Saturday, October 14, 2006

সিস্টেম লস


জুন, ২০০৬ সালে প্রকাশিত বাংলাদেশ পাওয়ার সেক্টর ড্যাটা বুকটি বেশ কাজে লাগছে আমার। তিন প্রকৌশলী, আব্দুর রউফ, কেএম নাঈম খান ও শাজিবুল হক এই রিপোর্টটি প্রস্তুত করেছেন। রিপোর্ট থেকে সিস্টেম লস সম্পর্কে জাতিসংঘ ও বিদ্যুৎ কর্তাদের একটি বক্তব্য পাওয়া গিয়েছে। সেটির সাথে বাস্তবতার ফারাকটুকু চোখে পড়ার মতো। আমি ট্যাব আর গ্রাফিক, দুটিই ব্যবহার করছি।

‍"সিস্টেম লস" শব্দদু'টির সমন্বয় প্রকৃতপক্ষে মাছঢাকার জন্যে ব্যবহৃত শাকে রূপ নিয়েছে। পৃথিবীতে কোন কিছুই নিখুঁত নয়, প্রায় সব প্রক্রিয়াতেই একটি ছোট ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়। বিদ্যুৎ ব্যবস্থাটি বেশ কয়েকটি সরল ও জটিল প্রক্রিয়ার একটি সমন্বয়, তার প্রতিটি স্তরেই কিছু ক্ষতি [লস] রয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের পর তাকে উচ্চ ভোল্টেজে সঞ্চালন করা হয় দূরদূরান্তে [সাধারণত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থাকে জ্বালানি সরবরাহের জন্যে সবচেয়ে সুবিধাজনক কোন লোকালয় ও কলকারখানা থেকে দূরবর্তী জায়গায়], তারপর আবার কোন গ্রিড স্টেশনে তাকে এক ধাপ নিচে নামিয়ে আনা হয়, তারপর আবার পাঠানো হয় বিভিন্ন জায়গায়, সেখানে আবার উপকেন্দ্রে তাকে আরো এক দুই তিন ধাপ নিচে নামিয়ে যার যেমন প্রয়োজন তেমন ভোল্টেজ অনুযায়ী সরবরাহ করা হয়। এই প্রতিটি স্তরেই কিছু ক্ষতি মেনে নিতে হয়, এটি ব্যবস্থাগত ক্ষতি, একে বড়জোর সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা যায়, কিন্তু একেবারে গলা টিপে মারা যায় না। সরবরাহ পাওয়ার পর বিদ্যুৎ ভোগের সময়ও কিছু ক্ষতি [বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অপচয়] ঘটে। প্রতিটি পর্যায়ের ক্ষতিগুলোকে আঁটি বেঁধে আমরা তার নাম দিয়েছি সিস্টেম লস।


নিচের ছকটি দেখা যাক। এটি জাতিসংঘের বেঁধে দেয়া মান।

বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ক্ষতির ছক

























































































বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ক্ষতি(%)
অংশ
উন্নত
মধ্যম
ভুয়া
১১/১৩২ কেভি ট্রান্সফরমার
০.২৫
০.৩৭৫
০.৫
প্রাইমারি ২৩০ কেভি সঞ্চালন
০.৫
০.৭৫
১.০
প্রাইমারি ২৩০/১৩২ কেভি গ্রিড
০.২৫
০.৩৭৫
০.৫
সেকেন্ডারি ১৩২ কেভি সঞ্চালন
১.০
১.৫
২.০
সেকেন্ডারি ১৩২/৩৩ কেভি গ্রিড
০.২৫
০.৩৭৫
০.৫
মোট সঞ্চালন ক্ষতি
২.২৫
৩.৩৭৫
৪.৫
প্রাইমারি ৩৩ কেভি বিতরণ
২.০
৩.০
৪.০
প্রাইমারি ৩৩/১১ কেভি উপকেন্দ্র
০.২৫
০.৩৭৫
০.৫
সেকেন্ডারি ১১, ০.৪ কেভি বিতরণ
৩.০
৪.০
৫.০
সেকেন্ডারি ১১/০.৪ কেভি উপকেন্দ্র
০.২৫
০.৩৭৫
০.৫
সার্ভিস ড্রপ
১.০
১.৫
২.০
মোট বিতরণ ক্ষতি
৬.৫
৯.২৫
১২.০
সঞ্চালন + বিতরণ ক্ষতি
৮.৭৫
১২.৬৩৫
১৬.৫


এবার আসা যাক আমাদের বিদ্যুৎব্যবস্থা সম্পর্কে আমাদের বিদ্যুৎকর্তাদের সমীক্ষায় কী ফল পাওয়া যায় তার দিকে দৃষ্টি ফেলতে। নিচের ছকে দেখা যাচ্ছে এমন কিছু ফল।

বাংলাদেশের বিদ্যুদ্ব্যবস্থায় মান কারিগরি ক্ষতি



























সংস্থা
বিতরণ ক্ষতি
সঞ্চালন ক্ষতি
মোট ক্ষতি
পিডিবি
৩.০০%
৭.০০%
১০.০০%
ডেসা
২.০০%
৭.৫০%
৯.৫০%
পল্লীবিদ্যুৎ
০.৫%
৮.৫০%
৯.০০%


এবার নিচের গ্রাফিকটিতে দেখানো হয়েছে ১৯৯৫-৯৬ অর্থ বছর থেকে ২০০৫-২০০৬ অর্থ বছর পর্যন্ত প্রকৃত সিস্টেম লসের চেহারা, সাথে জাতিসংঘের টেনে দেয়া দাগ।





অনেক পথ আমাদের পেরোতে হবে এমনকি দুর্বল বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় পৌঁছোনোর জন্য। নাম মনে পড়ছে না এই মূহুর্তে, কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষদিকে মার্কিন সৈন্যদের প্রশিক্ষণ জীবন নিয়ে নির্মিত একটি চলচ্চিত্রের একটি সংলাপ মনে পড়ছে, ড্রিল সার্জেন্ট ক্রিস্টোফার ওয়াকেন নবিশ ম্যাথিউ ব্রডরিককে তম্বি করে বলছে, You need two promotions to become an Asshole. বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও সরবরাহ পরিস্থিতি যেন সে সংলাপটিরই বাস্তব রূপায়ন।

গ্রাফিকে আনুভূমিক রেখা থেকে চক্রাবক্রা রেখাটির দূরত্বগুলো যদি দেখি, তাহলে বুঝবো, ঐটুকু দূরত্বের মধ্যে রয়েছে সামান্য যান্ত্রিক ও কারিগরি ত্রুটি, যা বিদ্যুৎ কর্তাদের সমীক্ষায় বেরিয়ে এসেছে, আর বাকিটা একেবারে নিখাদ চুরি। প্রতি বছর, কোটি কোটি টাকা। আমরা এক নিঃশ্বাসে অবলীলায় বলি, সিস্টেম লস। শাক দিয়ে মাছ ঢাকা হয়ে যায়। লোডশেডিঙে ভোগা কোটি কোটি মানুষের দুর্ভোগের প্রসঙ্গও সে নিঃশ্বাসের তোড়ে সিস্টেম লসকে অভিশাপ দিতে দিতে হারিয়ে ফুরিয়ে যায়।




১ Reference: Power System in Asia & Pacific with emphasis on Rural Electrification (206), Published by United Nations

২ PDB, DESA, REB & W/B. কর্তৃক পরিচালিত সমীক্ষা অনুযায়ী।


No comments:

Post a Comment

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।