Thursday, October 05, 2006

বইপাগল : মুখের দিকে দেখি


ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিলাম, রাত জেগে তাই পড়লাম শহীদুল জহিরের "মুখের দিকে দেখি"।

জহির আমার প্রিয় লেখকদের দলে ঢুকে পড়েছেন একেবারে প্রথম পাঠেই, তাঁর "কোথায় পাবো তারে" গল্পটি যাকে বলে গুরবে কুশতন শব এ আউয়াল, পহেলা রাতেই মার্জার নিধন। খুব আগ্রহ করে বইটা হাতে নিয়ে একটানে পড়ে শেষ করলাম, সেই আনপুটডাউনেবল বইগুলোর একটি এটি। বুক রিভিউ লিখতে বসিনি, বিস্তারিত চুলচেরা বিশ্লেষণের ইচ্ছা বা যোগ্যতা কোনটিই বোধহয় আমার নেই, যা লিখবো সেটি হয়তো র‌্যানসমনোট হয়ে দাঁড়াবে, মানে কাহিনীর এখান ওখান থেকে কেটে জড়ো করা কিছু, আর বলবো যে জহির অন্য রকম করে আঁকছেন গল্পকে। তাঁর কাহিনীর ভাষা আর ভাষার কাহিনী একে অন্যকে অতিক্রম করে ছুটছে শুধু, চরিত্রগুলোকেও তিনি কাথ ব্লঁশ ধরিয়ে দিয়েছেন হাতে, তারাও ছুটছে সমানে। "মুখের দিকে দেখি" পড়ে মনে হলো, এ এক সন্তর্পণ রেখা অতিক্রমের গল্প। চরিত্রগুলি মাঝে মাঝেই বাস্তবতার রেখা অতিক্রম করে বেড়াতে যায় অবাস্তবের দেশে। বাস্তবতার ভেতরেও তারা রেখা অতিক্রমের খেলায় মেতে থাকে, ক্যাথলিক ফাদার সেলিবেসির কড়ার আর ক্যাসক বিসর্জন দিয়ে রেখা পেরিয়ে প্রোটেস্টান্ট বালিকা প্রেয়সীকে বিয়ে করে, বাঙালি মুসলমান তৃষিত হয়ে ওঠে খ্রিষ্টান প্রেমিকার কণ্ঠলগ্ন যীশুকে চুম্বনের জন্য, মুসলমান যুবতী খ্রিষ্টান প্রেমিককে টেনে আনতে চায় নিজের ধর্মের চৌহদ্দির ভেতরে, মহল্লার সামাজিক বান্দরেরা বিবর্তনের রেখা টপকে স্নেহের টানে ফিরে আসে বান্দরের দুধ খেয়ে বেড়ে ওঠা চানমিঞার কাছে, চানমিঞার মা খৈমন সাধ্যের রেখা ফুঁড়ে ছেলেকে ভর্তি করায় পয়সাওলা পোলামাইয়াদের ইস্কুল সিলভারডেলে, মামুনের মা মামুনকে কাঠের ভুসি আনতে পাঠিয়ে তাকে ঠেলে দেয় স্থানকালের রেখার ওপারে ... তাই মামুন বছরের পর বছর মামুনুল হাই হয়ে একবার জুলি ক্লার্কের টানে নারীশিক্ষা মন্দিরের গল্লিতে হানা দেয়, আবার ওদিকে বছরের পর বছর আব্দুল ওদুদ চৌধুরীর মেয়ের পোষা খরকোস হয়ে চোরাচালানের ট্রলার নিয়ে সীমান্ত রেখা পার হয়ে বার্মা চলে যায় সার আর অক্টেন নিয়ে। সব চরিত্র কখনো এক কখনো অনেক হয়ে ছুটতে থাকে উপন্যাসের সাদাকালো ছকের মধ্যে। নারিন্দার ভূতের গল্লি থেকে বার্মিংহ্যাম পর্যন্ত জহিরের অক্ষরসন্তানেরা রীতিমতো একটা কান্ড করতে থাকে, কখনো র‌্যাবের কমান্ডার আর কখনো গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের গল্পনির্যাস এসে ভুলিয়ে দেয় কিভাবে কাদের সিদ্দিকি হয়তো রেসকোর্সের ময়দানে নিয়াজির থোতার নিচে ঘুসি মেরে কাঁদিয়ে দিয়ে বলতে পারতেন শুয়ারের বাচ্চা, চুতমারানির পোলা, তোর মায়রে চুদি, আর অরোরার প্রশ্নের জবাবে বলতে পারতেন আই অ্যাম এ বাঙ্গালি উইথ শক্ত হাড্ডি এন্ড লম্বা বিয়ার্ড, মাই নেম ইজ আব্দুল কাদের, আই কাম ফ্রম টাঙ্গাইল, ডুয়িং গুল্লি, ফাইটিং ফর মাই কান্ট্রি --- হু আর ইউ? পাঠকের চোখে মহল্লার বান্দরগুলির হোগার লাল আর রবার্ট ক্লার্কের জ্ঞানধন্য কাঁটাওলা শিমুলের ফুলের লালের ঘোর লাগে ... পাঠক তো আর চানমিঞা নয় যে লাল আর সবুজকে ধূসর দেখবে, পাঠক তো বান্দরের দুদ খেয়ে বড় হয় নাই।

আয়রে তবে ভুলের ভবে অসম্ভবের ছন্দেতে ... সুকুমারের ঐ চরণটাকেই তো জীবনের ধ্রুবতারা করি আমরা অনেকে। জহির আমাদের কাঁধে চড়িয়ে যেন চড়ক মেলা দেখানোর লোভ দেখিয়ে অপহরণ করে অসম্ভবের ছন্দে নাচতে নাচতে ঢুকে পড়েন ঐ ভুলের ভবে।

শহীদুল জহির, আপনি আমার অভিবাদন গ্রহণ করুন।

1 comment:

  1. বইটা পড়ার আগ্রহ জন্মে দিলে হিমু। ধন্যবাদ

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।