Monday, October 02, 2006

অটোরিকশা


অটোরিকশার অটো উপসর্গ কিসের ইঙ্গিত? অটোক্রেসি?

আমার মন বিশ্বাস করতে চায়, নিশ্চয়ই কোন নিয়মকানুন আছে যেগুলো এঁদের মেনে চলার কথা৷ যেমন, মিটার অনুযায়ী ভাড়া রাখতে হবে, যাত্রী যেখানে যেতে চায় সেখানে যেতে হবে (রুট পারমিটের আওতা মেনে), ইত্যাদি৷ তবে যেহেতু এসব নিয়ম না মানলেও কোন কর্তৃপক্ষ কিছু বলে না, কাজেই এসব নিয়ম মেনে চলার কোন গরজ এনারা দেখান না৷ ঢাকা শহরে এনারা দুর্দান্ত অটোক্র্যাট একেকজন৷ মর্জি হলে যান, না হলে ঝিমান৷

তবে এই সিয়েঞ্জিয়েরো -দের দোষ দিয়ে লাভ নেই৷ এনারা চালান "মহাজন" এর "গাড়ি"৷ মহাজন ভদ্রলোক লাভের আশায় সোয়া এক লাখ টাকার অটোরিকশা কিনেছেন চার থেকে সাড়ে চার লাখ টাকা দিয়ে৷ সেই টাকা তাঁকে উসুল করতে হবে৷ কাজেই দিনপ্রতি তিনি তাঁর সিয়েঞ্জিয়েরোদের কাছ থেকে আদায় করেন ছয়শো টাকা৷ দিনে দশ ঘন্টার শিফট চালান এক এক জন সিয়েঞ্জিয়েরো, অর্থাৎ‍ ৬০০ মিনিট৷ মিনিট প্রতি তাঁদের দায় ১ টাকা৷ ঢাকা শহরে জ্যামের কারণে গাড়ির গতি ঘন্টায় ১২ কিলোমিটার (আমার হিসাব, আপনাদের হিসাবে কমবেশি হতে পারে)৷ কিলোমিটার পিছু ভাড়া ওঠে অটোরিকশায় ৫ টাকা৷ তার মানে মিনিটপ্রতি ১ টাকাই ভাড়া ওঠে তাঁদের৷ শুধু মহাজনের দায় মেটাতেই তাহলে টানা দশ ঘন্টা অটোরিকশা চালাতে হবে তাঁদের৷ এই দশঘন্টার মধ্যেই তাঁদের সিয়েঞ্জি রিফিল নিতে হয় পঞ্চাশ টাকার (গড়ে এক ঘন্টা সময় লেগে যেতে পারে পাম্পিং স্টেশনে), ট্রাফিক কর্তার ক্ষুধার্ত থাবায় গুঁজে দিতে হয় কিছু৷ দশ ঘন্টার মধ্যে ভাত-চা-সিগারেটের জন্য সময় ব্যয় করতে হয়৷ তারপর নিজের আয়ের ব্যাপার তো আছেই৷

জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে, সিয়েঞ্জির দাম বেড়েছে, মহাজন আর ট্রাফিক কর্তার খাঁই বেড়েছে, কাজেই সিয়েঞ্জিয়েরোদের কৌশল পাল্টাতে হয়েছে জীবনের মুখোমুখি হবার জন্যে৷ তাঁরা মিটারের রিডিঙের চেয়ে দশ থেকে বিশটাকা বেশি দাবি করেন, অথবা মিটার পদ্ধতিই বাতিল করে বাংলা পদ্ধতিতে ভাড়া দাবি করেন, জ্যাম এড়িয়ে নিজেদের পছন্দমতো হালকা রাস্তায় চলেন৷ মাঝে মাঝে আমার মতো যাত্রীদের সাথে বচসা হয়, তারা অটোরিকশা উল্টে দেয়, পিটানোর চেষ্টা করে, অটোরিকশার উইন্ডশিল্ড ভেঙে দেয়৷ অনেক হ্যাপা৷

পরিস্থিতি এমন হতো না, যদি নিয়ম অনুযায়ী মহাজনের দল দিনপ্রতি ৩০০ টাকা করে জমা রাখতো৷ কেন তারা সেটা করছে না? ঐ যে, সাড়ে চার লাখ টাকার অটোরিকশার পেছনে আপফ্রন্ট কস্ট উসুল করার জন্য৷ কেন তারা সোয়া এক লাখ টাকার জিনিস সাড়ে চার লাখ টাকা দিয়ে কিনলেন?

মাননীয় যোগাযোগমন্ত্রী নাজমুল হুদা অর্থনীতির চাহিদা ও সরবরাহ দিয়ে এর একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন হ্যালো মিনিস্টার অনুষ্ঠানে৷ তিনি বলেছেন, মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে কারো ব্যবসায় হস্তক্ষেপ করতে পারে না সরকার৷ আর সীমিত সরবরাহের বিপরীতে (ঢাকায় দশ হাজারের বেশি অটোরিকশা রেজিস্টার করা যাবে না) এই নির্দিষ্ট মডেলের অটোরিকশাটির চাহিদা ছিলো সাংঘাতিক, তাই এর বাজারমূল্যের রকেটায়ন ঘটেছে৷ দুষ্টু কিছু সাংবাদিক বেফাঁস কিছু প্রশ্ন করে মন্ত্রীমহোদয়কে বিব্রত করার অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিলো অবশ্য (নিঃসন্দেহে এরা আওয়ামী লীগ তথা ভারতের দালাল, এবং দেশের উন্নয়নের জোয়ারের বিপরীতে দাঁড়িয়ে দেশের ক্ষতির চেষ্টায় সদা ব্যস্ত), অটোরিকশার পরিবেশক প্রতিষ্ঠানের সাথে মন্ত্রীর টেবিলঢাকা যোগাযোগের কথা বলতে চেয়েছিলো, মন্ত্রীমহোদয় করুণ হুঙ্কার দিয়ে তাদের নিরস্ত করেছেন আলহামদুলিল্লাহ৷ তিনি বলেছেন, তিনি যে কী তা জানেন একমাত্র আল্লাহ, আর জানে জনগণ৷

ঠিক ঠিক৷

তবে মহাজনেরা ৩০০ টাকার বেশি জমা আদায় করতে পারবে না, এমন একটা নিয়ম নাকি আছে৷ সেটি পালনে সরকার কাউকে বাধ্য করেছে, কিংবা সেটি অমান্য করায় কাউকে শাস্তি দিয়েছে, এমন কোন সংবাদ আমরা কাগজে পড়িনি৷ নিরুপায় মধ্যবিত্ত অটোরিকশার পেছনে প্রতিদিন যে পরিমাণ উত্‍কন্ঠা, পরিশ্রম আর মানসিক অবসাদে ভোগে, তার বাজার মূল্য ক্যালরি আর ভিটামিনে হিসাব করলে ৫০ টাকার কম হবে না (এটাও আমার হিসাব, আপনাদের সাথে মিলতে না-ও পারে)৷ ঢাকা শহরে দশ হাজার অটোরিকশা প্রতিদিন ব্যবহার করে কমপক্ষে দুই লক্ষ যাত্রী, এই ভোগান্তির মূল্য তাহলে প্রতিদিন এক কোটি টাকা৷ এই ক্ষতি রোধ করতে সরকারের কোন প্রচেষ্টা আমরা দেখি না৷ এর দায় বা দায়িত্ব যে সরকারের, সেটা স্বীকার মাত্র করেননি মাননীয় মন্ত্রী৷ তিনি অর্থনীতিশাস্ত্রে ব্যাপক দখল রাখেন, তবে গণমনস্তত্ত্বে সম্ভবত একটু কাঁচা৷ বিরোধী দল এই ইসু্যটিতে টোকা দিতে ব্যর্থ হয়েছে, তারাও জনগণের ভোগান্তি কমানোতে আগ্রহী, এমন কোন নমুনা আমরা দেখি না৷

কিছুদিন আগে একটা নামকাওয়াস্তে বিক্ষোভ-ধর্মঘট করেছে সিয়েঞ্জিয়েরোবৃন্দ৷ কোন ফল মেলেনি৷

এই সরকারের কাছে পাঁচ বছর ধরে চেয়ে চেয়ে আমরা হতাশ, এবারের মতো তাঁদের বিদায়ের সময়ও চলে এসেছে৷ তাহলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার কি এ ব্যাপারে কিছু করতে পারেন? সেই এখতিয়ার কি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কান্ডারীদের আছে?

অর্থনীতি শিখে শিখে আমরা ক্লান্ত৷ প্রতিদিন এই হ্যাপা আর ভালো লাগে না৷ অর্থনীতির পাশাপাশি স্থানীয় সমাজনীতিও আমরা অল্প শিখেছি, তার মধ্যে একটি জনপ্রিয় বাক্য হচ্ছে, মাইরের উপরে ঔষধ নাই৷


সিএনজি [CNG] চালিত অটোরিকশাচালকদের একটা বাহারী নাম থাকা উচিত। তাই ইংরেজি আর হিস্পানিকের সমস্বয়ে এই নাম রাখলাম। কাবায়েরো, ফন্তানেরো, তোরেরো, পিস্তলেরো হতে পারে ... সিয়েঞ্জিয়েরো কেন হতে পারবে না?

2 comments:

  1. Bechara auto-rickshawalara, khubi maya lagchhe.
    Nazmul Huda'r nadush nudush chehara dekhte aar guchhiye kotha bola shunte oshojjho lagey.

    ReplyDelete
  2. He could manage all those fluffy bullshit because he doesn't use Autorickshaw. I wish we could strip these guys off their due facilities serving their official capacity. If he had to attend office using a bus or cab, I think the scenerio would have turned better and smoother.

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।