Wednesday, November 29, 2006

নিউটন বনাম বেলতলা


[আবারও পুরনো লেখা পেস্ট করছি৷ নতুন লিখতে কাহিল লাগে৷ ২৬শে ডিসেম্বর, ২০০২ লেখা গল্পের নিচে৷]


১.

আজকে শিবলি কুঁইকুঁই করে নিউটনকে খুব গালাগালি করছিলো৷ উহুঁ, প্রফেসর শঙ্কুর পোষা বেড়াল নিউটন নয়, এক্কেবারে খোদ স্যার আইজ্যাক নিউটন, যিনি আমাদের সুখশান্তি বেমালুম হাইজ্যাক করেছেন৷

'গতিসূত্র বের করেছিস, ভালো কথা, এইবার ক্ষ্যামা দে৷' গজগজ করছিলো শিবলি৷ 'আপেলগাছের নিচে যাওয়ার কি দরকার ছিলো তোর? মহাকর্ষ! --- তারপর আবার শব্দের বেগ বের করা! তারপর আবার ক্যালকুলাস! গোটা ফিজিক্সটাকে পন্ড করে রেখে গেছিস ব্যাটা ফাজিল ---৷'

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলি৷ শিবলির ছাত্রীর সামনে ফিজিক্স পরীক্ষা৷ বেচারা৷ পদার্থবিজ্ঞান বইটা হাতে নিয়ে পাতা উল্টাতে থাকলে ঐ নিউটন অপদার্থটা বার বার চোখের সামনে ফিরে ফিরে আসে৷ আমরা নিজেরাও হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি ঐ অপোগন্ডটার অপকীর্তি৷ আমাদের টনকে টন পড়াশোনা ছিলো নিউটনময়৷ নিউটনের সূত্র, যদিও সব মিলিয়ে চারটা, কিন্তু পড়তে গেলে মনে হতো হাজারখানেক, সেই চারটা সূত্রের ফাঁদে পড়ে আমরাও হয়ে গিয়েছিলাম নিউটনের সেই আপেলটার মতো৷ কেউ এ বিষয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলে আকাশ থেকে পড়তাম৷

'--- গেলি তো বেল গাছের নিচে গেলি না কেন শালা?' শিবলি একটু উচ্চস্বর হয়ে ওঠে৷ আর ওটাই হলো কাল৷ মামা চায়ের অর্ডার দিয়ে বেঘোরে ঝিমুচ্ছিলেন, ধড়মড় করে উঠে বসলেন৷

'কাকে গালি দিচ্ছিস?' সন্দিহান গলায় শুধান তিনি৷

'নিউটনকে৷' আমি শিবলির হয়ে জবাব দেই৷

মামা চোখ কুঁচকে বলেন, 'ওহ, ঐ খুনীটাকে?'

শিবলির মুখে সম্মতিসূচক পাঁচশো ওয়াটের আলো জ্বলে ওঠে, আমি ভুরু কুঁচকাই৷ নিউটন খুনী? স্লো পয়জনিঙের দায়ে ব্যাটাকে ফাঁসানো যায় বটে, তাই বলে এমন পষ্টাপষ্টি খুনী বলে দেয়া? কিঞ্চিত্‍ বাড়াবাড়ি মনে হয় আমার কাছে৷

'কাকে খুন করেছিলেন নিউটন?' আমি আমার ঠান্ডা চায়ের কাপের দিকে বিষদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলি৷ কলিমুদ্দির দোকানের সার্ভিস দিনকেদিন খারাপ হচ্ছে৷

মামা হো হো করে হেসে ওঠেন৷ 'আপনি-আপনি করছিস কেন এই চশমখোর ব্যাটাকে? বল কাকে খুন করেছিলোওওওওওওওও ্#61630; আর কাকে করে নি ব্যাটা? যাবতীয় সায়েন্সের স্টুডেন্টদের খুন করেছে ব্যাটা৷ এখনও করছে৷ ভবিষ্যতেও করবে৷ ব্যাটাকে সময় থাকতে মিলিটারি ধোলাই দেয়া উচিত৷'
শিবলি সোত্‍সাহে মাথা নাড়ে৷

'কাকে খুন করেছিলো নিউটন?' আমি প্রমীত ধাতুরূপে আবার প্রশ্ন করি৷

'আমার বড়চাচার ছোটবেলার বন্ধু, বজলু চাচাকে৷' মামা হুঙ্কার দিয়ে তিন কাপ চায়ের অর্ডার দেন৷ আজকে রেজা অ্যাবসেন্ট৷

'হে হে --- নিশ্চয়ই উনিও টিউশনি করতেন?' শিবলি একগাল হেসে প্রশ্ন করে৷

'য়্যাঁ? কী জানি --- আজকালকার কথা তো নয়, প্রায় সেই ব্রিটিশ আমলের ঘটনা৷' মামা বিড়ি বের করেন৷ মনে হচ্ছে আজকে আরেকটা হাই ডোজ চাপা ছাড়বেন৷

ব্রিটিশ আমলেও নিউটন ছিলো, ভাবতেই আমার কেমন যেন লাগে৷ আর কেমন করে যেন ভাবনাটা মুখেও চলে আসে৷ অমনি মামা অট্টহাসি দিয়ে ওঠেন৷ 'আরে, ও তো ব্রিটিশই৷ ব্রিটিশ আমলে থাকবে না তো কি মোঘল আমলে থাকবে? হে হে৷'

নিউটনের ঠিকুজি কুলুজি আমার স্মরণ নেই, কিন্তু তবুও কেন যেন মনে হয়, লোকটা মোঘল আমলের দিকেই ছিলো৷ আমার এ সন্দেহটাও মুখে চলে আসে৷

মামা মাথা নাড়েন৷ 'হুম, তা অবশ্য হতে পারে৷ কিন্তু বজলু চাচা মনে হয় ঠিক ব্রিটিশ আমলে না, ঘায়েল হয়েছিলেন পাকিস্তান আমলেই৷ তবে উনি তো আর মোঘল আমলে ছিলেন না --- যাই হোক, এইসব আমলটামলের কথা আমলে নিস না, খুন হয়েছেন উনি কয়েক দিন আগে৷'

আমরা ভয়ঙ্কর চমকে উঠি৷ শিবলি ডানেবামে তাকিয়ে দ্যাখে ভালো করে, আশেপাশে নিউটন আছে কি না৷ সাবধানের মার নেই৷

এমন টাটকা খুন নিউটন করেছেন ভেবে আমি আশ্চর্য হই৷ বিজ্ঞানীদের কাজকারবার অতি বিচিত্র৷

ইতিমধ্যে চা চলে আসে, আমরা সবাই কড়া চুমুক দেই৷ মামা বিড়ির ধোঁয়া চা দিয়ে গিলে শুরু করেন৷


২.

বজলু চাচা ছিলেন ক্লাসের লাস্ট বয়৷ অতি ফাঁকিবাজ, মহা বখাটে৷ আজকে এক মারেন তো কালকে ওকে ধরেন৷ তার সাথে ফেলের কম্পিটিশনে কেউ পারতো না৷ তিনি একেক ইয়ারে কয়েক বছর করে কাটিয়ে, প্রায় মধ্য যৌবনে মেট্রিক পাশ করে কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে ওঠেন৷ ইতিমধ্যে আমার বড় চাচারা পড়াশোনা শেষ করে চাকরি বাকরি শুরু করে দিয়েছেন৷ সেই আমলে বুঝতেই পারছিস, হাতিশালে হাতি ছিলো, ঘোড়াশালে ঘোড়া --- কী বলে, গোলাভরা ধান ছিলো, পুকুরভরা মাছ ছিলো, সেশন জট ছিলো না, ছাত্র রাজনীতি চাঁদাবাজি ছিলো না --- ঝুটঝামেলা ছিলো না, সবাই পড়াশোনা শেষ করে চাকরিবাকরি পেয়ে যেতো, আমার মতো ফ্যা ফ্যা করে ঘুরতো না৷
তো আমার বড় চাচা প্রথমে নিজের কলেজেই মাস্টারির চাকরি পেলেন৷ তিনি আবার বিজ্ঞানের ছাত্র, ফিজিক্স পড়ান৷ আর ফিজিক্স মানেই নিউটন৷

একদিন ক্লাস শেষে বজলু চাচাকে ক্লাসে দেখে বড়চাচা খুব ঘাবড়ে গেলেন৷ কারণ বজলু চাচা অতি ঝামেলাবাজ পাবলিক, পদে পদে ভেজাল না করলে তার পেটের ভাত হজম হয় না, অনেকটা নিউটনের মতোই স্বভাব৷ --- তো এত বছর পর বজলু চাচাও বড়চাচাকে দেখে খুব খুশি৷ কারণ নিজের নেংটো কালের বন্ধু যদি লেকচারার হয়ে আসে, এর চেয়ে ভালো কিইবা হতে পারে?

কয়েক মাস ক্লাস নেয়ার পর চাচা বুঝলেন, বজলু আর আগের বজলু নেই৷ বরঙ অনেকটা শুধরে গেছে৷ পড়াশোনা করার চেষ্টা করে, মোটামুটি বোঝেও৷ সবচে বড় কথা, বজলু চাচা নিজে থেকেই শিখতে চান৷ বিশেষ করে ফিজিক্সে তাঁর দুর্দান্ত উত্‍সাহ৷

একদিন ক্লাসে বড় চাচা নিউটনকে থলি থেকে বের করলেন৷ তার গতির দুর্দান্ত তিনটা সূত্র৷ বাহ্যিক বল প্রযুক্ত না হলে স্থির বস্তু চিরদিন স্থির থাকে, গতিশীল বস্তু চিরকাল গতিশীল থাকে৷ এই সূত্র কপচিয়ে চাচা কী মনে করে বজলু চাচাকে দাঁড় করিয়ে বললেন, 'বজলুর রহমান, আপনি কি বলতে পারেন, এই সূত্রের উপযোগিতা কোথায়? মানে আপনি একটা উদাহরণ দিতে পারবেন?'

বজলু চাচা দাঁত বের করে বললেন, 'কী যে কস না দোস্ত, পারুম না ক্যান? --- মনে আছে, ক্লাস এইটে থাকতে ক্লাস নাইনের লগে ফাইন্যাল খেলায় অগোর ঐ পোংটা সেন্টার ফরোয়ার্ড মকবুল বল লইয়া কেমনে চার্জ করছিলো? পিছন থেইকা অরে ল্যাং না মারলে কিন্তু যাইতেই থাকতো৷ আর আরেকটু আগাইলেই গোল হইতো৷ বাহ্যিক ল্যাংটা মারছিলাম দেইখাই তো ওই হালার পুত আর গতিশীল থাকবার পারে নাই, এক্কেরে চিত্‍ হয়া পড়ছিলো সম্বুন্ধীর পো৷ --- আর এই যে স্থির বস্তুর ব্যাপারটা, হেইডাও তুই ঠিকই কইছস৷ ক্লাস নাইনে থাকতে আমাগো স্কুলের কায়েস আর আমি একবার হেডস্যারের গাছে উঠছিলাম আম পাড়নের লাইগা --- কায়েস ডরপোক গাছে উইঠ্যা আর নামবার পারে না --- মগডালের মধ্যে বয়া রইছে৷ আমি দেখলাম, বাহ্যিক বল প্রয়োগ না করলে ও অ্যামনেই সারাবেলা বয়া থাকবো, আর দুইজনেই ধরা খাইলে হেডস্যারের কচুয়া বেতের মাইর খায়া মরমু৷ তখন দিলাম বাহ্যিক বল শালার পিছে৷ এক্কেরে গতিশীল হয়া নাইমা পড়লো --৷'

ক্লাসের সবাই এই উদাহরণে খুব তুষ্ট দেখে বড় চাচা আর আপত্তি করলেন না৷ তিনি পরে সূত্রে গেলেন৷ বস্তুর ওপর প্রযুক্ত বল এর ভরবেগের পরিবর্তনের হারের সমানুপাতিক৷ তবে এবার আর তিনি বজলু চাচাকে সুযোগ দিলেন না, নিজেই নানা রকম ফিগার এঁকে অঙ্ক কষে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিলেন৷

তৃতীয় সূত্র, প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে, এখানে পৌঁছানোর পর বজলু চাচা একটা বিষণ্ন দার্শনিকতায় আক্রান্ত হলেন৷ দেখা গেলো তিনি জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আপনমনে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন আর নিজের পিঠে হাত বোলাচ্ছেন৷

ক্লাসের শেষে বজলু চাচা বড় চাচার সাথে দেখা করতে এলেন৷ 'আইচ্ছা দোস্ত, এই সূত্রগুলি বাইর করছে কেডা?'

বড় চাচা দীর্ঘশ্বাস চেপে বললেন, 'স্যার আইজ্যাক নিউটন৷'

বজলু চাচা মাথা নেড়ে বললেন, 'হক কথা কইছে নিউটন ভাই৷ উনার সাথে সাক্ষাত্‍ করাটা দরকার৷ এমন সোয়াবের সূত্র বাইর করছেন, একটু দেখাসাক্ষাত্‍ না করলে বেদ্দপি হইবো৷'

বড় চাচা বললেন, 'বজলু রে, নিউটন সাহেব বহুত্‍ আগে ইন্তেকাল করছেন৷ চারশো বছর হইলো প্রায়৷'

বজলু চাচা শোকে অভিভূত হলেন, এমন একজন খানদানী মানুষের সাথে দেখা করতে পারলেন না, কিন্তু চমত্‍কৃত হলেন আরো বেশি৷ 'খাইছে! পুরানা জমানার লোকজন কত এলেমদার আছিলেন, দ্যাখছস? আর আমরা দিল্লাগি কইরা মরি৷'

তো যাই হোক, নিউটনের তিন সূত্রে বজলু চাচা একেবারে ত্রিভঙ্গমুরারী হয়ে ঝুলে রইলেন৷ তিনি বড় চাচার কাছে সূত্রগুলো আরেকদফা বুঝে নিয়ে লাইব্ররিতে চলে গেলেন৷ সেখানে তিনি নানারকম বই ঘেঁটে এই সূত্রের ওপর সব অঙ্ক কষে কয়েক দিস্তা কাগজ হাতে করে সেগুলো যাচাই করতে বড় চাচাকে দিয়ে এলেন৷ চাচা সেই খাতা দেখেটেখে বুঝলেন, বজলু চাচা আর যাই হোক, এই তিন সূত্রে বেশ বু্যত্‍পত্তি অর্জন করেছেন৷

যাই হোক, এভাবে ভালোই চলছিলো দিন৷ হঠাত্‍ বাধলো ভজঘট৷

নিউটনকে আরেকদিন ক্লাসে আরেকটা থলে থেকে বের করতে হলো বড় চাচাকে৷ মহাকর্ষ তত্ত্ব৷ বিশ্বে যে কোন দু'টি কণা একে অপরকে নিজেদের সংযোজক রেখা বরাবর একটি বিশেষ বলে আকর্ষণ করে৷ এই বলের মান কণা দু'টির ভরের গুণফলের সমানুপাতিক আর মধ্যবর্তী দূরত্বের বর্গের ব্যস্তানুপাতিক৷

এই সূত্র বলার পর বজলু চাচা খুবই ঘাবড়ে গেলেন৷ তিনি উঠে বললেন, 'ক্যামনে ক্যামনে?'

বড় চাচা ভাবলেন, বজলু চাচা বুঝতে পারছেন না৷ তিনি তখন আবার ছবি এঁকে, অঙ্ক কষে ব্যাপারটা বোঝানোর উদ্যোগ নিলেন৷ কথা শেষ করে তিনি যখন বজলু চাচার দিকে ফিরলেন, তখন দেখলেন, বজলু চাচা খুব অভিমানী মুখ করে তাকিয়ে আছেন ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে৷ কী এক হতাশা তার চোখেমুখে৷

তারপর সারাটা ক্লাস বজলু চাচা কিছু বললেন না, কেবল কী কী সব হিজিবিজি লিখতে লাগলেন খাতায়৷

দু'দিন পর বজলু চাচা স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হলেন৷ বড় চাচা তখন ক্লাসে কী একটা জিনিস বোঝাচ্ছিলেন, তখন আচমকা বজলু চাচা উঠে বললেন, 'দোস্ত, কথাটা ঠিক না৷'

বড় চাচা লেকচারের মধ্যে বাধা পেয়ে ভারি চটলেন, কিন্তু কিছু বললেন না৷ শুধু গম্ভীর গলায় বললেন, 'কোন কথা?'

বজলু চাচা একটু থতমত খেয়ে বললেন, 'ঐ যে --- মহাকর্ষ সূত্র৷ নিউটন চাচা এইটা মিছা সূত্র দিছে৷ এই সূত্র ঠিক না৷'

বড় চাচা খুব বিরক্ত হয়ে বললেন, 'কেন বজলুর রহমান, আপনার কেন এমন মনে হচ্ছে?'

বজলু চাচা তখন মাথা চুলকে বললেন, 'ঠিক বুঝাইবার পারুম না --- তয় আমি এক্কেরে শিওর, এই সূত্র ঠিক না৷ এই সূত্রে একটা বড় গলদ আছে৷'

বড় চাচা খুব গম্ভীর গলায় বললেন, 'বজলুর রহমান সাহেব, আপনি যদি প্রমাণ করতে না পারেন, আপনি কিভাবে এই সূত্রকে মিথ্যা বলছেন? জানেন, কত বড়বড় বিজ্ঞানী কত হাজার হাজার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এই সূত্র নির্ভুল প্রমাণিত করেছেন?'

বজলু চাচা তখন কিছুটা অসহায়ের মতো বললেন, 'অগো হিসাবে ভুল অইছে৷ --- মাগার আমি কিরা কাইটা কইতাছি, এই সূত্র ঠিক না৷'

বজলু চাচা আরো কিছু বলতে চাচ্ছিলেন, কিন্তু বড় চাচা তাকে সুযোগ না দিয়ে আবার পড়াতে শুরু করলেন৷ ক্লাস শেষে বজলু চাচা এই নিয়ে আরো কি যেন বলতে চাচ্ছিলেন, তার খাতায় কি কি সব হিজিবিজি হিসেবও ছিলো, কিন্তু বড় চাচা এই ব্যাপারে আর কোন কথাও বলতে রাজি হলেন না, আর সেই হিসেবগুলো দেখারও প্রয়োজন বোধ করলেন না৷

কয়েক সপ্তাহ পর দেখা গেলো, বজলু চাচা বদ্ধ উন্মাদ হয়ে গেছেন৷ তিনি শুধু বিড়বিড় করে কী কী সব বকেন, আর মাঝে মাঝে চিত্‍কার করেন, 'ভুল ভুল --- এক্কেরে ভুল সূত্র দিছে হালায়, ঈমানে কইতাছি, এই সূত্র এক্কেরে মিছা কথা!'

এই কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বজলু চাচা কলেজের অন্যান্য বিজ্ঞানের লেকচারার, এবং প্রফেসরদের সাথেও রীতিমতো ধস্তাধস্তি করেছেন৷ তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ব্যাপারে কোন শিক্ষিত প্রফেসরের সাথে কথা বলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, কিন্তু তার আগেই তাঁর আত্মীয় স্বজন তাকে কলেজ থেকে চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে মাথা কামিয়ে শিকল দিয়ে বেঁধে একটা ঘরে তাকে বন্দী করে রাখলো৷ কয়েক মাস তিনি আর ক্লাস করলেন না৷ একদিন শোনা গেলো, বজলুর রহমান পুরোপুরি পাগল, সারাদিন ঘরের জানালার শিক ধরে দাঁড়িয়ে থাকে, আর নিউটনকে ঠগবাজ দুই নম্বুরী বলে বকাবকি করে৷


৩.

তারপর অনেক বছর বজলু চাচার আর কোন দেখা নেই৷ বড় চাচা ততদিনে ফিজিঙ্রে ওপর বাইরে থেকে ডক্টরেট করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করে দীর্ঘকাল সাফল্যের সাথে শিক্ষকতা করার পর প্রফেসর এমেরিটাস হিসেবে কয়েক বছর ক্লাসটাস নিয়ে পূর্ণ অবসর নিয়ে নিজের বাসায় অলস রিটায়ার্ড জীবন যাপন করছেন৷

হঠাত্‍ একদিন ভোরবেলা সংসদে হাঁটতে গিয়ে বড় চাচার সাথে বজলু চাচার দেখা৷ বজলু চাচার আগের মতোই মাস্তান স্বাস্থ্য, দেখে বুড়ো বলে মনেই হয় না, ঘাড় অবধি ঢেউ খেলানো বাবরি চুল, এই গুলি ফোলানো বাইসেপ, গলায় চেন, হাতে বালা, চোখে সানগ্লাস, পায়ে কেডস, হাঁপসে দৌড়াচ্ছিলেন সংসদ ভবনের পেছনের রাস্তা দিয়ে, আর বড় চাচা গুটি গুটি পায়ে দম ফেলতে ফেলতে আর দম নিতে নিতে টুকটুক করে উল্টো দিক থেকে হেঁটে আসছিলেন, হঠাত্‍ বড় চাচাকে দেখে বজলু চাচা হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, 'আরে দোস্ত তুই?'

বড় চাচা ভেবেছিলেন কোন অমানুষ সাংসদ কিংবা সাংসদের জন্য সরকারী উদ্যোগে বরাদ্দ মাসলম্যান সুপারম্যান গানম্যান এমন কেউ বুঝি সাতসকালে হাইজ্যাক করতে নেমেছে, তিনি ঘড়ি চশমা মানিব্যাগ প্রায় বের করে দিয়ে দিচ্ছিলেন, হঠাত্‍ সেই পুরনো চেহারা দেখে তিনিও বুড়োদের পক্ষে যত জোরে চিত্‍কার করা স্বাভাবিক, তত জোরে চেঁচিয়ে উঠলেন, 'বজলু তুই? বেঁচে আছিস?'

দেখা গেলো বজলু চাচা অত্যন্ত ভালোভাবে বেঁচে আছেন৷ তার ভাষ্যমতে, তিনি পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে পারিবারিক ব্যবসার হাল ধরেছিলেন৷ হাল ধরে পাল খুলে দিয়ে লবণ মরিচ আলু গরমমশল্লা এবং পরবতর্ীতে বাংলা সিনেমার রমরমা ব্যবসা করে এখন প্রায় কোটিকোটিপতি৷ ঢাকা শহরে তার কয়েক হালি বাড়ি, তিনি থাকেন অবশ্য ইকবাল রোডে৷ সংসদ ভবন জায়গাটা তার মাশাল্লা খুবই পছন্দ, ইচ্ছা আছে সামনে এমপি ইলেকশনে দাঁড়াবেন৷ তবে সামনে তিনি তৃতীয় বিবাহটাও করতে ইচ্ছুক, সেটার জন্যে সিলেকশনটাকেই তিনি আপাতত প্রাধান্য দিচ্ছেন৷ বড় চাচার হাতে ভালো কচি পাত্রীটাত্রী আছে কি না জানতে চাইলেন তিনি৷

এমন রোমহর্ষক জীবন কাহিনী শোনার পর তো বড় চাচার আরেকটু হলেই কার্ডিয়াক য়া্যারেস্ট হয়ে যাচ্ছিলো, বহু কষ্টে সংসদ ভবনের তাজা বাতাস শুঁকে নিজেকে সামলে নিলেন৷ বজলু চাচাকে নিজের জীবনের কথা বলতে গিয়েও সামলে গেলেন, কিইবা বলার আছে৷ নীরস জীবন, খালি পড়াশোনা আর পড়াশোনা৷ তিনি দু'এক কথায় হুঁ হাঁ করে কাটিয়ে যেতে চাইলেন৷ কিন্তু বজলু চাচা ছাড়লেন না৷ জিজ্ঞেস করলেন, 'তারপর? ইস্কুল ছাড়ার পর তো আর তোমার সাথে দেখা নাই --- তুমি ভাই কিসের ব্যবসা ধরলা?'

বড় চাচার খটকা লাগলো? ঘটনা কী? বজলুর রহমান কি তাহলে ঐ ঘটনার সব কিছু ভুলে গেলো? তার তো দেখি ঐ নিউটনের মহাকর্ষ পর্বের কিছুই মনে নাই৷ তিনি তখন আমতা আমতা করে বললেন, 'এই তো দোস্ত --- পড়াশোনা শেষ করে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে জয়েন করলাম --- এখন রিটায়ার্ড৷'

বজলু চাচা চোখ কপালে তুলে বললেন, 'আয় হায় --- তুমি দেখি বহুত পড়ালেখা কইরা ফালাইছো৷ যাউকগা, চলো এখন আমার বাসায় চলো৷'

বজলু চাচার বাসা দেখে বড় চাচার দ্বিতীয় বার টাশকি খাবার দশা৷ আলিশান তিনতালা বাড়ি৷ বাড়ির দরজায় লেখা --- "কুকুর কামড়াইলে মালিক দায়ী নহেন", কাজেই কুকুর হইতে সাবধান না হয়ে তাঁর উপায় নেই৷ বাড়িতে প্রচুর খানসামা-বেয়ারা, তারা ব্যস্তসমস্ত হয়ে ছোটাছুটি করছে৷ নতুন মেহমানের মেহমানদারী করার জন্য তারা যে আয়োজন করলো, সেটা দেখে বড় চাচা তৃতীয় কার্ডিয়াক অ্যারেস্টকে ঢোঁক গিলে হজম করে নিলেন৷
সিদ্ধির শরবতে চুমুক দিতে দিতে বজলু চাচা পুরনো দিনের গল্পে মেতে উঠলেন৷ ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় কিভাবে হেডস্যারের মেয়েকে জাপটে ধরে চুমু খেয়েছিলেন, তার দু'বছর পর ক্লাস সিক্সে উঠে কিভাবে তাকে আবার চুমু খেয়েছিলেন, ক্লাস সেভেনে থাকতে কিভাবে অঙ্কের ভয়াবহ দশাসই পার্বতীচরণ মাস্টারকে বৈশাখের অম্যাবস্যা রাতে ভূতের ভয় দেখিয়ে নিউমোনিয়ায় ফেলে দিয়েছিলেন, ক্লাস এইটে থাকতে ফুটবল ম্যাচে কিভাবে প্রতিপক্ষের স্ট্রাইকারের ঠ্যাং ভেঙেছিলেন, ক্লাস নাইনে থাকতে কিভাবে ডরপোক কায়েসকে গাছ থেকে পোঁদে লাথি মেরে ফেলে দিয়েছিলেন --- ইত্যাদি ইত্যাদি৷ বড় চাচা খুবই ঘাবড়ে গিয়ে লক্ষ্য করলেন, মেট্রিক পরীক্ষা শেষে পাশের বাড়ির শেফালির সাথে বিয়ে করার জন্যে ভেগে যাওয়া পর্যন্ত স্মৃতি বজলু চাচার স্পষ্ট মনে আছে, কিন্তু তারপর কয়েক বছরের কোন সারাশব্দ তাঁর আলাপে পাওয়া যাচ্ছে না৷ ঘটনাটা কী ঘটলো তিনি বুঝতে পারলেন না৷ বদ্ধ উন্মাদ থেকে তিনি কিভাবে বদ্ধ ব্যবসায়ীতে পরিণত হলেন?

'--- যাই কও দোস্ত --- বহুত পরিশ্রম করতে হইছে জীবনে৷' চোঁ চোঁ করে শরবত গিলে ফেলে বলতে থাকেন বজলু চাচা৷ 'তবে তার ফল হাতেনাতে পাইছি৷ যেমন ইনপুট, তেমনি অনপুট৷'

বড় চাচা এই কথা শুনে হঠাত্‍ কী ভেবে বলে বসেন, 'প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে, তাই না?'

এই কথা শুনেই হঠাত্‍ বজলু চাচা কেমন যেন হয়ে যান৷ তিনি ফ্যাকাসে মুখে আরেক গ্লাস সিদ্ধির শরবত হাতে নিয়ে বলেন, 'কী কইলা? এই কথাটা চিনা চিনা লাগে?'

বড় চাচা তখন হালকা গলায় বলেন, 'এটা নিউটনের সূত্র৷ --- গতিবিষয়ক তৃতীয় সূত্র বলে এটাকে৷ তুমি কি এটার কথা জানো?'

বজলু চাচা হঠাত্‍ ঝটকা মেরে সোজা হয়ে বসেন, তারপর কেমন যেন অস্থির ভঙ্গিতে উঠে পায়চারি করতে থাকেন৷ 'নিউটন --- নিউটন --- নামটা চিনা চিনা লাগে৷ কই শুনছি এই নাম?'

বড় চাচা তখন আরেকটু উসকে দিয়ে বলেন, 'ইনি একজন বড় বিজ্ঞানী ছিলেন --- মহাকর্ষ সূত্র আবিষ্কার করেছিলেন আপেলতলায় বসে ---৷'

বজলু চাচা আপনমনে তখন বলেন, 'হুম --- মনে হয় যখন আপেলের ব্যবসা করতাম তখন পরিচয় হইছিলো৷ নোয়াখালির লোক, একটু নাটকা কইরা --- গায়ের রং ময়লা --- ঠিক না?'

বড় চাচা খুবই হতাশ হলেন৷ তিনি ভেবেছিলেন, হয়তো এই আলাপচারিতার মধ্যেই সেই নিউটন পর্বের পুনসর্্মরণ ঘটে যাবে৷ কিন্তু না৷ বজলু চাচা এখন একেবারে হাড়েমজ্জায় জাত ব্যবসায়ী৷

বড় চাচা বেশিক্ষণ আর বসলেন না, বাড়ি ফিরে তাঁর ঔষধ খেতে হবে৷ আর বজলু চাচা যাবেন এফডিসি, তাঁর নূতন ছবি তুমি আমার মনের ময়না-র শু্যটিং চলছে ওখানে৷ বজলু চাচা অবশ্য চাচাকে শু্যটিং দেখার আমন্ত্রণ জানালেন৷ সেখানে নাকি একটা লিকলিকে নায়ক একটা বিশাল পোক্ত দুইমণী নায়িকাকে কোনমতে কোলে নিয়ে নাচানাচি করে, খুবই ফূর্তিজনক জিনিস, দেখলে নাকি আয়ু বাড়ে৷ তবে বড় চাচা ঔষধের দোহাই দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করলেন৷

আসার সময় বড় চাচা তাঁর ফোন নাম্বার দিয়ে এলেন৷ উপহারস্বরূপ বজলু চাচা একটা পেটমোটা চ্যাপ্টা বোতল ধরিয়ে দিলেন, সেটার গায়ে লেখা স্মিরনফ, খুবই নাকি ভালো সিরাপ৷ খেলে সর্দিকাশিও ভালো হয়, দেহে বলবৃদ্ধি হয়, কী কী সব কাজের উত্‍সাহ নাকি বাড়ে৷


৪.

এই ঘটনার সপ্তাহখানেক পর, চাচা বিকেলে বসে বসে বারান্দায় ইজিচেয়ারে শুয়ে শুয়ে সেই সিরাপটাই চুক চুক করে খাচ্ছিলেন, বেশ ভালো কাজের জিনিস, একটু তেতো, কিন্তু খেলে একেবারে তনুমন চাঙ্গা হয়ে যায়৷ এমন সময় ফোন এলো৷

ফোন করেছেন বজলু চাচা৷ তিনি খুবই উত্তেজিত৷ 'দোস্তো, তুমি জলদি আমার বাসায় চইল্লা আসো৷ তোমার ঠিকানা কও আমি গাড়ি পাঠাইতাছি৷'

বড় চাচা তার ঠিকানা বলে ফোন রাখার পাঁচ মিনিট পরই বজলু চাচার আলিশান মার্সিডিস বাড়ির সামনে এসে থামলো৷ বড় চাচা সিরাপের বোতল নামিয়ে রেখে ছড়ি হাতে গুটি গুটি পায়ে সেটাতে গিয়ে উঠলেন৷

বজলু চাচার বাড়িতে পৌঁছানোর পর দেখা গেলো হালত কিঞ্চিত্‍ খারাপ৷ সবাই খুব সন্ত্রস্ত৷ একজন ইয়া পালোয়ানটাইপ খানসামা ভয়ে ভয়ে বড় চাচাকে দোতলায় নিয়ে গেলো৷

দেখা গেলো, দোতলায় বজলু চাচা একটা হাফপ্যান্ট আর একটা স্যান্ডো গেঞ্জি পরে হাতে একতাড়া কাগজ নিয়ে উদভ্রান্তের মতো ঘোরাঘুরি করছেন৷ বড় চাচাকে দেখেই তিনি ছুটে এলেন, 'দোস্তো! মিছা কথা! --- এক্কেরে দুই লম্বুরী কথা৷ মহাকর্ষ সূত্র --- মিছা কথা! এইদ্দ্যাহো --- এই যে আমার ক্যালকুলেশন দ্যাহো --- নিউটন হালায় ভুল করছে, এক্কেরে সস্তা দুই লম্বুরী ভুল --- তুমি পইড়া দ্যাহো!'

বড় চাচা কাগজগুলো হাতে নিলেন অবশ্য, কিন্তু দেখলেন না৷ আর তিনি তেমন বিশেষ কোন সাহায্য করার সুযোগও পেলেন না৷ তার আগেই বজলু চাচার বউ-ছেলে-মেয়েরা কয়েক গন্ডা ডাক্তার নিয়ে তাঁকে একরকম ঠেলেঠুলে বের করে দিলো৷

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত বড় চাচা যা জানলেন, সেটা হচ্ছে বজলু চাচা আবার বদ্ধ পাগল হয়ে গেছেন৷ তাঁকে নাকি মাথা কামিয়ে শেকল দিয়ে বেঁধে ঘরে আটকে রাখা হয়েছে৷ তিনি সেই ঘরে বসে একটু পর পর চিত্‍কার করেন, 'মিছা কথা কইছে হালার ভাই! এক্কেরে মিছা কথা! ঈমানে কইতাছি!'


৫.

মামা পঞ্চম চায়ের কাপে চুমুক দিলেন৷ আমরা ইতিমধ্যে দু'দফা ডালপুরির অর্ডার দিয়ে ফেলেছি৷ শিবলি পুরি মুখে দিয়ে বললো, 'খুন হলো কিভাবে?'

মামা উদাস গলায় বললেন, 'এই তো, কয়েকদিন আগে বজলু চাচা কিভাবে যেন ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছিলেন৷ সন্ধ্যেবেলা পাড়ার বেলগাছের নিচে উনার ডেডবডি পাওয়া গেছে৷'

আমরা ঘাবড়ে যাই৷ এমন গল্পের এমন আধিভৌতিক ফিনিশিং? আমি ঢোঁক গিলে বলি, 'কিভাবে?'

'হয়েছে কি, উনার মাথা গরম দেখে সেটাকে বেশ চেঁছে কামিয়ে দেয়া হয়েছিলো৷ আর উনি ঠিক কী কাজে বেলতলায় গেছেন তা অবশ্য কেউ বলতে পারে না --- হয়তো মহাকর্ষ সূত্র ভুল এটা হাতে কলমে প্রমাণ করার জন্যে আপেল গাছের বিকল্প হিসেবে সবচে কাছে বেলগাছটার তলায় বসতে গিয়েছিলেন৷ কিন্তু মোট কথা হলো এই, একটা পাকা বেল ওনার ন্যাড়া মাথায় খসে পড়েছে৷ --- এই মোমেন্টাম সামলাতে পারেন নি বজলু চাচা৷ তোরা তো জানিস, ন্যাড়া একবারই বেলতলায় যায়৷' মামা চুমুক দেন চায়ে৷ 'অবশ্য বেলগাছের কিছু ভৌতিক বদনামও আছে৷ এখন যদি লোকে বলে যে নিউটনের ভূত বেলগাছ থেকে নেমে এসে বজলু চাচাকে মার্ডার করেছে --- আমার কিছু বলার নেই৷'

আমি খানিকটা সন্দিহান হয়ে বলি, 'আপনি জানলেন কিভাবে এতসব?'

মামা দাঁত খিঁিচয়ে বললেন, 'আরে এতে না জানার কী আছে? তোদের সন্দেহ হলে পরদিনের সাপ্তাহিক নগ্নবাংলা, পাক্ষিক মৌজমোহনা, মাসিক সিনেমাসিক আর দৈনিক মানবমানবী খুলে দ্যাখ৷ "রহস্যময় বেলের আঘাতে বজলু সওদাগর নিহত", "বজলু ভাইয়ের বেলপ্রাপ্তি", "কে খুন করেছে বজলুর রহমানকে?", "অবশেষে বজলু ওস্তাদ ঠান্ডা হইলেন" --- যা না, নিজের চোখে দেখে আয়!'

শিবলি পুরি খেতে খেতে বলে, 'কোন তারিখ?'

মামা ভারি চটেমটে বলেন, 'দ্যাখ, এতো সনতারিখ মনে থাকে না --- ইতিহাসের ক্লাস পেয়েছিস ? সনতারিখ খুঁজতে হয় তো যাদুঘরে গিয়ে খোঁজ নে!'

আমি আর মামাকে না খুঁচিয়ে শিবলির দিকে মনোযোগ দেই৷ শিবলি ইয়া মোটকা, একশো কেজি ওজন৷ ওর ছাত্রীটাও মাশাল্লা ঐ রকমই হবে৷ আর শিবলির সাথে তার ছাত্রীর দূরত্বও অমন বেশি কিছু না৷ কাজেই নিউটনের সূত্রানুযায়ী দু'জনের মধ্যে একটা বড়সড় মহাকর্ষ কাজ করার কথা৷ আসলেই করে না কি, এই কথা জিজ্ঞেস করতে শিবলি যা বললো, তার মর্মার্থ হচ্ছে, প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া থাকে, এটাও নিউটনের সূত্র, হাতে কলমে কাজ করে কি না, সেটা আমি আদৌ জানতে উত্‍সাহী কি না৷ আমি তাই আর বেচারাকে না ঘাঁটিয়ে দোকানের বাইরের দিকে গতিশীল হই৷ বাহ্যিক বল ব্যাপারটা সবসময় ভালো না৷


2 comments:

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।