Wednesday, October 04, 2006

লক্ষভেদী কাহিনী : এক ঘর মে দো পীর



যুগে যুগে লক্ষভেদীরা নির্মম মাৎসর্য্যের শিকার হয়েছেন। লক্ষ শিকার করতে গিয়ে ঝামেলা স্বীকার কম করতে হয়নি তাদের। কারণ হতে পারে একটাই, প্রতিপক্ষের ঈর্ষা।

ভাবুন একলব্যের কথাই। মানসগুরু দ্রোণাচার্যের ধ্যান করতে করতে জঙ্গলের মধ্যে আপনমনে ধনুর্বিদ্যা চর্চা করছিলেন বেচারা। চর্চায় চান্দু চৌকস, অর্থাৎ কি না, Practice makes a man perfect, একলব্য একাকী জঙ্গলে আর সব কিছু ভুলে কেবল শরনিক্ষেপ করতেন। একদিন একদল সাঙ্গোপাঙ্গো নিয়ে দ্রোণ নিজেই এসে হাজির সে জঙ্গলে। সাঙ্গোপাঙ্গোরাও হেঁজিপেঁজি কেউ নয়, খোদ কৌরব-পান্ডবের আঁটি। সাথে ছিলো একটা বেয়াড়া কুকুর। অচেনা একলব্যকে দেখে বড্ড কাউকাউ করছিলো সে। চর্চানিষ্ঠ একলব্য বিরক্ত হয়ে ঘাড়টিও ফেরালেন না, কুকুরের ঘাউঘাউ শুনে সেই শব্দ লক্ষ করে শর নিক্ষেপ করলেন। কুকুর ব্যাটা ঘায়েল। দ্রোণ স্তম্ভিত। অর্জুন, দ্রোণের ছোকরা সাগরেদ, ঈর্ষায় জরজর। করেছে কী, য়্যাঁ? এই জংলি নিষাদপুত্র যে শব্দভেদ বিদ্যা আয়ত্ব করে বসে আছে, যা দ্রোণ পর্যন্ত তাঁর শিষ্যদের শেখান না! যাই হোক, একলব্য দ্রোণকে চিনতে পেরে প্রণাম করে জানালেন, দ্রোণই তাঁর মানসগুরু, দ্রোণের আশীর্বাদেই তাঁর এই ফাঁট। অর্জুন হারামী কম নয়, সে দ্রোণের কানে গিয়ে ফুসুরফাসুর করলো কী যেন। দ্রোণ বেতনভূক জায়গীরমাস্টার, কী আর করবেন, মনে সায় না দিলেও তিনি বেশ গলা খাঁকরে বললেন, ওহে, গুরু তো তোমার হলাম, গুরুদক্ষিণা কই আমার? বাকির নাম ফাঁকি, দ্রোণ জানতেন। একলব্য জিভ কেটে বললেন, দ্রোণ গুরুদক্ষিণার খালি নামটা বললেই হলো, সে এনে দেবে। দ্রোণ অর্জুনের দিকে তাকালেন, অর্জুন ভিলেনি মুহুহুহু হাসি দিলো। দ্রোণ বললেন, দাও তবে তোমার ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলটি কেটে। একলব্যের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেলো, কিন্তু সে-ও বাপের ব্যাটা, মরদকা বাত হাতি কা দাঁত ... খ্যাঁচ করে কেটে দিলেন নিজের আঙুলটা। একলব্য, বেচারা লক্ষভেদী, কথা রাখতে গিয়ে লক্ষভেদী হিসেবে নিজের ক্যারিয়ারটাই বরবাদ করলেন।

একলব্যের পর অর্জুনই ছিলো সেরা লক্ষভেদী। আর, অবশ্যই, দ্রোণাচার্য। অর্জুন দ্রুপদ রাজার শ্যামলা মেয়ের স্বয়ম্বরা সভায় গিয়ে পানির নিচে মাছের চোখ বিদ্ধ করে দ্রৌপদীকে বাগিয়েছিলো ঠিকই, কিন্তু একটু ঠকেই গিয়েছিলো বেচারা, দ্যাখা গেলো মেয়ে খুবই স্পোর্ট, সে পাঁচ ভাইকেই ভোগ করতে চায়। জুয়াড়ি যুধিষ্ঠির থেকে শুরু করে বিটলে সহদেব, কোনটিতেই তার অরুচি নেই। আর এই দ্রৌপদী ঘরে আসার পরই পান্ডবদের যতো ঝামেলা, তার ফাইফরমাশ খাটতে গিয়ে ওষ্ঠাগত প্রাণ, তার ইজ্জৎ বাঁচাতে গিয়ে মুল্লুকজোড়া যুদ্ধ লেগে গেলো। আর অর্জুন তো যুদ্ধে গিয়ে শুরুতে মাথা বিগড়ে বসেছিলো, উল্টোপাল্টা কী সব বকছিলো, শেষে চতুর লেডিকিলার কানু ব্যাটা তাকে পটিয়ে পাটিয়ে আবার যুদ্ধে নিয়ে আসে। কত মেয়েকে পটিয়ে বিছানায় নিয়েছে সে, আর এ তো একটা ভোদাইকে পটিয়ে যুদ্ধে নেয়া। তবে কানু বেশ বলিয়ে লোক, তার বক্তৃতাটা বিখ্যাত হয়েছে বেশ, পুস্তকাকারে পাওয়া যায়। ওদিকে যুদ্ধে নেমেও অর্জুন সুবিধা করতে পারেনি, আদরের ছেলে অভিমন্যুকে খোয়ায় সে কৌরবদের হাতে। পুঁচকে মাস্তান অভিমন্যু মহড়া নিতে গিয়েছিলো বাঘা বাঘা ক্যাডারদের সাথে, সবাই মিলে ধরে তাকে একেবারে নিকেশ করে ছাড়ে।

লক্ষভেদী দ্রোণাচার্যও করুণ পরিণতি ভোগ করেন। ভন্ড জুয়াড়ি যুধিষ্ঠির গোবদা মাস্তান ভীমের বুদ্ধিতে এসে দ্রোণকে হেঁকে জানান, অশ্বত্থামা হত, তারপর বিড়বিড়িয়ে বলেন, ইতি গজ। অশ্বত্থামা দ্রোণের একটি মাত্র ছেলে, ছেলেবেলা থেকেই বখা, তবে মারকুটে, তার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে দ্রোণ বিহবল হয়ে অস্ত্র ফেলে বসে পড়েন। আসল ঘটনা হচ্ছে, অশ্বত্থামাকে পান্ডবরা কাবু করতে পারেনি, সে দূরে এক কোণায় দেদারসে প্যাঁদাচ্ছিলো পান্ডবসেনাদের। দ্রোণকে কাবু করার জন্য একটা হাতি ডেকে এনে সেটার নাম দেয়া হয় অশ্বত্থামা, ভীম গিয়ে গদার এক বাড়িতে সেই হাতিকে ঘায়েল করেন, তারপর যুদ্ধিষ্ঠিরকে বলেন, যাও, মাস্টারসাবকে গিয়ে বলো অশ্বত্থামা পটল তুলেছে। যুধিষ্ঠির আবার মিথ্যা বলতে পারে না, তাই সে বিড়বিড়িয়ে বলেছিলো, ইতি গজ, কিন্তু ওতেই তার ভাসমান রথ ঠাস করে ধূলায় পড়ে যায়, মিথ্যুকদের রথ সে আমলে ভাসতো না। যাই হোক, দ্রোণাচার্য ধনুক ফেলে আসন পেতে ধ্যান করতে থাকেন পুত্রশোকে, কাপুরুষ ধৃষ্টদ্যুম্ন এসে তখন চপার বার করে দ্রোণাচার্যের মুন্ডচ্ছেদ করে।

সব বলতে গেলে তো মহাভারত। কিন্তু এর পরবর্তীতেও যারা লক্ষভেদে ভালো ফল করেছেন, ভুগতে হয়েছে তাঁদেরও। ডোডি ফায়েদের কণ্ঠলগ্না হয়ে বেঘোরে মরতে হলো প্রিন্সেস ডি-কে। মনিকা লিউয়িনস্কির সাথে মৌখিক সঙ্গম করতে গিয়ে সিংহাসন খোয়াতে হলো লুচ্চা ক্লিনটনকে। এমনি আরো কতো কাহিনী। সব হিংসুটে লোকজনদের পাল্লায় পড়ে।

যা বলছিলাম, পুলিশও কিন্তু কম লক্ষভেদী নয়। বছরে লক্ষ লক্ষ লোককে ভেদ করেন তাঁরা। একেবারে ফুঁড়ে দেন। পেশাটাই তাঁদের এমন।

তাই লক্ষভেদী আসিফ হোসেন খান কমনওয়েলথ থেকে স্বর্ণপদক জয় করে আনায় স্বভাবতই পুলিশ কিছুটা গোস্বা করেছেন। এক ঘর মে দো পীর? এতদিন খেটেখুটেও তাঁরা Transparency Internationl এর খাতায় উঠতে পারলেন না, কোথাকার যোগাযোগ আর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় স্বর্ণপদক নিয়ে যায় ... আর একটা ওঁছা বেয়াদব শুটার দেখায় স্বর্ণপদকের ফাঁট? পিডা!
















ছবিসূত্র : বিবিসি

ছবিসূত্র : ইত্তেফাক


এক ঘর মে দো পীর? যাও বাচ্চা, সো রাহো।

আসিফ এখন বিছানায় শুয়ে, হাতে ব্যান্ডেজ। পরবর্তী এশিয়ান গেমসে বোধহয় অংশ নিতে পারবেন না বেচারা। আমরা তাঁর, এবং আমাদের পুলিশব্যবস্থার দ্রুত আরোগ্য কামনা করি।

1 comment:

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।