্যাঁ, যতই নিরীহ হোক না কেন, সাহিত্যের প্রশ্নে মোফা অটল। ঐ একটি ক্ষেত্রে সে মেষ নয়, রীতিমতো বঙ্গীয় রাজশার্দুলের মতো বীর্যবান। খোদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মর্যাদা রক্ষার খাতিরে সে এক ইয়া পালোয়ান বকলম মাঠাওয়ালার সাথে রীতিমতো লড়াই করেছে, শুনেছো নিশ্চয়ই। লড়াইয়ে নেট লস ওরই হয়েছে, খামোকা হাসপাতালে পড়েছিলো কয়েকদিন, কিন্তু লড়াইতে হারজিত চিরদিন থাকবেই, হারের চিন্তা মাথায় পুষে বীরেরা লড়ে না।

এবারও নিশ্চয়ই মোফা এমনি কোন সম্মুখসমরে হেরে এসেছে। হয়তো গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ কিংবা ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার বদনাম করেছে কোন এক ষন্ডামার্কা পাষন্ড, অমনি মোফা উত্তেজিত হয়ে উল্লেখিত সাহিত্যিকদের আশুবিপন্ন সম্ভ্রম বাঁচাতে এগিয়ে এসেছে। কিংবা হয়তো কোন স্বাস্থ্যবান সাহিত্যমূর্খ বঙ্কিমচন্দ্রকে বন্দ্যোপাধ্যায় উপাধি দিয়ে বসেছে, তাতে চট্টোপাধ্যায় হয়ে মোফা তাকে মৌখিক বা দৈহিক আক্রমণ করে বসেছে। কিংবা হয়তো বুদ্ধদেব বসু আর বুদ্ধদেব গুহ, কিংবা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় আর শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে গুলিয়ে ফেলেছে কেউ। সাহিত্যিকের এমন অপমান, এমন অপরাধ, কি একজন জীবন্ত কবি হয়ে মোফা সইতে পারে?

আমি সহানুভূতির সাথে জানতে চাই, ‘কে রে শালা ইডিয়েটটা? এভাবে জমিয়ে মারলো তোকে?’

রেজা বলে, ‘থাক রে মোফু, কান্দিস না। নে, পুরি খা।  ওহহো, তোর তো চাপা ফাটিয়ে দিয়েছে, খাবি কিভাবে?’

শিবলি বলে, ‘ইশ্শ্, একেবারে হৃদয়হীনের মতো মেরেছে রে, কিচ্ছু আস্ত রাখেনি, চোখমুখ ফুলে চিত্রবিচিত্র হয়ে তোকে বুড়োবয়সের নূরজাহানের মতো দেখাচ্ছে!  কী দিয়ে মারলো তোকে? হকিস্টিক না নানচাক্কু?’

মোফা সদ্যজাত বাছুরের মতো করুণ চোখে তাকায় আমাদের দিকে। কিন্তু মুখে কিছু বলে না।

আমি বলি, ‘জুতো পেটা করেনি তো?’

মোফা এমন একটা সম্মতিসূচক মৌনতা অবলম্বন করে, যে আমাদের গা ঠান্ডা হয়ে যায়। ভাবতে থাকি, নিরীহ বুদ্ধিজীবী মোফাকে এমনভাবে ঠ্যাঙাতে পারে, কে বা কাহারা এতবড় নৃশংস নরপশু হতে পারে? কোন সাংসদ? কিংবা মন্ত্রী? কিংবা তাদের পোষা মস্তানবৃন্দ?

আমরা মনের জিজ্ঞাসাকে মুখের বাইরে বের করি। মোফা মাথা নাড়ে। বলে, ‘মনিকা খালু।’

মনিকা খালু? এ আবার কি চীজ? খালুর নাম মনিকা হয় কখনো? মনিকা নামের কোন লোককে কোন সুস্থ খালা বিয়ে করে তাকে খালু হয়ে ওঠার সুযোগ দিতে পারেন কখনো? এ-ও কি সম্ভব?

আমরা জানতে চাই। ‘মনিকা খালুটা কে রে? এ আবার কেমন ধাঁচের নাম? মনিকা লিউয়িনস্কি পর্যন্ত শুনেছি  ইদানীং খালুরাও মনিকা হচ্ছে নাকি?’

মোফা গুম হয়ে থাবে কিছুক্ষণ। তারপর বলে, ‘আমাদের মনিকা খালার বর। সে জন্যে আমরা মনিকা খালু ডাকি।’

আমরা তৎক্ষণাৎ জানতে চাই, ‘মনিকা খালা কে?’

মোফা বলে, ‘আমাদের পাশের বাসায় থাকতো আগে, এখন অন্য জায়গায় থাকে।’

‘মনিকা খালার বর তোকে খামাখা মারলো কেন? কী করেছিস তুই?  মনিকা খালার সাথে কোন রকম ইয়ে ?’ আমি অনুসন্ধিৎসু হই।

মোফা ভারি বিরক্ত হয়। বলে, ‘বেকুব কোথাকার, মনিকা খালার মেয়ের বয়স আমার সমান  আর তাছাড়া আমি কেন যাবো এইসব করতে ?’
আমরা নড়েচড়ে বসি।

‘মনিকা খালার মেয়ে দেখতে কেমন রে?’ শিবলি জানতে চায়।

মোফা বলে, ‘ভালো।’

আমাদের মধ্যে সূক্ষ্ম একটা পরিবর্তন আসে। হুম। তাহলে একটা দেখতে-ভালো-মেয়ের বাবা মোফাকে আচ্ছামতো পেঁদিয়েছে। কেন? আমরা দল পাল্টাবো কি না ভাবতে থাকি। মোফার দলে থেকে খুব একটা লাভবান হতে পারবো না মনে হচ্ছে। হারু পার্টির পোঁ ধরে কী লাভ?

আমরা বিস্তারিত ঘটনা জানতে চাই।

২.
ঘটনা হচ্ছে সরল।

মোফা যেহেতু বাংলা ভাষার ওপর ভালো দখল রাখে, তাই অনেকেই তার কাছে আসে নামের জন্যে। আমাদের নিত্যদিনের আড্ডাস্থল, এই কলিমুদ্দির তেলেভাজার দোকানটার নাম মোফারই রাখা  তেলোত্তমা রেস্তোরাঁ। আমাদের পাড়ার মানবাধিকার কর্মী ইজ্জত আব্রাহাম ভাই কয়েকজন বন্ধুর সাথে জোট বেঁধে তাঁর খালি গ্যারেজে একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি খুলেছিলেন কয়েক দিনের জন্য, কিন্তু জেদ ধরেছিলেন সেটার নাম বাংলা ভাষায় রাখবেন। বাতলে দিয়েছে মোফা, ছায়াসুনিবিড় বিশ্ববিদ্যালয়। পুরনো বাড়ি ভেঙে নতুন দালান বানিয়েছেন আজম চাচা, নাম রাখার জন্যে ছুটে গেছেন মোফার কাছে। চাওয়ার সাথে সাথে নাম পেয়ে গেছেন, আজমহল। নামকরণে মোফার দক্ষতা তুলনারহিত, কেবল নিজের নামটা বেচারাকে রাখবার সুযোগ দেয়া হয়নি বলেই একটা বদখদ লম্বাচওড়া কাবুলি নাম নিয়ে ঘুরতে হয় তাকে। সে দুঃখ সে ভুলেছে হরেক রকম ছদ্মনামে কবিতা লিখে।

এমনই একসময় মোফার ডাক পড়েছে, মনিকা খালার বাসায়। মোফার মা মোফাকে ডেকে বলেছেন, ‘মোফা রে, তোর মনিকা খালার বাসায় চল আজ। বাচ্চার নাম রাখতে হবে।’

মোফা খুব উৎসাহের সাথে রাজি হয়েছে। সে জানতে চেয়েছে, ‘কিসের বাচ্চা মা, বেড়াল না কুকুর?’ বলে নেয়া ভালো, এ পাড়ায় তাবৎ জীবজন্তুর নাম ওর রাখা। কুদ্দুস সাহেবের পোষা গরু ধবলীর যমজ বকনা বাছুর হলো, একটা কালো আর একটা সাদা। মোফা এক নজর দেখেই নাম দিলো সরসী আর ফরসী। মনজুর চাচার দুর্ধর্ষ নতুন কুকুরটা, খাবলুর পর যার আগমন, যেটার জ্বালায় পাড়ার বেড়ালগুলো অতিষ্ঠ, সেটার নামও জুগিয়েছে মোফা, ম্যাওছাতুং  সমাস করলে দাঁড়ায়, ম্যাও পেলেই ছাতু করে ফেলে যে।

কিন্তু মোফার মা ক্ষেপে ওঠেন। ‘মানুষের বাচ্চা, মানুষের! মনিকার মেয়ে হয়েছে, তার নাম রাখতে হবে তোকে, বুঝলি? আজকে সন্ধ্যায় তৈরি থাকিস।’
মোফা মনিকা খালার বাসায় যেতে হবে ভেবেই পুলকিত হয়, কারণ মনিকা খালার মেয়ে দুটি, কুন্তু আর খান্তু, বেশ ইয়ে, নাম বদখদ হওয়া সত্ত্বেও। আর দেখতে ইয়ে হলে নামে কী-ই বা আসে যায়? শেক্সপিয়ার তো বলেছেনই  যাক গে! বিনা বাক্যব্যয়ে সে খোঁচা খোঁচা কবিসুলভ গোঁপদাঁড়ি কামিয়ে, পাঞ্জাবী ইস্তিরি করে পাতলুনের ওপরে এঁটে একেবারে ধোপদুরস্ত কবিটি সেজে পুলকিত চিত্তে সন্ধ্যেবেলা মায়ের সাথে মনিকা খালার বাসায় গেলো।

কিন্তু বিধি বাম। মনিকা খালু বাসায় ছিলেন সে সন্ধ্যে বেলা। ব্যাটা ব্যবসা করেন, নিশ্চয়ই দ্বিসাংখ্যিক কিছু, মোফা অভিমত জানালো। দ্বিসাংখ্যিক মানে যে দুইলম্বরি, তা আমরা জানতাম না। যাই হোক, কত কিছুই তো আমরা জানি না। সেই ব্যাটা নাকি দেখতে ময়দানবের মতো, কালো ভূত, সারা গায়ে লোম, কুতকুতে চোখ, এক কথায় বিচ্ছিরি। এই লোকের যে কেমন করে পরীর মতো সুন্দর দুটো মেয়ে হলো, সেটা মোফা বুঝতে পারে না, কাজেই আমরাও পারি না। এই রহস্য ভেদের দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে কেবল আমাদের এ পাড়ার আরেক গর্ব, উপমহাদেশের প্রখ্যাত গোয়েন্দা গুলু ভাইকে।

যাই হোক, সেই ব্যাটা বেনিয়া মুখ্যুটা বাসায় ছিলো, এই হলো সমস্যা। কুন্তু আর খান্তুর সাথে চোখের দেখা হয়নি মোফার। বাপটা হচ্ছে মহা চামার কিসিমের। যেহেতু মোফা বেগানা পুরুষ, কাজেই মেয়েদুটো ভেতরের ঘরে লুকিয়ে রইলো, বাইরে আসার সাহসই পেলো না। মোফার মা চলে গেলেন মনিকা খালার সাথে, নতুন পিচ্চিকে দেখতে। আর মোফা বসবার ঘরে মনিকা খালুর সাথে বসলো।

মনিকা খালু শুরুতেই বললেন, ‘দ্যাখো বাবা, আমার কপালটা কী খারাপ একবার দ্যাখো। ভেবেছিলাম এবার একটা ছেলে হবে, কিন্তু এবারও সেই মেয়েই হলো। নাম রাখা নিয়েও একটা পেজঘি লেগে গেলো। কী যে করি, ভালো লাগে না।’

মোফা হাসি হাসি মুখে বললো, ‘নাম রাখা নিয়ে কি সমস্যা?’

মনিকা খালু বললেন, ‘না, ছেলে হলে বোনদের নামের সাথে মিল রেখে বেশ একটা ছন্দ রেখে নাম রাখা যেতো, বুঝলে? আগেই ভেবে রেখেছিলাম একটা নাম, কিন্তু ছেলের বদলে মেয়ে হয়ে একেবারে সব পরিকল্পনা মাঠে মারা গেলো। দেখি, আর একবার চেষ্টা করে ।’

৩.
এইটুক পর্যন্ত শুনে শিবলি ঠা ঠা করে হেসে উঠলো, ‘ব্যাটা দেখি পরিবার পরিকল্পনাও মাঠে মেরে দিচ্ছে। পশু কোথাকার!’

মোফা তার বন্ধ হওয়া ডান চোখ টিপে বললো, ‘ঠিক বলেছিস, আস্ত জানোয়ার ব্যাটা, কিন্তু আগে বাকিটা শোন।’

৪.
মোফা মনে মনে ভাবলো, এই ব্যাটার ছেলে তো এর মতোই হবে দেখতে, মেয়েদের সাথে মিল রেখে কী নাম রাখা হতো, জন্তু? কিন্তু এ তো আর মুখে বলা যায় না, সে বললো, ‘কী নাম ঠিক করেছিলেন, খালু?’

মনিকা খালু একগাল হেসে বললেন, ‘টনিক!’

মোফা আঁতকে উঠে আর একটু হলেই সোফা থেকে পড়ে যাচ্ছিলো, এমন অসংস্কৃত, অভব্য নাম শুনে। টনিক একটা নাম হলো?

মনিকা খালু হেসে বললেন, ‘হেঁ হেঁ হেঁ  জিন অ্যান্ড টনিক আবার আমার খুব প্রিয় জিনিস, বুঝলে কি না? ব্যবসা করার এই একটা সমস্যা, বুঝলে বাবা  নানা দেশের নানা রকম লোকের সাথে মিশতে গিয়ে নানা বদভ্যাস তৈরি হয়ে যায়। তবে জুম্মার নামাজটা ঠিকই পড়ি, আর ইচ্ছা আছে চুলদাড়ি আরেকটু পাকলে গিয়ে হজ্জ করে আসবো।  আর ছেলের জন্যে একটা ইসলামি নামও ঠিক করে রেখেছিলাম।’

মোফা আর জিজ্ঞেস করার সাহস পায় না, সেটা কি।

মনিকা খালু বলেন, ‘শুনবে নামটা?’

মোফা বহুকষ্টে ঢোঁক গিলে, নিজেকে শক্ত করে নিয়ে মাথা ঝাঁকায়।

মনিকা খালু উদ্ভাসিত মুখে বলেন, ‘কাবুল হোসেন!’

মোফার কাছে জগৎ আঁধার হয়ে আসে, কাবুল হোসেন নামটাকে তার কাছে টনিকের মতোই ভদ্র সমাজে অপাঙক্তেয় মনে হয়। অনাগত পুত্রসন্তানটি যে কী পরিমাণ ফাঁড়ার ওপর আছে, কল্পনা করতে গিয়ে মোফা শিউরে ওঠে। টনিক নামটা নিয়ে যাও ছেলেটা টলমলিয়ে খানিকটা দূর যেতে পারতো, কাবুল হোসেন নামটা এর ওপর জবরদস্তি চাপিয়ে দিলে সেই অনাগত ছোকরার ভবিষ্যত আকিকার পরদিনই দফারফা হয়ে যেতো। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় তো বটেই, ওগুলো পার করার পর ব্যবসাবাণিজ্য বা চাকরিবাকরি, সবকিছুতেই বেচারা টনিকের টনক নড়ে একেবারে টনটনিয়ে থাকতো। তাছাড়া তার বিয়ে দেবার সময় কী একটা হুজ্জতেই পড়তে হবে! কোন মেয়ে যদি শোনে, তার হবু বরের নাম কাবুল হোসেন, ডাক নাম হচ্ছে গিয়ে টনিক, সে কি কখনো স্বেচ্ছায় রাজি হবে এমন একটা লোককে বিয়ে করতে? ছোকরা না জন্মে বড় শক্ত বাঁচা বেঁচে গিয়েছে দেখা যাচ্ছে।

৫.
আমরা খিকখিক করে হাসতে থাকি। ‘কাবুল হোসেন টনিক! হে হে হে, কাবুল হোসেন টনিক!’

মোফা বলে, ‘তাছাড়া দ্যাখ! ছোকরা যদি ভবিষ্যতে পলিটিক্স করতে চায়, এই নামটা নিয়ে কি বাটে পড়বে? এমনিতেই আমাদের পলিৎসুক গুলোর নামের যা ছিরি! মেয়রের নাম হচ্ছে কাসেদ হোসেন খোকা, খেলাধূলামন্ত্রীর নাম বজলুর রহিম পটল  !’

আমরা তবুও হাসি, ‘কাবুল হোসেন টনিক! হে হে হে!’

মোফা বলে, ‘হাসি রাখ, এর পর শোন কি হলো।’

৬.
কিন্তু মনিকা খালু তৃপ্ত ভঙ্গিতে হাসেন। ‘আমার নামের সাথে মিল রেখেই রাখলাম, বুঝলে কি না?’

মোফা ভাঙা গলায় বলে, ‘আপনার নাম কি? আবুল হোসেন?’

মনিকা খালু ভারি বিরক্ত হন। ‘কথার মাঝখানে কথা বলো কেন?  আমার নাম বাবুল হোসেন। আবুল হোসেন আমার বাবার নাম।’ বলতে বলতেই তাঁর মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ‘লক্ষ্য করেছো? বেশ একটা ছন্দ তৈরি হলো কিন্তু? আবুল হোসেন, তস্যপুত্র বাবুল হোসেন, তস্যপুত্র কাবুল হোসেন  বেশ চলছে কিন্তু, তাই না? আমাদের খানদানের সুরটা বেশ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে!  কিন্তু সমস্যা একটা, হারামজাদা ছেলেটা আদপে হলোই না, বরং আরেকটা মেয়ে এসে হাজির! ছেলেটা হয়ে গেলে বেশ একটু নিশ্চিন্তে থাকতে পারতাম! ব্যবসাবাণিজ্য তো কারো হাতে ছেড়ে যেতে হবে, নাকি? মেয়ে দু’টাই হয়েছে পটের বিবি, আলতা পায়ে হাঁটে, এদের ওপর এই গুরুভার ন্যস্ত করা মোটেও বুদ্ধির কাজ হবে না।’

মোফার মাথায় এই সমস্যাটা বেশ টোকা দেয়। সে বলে, ‘কিন্তু খালু, কাবুল হোসেনের ছেলের নাম কি হবে? মানে, খানদানের সুরটা বজায় থাকবে কিভাবে?’

মনিকা খালু বিরক্ত হন। ‘তার আমি কি জানি? আমি কেন তা নিয়ে মাথা ঘামাতে যাবো? আমার বাবা যখন আমার নাম রাখলেন বাবুল হোসেন, তখন কি তিনি ভেবেছিলেন, আমি আমার ছেলের নাম কি রাখবো? ভাবেননি! তিনি যখন ভাবেননি, আমিও ভাববো না। ঐ শালা কাবুল হোসেনই এইটা নিয়ে মাথা ঘামাবে! তাছাড়া কাবুল হোসেনই এলো না এখন পর্যন্ত, আবার তার ছেলে!  আর খানদানের সুর! খানদান ডুবতে বসেছে ছেলের অভাবে!’

মোফা কাঁচুমাচু হয়ে বললো, ‘ইয়ে খালু, একটা প্রশ্ন ছিলো।’

মোফার আদবকায়দায় সন্তুষ্ট হয়ে এবার মনিকা খালু খুশি খুশি গলায় বললেন, ‘একটা কেন, দশটা করবে, তুমি তো বলতে গেলে ঘরের ছেলে। বলো বলো?’

মোফার মনে একটা হালকা খুশি উলু দিয়ে গেলো। অ্যাঁ, বলে কী ব্যাটা? ঘরের ছেলে? ওকে নিয়ে কোন মধুর পারিবারিক মতলব আছে নাকি কাবুল হোসেনের বাবার মনে? কিন্তু নিজের সম্ভাব্য শ্বশুরের নাম বাবুল হোসেন, কিংবা শালার নাম কাবুল হোসেন, এটা ভাবতে গিয়েই মোফার মেজাজ খিঁচড়ে গেলো। নাহ, পাঁচে পদে কোনকিছু মেলে না এ জগতে, একটা না একটা ত্রুটি রয়েই যায়!

মনের খুশি চেপে রেখে মোফা বললো, ‘কাবুল হোসেন নামটা ইসলামি হলো কিভাবে?’

মনিকা খালুর মুখ এবার গোমড়া হয়ে গেলো। ‘এটা তো একটা বলদের মতো প্রশ্ন হয়ে গেলো বাবা! তোমরা, এই ইয়াং ছেলেপেলেরা খালি প্যাচাল পাড়তে জানো! কাবুল হোসেন নামটা ইসলামি হবে না কেন, শুনি?  হোসেন তো একটা ইসলামি নাম, তা তো মানো? এই যেমন ধরো বাপের ব্যাটা সাদ্দাম হোসেন, মুসলিম বিশ্বের প্রতিবাদী কন্ঠস্বর ! তবে সাদ্দাম হোসেন নামটা কমন হয়ে গেছে, সব চাষাভূষাতেলিমুদির ছেলের নামও দেখি সাদ্দাম হোসেন! আর ধরো গিয়ে  এই বাগদাদ, বোখারা, কাবুল, এসব শহরকে ভিত্তি করেই তো ইসলাম আমাদের দেশের দিকে এগিয়ে এসেছিলো, নাকি? আমি তো ছেলের নাম মস্কো হোসেন রাখতে পারি না! এখন তুমি এই প্রশ্ন আবার করো না, আমি আমার ছেলের নাম কেন বাগদাদ হোসেন রাখলাম না।  আর সবচে’ বড় যুক্তি হচ্ছে, কাবুল হোসেন বাবুল হোসেনের সাথে মেলে! ব্যস!’

মোফা সায় দেয়। ‘জ্বি জ্বি।’

মনিকা খালু বিমর্ষ মুখে বলেন, ‘এতো দিনরাত চিন্তা করে একটা নাম রেখেছিলাম, নিমকহারাম ছেলেটা মেয়ে হয়ে দুনিয়ায় এলো। কি সুন্দর মিষ্টি হতো ব্যাপারটা, আমার দুই মেয়ে, কুন্তু আর খান্তু, তার সাথে ছেলেটা, টন্তু!’

মোফা আবার টলে ওঠে। কুন্তু আর খান্তুর নামটা পান্তুয়ার মতোই মিষ্টি শোনায় ওর কাছে, কিন্তু টন্তু একটা নাম হলো?

মনিকা খালু বকে যান, ‘এখন এই মেয়ের কোন নাম আমার মাথায় আসছে না। এর নাম তো আর কাবুল হোসেন রাখা যায় না, যতোই ইসলামি নাম হোক না কেন! কিংবা, টনিক থেকে তো আর ওকে টনিকা বানিয়ে দেয়া যায় না। ছেলেদের তো নাম নিয়ে কোন ঝামেলা নেই, কিন্তু আজকালকার মেয়েদের নাম নিয়ে বড় হুজ্জত! কি বিটকেল বিটকেল সব নাম! শাগুফতা, আফ্রোদিতি, কাসাব্লাংকা  এমন সব নাম! এগুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে চলার মতো নাম আমার জানা নাই, তাই তোমার শরণাপন্ন হলাম।’

মোফা তবুও খুঁতখুঁত করে। ‘কিন্তু খালু, কুন্তু আর খান্তুর সাথে টনিক কিভাবে মিলতো?’

মনিকা খালু ভারি বিরক্ত হন। ‘কি আপদ, কুন্তু আর খান্তুর সাথে টনিক কেন মিলবে? কুন্তু আর খান্তুর সাথে মিলবে টন্তু! আর এ কথা কেন উঠছে, যেখানে টনিক একেবারেই অনুপস্থিত?’

মোফা বিব্রত হয়ে বললো, ‘বা রে, আপনিই তো বললেন, মেয়েদের নামের সাথে মিলিয়ে ছেলের নাম রাখবেন টনিক ।’

মনিকা খালু বলেন, ‘তাই তো! আমার মেয়েদের আসল নাম কণিকা আর ক্ষণিকা, তাদের মায়ের সাথে মিলিয়ে রাখা, তাই তাদের সাথে মিলিয়ে ছেলের নাম রাখতাম টনিক! কিন্তু শুধু মায়ের সাথেই মিলিয়ে যাবে, বাবার সাথে মিলবে না, তাই কি হয়? তাই আসল নাম ঠিক করেছিলাম কাবুল হোসেন!  বুঝলে, এই মেয়েদের মা-ই হচ্ছে সব গন্ডগোলের মূলে! কেমন বারবার খালি নিজের নামের সাথে মিলিয়ে নাম রাখা! এখন এই নূতন মেয়েটার নাম রাখতে গিয়ে আমি পড়েছি বাটে। তা-ও যদি উনি একটা ছেলে পয়দা করতেন, একটা ব্যবস্থা আমি নিজেই নিতে পারতাম। কিন্তু উনি আমাকে কোনভাবেই সহযোগিতা করতে রাজি নন!  যাকগে, সবকিছু তোমার কাছে স্পষ্ট তো? এখন বাপধন, আমাকে একটা সুইট অ্যান্ড স্যুটেবল নাম বলো দেখি সুট করে!’

মোফার অন্তর একেবারে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠলো খুশিতে। কণিকা! মানে কুন্তু! ক্ষণিকা, মানে খান্তু? ঈষৎ সংক্ষেপণের পাল্লায় পড়েই তবে তাদের কুন্তুত্ব আর খান্তুত্ব লাভ? মোফার মানসচোখে মনিকা খালার নামবিতর্কোর্ধ্ববর্তিনী কন্যাদুটির রূপসী চেহারা  আর তেমনি লাগসই ফিগার  ভেসে ওঠে। কণিকা, অর্থাৎ কি না বড়জন, বেশ চকিতহরিণপ্রেক্ষণা কিন্তু ওদিক দিয়ে ঠিকই শ্রোণীভারাদলসগমনা, সেইসাথে স্তোকনম্রা  হেঁ হেঁ হেঁ! ক্ষণিকা, মানে মেজো মেয়েটা, সেই শিখরীদশনা, আর সেই সঙ্গে পক্কবিম্বাধরোষ্ঠী, সেই পর্যাপ্তপুষ্পস্তবকানম্রা সঞ্চারিণী পল্লবিনী লতা? আর সে নিজে, মোফা, সে তো ঘরের ছেলে, সে কথা তো বাবুল হোসেন নিজেই বললেন। ইয়াহু কবি কালিদাস, জিতা রহো কুমারসম্ভব, মার দিয়া কেল্লা! কণিকা বা ক্ষণিকা, দুটি নামই তার পছন্দ, নামের মালকিনদের আরো পছন্দ। অ্যাদ্দিন তো এ সুখবর সে পায়নি। এদের নাম তো তৈরিই রয়েছে দেখা যাচ্ছে। নইলে কুন্তু/খান্তুকে একটা সুন্দর নাম কি সে উপহার দিতে পারতো না? রবিদা কি করেছিলেন? ভবতারিণী নামের একটা মেয়েকে বড়দের চাপে পড়ে বিয়ে করতে হয়েছিলো বেচারা রবিঠাকুরকে, কিন্তু ঐ গেঁয়ো নাম বরদাশ্ত করা তাঁর মতো ভাবুকের পক্ষে সম্ভব হয়নি, স্ত্রীর একটা আপটুডেট কাব্যসুষমামন্ডিত লাগসই নাম ঠিকই দিয়েছিলেন তিনি, মৃণালিনী, আবার সেটাকেও দমে বসিয়ে ছোট্ট করে ডাকতেন শুধু ছুটি বলে। মোফা কি পারে না, কুন্তুকে কুমুদিনী নামে, খান্তুকে ক্ষীণতনু নামে কাছে ডাকতে? আলবাত পারে, ঠিক যেমনটি পেরেছিলেন মোফার মানসগুরু রবিদা।

যেহেতু সত্যযুগের মতো, আইয়ামে জাহেলিয়াতের মতো, ভূটানের রাজপরিবারের মতো একই সঙ্গে একাধিক স্ত্রী গ্রহণ এখন আর সম্ভব নয়, তাই কণিকা নাকি ক্ষণিকা, কোনটি তার ভাগ্যে জুটতে পারে, এই বিশ্লেষণে মোফা কল্পনায় বুঁদ হয়ে যায়, আর শুনতে পায়, নিচে, অর্থাৎ কল্পনালোকের নিচে শক্ত মাটির ওপর কঠোর বাস্তব জগতে বসে মনিকা খালু বলছেন, ‘ তোমার খালা গোঁ ধরেছেন, ঠিক ছন্দ রেখে, মিল রেখে যুৎসই একটা নাম রাখতে হবে মেয়ের। বললাম, বেশ তো, রাখো না, কে মানা করেছে? কিন্তু অ্যাদ্দিন হয়ে গেলো, মা আর বোনেরা মিলে কোন নাম ঠিক করতে পারলো না। শেষ পর্যন্ত তোমাকে তলব করা হয়েছে। তুমি নাকি বেশ বিশেষজ্ঞ, পদ্যটদ্য লেখো, সেগুলো আবার পেপারটেপারে ছাপাটাপা হয়  তুমিই একটা নামটাম ঠিক করো বাবা  কণিকা আর ক্ষণিকার পর এই মেয়েটার কী নাম দেয়া যায়?’

আর নিজের হবু শালির নাম রাখতে গিয়ে ঠিক তখনই মোফা করে বসে সেই মারাত্মক ভুল, যেই ভুলের খেসারত হিসেবে হয়তো খসে যায় কণিকা ওরফে কুন্তুকে কুমুদিনী ডাকার সুযোগ, ক্ষণিকা ওরফে খান্তুকে ক্ষীণতনু ডাকার সম্ভাবনাটি ক্ষীণতর হয়ে যায় সেই কুক্ষণের ভুলে।

তবে ভুলটি সম্পূর্ণ মোফার নিজের দোষে হয় না, খানিকটা দোষ চাপানো যেতে পারে বাংলা বর্ণবিন্যাস কিংবা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের স্কন্ধে। কে সাজিয়েছিলেন বাংলা বর্ণ, উইলিয়াম কেরি নাকি বিদ্যাসাগর? মোফা ভুলে গেছে, তাই আমরা আর সঠিক তথ্যটি জানার সুযোগ পাই না, কিন্তু সেক্ষেত্রে দুজনের ঘাড়েই বিশ পার্সেন্ট দরে শতকরা চল্লিশ ভাগ দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া যেতে পারে। কিন্তু বাংলা বর্ণবিন্যাসের একনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে বাকি ষাট ভাগ, বালাই ষাট, মোফার শুকনা নড়বড়ে ঘাড়েই চাপে।

ক, খ এর পর গ-ই তো আসে, তাই না? সেই নিয়মের ভরবেগে, নিউটন কর্তৃক কপচিত গতিজড়তার পাল্লায় পড়ে মোফা মুখ ফসকে বলে ফেলে, অনেকটা সুপারিশের সুরে, ‘গণিকা?’

৭.
আমরা আঁতকে উঠি। কাহিনী কোনদিকে যাচ্ছিলো আমরা ধরতে পারিনি, এখন সব জলের মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মোফার বন্ধ হয়ে যাওয়া ডান চোখ, আব গজিয়ে যাওয়া ডান চোয়াল, সব কিছুর পেছনে একটা স্পষ্ট পোক্ত অনপনেয় কারণ, যেটা ছাড়া কার্য হওয়া মুশকিল, খুঁজে পাই আমরা।

মোফা একটু থামে, হাঁক ছেড়ে জুম্মনকে বলে চা দিয়ে যেতে, তারপর আবার বলতে থাকে।

৮.
নাম শুনেই মনিকা খালুর মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, ‘বাহ্! বেশ চালু মাথা তো তোমার ?  হবে না, কবিতাটবিতা লিখলে বেশ মাথা খোলে, ছন্দগুলো পটাপট মিলিয়ে দেয়া যায়। কণিকা ক্ষণিকা গণিকা  একেবারে রেলের বগির মতো, অ্যাঁ, ক খ গ! আমার তো নিজেকে ইঞ্জিনের মতো মনে হচ্ছে হে, টেনে চলেছি সমানে!  ইশ্, আমার ছেলেটা যদি মাঝখানে ডাইনিং কারের মতো হঠাৎ উড়ে এসে জুড়ে বসতে পারতো, কি চমৎকার দেখাতো? অ্যাঁ ? কণিকা, ক্ষণিকা, টনিক, তারপর গণিকা?  তোমার মনিকা খালা স্টেশন মাস্টারি করতে গিয়ে বেশি পোদ্দারি করে ফেললো, নইলে এবারেই ডাইনিং বগিটাকে ঠিক জায়গায় ফিট করে ফেলতে পারতাম। দেখি, কী আর করা, সামনের বার ।’

উৎফুল্ল মনিকা খালু সমানে বকে যান, আর হতভম্ব মোফা বসে থাকে সোফায়, কাষ্ঠপুত্তলিকাবৎ! এ কি করলো সে? নিজের পায়ে এভাবে কুড়াল মারলো? নিজের কবর নিজে খুঁড়লো?  কিন্তু এই ব্যাটা বাবুল হোসেন এই নাম শুনে এতো খুশি কেন ?

তৎক্ষণাৎ উত্তর পেয়ে যায় মোফা। মনিকা খালু বলেন, ‘মানে কী এই নামের, অ্যাঁ?  বাংলায় আমি একটু কাঁচা, বুঝলে, টেনেটুনে কোনমতে পাশ করে গেছি পরীক্ষায়। প্রত্যেকবার কানের পাশ দিয়ে গুল্লি গেছে, গুল্লি! কানের লতি গরম হয়ে আছে এখনো! গণিকা মানে কী?’

মোফা পালাবার পথ খোঁজে, কিন্তু পা দুটো বিশ্বাসঘাতকতা করে ওর সাথে, তারা নড়তে চায় না।

নিরুত্তর মোফাকে বসে থাকতে দেখে মনিকা খালু হাসেন। ‘হা হা হা, কোন চিন্তা নেই! মানে নিয়ে আমি মাথা ঘামাই না এতো, এই বাবুল হোসেন নাম নিয়ে জন্মেছি, নামের মানে নিয়ে লাফালাফি করা কি আমাকে মানায়, বলো? এই গণিকা নামটাই ইনশাল্লা ফাইন্যাল করে ফেলবো, তুমি বাবা কোয়ালিফায়েড ছেলে, তুমি নিশ্চয়ই আমাকে আলতুফালতু একটা নাম সাজেস্ট করবে না? য়্যাঁ?’

মোফা খানিকটা হাঁপ ছেড়ে বাঁচে, আর মনে মনে প্রাণপণে নূতন আরেকটা মিল খুঁজতে চায়, গণিকার পরিবর্তে আরেকটা নাম তো তাকে সামনে হাজির করতে হবে, নইলে মনিকা খালুর এই গণিকাপ্রীতি পরে তার জন্যে ঘোর বিপদ ডেকে আনতে পারে। এ নামের খবর পাঁচকান  শিক্ষিত কান  হলে মোফা কঠিন বাটে পড়বে।  কিন্তু আর কোন নাম তার মাথায় আসে না, বিপদে মাথা ঠান্ডা রাখার ছেলে তো মোফা নয়। তার মাথা আরো গুলিয়ে যায়, কিছুই ভেবে পায় না সে।

ওদিকে মোফার রক্ত ঠান্ডা করে দিয়ে, মনিকা খালু বকে যান। ‘  তবে হয়েছে কি বাবা, আজকালকার ছেলেমেয়েরা শুধু নামটাই দ্যাখে, নামের চটকটাই খোঁজে, নামের অর্থ নিয়ে তাদের কোন মাথাব্যথা নেই। একটা বিদঘুটে আরবি কি ফারসি কি পশতু কি উজবেক কি উর্দু শব্দ কানে ঢুকলেই হলো, বাচ্চার বাবামা অমনি ছেলেমেয়ের নাম রাখে ফারদিন, কারিশমা, ইনটিমেট, গিলগামেশ, সালদানহা  তুমিই বলো, অর্থ না জেনে কারো নাম রাখা কি নিরাপদ? শেষে একদিন জানা যাবে, পশতু ভাষায় নামের অর্থ গিয়ে দাঁড়ায় পেচ্ছাপপায়খানা! উঁহু বাবা, আমি সেই রিস্কে যেতে চাই না।  আমার কথা হলো, নাম যখন একটা রাখা হবে, তার সাথে অর্থও জোটা চাই। অর্থই আমার কাছে আসল, তার জন্যে একটা অনর্থ ঘটিয়ে ফেলতেও আমি পিছপা নই! সেজন্যে, এই যে দ্যাখো, আজকেই বিকালে নিউমার্কেট থেকে নগদ অর্থ খরচ করে আমি বাংলা ভাষার ডিকশনারি কিনে এনেছি! ঐখানে অবশ্য বাচ্চাদের নামের বইও পাওয়া যায়, উল্টেপাল্টে দেখলামও একটু, কিন্তু নামগুলো বদসুরত আর খাপছাড়া। আর তুমি যখন আছো, তখন কি আর নামের বই লাগে নাকি?’

বলতে বলতে সোফার পাশের টিপয় থেকে প্রকান্ড একটা ডিকশনারি বের করে নিয়ে আসেন মনিকা খালু, আর মোফার হৃৎপিন্ড টনসিলের কাছে এসে কয়লার ইঞ্জিনের মতো ঝুকঝুক করতে থাকে।

মনিকা খালু পাতা ওল্টান আর বলেন, ‘গণিকা, তাই না? বানান কীভাবে? আবার জএর পিঠে ঞ জ্ঞণিকা না তো? এই জ্ঞ অক্ষরটা লিখতে, বুঝলে, আমার খুব সমস্যা হয়, উল্টাপাল্টা লেগে যায়। খান্তুর সময় এমন হয়েছিলো। তোমার খালা সেবার তাঁর কোন এক অধ্যাপক মামুকে ধরে এনেছিলো নাম রাখার জন্যে। আমি তো প্রথমে ভেবেছিলাম, মেয়ের নাম হচ্ছে খনিকা। তারপরে শুনি না, ক্ষণিকা! আবার মূর্ধ্য ণ দিয়ে লিখতে হয়। খ লিখতে গেলেই জানকাবার, ক্ষ লেখা তো আরো টাফ!  তবে আমার মেয়ে দুটার মাথা ভালো, নিজেদের নাম কি পটাপট বাংলায় লেখা শিখে গেছে!  আর আমি তো বাচ্চা বয়সে বাবুল লিখতে গেলেই হিমসিম খেয়ে যেতাম। কণিকা আর ক্ষণিকা যদি লিখতে হতো  বাবারে!  দাঁড়াও, চট করে আগেই দেখে নিই, জ্ঞণিকা বলে কোন মাল আছে কি না। থাকলে খুবই সমস্যা  উঁহু, জ্ঞ দিয়ে এমন কিছু নেই! বাঁচা গেলো!’

মোফা একটা কিছু বলতে যায়, কিন্তু তার আগেই খালু গুনগুন করতে থাকেন, ‘তাহলে গ-তেই ফিরে আসি। হুম, গণ  গণৎ  গণিকা  গণিকা ।’

পড়তে পড়তে মনিকা খালুর কালোপানা মুখখানা লাল হয়ে যায়, তারপর সেটা আগের চেয়ে কালো হয়ে ওঠে, তারপর কখনো কালো, কখনো লাল, কোথাও কালো, কোথাও লাল, এমন হরেক ছোপ আর শেডের দুরঙা মুখ তুলে মোফার দিকে তাকান তিনি। মোফা একটা অভয় দানের ভঙ্গিতে হাসার চেষ্টা করে, কিন্তু সেটা শেষ পর্যন্ত একটা কাঁচুমাচু কৈফিয়তের হাসিতে রূপ নেয়।

মনিকা খালু সিংহ গর্জনে বলেন, ‘গণিকা, না?’

মোফা বলতে চেষ্টা করে, ‘না খালু, ইয়ে ।’

‘আমার মেয়ের নাম নিয়ে ফাইজলামি করো তুমি?’ হুঙ্কার ছাড়েন মনিকা খালু। ‘এইজন্য তোমাকে আমরা এক্সপার্টের মতো খাতির করে ডেকে আনলাম? গণিকা?’ তিনি বিপজ্জনক ভঙ্গিতে তাঁর কুর্তার হাতা গোটাতে থাকেন। তাঁর ভাবভঙ্গি দেখে মনে হয়, অবিলম্বে তিনি কর্তৃকারক ও কর্মকারককে আলোচনায় টেনে আনবেন।

জান বাঁচানো ফরজ, তাই চকিতে মোফার মস্তিষ্কে একটি মিল ঘাই মেরে যায়। সে ঠোঁটে হাসি টেনে বলে, ‘না না খালু, আমি তো বলেছি ঘনিকা  আপনি কি শুনতে কি শুনলেন? ঘনিকা, মানে কি না, খুব ঘন, নিবিড়, আপন ।’

কিন্তু মনিকা খালু ততক্ষণে প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছেন। বাঙালি একবার ক্ষেপলে কি বিনা রক্তপাতে কখনো শান্ত হয়? কখনো হয়েছে? দাঁত কিড়মিড় করে তিনি বলেন, ‘গণিকাঘনিকার খ্যাতা পুরি আমি, বদমায়েশ কোথাকার ।’ তিনি সোফা ছেড়ে তাঁর আড়াইমণি লাশ নিয়ে উঠে দাঁড়ান, তাঁর হাবভাব দেখে মোফার মনে হয়, শিগগীরই একটি যুৎসই করণকারক তাঁর হস্তগত হয়ে আলোচনায় অনুপ্রবেশ করতে যাচ্ছে।

৯.
আমরা রূদ্ধশ্বাসে শুনছিলাম, আমাদেরও কালো মুখ লাল হয়ে ওঠে উত্তেজনায়। মনিকা খালুর মতো আমরাও উঠে ঝুঁকে পড়ি মোফার দিকে। এবার তবে সেই পাদুকাপর্ব, দ্বারা-দিয়া-কর্তৃকের চূড়ান্ত?

‘তারপর, তোর চুল মুঠি করে ধরে দিলো চপ্পলের বাড়ি?’ বলে রেজা।

‘আরে যা ভাগ তুই!’ খেঁকিয়ে ওঠে শিবলি। ‘চপ্পল মেরে এই তস্করমারা হাল করা যায় কারো? তোকে স্যান্ডেল খুলে মেরেছে, না রে? মোটা সোলের মহিষের চামড়ার স্যান্ডেল?’

আমি ঘোর আপত্তি করি। ‘কিসের স্যান্ডেল? স্যান্ডেল দিয়ে এমন শুয়োরপেটা করতে গেলে সোল খুলে পড়ে যাবে। খালু শালা নিশ্চয়ই বুট পরে ছিলো!’

মোফা চরম নেতিবাচকতায় মাথা নাড়তে গিয়ে ককিয়ে ওঠে। তারপর নিজের ক্ষতিগ্রস্থ চোয়ালটাকে যতদূর সম্ভব কম নাড়িয়ে বলে, ‘আমাকে মেরেছে ডিকশনারি দিয়ে!’

আমরা স্তব্ধ হয়ে যাই। ডিকশনারি দিয়ে যে কাউকে মারা সম্ভব, এ আমাদের কল্পনাতেও আসে না। মনিকা খালু লোকটা এতবড় সাহিত্যিক গুন্ডা!

মোফা ভাঙা গলায় বলে, ‘বদমাইশ লোকটা বাংলা একাডেমির ডিকশনারি দিয়ে মেরেছে আমাকে। সংসদ ডিকশনারি হলে এতো জোরে লাগতো না, একবার মারলেই বাঁধাই খুলে বইটা নরম হয়ে যেতো। কেন যে বাংলা একাডেমির লোকজন এতো মজবুত বাঁধাইয়ের বই বার করে! তাছাড়া চোখা হার্ড কাভার, ওফ, বাবাগো !’ চোয়ালে হাত বুলায় সে।

‘অনেকবার মেরেছে নাকি তোকে?’

মোফা মুখ বিকৃত করে মাথা ঝাঁকায়। ‘হ্যাঁ, মিনিট দশেক ধরে। মনিকা খালা আর আম্মা না আসলে আমাকে পঙ্গু করে ফেলতো।’

১০.
কাহিনী এভাবেই শেষ হয়। মোফা বেচারা রোগাভোগা মানুষ, জান বাঁচানোর ফরজ উদ্দেশ্যে খানিকটা ছুটোছুটি করার চেষ্টা করে সে, কিন্তু শিগগীরই ঘায়েল হয়ে পড়ে, মনিকা খালু ডিকশনারিটা দিয়ে চরমভাবে তাকে উত্তমমধ্যম দেন।

তবে দু’চার ঘা খেয়েই বুদ্ধিমানের মতো চেঁচাতে থাকে মোফা। অকারণে অন্যায় মার খেলে কখনো চুপ করে থাকতে নেই, কোন এক সংস্কৃত শ্লোকে নাকি মোফা পড়েছিলো, সেই শাস্ত্রীয় টেকনিক বেশ টেকসই, হাতেনাতে কাজ দেয়। সবাই উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে আসে  মনিকা খালা, মোফার মা, কাজের লোক, সর্বোপরি সাময়িকভাবে পর্দানশীন কণিকা ও ক্ষণিকা। সবাই তড়িঘড়ি করে এসে খালুর হাত থেকে মোফাকে উদ্ধার করে। মোফার মা মোফার অবস্থা দেখে সোফায় ঢলে পড়ে যান, মনিকা খালা খালুর হাত থেকে ডিকশনারি কেড়ে নিয়ে চেঁচাতে থাকেন, ‘ছি? লজ্জা করে না তোমার? আবার এই ভর সন্ধ্যায় মদ খেয়ে মাতলামো করছো? রোগা ছেলেটা, এত কষ্ট করে এসেছে তোমার মেয়ের একটা ভালো নাম রাখতে, আর তুমি তাকে এভাবে মারপিট করছো?’

মনিকা খালু চটেমটে বলতে যান, ঠিক কোন কিসিমের ঘটনার প্রেক্ষিতে তিনি এমন একটা মাতালসুলভ গাজোয়ারিতে লিপ্ত ছিলেন, কিন্তু ক্ষিপ্ত মনিকা খালা তাঁকে ঐ ডিকশনারিটা দিয়েই দু’চার ঘা বসিয়ে দ্যান তৎক্ষণাৎ। ওদিকে কুন্তু ও খান্তু ভুলুন্ঠিত মোফাকে তুলে সোফায় বসিয়ে পরম পরিচর্যা করছিলো, তৃপ্ত মোফা মনে মনে আকন্ঠ ধন্যবাদ জানাচ্ছিলো মনিকা খালুকে, কারণ তিনি এমনটা না করলে হয়তো কুন্তু-খান্তুকে শেষ দেখার সুযোগটাও তার মিলতো না। আর শুধু শেষ দেখাও নয়, একেবারে মাটি থেকে তুলে কোলে বসানো, ওড়না তুলে বাতাস করা, পানি খাওয়ানোর অপচেষ্টা  সঅব! ষোল আনার ওপর আঠারো আনা হচ্ছে মনিকা খালার হাতে মনিকা খালুকে মার খেতে দেখা। মোফা তো আর একটু হলেই বলে ফেলছিলো, ‘মারো শালেকো!’

অচিরেই আবার সব স্বাভাবিক হয়ে আসে, মনিকা খালা সোফার আড়াল থেকে জিন আর টনিকের বোতল আর একটা বড় মগ খুঁজে পান, সেই সাথে “শিশুদের সুন্দর নাম” শীর্ষক একটি পাতলা বই, সেগুলো সহ তিনি কাঁচপোকার মতো তেলাপোকাসদৃশ মনিকা খালুকে টেনেহিঁচড়ে ঘরের বাইরে নিয়ে যান। স্ত্রীর কাছে ভদ্রলোক পালোয়ানগিরির সাহস পান না, সুড়সুড় করে চলে যান। মোফার মা জ্ঞান ফিরে পান, মোফাকে কুন্তু আর খান্তু মিলে ঘন্টাখানেক ধরে ব্যান্ডেজ বেঁধে দেয়, শরবত খাওয়ায়, ফিসফিস করে গল্পও করে। কুমুদিনী আর ক্ষীণতনু নাম দুটিও মোফা জানিয়ে দেয়, দুই বোন মুখে ওড়না চেপে খিলখিল করে হাসে। পরিশেষে আলগোছে নিজের মোবাইল নাম্বারটা গছিয়ে দিয়ে মোফা মাকে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসে। ওর নটে গাছটিও সাথে মুড়োয়।

১১.
গল্পের শেষটা আমার কাছে একেবারেই ভালো লাগে না। মোফা শালা ধোলাই খাচ্ছিলো, ততটুকু শুনতে বেশ ভালোই লাগছিলো, কিন্তু শেষমেষ কুন্তু আর খান্তুর নখড়ামোর আখ্যান শুনে পিত্তি জ্বলে ওঠে। নাহয় খানিকটা ধোলাই খেয়েছে, অত খাতিরের দরকারটা কি রে বাবা?

পরশ্রীকাতরতায় আমি জ্বলতে থাকি, তারই আগুন জ্বলে ওঠে আমার প্রশ্নে, ‘তাই? আর সেই পিচ্চিটার নাম রাখার কী হলো?  যে কাজে গিয়েছিলি, সেটাই না করে চলে এলি?’

মোফা গম্ভীর হয়ে বলে, ‘মোটেও না। মনিকা খালাকে চলে আসার আগে আরেকটা নাম দিয়ে এসেছি।’

আমরা সবাই একটা নিস্তব্ধ ঈর্ষাজর্জর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি মোফার দিকে।
মোফা চায়ের কাপে চুমুক দেয় আর আপনমনে বকে যায়। ‘মনিকা খালার এই মেয়েটা পুরো তার বাপের মতো হয়েছে দেখতে। একেবারে কৃষ্ণকলি, ইয়া মুশকো চেহারা, এই ক’দিন বয়স, এখনই নাক ডাকিয়ে ঘুমায়। মনিকা খালুর টনিকের স্বপ্ন তো পূরণ করবেই, ব্যবসা দেখার দায়িত্বও বোধহয় খালু এর হাতেই ছাড়বে।  তাই একটা যুৎসই, সামঞ্জস্যপূর্ণ নাম ভেবে বার করলাম, সাথে অন্তমিলের শ্যাম আর আধুনিকতার কূল দুটোই বজায় রাখলাম।’

‘কী সেটা? ধনিকা?’ জানতে চায় শিবলি। ‘মানে, যে মেয়ে খুব ধনী?’

‘উঁহু।’ মোফা মাথা নাড়ে। ‘সেটা সেকেলে শোনায়। আমার দেয়া নামটা মিষ্টি, বণিকা।  অর্থাৎ কি না, যে মেয়ে ব্যবসা করে। মনিকা খালু বন্তু বলে ডাকছেন এখন। আমি আবার মনিকা খালাকে একেবারে ডিকশনারি খুলে দেখিয়ে দিয়ে এসেছি, যে নামের একটা ভালো অর্থ আছে।’

আমরা মোফার ক্ষতবিক্ষত মুখে একটা তৃপ্ত হাসি ফুটে উঠতে দেখি।

আমি খাঁটি বাঙালি, অপর বাঙালির সুখী মুখ দেখলে আমার গা জ্বালা করাটাই স্বাভাবিক, কিন্তু কেমন একটা অস্বাভাবিক মাত্রাছাড়া গাত্রদাহ হতে থাকে আমার। মনে মনে ভাবি, ‘ব্যাটা বেক্কল, শালির নাম রাখার আনন্দে বত্রিশ দাঁত বের করে হাসছে!’


2 comments:

  1. হিমু ভাই,
    অনেক দিন পরে একটা এত বড় লিখা পড়লাম। লিখাটির স্বাস্থ্য মাসাআল্লাহ। সচলায়তনে প্রকাশিত হয়েছে নাকি? কিন্তু আমি সচলায়তন খুলতে পারছি না। আপনারা কবে নাগাত সচলায়তন পূর দমে চালু করবেন?

    কিছু মনে করবেন না। জানতে আগ্রহ বোধ করছি । লিখাটি পুর বাংলায় ব্লগে লিখতে আপনার কর সময় লেগেছে। আপনি কি অভ্র ব্যাভার করেন।

    ReplyDelete
  2. Anonymous21 June, 2007

    ব্লগে নতুন করে লেখার প্রয়োজন পড়েনি। এস এম মাহবুব মুর্শেদ-অরূপ কামাল জুটির তৈরি কনভার্টার ব্যবহার করে বিজয়ে লেআউটে লেখা টেক্সট কনভার্ট করেছি, তারপর পেস্ট করে দিয়েছি।

    সচলায়তনের ব্যাপারে আপনার আগ্রহের কথা জেনে ভালো লাগলো, আরো কিছু পরীক্ষানিরীক্ষার পর সচলায়তনকে উন্মুক্ত করা হবে। ধন্যবাদ।

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।