Thursday, June 07, 2007

চিহ্ন (প্রথম খন্ড)



ধারাবাহিক রহস্যগল্প। শুরু করেছিলাম সামহোয়্যার ইনে। টুকরো টুকরো করে বাড়বে এটা। সাথে থাকুন।



নগ্ন নারীদেহের প্রতি আকর্ষণ কি আমার স্মৃতির সমান বয়সী? চোখ বন্ধ করলো কায়েস, যেন উত্তরটা চোখের সামনের অন্ধকারে ফুটে উঠবে।

তার সামনে বিছানায় পড়ে থাকা শরীরটার দিকে আবারও তাকাতে হলো কায়েসকে। বিছানার চাদরের রং হালকা নীল, এর ওপরে বাদামী শরীরটা ঘরের মলিন আলোর সাথে রং মিলিয়ে ফুটে আছে। হালকা সবজে রং করা নখ, চমৎকার পায়ের পাতা, গোড়ালি, মসৃণ কাফ, হাঁটু বেয়ে ঊরুর কাছে এসে কায়েসের চোখ একটু মন্থর হয়ে পড়ে নিজ থেকেই। বাম পা টা একটু ভাঁজ হয়ে আছে, ডান পা টা সটান সোজা। কায়েস জোর করে চোখ সরিয়ে নেয় টোল পড়া খয়েরি ঊরুসন্ধি থেকে। শরীরটা এরপর ছোট্ট, অগভীর নাভি হয়ে বয়ে গেছে নিটোল, সতেজ একজোড়া বুকের দিকে। কায়েস সেদিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মৃত্যুর একটা কুৎসিত ক্ষমতা আছে সুন্দর জিনিসের প্রতিও বিতৃষ্ণা জাগানোর। এই মুঠোভরা স্তন, গাঢ় খয়েরি বৃত্তের মাঝে বাদামী বৃন্ত, সবই ভালো লাগতো তার দেখতে, কিন্তু বিছানার ওপর পড়ে থাকা শরীরটা মৃত।

শারমিন মনোযোগী বিতৃষ্ণা নিয়ে কায়েসকে দেখছিলো, সে এবার চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, "তোমার দেখা শেষ?"

কায়েস একটু চমকে ওঠে শারমিনের গলার বিষাক্ততা টের পেয়ে, এক হাতে কপালের ওপর থেকে চুল টেনে মাথার ওপর তুলে বলে, "ইয়ে ... ডক্টর মালিক কোথায়?"

শারমিন তপ্ত চোখে তাকিয়ে থাকে কায়েসের দিকে। কায়েস শারমিনের দিকে চোখ রাখতে না পেরে চোখ সরিয়ে নেবার চেষ্টা করে, বিছানায় পড়ে থাকা মৃত, নগ্ন দিলনাজ দুররানির বিকৃত, বীভৎস চেহারাটা কেন যেন চুম্বক হয়ে তার দৃষ্টি ধরে রাখে।

কায়েস একটু পিছিয়ে গিয়ে ঘরের দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়। ওয়াইনের কল্যাণেই কি না কে জানে, তার চোখের সামনে সবকিছুই মনে হচ্ছে স্বচ্ছ কোন তরলের মধ্যে ডোবানো, মাঝে মাঝেই পৃথিবী দুলে উঠছে মৃদুলয়ে।

কেন আমি এই ঘরে দাঁড়িয়ে আছি? নিজেকে প্রশ্ন করলো কায়েস মনে মনে।

শারমিন ঘুরে দাঁড়ালো ঝট করে। তার চোখে রাগের হল্কা এখনো কাটেনি। "মানে?" চাপা গলায় হিসিয়ে ওঠে সে।

কায়েস চমকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। কী আপদ, মনে মনে প্রশ্নগুলি যদি জোরে জোরে হয়ে যায় তাহলে দেশটা চলবে কিভাবে?

শারমিনের দিকে তাকিয়ে কায়েস একটু বিস্ময় বোধ করে। শুরুতে আঁতকে উঠলেও সামলে নিয়েছে শারমিন। একটা আবছা পর্দা নেমে এসেছে মুখের অভিব্যক্তিতে, কিন্তু নিরুপমা ফৌজদারের মতো এতোটা বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে না তাকে।

কায়েস আড়চোখে নিরুপমা ফৌজদারের দিকে তাকায়। ঘরের বামদিকে নিচু সোফার ওপর এলিয়ে পড়ে আছেন মহিলা। কায়েস আড়চোখে শারমিনের দিকে তাকিয়ে সতর্ক হয়ে ওঠে, শারমিন কঠিন, সরু চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকেই।

ভেতরে ভেতরে একটু বিদ্রোহ করে ওঠে কায়েসের মনটা। আমি একজন লেখক, রীতিমতো কষ্ট করে এবার মনে মনে বলে সে, একেবারে সিনেমার স্ক্রিপ্টরচয়িতা যাকে বলে। আমার কাজই হচ্ছে পর্যবেক্ষণ। এখন প্রতিটা ঘটনা আমাকে খুঁটিয়ে দেখতে হবে একশো চোখে। শারমিনকে এখন আমি পরোয়া করি না।

কায়েস এবার ঘাড় ঘুরিয়ে মিসেস ফৌজদারকে দেখতে থাকে। মিসেস ফৌজদারের বয়স দিলনাজের চেয়ে দুয়েক বছর বেশিই হবে, সৌন্দর্যে তিনিও দিলনাজের চেয়ে কম যান না। তবে শোকের মূহুর্তে (নাকি শকের মূহুর্তে, কায়েস কষ্ট করে আবার মনে মনে ভাবে, আর এই পান এর জন্য নিজের পিঠ নিজেই চাপড়ে দিতে চায়) সোফায় এলিয়ে পড়লেও কায়েসের মতো দুষ্টু লোকজনের দৃষ্টির জন্য কোন কিছু বরাদ্দ রাখেননি তিনি, তাঁর চমৎকার আকাশের নকশা কাটা শাড়ি সবকিছু মাপজোক করে ঢেকে রেখেছে। কায়েস নিরুপমা ফৌজদারের গ্রীবাদেশের দিকে তাকিয়ে আনমনে ভাবে, কপাল বটে মনসুর ফৌজদারের।

শারমিন আবারও ঘাড় ফিরিয়ে তাকায় কায়েসের দিকে। "কী?" ফিসফিসিয়ে বলে সে।

কায়েস বিরক্ত হয়। বলে, "কিছু না।"

কায়েসের কণ্ঠ হয়তো বিরক্তির চাপেই দুয়েক পর্দা চড়ে গিয়েছিলো, সোফার ওপর ঝুঁকে পড়া স্ত্রীকে সান্ত্বনারত মনসুর ফৌজদার ঘাড় ফিরিয়ে তাকান কায়েসের দিকে। কায়েস শুনতে পায় তিনি বলছেন, "কামরান সাহেব, একটু দেখবেন মালিক কোথায়?"

কায়েসের চোখ আবারও চলে যায় দিলনাজের নিথর শরীরের দিকে। অপচয়। এই মৃত্যু এক বিশাল অপচয়।

তার চটকা ভাঙে শারমিনের চাপা ধমকে, "কায়েস, মনসুর ভাই কী বলছেন তোমাকে? ডক্টর মালিককে একটু ডেকে আনো!"

কায়েস চমকে ওঠে এবার। তার নামের এই অংশটায় সে অভ্যস্ত না। নিজের নামটা মনে মনে হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখে সে। কায়েস কামরান। কেমন একটা নাম! কামরান কায়েস হলে কি আরেকটু ভালো শোনাতো? উঁহু। যে-ই লাউ সে-ই কদু। নাকি একটা জবরদস্ত পদবী যোগ করা উচিত ছিলো নামটার লেজে বা মুড়োয়? কায়েস কামরান ফৌজদার! নাহ, ফৌজদার নামটা পছন্দ না তার, কায়েস কামরান তোপদার? কিংবা মনসবদার কায়েস কামরান?

এবার শারমিন একটু ঠেলে দেয় তাকে হাতে ধরে দরজার দিকে। কায়েস লজ্জিত হয়ে ওঠে হঠাৎ। একটা সুন্দরী মেয়ে ন্যাংটা হয়ে মরে আছে ঘরের মধ্যে, তা-ই দেখে আরেকটা সুন্দরী মেয়ে ফিট হয়ে পড়ে আছে, আর সে কি না ব্যাটাছেলে হাঁ করে এসব দেখছে? এ জন্যেই তো তাকে আরেকটা সুন্দরী মেয়ের ধাক্কা খেতে হলো। ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে কায়েসের আবার মনে হলো, মনসুর ফৌজদার আসলেই ললাটবান লোক। না হলে কেন কায়েসকে বেরিয়ে যেতে হচ্ছে ঘর ছেড়ে, আর ঐ ব্যাটা দিব্যি দাঁড়িয়ে সব দেখছে?

করিডোরে বেরিয়ে এসেই কায়েস ধাক্কা খায় ডক্টর মালিকের সাথে।

মালিক আবদুল হক পাক্কা ছয় ফুট লম্বা, সেইরকম চওড়া, কায়েস এর আগেও একদিন তার সাথে ধাক্কা খেয়ে ব্যথা পেয়েছে, কিন্তু কষ্টেসৃষ্টে চেহারায় একটা হাসি ফোটালো সে। "ডক্টর, আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন মনসুর সাহেব ...।"

মালিকের দশাসই চেহারার তুলনায় কণ্ঠস্বর অনেক মিহি, অনেকটা শচীন টেন্ডুলকারের মত। "আই নো!" কায়েসকে একরকম ঠেলেই ঘরের ভিতর ঢুকে গেলো সে। কায়েস বাইরে দাঁড়িয়ে শুনতে পেলো, মালিক আঁতকে উঠে চেঁচাচ্ছে, "ইয়া খোদা!"

কায়েস কাঁধ ডলতে ডলতে আবার ঘরে ঢুকলো।

মনসুর ফৌজদার মাঝারি উচ্চতার মানুষ, তার পাশে মালিককে দেখাচ্ছে দুঃখী একটা গরিলার মতো। সে প্রায় ফুঁপিয়ে উঠে বললো, "হোয়াট হ্যাপেন্ড স্যার ...?"

মনসুর ফৌজদার শীতল কণ্ঠে বললেন, "সেটা আপনাকেই আপাতত বার করতে হবে ডক্টর।"

মালিক এগিয়ে গিয়ে সন্তর্পণে ঝুঁকে বিছানায় পড়ে থাকা দিলনাজের গলায় হাত রাখলো। কয়েক সেকেন্ড পর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে সে ধরা গলায় বললো, "শী ইজ ডেড স্যার!"

মনসুর ফৌজদারের চেহারায় কোন পরিবর্তন লক্ষ করতে পারলো না কায়েস, শুধু পিঠের পেছনে বেঁধে রাখা হাতটা মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেলো।

নিরুপমা ফৌজদার ওদিকে সোজা হয়ে বসেছেন, ডক্টর মালিক এবার তার দিকে এগিয়ে গেলো। "আর ইউ অলরাইট ম্যাম?"

নিরুপমা মুখে একটা হাত চাপা দিয়ে ফুঁপিয়ে শ্বাস নিলেন। "দিলনাজ ... দিলনাজ ...।" একটা হাহাকার বেরিয়ে এলো তাঁর কণ্ঠ থেকে।

মনসুর ফৌজদার মালিকের দিকে ফিরে কঠিন কন্ঠে বললেন, "মালিক, দিলনাজ কিভাবে মারা গেলো?"

মালিক একটা রুমাল বার করে ঘাড় মুছলো। কিছু বললো না।

শারমিন নিচু গলায় বললো, "স্যার, আপনার মনে হয় পুলিশে ফোন করা উচিত।"

নিরুপমা ফৌজদার আবারও ফুঁপিয়ে উঠলো।

মনসুর ফৌজদার কিছু বললেন না, তীব্র চোখে শুধু তাকিয়ে রইলেন ডক্টর মালিকের দিকে।

মালিক গলা খাঁকরে বললো, "আই থিঙ্ক শী হ্যাজ টেকেন সাম পয়জন স্যার।"

ঘরে সবাই হঠাৎ চুপ করে গেলো।

কায়েস এই নীরবতার মধ্যে কোন কিছু খুঁজে না পেয়ে আবার তাকালো দিলনাজ দুররানির মৃতদেহের সাথে। চমৎকার একটা বাদামী শরীর ছাড়া ঘরের আর সবকিছু তার কাছে অচেনা উদ্ভিদের মতো মনে হতে লাগলো। দিলনাজ, দুরন্ত দিলনাজ, আজ বিকেল বেলাও কায়েস তাকে চোরাচোখে দেখে বারবার মুগ্ধ হচ্ছিলো, কী চমৎকার শরীরের বাঁধন, কী অদ্ভুত মিষ্টি কণ্ঠস্বর ... এখন সে মরে পড়ে আছে একটা কলাগাছের মতো।

ঘরে সবাই একসাথে সরব হয়ে ওঠে, আর এর মধ্যেই করিডোরে ভেসে আসে একটা পায়ের আওয়াজ। কয়েক সেকেন্ড পরই হন্তদ্ত হয়ে একটা শরীরের ঝলক ঢুকে পড়ে ঘরের মধ্যে।

"হেই, কী হচ্ছে ...।" লানার কথাটা যেন হঠাৎ দেয়ালের সাথে ধাক্কা খেয় স্তব্ধ হয়ে যায়। আবার বিশ্রী নীরবতা নেমে আসে ঘরের মধ্যে।

"বাবা? হোয়াট'ম গোয়িং অন?" ঘড়ঘড়ে একটা প্রশ্ন ভেসে আসে লানার কাছ থেকে।

মনসুর ফৌজদার অস্বস্তিভরে এগিয়ে যান মেয়ের দিকে। "লানা, মামণি, শান্ত হও। তোমার দিলনাজ আন্টি মারা গেছেন।"

লানার ছোট্টখাট্টো কিশোরী শরীরটা এবার বিচিত্র একটা যন্ত্রণায় যেন এঁকেবেঁকে ওঠে। মনসুর ফৌজদার মেয়েকে জড়িয়ে ধরতে যান, কিন্তু লানার চিৎকারে ফৌজদার ভিলার প্রত্যেকটা জানালার কাঁচ যেন ঝনঝন করে ওঠে। এরই সাথে তাল মিলিয়ে অনেক দূরে ডেকে ওঠে কয়েকটা কুকুর।

কায়েস আবার দেয়ালে হেলান দেয়। নিরুপমা ফৌজদার আবারও এলিয়ে পড়েছেন সোফার ওপর। কায়েসের দৃষ্টি তাঁর মুখ থেকে পিছলে গলা বেয়ে নেমে আসে খানিক উন্মুক্ত বুকের খাঁজের দিকে। কায়েস টের পায়, শারমিন তীব্র চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে, কিন্তু সে পরোয়া করে না। জাহান্নামে যাক সব কিছু।

মনসুর ফৌজদার অস্বস্তিভরে তাকালেন শারমিনের দিকে, বুকে শক্ত করে লানাকে জড়িয়ে ধরে আছেন তিনি। কান্নার দমকে লানার পিঠ কেঁপে কেঁপে উঠছে, অস্পষ্ট গোঙানির শব্দ বেরিয়ে আসছে তার মুখ থেকে।

শারমিন এগিয়ে গিয়ে লানার কাঁধে হাত রাখলো। "লক্ষ্মী মেয়ে লানা ... চলো আমার সাথে নিচে ...।"

লানার ছোটখাটো শরীরটা একটা বিস্ফোরণের মতো বেরিয়ে এলো মনসুর ফৌজদারের আলিঙ্গন ছিঁড়ে। "আমাকে ছোঁবে না!" তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠলো সে। "যাও তুমি এখান থেকে!"

শারমিন বিব্রত মুখে তাকালো মনসুর ফৌজদারের মুখের দিকে। লানা শারমিনকে পছন্দ করে না একেবারেই।

মনসুর মেয়েকে আবার হাত বাড়িয়ে কাছে টানলেন। "শারমিন, একটু দেখবে আসমা কোথায়?"

শারমিনকে কষ্ট করে দেখতে হলো না আর, আসমা, লানার দেখভালের কাজে নিয়োজিত বুয়া রকেটের মতো ছুটে ঘরে ঢুকলো।

"কী হইছে? হইছে কী?" হাঁপাতে হাঁপাতে বললো আসমা। প্রায় সাথে সাথেই দিলনাজের নগ্ন মৃতদেহ চোখে পড়লো তার। "আস্তাগফিরুল্লাহ! ঐ ম্যাডামের কী হইছে?" মুখে হাত চাপা দিলো আসমা।

মনসুর ফৌজদার শক্ত হাতে লানাকে ঠেলে দিলেন আসমার দিকে। "আসমা, মামণিকে একটু নিচে নিয়ে যাও। একটু ঠান্ডা শরবত খেতে দাও ওকে।"

নিরুপমা ফৌজদার ওদিকে সোফায় উঠে বসেছেন, তিনি জড়ানো গলায় বললেন, "উহ!"

মনসুর ফৌজদার নিরুপমার দিকে না তাকিয়েই বললেন, "রহমানকে বোলো ব্র্যান্ডি নিয়ে ওপরে আসতে। আমরা তিনজন।"

কায়েস মনে মনে ভাবলো, কী ব্যাপার, মনসুর সাহেব মদের ব্যাপারে এমন লৈঙ্গিক কেন? নিরুপমা আর শারমিন বাদ পড়লো কেন?

মালিক মিনমিন করে বললো, "আসমা, আমি একটু পানি খাবো।"

কায়েসের মনে পড়ে গেলো, মালিক অ্যালকোহল স্পর্শ করে না। শারমিনও না। মনসুর ফৌজদারের ওপর শ্রদ্ধা বেড়ে গেলো তার। এমন একটা ঘটনার পরও কে কী খায় না খায় সেটার হিসেব রাখা সহজ নার্ভের কথা নয়। সাধে কি ব্যাটা এত উন্নতি করেছে জীবনে? কায়েস মনে মনে শপথ নেয়, সে-ও কাল থেকে লোকের মদ খাওয়ার হিসেব রেখে চলবে।

শারমিন মৃদু কিন্তু স্পষ্ট গলায় বললো, "দিলনাজ বিষ খাবে কেন?"

কথাটা ধাক্কার মতো লাগলো সবার গায়ে। মনসুর ফৌজদারের মুখটা বিবর্ণ হয়ে গেল, নিরুপমা ফৌজদার মুখে আঁচল চাপা দিলেন, মালিক রুমাল দিয়ে ঘাড় মুছতে লাগলো মুখ নিচু করে। কায়েস এই প্রথমবারের মতো ঘটনাটার পেছনে একটা স্পষ্ট ব্যাখ্যার অভাব বোধ করলো। দিলনাজ দুররানি, এখনকার সেরা ইন্টেরিয়র ডিজাইনারদের একজন, কোন দুঃখে বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করলো?

কায়েস ওয়াইনের ঘোরেই হয়তো শারমিনের কথার লেজ ধরলো, "জামা খুলেই বা কেন দিলনাজ বিষ খাবে?"

শারমিন কড়া চোখে তাকালো কায়েসের দিকে, তার চোখ বলছে, তুমি এর মধ্যে কিছু বলতে এসো না। কিন্তু কায়েস পরোয়া করলো না, সে জানে তার কথাটা নেহায়েত ফ্যালনা হয়নি। বিষ যদি খেতেই হয়, তাহলে পর্দাপুশিদা সামলেই খাওয়া যেতো। ওরকম দিগম্বরী হয়ে কে কবে বিষ খেয়ে মরেছে?

শারমিন এবার আরো শক্ত বোমা ফাটালো, "এই বাড়িতে, আজকের দিনে, এই ঘরে কেন বিষ খাবে দিলনাজ?"

মনসুর ফৌজদার বসে পড়লেন সোফায়।

মালিক ঘড়ঘড়ে গলায় বললো, "মিস খান, আপনি কী বলতে চাইছেন প্লিজ?"

শারমিনের চোয়ালটা শক্ত হয়ে গেলো। সে এবার আরেকটু জোরে বললো, "আমার মনে হয় আমাদের উচিত পুলিশকে খবর দেয়া।"

মনসুর ফৌজদার ক্লান্ত গলায় বললেন, "শারমিন, তুমি কি একটু কষ্ট করে ফোন করবে থানায়? আই ডোন্ট ফিল ভেরি ওয়েল ...।" নিজের মোবাইলটা পকেট থেকে বার করে দিলেন তিনি। "ও.সি. ইকবালের নাম্বার সেভ করা আছে এটাতে।"

শারমিন মোবাইল নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলো। শারমিনের পাশ ঘেঁষে নিঃশব্দে ঘরে ঢুকলো এক যুবক।

"কোন সমস্যা স্যার?" বিছানায় পড়ে থাকা দিলনাজ দুররানির দিকে চোখ রেখে জিজ্ঞেস করলো সে।

মনসুর ফৌজদার তার দিকে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করলেন না। কায়েস একটু অবাক হয়ে তাকালো মুস্তাফার দিকে। কোন ভাবের লেশ নেই তার চেহারায়, যেন খবর পড়তে এসেছে এখানে।

মুস্তাফা দিলনাজের দিকে চোখ না সরিয়ে কায়েসকে নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করলো, "কায়েস ভাই, ঘটনা কী? দিলনাজের কী হয়েছে?"

কায়েস এদিক ওদিক তাকিয়ে চেয়ার খুঁজতে লাগলো। তার হঠাৎ দাঁড়িয়ে থাকতে বিরক্ত লাগছে। মুস্তাফার সুদর্শন বেওকুফ চেহারার দিকে তাকিয়ে তার মেজাজ আরো এক পর্দা চড়লো। একটা মেয়ে খাটের ওপর ন্যাংটা হয়ে মুখ ভেটকে পড়ে আছে কলাগাছের মতো, তার আশেপাশে লোকজন বসে আছে বিধ্বস্ত চেহারা নিয়ে, আর মুস্তাফা ঘটনা বুঝতে পারছে না। ছাগল কোথাকার।

রহমান নিঃশব্দে ঘরের ভেতরে ঢুকলো, হাতে একটা ট্রে। তার ওপর তিনটা গ্লাস, বরফের টাম্বলার আর একটা পেটমোটা বোতল। কায়েসের ভেতরে পিপাসা বেড়ে গেলো হঠাৎ।

রহমান নিঃশব্দে নিচু টেবিলটার ওপরে ট্রেটা রেখে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। কায়েস লক্ষ করলো, রহমান ভুলেও দিলনাজের মৃতদেহের দিকে তাকাচ্ছে না। কায়েসের চোখ চলে যায় মুস্তাফার দিকে, ছোকরা একেবারে হাঁ করে দেখছে দিলনাজের শরীরটাকে। শালা। কায়েস সিদ্ধান্তে পৌঁছায়, সে মুস্তাফাকে পছন্দ করে না।

চেয়ারে বসে কায়েস একটু এলিয়ে দেয় শরীরটাকে। মনসুর ফৌজদার রহমানকে নিচু গলায় কী যেন বলেন, রহমান বেরিয়ে যায় ঘর ছেড়ে। মালিক রুমাল বার করে নিজের মুখ মোছে আবারও।

কায়েস চোখ বন্ধ করে ভাবতে চেষ্টা করে গোটা দিনটার কথা।

মনসুর ফৌজদার আজ সবাইকে ডেকেছিলেন "জাহাজডুবি" নিয়ে কথা বলতে। জাহাজডুবি একটা মাঝারি দৈর্ঘ্যের টেলিফিল্ম, যার কাহিনী কায়েসের কীবোর্ড দিয়েই বেরিয়েছে। মনসুর ফৌজদার এর আগেও বেশ কিছু টেলিফিল্মের পেছনে টাকা খরচ করেছেন, সম্প্রতি শারমিন তাঁকে রাজি করাতে পেরেছে এই জাহাজডুবির প্রযোজনায়।

শারমিনের কথা মনে পড়তে কায়েস তাকালো দরজার দিকে। ওসিকে ফোন করতে এত দেরি হচ্ছে কেন ওর?

কায়েস নিজের বান্ধবীর কথা ভাবতে গিয়ে মনে মনে হোঁচট খায়। আজকে ফেরার পথে শারমিন তাকে একগাদা কথা শোনাবে। এভাবে দিলনাজ দুররানিকে দেখার মাশুল কায়েসকে গুনতেই হবে। শারমিন জাহাজডুবির পরিচালিকা, কিন্তু মাঝেমধ্যে সে কায়েসকেও পরিচালনার আওতায় নিয়ে আসতে চায়।

পাশে দাঁড়ানো মুস্তাফার দিকে একবার বিতৃষ্ণ চোখে তাকালো কায়েস। এখনো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দিলনাজকে দেখছে বেওয়াকুফটা। এই ব্যাটা হবে জাহাজডুবির নায়ক। নায়িকা মিথিলার সাথে একটা ছোট্ট লাইফবোটে করে সাগরে ভেসে বেড়াবে সে গোটা সিনেমা জুড়ে। বাস্তব জীবনে এমন ঘটনা ঘটলে মিথিলার কপালে দুঃখই ছিলো।

রহমান ঘরে ঢোকে একটা ভাঁজ করা সাদা চাদর নিয়ে। তারপর দ্রুত হাতে সেটা খুলে ঢেকে দেয় দিলনাজকে। মুস্তাফার কণ্ঠ থেকে একটা হতাশ ঘড়ঘড়ে শব্দ বেরিয়ে আসে। মালিক ঘুরে দাঁড়িয়ে একবার দেখে নেয় মুস্তাফাকে।

কায়েস আবারও ঘটনাটার কথা ভাবে। সে আর শারমিন স্টাডিতে বসে কথা বলছিলো মনসুর ফৌজদারের সাথে, এমন সময় রহমান নক করে ঘরে ঢোকে। সোজা মনসুর ফৌজদারের পাশে গিয়ে কানে কানে একটা কিছু বলে। মনসুর ফৌজদার ভুরু কুঁচকে তাকান তার দিকে, তারপর শারমিনকে বলেন, "শারমিন, একটু এসো তো আমার সাথে।"

কায়েস শারমিনের দিকে তাকায় সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে। শারমিন উঠে বেরিয়ে যায় মনসুর ফৌজদারের সাথে। কায়েস স্টাডির নিঃশব্দ পরিবেশে মিনিটখানেক বসে থেকে সিদ্ধান্ত নেয়, বেরিয়ে গিয়ে ড্রয়িংরূমে একটু বসবে সে। স্টাডির দরজা খুলে সে বেরিয়ে আসে, তারপরে কী মনে করে ড্রয়িংরুমের দিকে না গিয়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যায়। সিঁড়ি বেয়ে তখনও উঠছে রহমান, তার পেছন পেছন মনসুর ফৌজদার আর শারমিন। কায়েস অনুসরণ করে তাদের। কায়েসকে দেখতে পেয়ে মনসুর ফৌজদার কিছু বলেন না, শারমিন শুধু একটু পিছিয়ে পড়ে কায়েসের সঙ্গ ধরে ফিসফিস করে বলে, "তুমি আবার আসছো কেন?"

কায়েস গম্ভীর হয়ে বলে, "একমাত্র মূলধন নিয়ে আসছি।"

শারমিন চুপ করে যায়। কায়েসের প্রিয় বুলি এটা। তার একমাত্র মূলধন নাকি কৌতূহল।

তবে ঘরে ঢুকে এ দৃশ্যটা দেখার জন্য প্রস্তুত ছিল না কেউই। বিছানার ওপর নিঃসাড়ে পড়ে আছে দিলনাজ, আর সোফার উপর ঢলে পড়ে আছেন নিরুপমা ফৌজদার।

কায়েসের মনে পড়ে, সে সাথে সাথেই তাকিয়েছিলো মনসুর ফৌজদারের দিকে। ভদ্রলোক প্রচন্ড চমকে উঠেছিলেন।

কায়েস শারমিনের নার্ভের প্রশংসা না করে পারলো না। শারমিন একটা অস্ফূট শব্দ করে উঠলেও এগিয়ে গিয়ে দিলনাজের গায়ে হাত রেখে মৃদু ধাক্কা দিয়ে ডাক দিয়েছিলো, "দিলনাজ!"

মনসুর ফৌজদার স্ত্রী নিরুপমার দিকে ঝুঁকে পড়ে তাকে মৃদু গলায় ডাকছিলেন, "নিরু! নিরু!"

শারমিন দিলনাজের নাকের সামনে হাত ধরে বিবর্ণ মুখে উঠে দাঁড়িয়ে বলেছিলো, "শ্বাস পড়ছে না!"

মনসুর ফৌজদার তখন শুধু বলেছিলেন, "ওহ নো!"

শারমিন ফোন হাতে ঘরে ঢোকে। মনসুর ফৌজদারকে বলে, "স্যার, পুলিশ আসছে কিছুক্ষণের মধ্যে।"

মুস্তাফা ফ্যাকাসে মুখে বলে, "পুলিশ?"

...

No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।