Thursday, November 02, 2006

উইকিবাদ, আর আমরা যারা ফকির


প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্রোপ্রিয়েট টেকনোলজির শ্রদ্ধেয় ড. নুরুল ইসলাম স্যার এর একটা সাক্ষাৎকার পড়েছিলাম বহু আগে। সখেদে বলেছিলেন, বাংলাদেশে ভিক্ষা ব্যবসায় যারা নিয়োজিত, তারা শিশু অপহরণ করে তাদের হাত পা নুলো করে বড় একটা হাঁড়ির মধ্যে রেখে দিতো। পরবর্তীতে এই বিকলাঙ্গ শিশুদের কাজে লাগানো হতো ভিক্ষাবৃত্তিতে। আর বাংলাদেশকেও একইভাবে হাত পা ভেঙে দিয়ে হাত পাততে বাধ্য করা হচ্ছে।

আমার প্রবাসের অভিজ্ঞতা হ্রস্বকালীন, তা-ও ইয়োরোপে, বাংলাদেশকে হয় বেশির ভাগ লোকে চেনে না, বা নাম শুনলে একটু ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি চলে আসে তাদের ঠোঁটে। বাংলাদেশ, যেখানে প্রচুর দরিদ্র লোক পানির নিচে ডুবে থাকে বছরের ছয়মাস। যারা হাত পাতে বিদেশীদের কাছে। প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান একবার অসন্তুষ্ট হয়ে বলেছিলেন আওয়ামী অর্থমন্ত্রী কিবরিয়াকে উদ্দেশ্য করে, এত উন্নতি দেখাবেন না, তাহলে সাহায্য আসবে না। সাইফুর রহমান বাংলাদেশকে যেভাবে ঋণী করেছেন, যেভাবে ফকিরের বাচ্চা বানিয়েছেন আমাদের, সেভাবে আর কোন অর্থমন্ত্রী কোন দেশে কাজ করেছেন কি না আমি জানি না। মনে পড়ে যায় নুরুল ইসলাম স্যারের কথা। ভিক্ষা ব্যবসা, হাহ।

আমাদের ভিক্ষা দেওয়ার জন্য অনেকেই মুখিয়ে আছে। ঠিক ভিক্ষুক নয়, তারা আমাদের বেশ্যা বানিয়ে ছেড়েছে। পয়সা ঠিকই দেয়া হবে, যদি পাছা উদাম করে রাখিস। এই নে টাকা, এবার একটু নাচ দেখি। ঘুরেফিরে নাচ। নাহলে বিশ্বব্যাঙ্ক আর এশীয় উন্নয়ন ব্যাঙ্কের দেশ-পরিচালকরা এসে কোন স্পর্ধায় আমাদের হুকুম করে, তোমাদের এটার দাম বাড়াও, ওটার দাম বাড়াও, তেলের দাম বাড়াও, বালের দাম বাড়াও? আর্জেন্টিনার উদাহরণ তো আমাদের চোখের সামনেই আছে, পাছায় প্রায় লাথি মেরে তাদের বার করে দেয়া হয়েছে সে দেশ থেকে। আমরা দেখে তো শিখতে চাই-ই না, এমনকি ঠেকেও শিখি না।

আমরা গৌতম বুদ্ধের মঝ্যিমপন্থা একেবারে মজ্জায় মিশিয়ে ফেলেছি, পথেঘাটে বক্তৃতায় আর রুপালি পর্দায় বিবৃতিতে আকাশ বিদারণকরি আর নিজেদের ঘরোয়া আড্ডায় নিজেদের মধ্যে চোখ টিপে খাচরা কৌতুক করে যাই এই দারিদ্র্য আর ভিক্ষা/বেশ্যাপণ নিয়ে, তাদের সেই বিচিটুকু নাই, নিজেদের এই ফকিরের অবস্থা থেকে উত্তরণের কোন উদ্যোগ নিতে। ভালোই তো, ঋণ আসুক, সাহায্য আসুক, ঐ পয়সা তো সিস্টেম লসের চিলুমচিতে পড়বে, যার নিচে আছে আমার আর আমাদের চিরক্ষুধার্ত পকেট, গরীবের জন্য যে দুয়েক চামচ থাকবে, সেটা গরীব গিলতে পারবে না, কষ বেয়ে পড়ে যাবে, কাজেই দুঃখ নাই। ফকির মরলে দেশের লাভ। তারচেয়ে এই পয়সা দিয়ে কাজে লাগুক আমার নতুন গাড়িটা কেনার কাজে, হোম থিয়েটার, বউশালিদের মোটাসোটা গলায় গয়না, ছেলেটা কাঁদে ভালো একটা ক্যামেরাঅলা মোবাইলের অভাবে শাঁসালো গার্লফ্রেন্ড বাগাতে বা লাগাতে পারে না বলে, মেয়েটারো অভিযোগ কাছাকাছি রকমের, ওদের ওসব কিনে দিই, আসছে ফলে দুটাকেই পাঠিয়ে দেবো কানাডায়, টিউশন ফি কোন ব্যাপার না ... আর টাকা না মারতে পারলে থাইল্যান্ডের সৈকত হোটেলে চিংকু মাসৌজের রেশমী ঊরু অধরা থেকে যাবে। কাজেই দেশ চুলায় যাক, আমি পয়সা মারি। শেষ বয়সে কয়েকবার হজ করে উসুল করে নিলেই হবে।

তবে যাদের প্রসঙ্গ উঠলে আমরা প্রকাশ্যে চোখ ঢুলুঢুলু করে নানা বাজে বকি আর ভেতরে ভেতরে নাক সিঁটকাই, সেই দরিদ্র জনগোষ্ঠী, যারা ভিটামাটি বেচে বিদেশে গিয়ে জানোয়ারের মতো খাটে, আধপেটা খেয়ে পয়সা জমায় দেশে পাঠানোর জন্য, এই বৃত্তি বেছে নিতে মরুভূমি আর সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে তৃষ্ণায় মরে, তারা কিন্তু অপমানটা সহ্য করেনি। চুপচাপ দাঁতে দাঁত চেপে একটু একটু করে তারা রেমিট্যান্সের পরিমাণ বাড়িয়েছে। এখন পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে বৈদেশিক সাহায্যের ওপর আমাদের নির্ভরতা আর আগের মতো নেই। বেশ্যা থেকে আবার গৃহবধূ হবার পথে চলছি আমরা। এ অবস্থায় একটা ভ্যাজাল লাগলে বেশ্যাপাড়ার কাপ্তানদের সুবিধাই হবে। তাই আমাদের রাজনীতির চোরাকারবারিদের কাছে দাঁত বার করে এসে কী কী যেন বলতে চায় তারা, টিভিতে দেখি।



অলটাইম ফকির পার্টটাইম বেশ্যা আমরা নিজেদের অবস্থার একটু উন্নতি করতে পারতাম, যদি নিজেদের কাছেই হাত পাততাম। নিজেদের ওপর আমাদের আস্থা নাই, তাই অন্যের কাছে গিয়ে কাপড় খুলে শুয়ে পড়ি। এখানেই উইকি-সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলবো।


উইকিপিডিয়া একটা বড় উদাহরণ, অলাভজনক প্রতিষ্ঠানও যে কত বড় কীর্তি করতে পারে তার। আমি যতদূর জানি, উইকিগোষ্ঠীর বেতনভূক কর্তাদের সংখ্যা হাতেগোণা, এর বেশির ভাগই স্বেচ্ছাসেবীদের অবদান। তার মানে, দুনিয়াতে কিছু লোক আছে, যারা নিজের সময় আর শক্তি দান করেছে উইকিকে। শুধু তা-ই নয়, উইকিগোষ্ঠীকে দরাজ হাতে চাঁদাও দেয় লোকে। মাগনা কাজের কিছু সমস্যা থাকে, সেগুলোকেও উইকি ভালোই মোকাবেলা করতে পেরেছে আর পারছে। উইকি এখন রোজ বাড়ছে, আরো সুশ্রী সতেজ হচ্ছে দিনকে দিন। শুধু বিশ্বকোষ না, এখন উইকি নিয়ে এসেছে আরো এক গাটঠি জিনিস। এখন শব্দকোষ থেকে শুরু করে উন্মুক্ত বিদ্যালয় পর্যন্ত খুলে বসেছে উইকি। কারণ পৃথিবীর এমন কিছু মানুষকে তারা দলে টানতে পেরেছে, যারা বিশ্বাস করে এমন কীর্তিতে। উইকির সাফল্য এই মানুষদের সাফল্য।

কোন লাভ ছাড়াই মানুষের কাজে আসা, এ-ই হচ্ছে উইকির মেসেজটা। আমরা ক্ষুদ্রঋণ গিলিয়ে বৃহৎসুদ বার করে নেই পেট থেকে, তারপর অন্যের পেটের কথা ভুলে গিয়ে নিজের পকেট নিয়ে লাফাই। অন্যলোকে জাহান্নামে যাক।


উইকির এই উদ্যোগটা কি আমরা আমাদের কাঠামোতে প্রয়োগ করতে পারি না? এই যে টেলিযোগাযোগের বিস্তৃতির সুযোগটাকে কাজে লাগিয়ে? পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীগুলোর কাছে কোনভাবে উইকিসাহায্য পৌঁছে দেয়া যায় না? সাহায্য কি শুধু কাগজের নোটেই করতে হবে? পরামর্শ দিয়ে কি করা সম্ভব নয়? মাইক্রোক্রেডিটের বদলে মাইক্রোকাউন্সেল? মৌলিক ৫টি খাতেই তো পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করা সম্ভব বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষগুলিকে। কয়েকটি নির্দিষ্ট খাতে দিনে ৫ মিনিট করেও যদি নেটযোগাযোগসম্পন্ন কেউ সময় দেন, বাংলাদেশ আর বাংলাদেশের বাইরে থেকে অনেকেই সাহায্য করতে পারি নিজেদের লোকগুলিকে। যারা আমাদের বেশ্যা বানিয়ে রাখতে চায়, তাদের মায়রে বাপ।


3 comments:

  1. well said.
    Enjoyed it thoroughly
    :)

    ReplyDelete
  2. Himu, you are brilliant! Take my advice, and become a professional political satirist.

    ReplyDelete
  3. হিমু, আপনি বাংলা উইকিপিডিয়াতে চলে আসুন!! বাংলায় ব্লগ লিখে, এরকম উৎসাহী মানুষদের আমরা খুঁজছি। আপনার পোস্টটা পড়ে ভালো লাগলো, আপনি আমাদের এই প্রজেক্টে অবদান রাখলে আরো ভালো লাগবে।

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।