Thursday, May 31, 2007

সংভক্ষকদের জন্য বিশেষ ছাড়



১.
খবরের কাগজ খুলে প্রধান বন সংভক্ষক টারজান গণির চেহারা দেখে প্রকৌশলী মোহাম্মদ গোলাম এ খোদার চোখে তীব্র জলের চাপ অনুভূত হলো। শিক্ষিত একজন মানুষ, নামের গোড়ায় একটা বিচিঅলা ড দেখা যাচ্ছে, মানে ডক্টরেট করেছেন। কিন্তু আজ তার কী হাল! বিধির কী বিচিত্র বামপন্থা, আজ এই মেধাবী মানুষটিকে নিয়ে পুলিশ আর সাংবাদিকরা টানাহ্যাঁচড়া করছে। বিছানার তোষক, চালের ড্রাম, শালির পেটিকোট, কিছুই উল্টে দেখতে বাকি রাখছে না তারা। টাকাই কি সব? ইজ্জত আব্রুর কি কোন মূল্য নাই এই দেশে? মানী লোকের মান থাকছে না, টাকা দিয়ে হবেটা কী?

এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢোকেন প্রকৌশলী খোদার স্ত্রী মিসেস খোদা। তাঁর চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ।

"শুনছো নাকি? লায়লা আপার বড় ভাইরে নাকি পুলিশে ধরছে! টাকাপয়সা নাকি ঘরদোর থেকে সব নিয়া যাইতেছে! তোষক ফাইড়া বলে টাকাপয়সা বাইর করছে! শুনছো কী হইতাছে?"

প্রকৌশলী খোদা অশ্রুসজল চোখে খবরের কাগজ বাড়িয়ে ধরেন মিসেস খোদার দিকে। লায়লা আপার বড় ভাইয়ের হোগামারাখাওয়া চেহারা দেখে মিসেস খোদা চোখে আঁচল চাপা দেন।

প্রকৌশলী খোদা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ভাবেন, তাঁর কী হবে?

মিসেস খোদাও একই প্রশ্ন করেন, "আমাগো কী হইবো?"

প্রকৌশলী খোদা দুর্বল গলায় বলেন, "চালের ড্রাম থেকে টাকাগুলা সরাইতে হইব, বুজছো টুম্পার মা?

মিসেস খোদা বলেন, "তোষকটারেও তো ফাইড়া বাইর করতে হইবো!"

প্রকৌশলী খোদা বলেন, "কই রাখন যায় কও তো?"

মিসেস খোদা বলেন, "প্লাস্টিকের ব্যাগে ভইরা পানির টাঙ্কিতে চু্বাইয়া রাখলে কেমন হয়?"

প্রকৌশলী খোদা বলেন, "পাড়া পড়শী দেইখা ফালাইলে আরো বিপদে পড়বা। ঘরের বাইরে রাখন ঝামেলা। ঘরের ভিতরে কই রাখন যায় কও।"

মিসেস খোদা অস্থির হয়ে ওঠেন। "ফুলের টবের ভিতরে?"

প্রকৌশলী খোদা মাথা নাড়েন। "ফুলের টবের ভিতরে এত টাকা কেমনে রাখবা? এইটা কি দশবিশহাজার টাকা? দুই কুটি টাকা তুইলা আনছি ব্যাঙ্ক থিকা। কয়েক কিউবিক ফিট টাকা। ফুলের টবে রাখা যাইবো না।"

মিসেস খোদা ডুকরে ওঠেন, "হারামীর বাচ্চারা যে ক্যান দশ হাজার ট্যাকার নোট বাইর করে না! এহন এত ট্যাকা কই লুকাই?"

ভাবতে ভাবতেই প্রকৌশলী খোদার চোখে পড়ে খবরের কাগজের পেছনের পাতার বিজ্ঞাপন। বড় বড় হরফে লেখা:

সংভক্ষকদের জন্য বিশেষ ছাড়!

তার নিচে একটা মোবাইল নাম্বার দেয়া।


২.

প্রকৌশলী খোদা যতদূর সম্ভব ছদ্মবেশে এসেছেন। ব্যাপারটা ফাঁদ কি না তা চেক করার জন্য আগে নিজের শালাকে পাঠিয়েছিলেন। শালার রিপোর্ট শুনে আশ্বস্ত হয়ে এখন নিজেই এসেছেন, কিন্তু সাবধানের মার নাই। পরচুলাটা মাঝে মাঝে হাত দিয়ে পরখ করে দেখছেন, জিনিসটা খারাপ না।

কিন্তু লোকটা অতীব ধুরন্ধর, তাঁকে দেখেই খিলখিল করে হেসে ওঠে। বলে, "পরচুলা লাগিয়ে আসার কোন দরকার ছিলো? অ্যাঁ? এত অবিশ্বাস নিয়ে কাজ করা যায়?"

প্রকৌশলী খোদা একটু চটে যান মনে মনে, কিন্তু রাগ সামলে বলেন, "সাবধানের মার নাই।"

লোকটা হাসে। "তা ঠিক। চুরিদারি করলে সাবধানে থাকাই ভালো।"

প্রকৌশলী খোদা এবার ভীষণ ক্ষেপে ওঠেন। তাকে এভাবে মুখের ওপর চোর বললো? তিনি বললেন, "দেখুন ...।"

লোকটা গম্ভীর হয়ে যায়। বলে, "দেখাবেন না। কোন কিছু দেখাবেন না। অনেক দেখেছি। আমার কথা শুনলে ঐ গাধার বাচ্চা টারজান গণি আজ নিশ্চিন্তে অফিসে বসে কাজকাম করতে পারতো। কথা শোনেনি বলেই হাজতে বসে লপসি খাচ্ছে। সে-ও আমাকে আপনার মতো দেখাতে এসেছিলো। দেখে শিখুন। ঠেকে শিখবেন না।"

প্রকৌশলী খোদা একটু ঠান্ডা মেরে যান।

লোকটা এবার একটা কটন বাড বার করে বলে, "কত টাকা লুকাতে হবে?"

প্রকৌশলী খোদা এমন সোজাসাপ্টা কথায় একটু বেসামাল হয়ে বলেন, "এই ... ধরেন গিয়া ... দুই কুটি?"

লোকটা বলে, "হুম। পাঁচশো টাকার নোটে দুই কোটি টাকা মানে চল্লিশ হাজার নোট। এক লাখ টাকার বান্ডিল করলে দাঁড়াবে দুইশো বান্ডিল। কম না।"

প্রকৌশলী খোদা বলেন, "ঘরে রাখতে সাহস পাইতাছি না। ব্যাঙ্কেও না। আত্মীয়স্বজনগুলিও সব চুর। অদের কাছে রাখলে মাইরা দিতে পারে। আবার ধরাইয়াও দিতে পারে। বিশ্বাস নাই। সব কাফের।"

লোকটা বলে, "হুমম! কোন সমস্যা না।"

প্রকৌশলী খোদা তাকিয়ে থাকেন।

লোকটা বলে, "আমাদের কাজই হচ্ছে আপনাদের মতো চোরদের বিপদের দিনে সাহায্য করা।"

প্রকৌশলী খোদা বলেন, "কিন্তু কেমনে?"

লোকটা বলে, "দশহাজারী মার্কিন ডলারের নোট দিয়ে।"

প্রকৌশলী খোদা বলেন, "দশহাজারী নোট?"

লোকটা বলে, "হ্যাঁ। পঁচিশটা নোট পাবেন। পরে ভাঙালে পাবেন এক কোটি পঁচাত্তর লাখ টাকা।"

প্রকৌশলী খোদা বলেন, "মানে? বাকি পঁচিশ লাখ যাইবো কই?"

লোকটা এবার নিজের নখ দ্যাখে। বলে, "ওটা আমাদের ফি।"

প্রকৌশলী খোদা বলেন, "এত্ত!"

লোকটা মাথা নাড়ে। "হুঁ!"

প্রকৌশলী খোদার অবশ্য বুদ্ধিটা মনে ধরে। তিনি বলেন, "বেশি হইয়া যায় ভাই। আরেট্টু কম রাখেন।"

লোকটা মাথা নাড়ে। "উঁহু। তাছাড়া সাথে একটা ক্যাপসুল দিচ্ছি আমরা।"

প্রকৌশলী খোদা বলেন, "ক্যাপসুল! কিসের ক্যাপসুল?"

লোকটা বলে, "স্টেইনলেস স্টিলের ক্যাপসুল। ক্যাপসুলের ভেতরে ডলারগুলি গোল করে পাকানো থাকবে।"

প্রকৌশলী খোদা বলেন, "তারপর?"

লোকটা হাসে। বলে, "বিপদ দেখা দিলে ক্যাপসুলটা নিজের পশ্চাদ্দেশ দিয়ে ঢুকিয়ে দেবেন বহুদূর। পুলিশ আপনার তোষক ফাঁড়বে, চালের ড্রাম হাঁটকাবে, শালির পেটিকোট উল্টে দেখবে, কিন্তু আপনার পাছায় আঙ্গুল ঢুকিয়ে নিশ্চয়ই দেখবে না?"

প্রকৌশলী খোদার মনে ধরে পদ্ধতিটা। তাই তো!


৩.

সংভক্ষকদের জন্য বিশেষ ছাড় নিয়ে তিনি ফিরে আসেন। ক্যাপসুল ব্যবহারের জন্য নাকি তাঁকে আর মিসেস খোদাকে বিশেষ নার্স পাঠিয়ে ট্রেনিং দেয়া হবে। কী চমৎকার বুদ্ধি।

প্রকৌশলী খোদার মনটা অবশ্য একটু খচখচ করে। এত কষ্টের চুরিদারি, এত ঘুষ, এত তদবিরের সম্মানী, শেষমেশ কি না তিনি নিজেই নিজের হোগা দিয়ে ঢোকাবেন?


3 comments:

  1. প্রজন্ম ফোরামের মাঞ্চু আমাকে আপনার পোস্টের লিংটা দিল। পড়ে বেশ মজা পাইলাম।
    চমৎকার লেখেন ভাইয়া :)।

    ReplyDelete
  2. hhaahhaaaaa. somewhere e pora hoe nai. ekhon porlam.

    :))

    ReplyDelete
  3. mamu chalay jan..amra achi..jottil hoiche as usual..

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।