Friday, September 01, 2006

গোয়েন্দা ঝাকানাকা!


১.

'মুহাহাহাহাহা!'

চারপাশ কেঁপে ওঠে। কাঁপবেই তো।

পাঠক হয়তো এ শব্দটার কোন কিনারা করতে পারবেন না, আর করবেনই বা কিভাবে, যা বিদঘুটে আওয়াজ, বাব্বাহ্ --- কিন্তু অভিজ্ঞ পাঠক বুঝে ফেলেছেন, এটা একটা হাসির শব্দ। তবে অভিজ্ঞ পাঠকদের মধ্যেও জাতভেদ আছে, স্বীকার করতেই হবে। এনাদের মধ্যে যাঁরা একটু নিচু জাতের, তাঁরা হয়তো এটাকে কোন ভিলেন কি টপটেররের অট্টহাসি ভাবছেন। বড়জোর কোন মন্ত্রী-সাংসদ। কিন্তু না, নিচু জাতের অভিজ্ঞ পাঠক ভাইসব, এ হাসি সেই কুখ্যাত খুনে দসু্য বদরু খাঁ, যে শুধু রাত বারোটায় খুনখারাপি করে, তার বিকট কন্ঠনিঃসৃত নয়, কিংবা চতুর চোরাচালানবাজ আদমাহানি ইস্পানজি, যে কেবল ভোর তিনটেয় ট্রাকের পর ট্রাক সীমান্তের এপারওপার করে, সেও অমন হাসির জন্যে দায়ী নয়, এ হাসি হাসছেন আমাদের গল্পের নায়ক, উপমহাদেশের স্বনামখ্যাত গোয়েন্দা, গোয়েন্দা ঝাকানাকা, যাঁকে সনাক্ত করতে পেরেছেন কেবল আমাদের উঁচু জাতের অভিজ্ঞ পাঠক সমাজ!

ঝাকানাকার হাসির শব্দে চারপাশ যেমন কেঁপে ওঠে, তেমনই কেঁপে ওঠেন বৈঠকখানায় বসে থাকা তিন ভদ্রলোক। সোফার পাশে চার পা মুড়ে বসে থাকা ছাগলটাও দাড়ি কাঁপিয়ে ম্যাঅ্যাঅ্যা করে ডেকে ওঠে।

'আপনাদেরকে যদিও তিন ভদ্রলোক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া হচ্ছে,' আলাপের সুরে বললেন ঝাকানাকা, আর বলবেন না-ই বা কেন, তিনি তো আলাপই করছেন, আলাপের মাঝে তো আর বিলাপের সুর তোলা ভালো কাজ নয়, 'কিন্তু আদতে আপনাদের মধ্যে কেবল দুজন ভদ্রলোক। বাকিজন হচ্ছে লুচ্চা, গুন্ডা, বদমাশ, খুনে, ইতর এক বোঁচকামারা বাটপার!'

আবারও চারপাশ কেঁপে ওঠে ঝাকানাকার আলাপের সুরে, দুই ভদ্রলোক আর লুচ্চা, গুন্ডা, বদমাশ, খুনে, ইতর এক বোঁচকামারা বাটপার আরো বেশি করে কেঁপে ওঠেন। ছাগলটা আবারও ম্যা বোল তোলে। ঝাকানাকা তৃপ্তির হাসি হেসে চায়ে চুমুক দেন আর গোঁফে একবার তা দেন। 'আসুন, পরিস্থিতিটা একবার বিশ্লেষণ করে দেখা যাক।' গোয়েন্দাশ্রেষ্ঠ উঠে পড়েন সোফা থেকে, তারপর পায়চারি করতে থাকেন ঘরের এ কোণ থেকে ও কোণ। আর এরই ফাঁকে পকেট থেকে একটা জাবদা চেহারার নোটবই বের করে তিনশো একান্ন নাম্বার পৃষ্ঠা বার করেন। 'গত পরশু দিন, রাত বারোটার সময় এখানে একটা নৃশংস খুন হয়।' গোয়েন্দা ঝাকানাকা ডায়রি দেখে হেঁকে বলেন।

এবার আরেকটা সোফায় বসা দারোগা কিংকর্তব্যবিমূঢ় চৌধারি, যাঁকে অভিজ্ঞ পাঠক সমাজ (উঁচু ও নিচু দুজাতেরই) কিংকু চৌধারি নামেই চেনেন, মোলায়েম একটা কাশি দেন। ঝাকানাকা থেমে পড়ে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকান। 'গতকাল রাত বারোটায়।' বিনীত গলায় বললেন কিংকু চৌধারি, আর বলবেন না-ই বা কেন, চৌধারি বংশের সন্তান, চৌদিকেই ধারালো তিনি, বিনয়-আদব তাঁর রক্তে মিশে আছে। তাছাড়া গোয়েন্দা ঝাকানাকার সাথে বিনয় না দেখিয়ে তাঁর উপায়ও নেই, বেয়াদবি করলেই তাঁকে ঘাগড়াছড়িতে বদলি করা হতে পারে, যেমন করা হয়েছিলো এই থানার ভূতপূর্ব দারোগা ঘুষেন্দ্র মালদারকে।

গোয়েন্দা ঝাকানাকা ভুরু কুঁচকে বলেন, 'কিন্তু কিংকু সাহেব, আপনিই তো আমাকে গতকাল ভোর একটায় ফোন করলেন?'

কিংকু চৌধারি একটু ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, 'ভোর একটা? হ্যাঁ, তা বলতে পারেন।' ঝাকানাকা বুক ঠুকে বললেন, 'অবশ্যই বলতে পারি, রাত বারোটার পরই তো ভোর। --- যাকগে এসব বাজে আলাপ, যা বলছিলাম, গত পরশু, রাত বারোটায় একটা খুন হয় এ বাড়িতে। কাকে খুন করা হয়েছিলো যেন?' ডায়রির পাতা উল্টে যান তিনি, 'ও হ্যাঁ --- এ বাড়ির মালিক, সরফরাজ জবরদস্ত-কে।'

তিন ভদ্রলোক, থুক্কু, দুই ভদ্রলোক আর লুচ্চা, গুন্ডা, বদমাশ, খুনে, ইতর এক বোঁচকামারা বাটপার এবার ভারি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন ঝাকানাকার দিকে। ছাগলটাও যেন ঘাবড়ে গিয়ে একবার এদিক, আরেকবার ওদিকে তাকায়। কিংকু চৌধারি ভারি বিনীত গলায় শুধরে দেন, 'জ্বি না, তাঁর নাম আওরঙ্গ আলম।'

গোয়েন্দা ঝাকানাকা এবার ডায়রিটা চোখের কাছে ধরেন, তারপর পকেট থেকে একটা চশমা বের করে ডায়রিটা আলোর দিকে ফিরিয়ে ধরেন, তারপর সোজা হয়ে বলেন, 'ঠিক, আওরঙ্গ আলমই বটে।' তারপর গলা খাঁকরে কিংকু চৌধারির দিকে ফিরে কড়া গলায় বলেন, 'এমন জড়ানোপাকানো বিচ্ছিরি হাতের লেখা, কী লেখা হয়েছে, কিচ্ছু বোঝার উপায় নেই --- কে লিখেছে এসব?'

কিংকু চৌধারি বিনয়ে মাথা নত করে লাজুক গলায় কী যেন বললেন। কিন্তু ঝাকানাকা উত্তর শুনে মহা চটে গেলেন। 'আপনার সুন্দরী সেক্রেটারি মিস মিলি? কেন এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লেখার দায়িত্ব আপনি আপনার সুন্দরী সেক্রেটারি মিস মিলিকে দেন? আর দেবেন না বলে দিচ্ছি। শুধু গ্ল্যামার থাকলেই কাজ চলে না, গ্রামারও কিছু জানতে হয়! মেয়েটার হাতের লেখা যে কী বিচ্ছিরি, বলে বোঝানোর উপায় নেই। ভবিষ্যতে ওকে আর এসব গুরুত্বপূর্ণ কাজ দেবেন না, বরং হালকা কোন কাজ, যেমন ধরুন, আমার সাথে যোগাযোগ করার দায়িত্ব, এ ধরনের কোন কাজ দেবেন আপনার সুন্দরী সেক্রেটারি মিস মিলিকে।'

কিংকু চৌধারি অবাক হয়ে বিনয়ে মাথা সোজা করে বললেন, 'কিন্তু স্যার, আমি তো সরকারি চাকরি করি, দারোগার আবার সুন্দরী সেক্রেটারি আসবে কোত্থেকে? তাছাড়া, মিস মিলি তো আপনার সেক্রেটারি!'

ঝাকানাকা চটে গিয়ে বললেন, 'তাহলে আপনি কেন বললেন, এসব আপনার সুন্দরী সেক্রেটারি মিস মিলির লেখা?'

কিংকু চৌধারি ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, 'সেটাই তো বললাম স্যার, ওই নোটবুকে যা কিছু সব আপনার সুন্দরী সেক্রেটারি মিস মিলির লেখা।'

গোয়েন্দা ঝাকানাকা গভীর ভাবনায় মগ্ন হয়ে পড়েন, তারপর কটমট করে কিংকু চৌধারির দিকে তাকিয়ে বলেন, 'ওহ!' ওদিকে দুই ভদ্রলোক আর লুচ্চা, গুন্ডা, বদমাশ, খুনে, ইতর এক বোঁচকামারা বাটপার একে অপরের মুখের দিকে তাকায়। তবে ছাগলটার মুখের দিকে কেউ তাকায় না, তাকাবেই বা কেন বলুন, ছাগলের মুখ তো আর তাকিয়ে থাকার মতো কিছু নয়, তাই ছাগলটা সবাইকে একবার করে দেখে নিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেয়ালে ঝোলানো আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকে খুঁটিয়ে দেখে।

যাই হোক, ঝাকানাকা নিজেকে সামলে নিয়ে আবার পায়চারি শুরু করেন। 'যা বলছিলাম, গত পরশু রাত বারোটায় এ বাড়িতে নৃশংসভাবে খুন হন এ বাড়ির মালিক, আওরঙ্গ আলম। মৃতু্যকালে তাঁর বয়স হয়েছিলো --- দাঁড়ান দেখি কত,' আবারো ডায়রিটা খুলে ধরেন তিনি, কিছুক্ষণ চোখ কুঁচকে তাকিয়ে থেকে সেটা বন্ধ করে পকেটে গুঁজে রাখেন, তারপর গলা খাঁকরে বলেন, 'ইয়ে --- অনেক বয়স হয়েছিলো বেচারার। কয়েকদিন বাদেই হয়তো অসুখবিসুখে পড়ে মারা যেতেন, কিন্তু না!' নাটকীয়ভাবে শরীর মোচড় দিয়ে ঘোরেন তিনি সোফার দিকে, যেখানে সেই তিন --- ব্যক্তি বসে আছে। 'কয়েকদিন সময় তাঁকে দিতে চায়নি সেই লুচ্চা খুনেটা। তাঁকে রাতে ঘুমের মধ্যে মুখের ওপর বালিশ চেপে ধরে নির্মমভাবে খুন করে সে। ধস্তাধস্তির শব্দ শুনে বাড়ির লোকজন ছুটে আসে। এসে দেখে যে শোবার ঘরে মরে পড়ে রয়েছেন অসহায় আওরঙ্গ আলম, মুখের ওপর তখনও বালিশটা পড়ে রয়েছে,' পকেট থেকে ডায়রিটা আবার বের করে পড়েন ঝাকানাকা, 'ঘাতক বালিশের ছিলো নীল রঙের ওয়াড়, ওজন প্রায় এক কেজি, নীলক্ষেতের তুলোর দোকান থেকে বানানো হয়েছিলো --- ইয়ে, বছর পাঁচেক আগে, হুমম। যাকগে, আওরঙ্গ আলম মৃত্যুর আগে পর্যন্ত চরম ধস্তাধস্তি করেছিলেন, এ থেকে বোঝা যায়, তিনি ঘুম থেকে জেগে উঠেছিলেন, অথবা আদপে ঘুমোননি --- তবে বালিশটাকে আঁচড়ে কামড়ে একেবারে ফালাফালা করে ফেলা হয়েছে। অবশ্য পাঁচ বছরের পুরনো বালিশ, ধস্তাধস্তি সহ্য করার ক্ষমতা তার আদৌ ছিলো বলে মনে হয় না। যাই হোক, আমরা ধরে নিতে পারি, খুন হবার আগে তিনি সচেতন ছিলেন, কে জানে, হয়তো হত্যাকারীকে চিনেও ফেলেছিলেন। ধস্তাধস্তির শব্দ শুনে দোতলার ঘরে ছুটে আসেন তাঁর কন্যা, বনানী পারভিন, যিনি এখন মানসিক আঘাত পেয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন, আর আপনি,' বসে থাকা তিন ব্যক্তির মধ্যে একজনের দিকে আঙুল তুলে বাজখাঁই গলায় বলেন ঝাকানাকা, সেই ব্যক্তি কেঁপে ওঠেন, '--- জিন্দাদিল জব্বলপুরী, তাঁর জামাতা। এসে দেখেন, ঘরের দরজা খোলা, ভেতরে খাটের ওপর পড়ে আছেন আওরঙ্গ আলম, তাঁর মুখের ওপর বালিশ। তাই তো?' জিন্দাদিল জব্বলপুরী ইতিবাচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়েন। 'হুম। আপনারা দুজন তখন জোর চিৎকার করে ওঠেন। এই চিৎকার শুনে কোত্থেকে যেন ছুটে আসেন, আপনি,' দ্বিতীয় ব্যক্তির দিকে তাকিয়ে চোখ গরম করেন দুর্ধর্ষ গোযেন্দা, 'নিহত আওরঙ্গ আলমের ভাগ্নে, বজরঙ্গ বাহরাম। ঠিক?' বজরঙ্গ বাহরাম শুষ্ক মুখে মাথা নাড়েন। 'তারপর আপনিও দৃশ্যটা দেখে চিল চিৎকার করে ওঠেন। আপনাদের চিৎকার শুনে, বাইরে থেকে ছুটতে ছুটতে ঘরে ঢোকেন আপনি,' কটমটিয়ে অবশিষ্ট ব্যক্তিটির দিকে তাকান ঝাকানাকা, 'আওরঙ্গ আলমের শালা, বিল্লাল বসুনিয়া, নাকি ভুল বললাম?' নেতিবাচকভাবে মাথা দোলান বসুনিয়া। 'তারপর আপনারা সবাই মিলে পাড়া মাথায় তুলে চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে ঘরে ঢুকে নিহত আওরঙ্গ আলমের মুখের ওপর থেকে বালিশটা সরান। সরিয়ে দেখেন, তিনি মুখ ভেটকে পড়ে আছেন, তাই না?' এবার সবাই মাথা নাড়েন, এমনকি ছাগলটাও। 'আপনারা তাই দেখে ভয়ে আরো জোরে চেঁচিয়ে ওঠেন। এবার ঘটে এক আছায্য ঘটনা, আওরঙ্গ আলম চোখ খোলেন। তারপর হাত পা নাড়ান। তারপর একটা হাত তুলে বলেন, "ব --- ব --- ব --- ব ---", তারপর তিনি আবার মৃতু্যর কোলে ঢলে পড়েন। নাকি?'

এবার কিংকু চৌধারি মৃদু কাশেন। 'আবার নয়, তখনই তিনি মৃতু্যর কোলে প্রথম ও শেষবারের মতো ঢলে পড়েন।'

'ঐ হলো। যেই লাউ সেই কদু।' ঝাকানাকা হাতে হাত ঘষেন। 'উনি কবার মরলেন, সেটা বড় ব্যাপার নয়। বড় ব্যাপার হচ্ছে, মরার আগে তিনি চারবার "ব" বলেছেন। কেন?'

এবার জিন্দাদিল জব্বলপুরী লাফিয়ে ওঠেন, 'আমি জানি কেন! তিনি খুনীকে চিনিয়ে দিয়ে গেছেন! এই বজরঙ্গ আর এই বসুনিয়া, দুই ব-ওয়ালা বখাটে বকলম বদমাশ মিলে বালিশ দিয়ে চটকে আব্বাসাহেবকে খুন করেছে! দেখেছেন ওদের স্বাস্থ্য? এই বজরঙ্গ হারামজাদাটা দিন রাত বারবেল ভাঁজে, সারাটাক্ষণ গুন্ডামির তোড়জোড় করে ব্যাটা, আব্বার পয়সায় ছোলামটর খেয়ে খেয়ে দেখুন কেমন কেঁদো শরীর বানিয়েছে বদমাশটা, দেখুন, বাইসেপ ট্রাইসেপ সব কেমন বাগিয়ে বসে আছে! আর --- আর ঐ বসুনিয়াটাও কম যায় না, সারারাত ধরে গাঁজা খেলে কী হবে, সকালে উঠেই দুসের দুধ খেয়ে ক্ষেতিটা একেবারে সুদে আসলে পুষিয়ে নেয় ব্যাটা বাটপার!'

'বটে?' সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে বাকি দুজনের দিকে তাকান ঝাকানাকা। 'সত্যি নাকি?'

জিন্দাদিলের দিকে এক পশলা জিঘাংসু দৃষ্টি হেনে বজরঙ্গ বলেন, 'হ্যাঁ স্যার।'

ঝাকানাকা গর্জে ওঠেন, 'হ্যাঁ স্যার মানে? কী --- কী বলতে চাও তুমি? তোমরা দুজন মিলে আওরঙ্গ আলমকে একটা পাঁচ বছরের পুরনো ময়লা বিটকেলে গন্ধওয়ালা বালিশ চেপে খুন করেছো? আবার এতবড় সাহস, সরাসরি কবুল করো আমার সামনে, আমাকে মাথা ঘামানোর বিন্দুমাত্র সুযোগ না দিয়ে? কিংকু সাহেব, দিন তো ফিচলে দুটোর হাতে হাতকড়া এঁটে!'

বজরঙ্গের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়, সে তাড়াতাড়ি বলে, 'না স্যার, আমি সে কথা বলছি না।'

ঝাকানাকা এবার খানিকটা প্রসন্ন মুখে বললেন, 'তবে কী বলতে চাও?'

'আপনি যে বললেন, সত্যি কি না, আমি ভাবলাম, ব্যায়ামের কথা বলছেন বুঝি, তাই হ্যাঁ বলেছি স্যার। আমার স্যার, একটু স্বাস্থ্যবাতিক আছে আর কি, তাই খুব ভোরে উঠে ব্যায়াম করতে বসি। ডন বৈঠক দেই, আর ছোলাটোলা খাই, আপনাদের দোয়ায় স্বাস্থ্য আমার খারাপ না।' সত্যি সত্যি শার্টের হাতা গুটিয়ে দোয়াদত্ত এক গুচ্ছ চারতলা পেশি দেখিয়ে দেয় সে। 'কিন্তু এই ব্যাটা বল্টু যা বলছে, তা মোটেও সত্যি নয় স্যার। আমি কেন মামাকে খুন করতে যাবো?'

'বল্টু কী?' ঝাকানাকা প্রশ্ন করেন।

'কী নয়, বলুন কে! এই যে, এই অকর্মার ধাড়িটার নামই তো বল্টু!' জব্বলপুরীকে দেখিয়ে বলে বজরঙ্গ। 'ব্যাটার নাম তো খুব জাঁকের, জিন্দাদিল জব্বলপুরী, কিন্তু সবাই ওকে বল্টু নামেই চেনে।'

'আচ্ছা!' মোচে তা দিলেন ঝাকানাকা।

'আর ও মোটেও সত্যি বলেনি স্যার!' বসুনিয়া এই ফাঁকে ডুকরে ওঠেন। 'আমি স্যার, গাঁজাফাঁজা খাই না স্যার। সারারাত জেগে থাকতে হয়, সকালে একটু দুধ না খেলে শরীরে বল আসে না স্যার। তাতেও এই বল্টু শালার আপত্তি। আর নিজে দুলাভাইয়ের পয়সায় ঘিচপচপ পরোটা আর মুর্গমোসল্লম ওড়ায়! ওর স্বাস্থ্যটাই বা খারাপ কিসে, বলুন? বছরে পর বছর মাগনা খেয়ে খেয়ে ওর ভুঁড়িটা কেমন হয়েছে, একবার পাঞ্জাবী উল্টে পরখ করে দেখুন না স্যার। ওরকম একটা ভুঁড়ি থাকলে বালিশ লাগে? ঐ ভুঁড়ি দিয়েই তো ও দুলাভাইকে খুন করেছে!'

'হুমম।' জব্বলপুরী ওরফে বল্টুর পাঞ্জাবীআবৃত ভুঁড়ির দিকে একটি কটাক্ষ হানেন ঝাকানাকা। 'হ্যাঁ, ভুঁড়িটা তো নেহায়েত ফেলনা নয় --- যদিও ভুঁড়িটুড়ি ফেলে দেয়াই ভালো।'

বল্টু এবার দাঁতে দাঁত পিষে বলেন, 'আমি আমার শ্বশুরের পয়সায় খাই, তাতে তোদের এতো জ্বলে কেন রে, পরগাছার দল? দাঁড়া, এবার তোদের পেঁদিয়ে এই বাড়িছাড়া যদি না করেছি তো আমার নাম বল্টু, মানে জিন্দাদিল জব্বলপুরীই নয়!'

ছাগলটা ম্যা করে ওঠে। ঝাকানাকা গর্জে ওঠেন, 'খামোশ!' সবাই থেমে যায়, ছাগলটাও।

ঝাকানাকা খানিকটা পায়চারি করে বলেন, 'খুবই সন্দেহজনক। এ বাড়িতে নিহত আওরঙ্গ আলম বাদে আর মাত্র চারজন বাস করেন, বনানী, বল্টু, বজরঙ্গ আর বসুনিয়া। চারজনের নামই তো ব দিয়ে শুরু। আবার আওরঙ্গ সাহেব দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে যে প্রথম গানটা জুড়ে দিয়েছিলেন, তাতেও ব আছে চারবার! মনে তো হচ্ছে, চারজন মিলেই কাজটা করেছে!'

এবার সবার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায়। ঝাকানাকা আড়চোখে তিনজনকে দেখেন। তারপর গলা খাঁকরে বলেন, 'মিসেস বল্টু, মানে বনানী পারভিন তো হাসপাতালে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছেন। তাঁকে এখনো জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়নি। তবে তিনিও আমাদের সন্দেহের তালিকায় বিদ্যমান। যাই হোক, আপনাদের প্রাথমিকভাবে যখন পুলিশ জেরা করেছে, আপনারা একেকজন একেকরকম কাহিনী পয়দা করেছেন। আপনাদের তিনজনের মধ্যে একজনের কাহিনীতে গলদ থাকবে, স্বাভাবিকভাবেই, কারণ খুনটা সেই ব্যাটাই করেছে! আসুন দেখি, আরেক দফা শোনা যাক গল্পগুলো। প্রথমে আপনি, বল্টু, বলুন, কী হয়েছিলো সে রাতে?'

বল্টু ঘাবড়ে গিয়ে বলেন, 'আমি? আমি কেন শুরুতে বলবো? এই বজরঙ্গ আর ঐ বসুনিয়া, ওরাই বলুক না আগে। ওদের গল্পেই বিস্তর গলদ পাবেন আপনি। মিথু্যকগুলো রোজ বাজারের পয়সা মারতো, আর হিসেব দিতে গিয়েই আব্বাসাহেবের কাছে ধরা খেতো!'

বজরঙ্গ বাইসেপ ফুলিয়ে বল্টুর দিকে ফেরেন। 'আর তুই? ব্যাটা ঘাগু চোর! তোকে তো মামা একদিনও পাকড়াতে পারেনি, অথচ তুই রোজ বাজারের পয়সা ঝেড়ে দিয়ে সিনেমা দেখিস, বিড়ি খাস, ফকিরকে পয়সা বিলিয়ে বেড়াস, ব্যাটা ফাজিলের ঝাড়!'

বসুনিয়াও ফুঁসে ওঠেন, 'বাজারের পয়সা মেরে মেরে তুই গাঁজা খাস রাতের বেলা, তুই!'

'চোপ!' গর্জে ওঠেন ঝাকানাকা। 'কী হলো, বল্টু?'

বল্টু গলা খাঁকরে বলেন, 'আচ্ছা, আচ্ছা, বলছি শুনুন।' আড়চোখে বাকি দুজনের দিকে চেয়ে দেখলেন একবার, তারপর বলতে লাগলেন। 'আমাদের ঘরটা দোতলায়, ডানদিকে। তো, রাতে শুয়ে আছি, এমন সময়, নিচে ক্যাঁঅ্যাঁচ ক্যাঁঅ্যাঁচ করে একটা শব্দ হলো। আমি বনুকে বললাম, "এটা কিসের শব্দ?" বনু বিরক্ত হয়ে বললো, "তোমার মাথা!" আমি বললাম, "চোর না তো?" বনু বললো, "তোমার কি মাথা খারাপ? চোর এসে কী ঘোড়ার ডিম চুরি করবে, এ বাড়িতে চুরি করার মতো আছে কিছু? তাছাড়া এ বাড়িতেই তো জলজ্যান্ত দুটো চোর বাস করে, বাইরে থেকে আবার চোর আসতে হবে কেন?" তো, আমি ভেবে দেখলাম, কথা সত্য ---।' বজরঙ্গ আর বসুনিয়া, দুজনই শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে উঠে দাঁড়ালেন। বল্টু জব্বলপুরী তাড়াতাড়ি বললেন, 'আমি ভেবে দেখলাম, কথা সত্য, এ হচ্ছে আব্বাসাহেবের মতো হাড়কেপ্পনের বাড়ি, এখানে চোর আসবে কেন? তো, আমি আবার ঘুমোনোর চেষ্টা করছি, এমন সময় সিঁড়িতে খুটখুট আওয়াজ হলো। আমি আবার বললাম, "বনু, সিঁড়িতে কিসের শব্দ?" বনু ঘুমিয়ে পড়েছিলো, সে মহা ক্ষেপে গিয়ে বললো, "আমার মাথা!" তো, আমি ভাবলাম, নিশ্চয় বসুনিয়া কোথাও থেকে গাঁজাটাজা খেয়ে বাড়ি ফিরেছে, তো, আবার শুয়ে পড়লাম।' বসুনিয়া পাঞ্জাবীর হাতা আবার কব্জি পর্যন্ত সমান করে এনেছিলেন, তিনি এ কথা শুনে আবারও তা গোটাতে শুরু করলেন, কিন্তু ঝাকানাকা একটি রক্তজলকরা কটাক্ষ ঝেড়ে তাঁকে নিবৃত্ত করলেন। জব্বলপুরী বলতে লাগলেন, 'একটু পরেই কেমন একটা হাত-পা ছোঁড়াছুঁড়ির শব্দ হতে লাগলো, আমি বনুকে বললাম, "বনু, একটা মারামারির শব্দ হচ্ছে, শুনতে পাচ্ছো?" বনু এবার চোখ খুলে বললো, "হ্যাঁ, তাই তো!" এরপর আবার সিঁড়িতে একটা খটখট শব্দ হলো, তারপর আবার ক্যাঁঅ্যাঁচ ক্যাঁঅ্যাঁচ করে শব্দটা হলো। আমি উঠে বসে বললাম, "চলো, দেখে আসি।" বনু বললো, "হ্যাঁ, চলো।" তারপর আমরা দুজন ঘর থেকে বেরিয়ে দেখি, আব্বাসাহেবের ঘরের দরজা খোলা, ভেতরে আলো জ্বলছে! তখনই বুঝলাম, ডাল মে কুছ কালা হ্যায়, কারণ আব্বাসাহেব কখনো রাতে নিজের ঘরে আলো জ্বলতেন না, পয়সা বাঁচানোর জন্যে। বনু তো ভেতরে গিয়ে উঁকি দিয়েই চেঁচাতে লাগলো। তারপর আমিও উঁকি দিয়ে দেখি, আব্বাসাহেব খাটের ওপর তিনভাঁজ হয়ে পড়ে, মুখের ওপর বালিশ। এই দুই বদমায়েশকে ডাকাডাকি শুরু করলাম। একটু পর নিজের ঘর থেকে এই বজরঙ্গ শালা বের হয়ে এলো, চোখ ডলতে ডলতে, এমন একটা ভাব যেন সে ঘুমোচ্ছিলো, কিন্তু মুখ দিয়ে ভকভকিয়ে তাড়ির গন্ধ বেরোচ্ছে, মাতাল কোথাকার! --- তারপর ঘরে ভেতরে একবার উঁকি দিয়েই সে চেঁচাতে লাগলো। তখন বাইরে থেকে গদাম করে দরজা খুলে বসুনিয়াটা লুঙ্গি মালকোঁচা মেরে ছুটতে ছুটতে এলো --- তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে সিঁড়ি বেয়ে উঠলো, তারপর ঘরে ঢুকে বিকট একটা চিৎকার দিলো। তো, আমি সবাইকে কোনমতে শান্ত করে বললাম, চলো, বালিশটা উল্টে দেখি! তখন এই বজরঙ্গ বলে কি, "আমি ঐ বালিশে হাত লাগাতে পারবো না, ওটা কয় মাস ধোয়া হয় না কে জানে, চিমসে একটা গন্ধ বেরোচ্ছে, দেখছো না?" আমি বললাম, "তবে রে অকৃতজ্ঞ, যার পয়সায় খেয়েপরে বেঁচে আছিস, তার জন্যে এটুকুও করতে পারবি না, পাষন্ড কাঁহিকা?" তখন বজরঙ্গ আমায় তেড়ে মারতে এলো। তখন বনু সবাইকে ধমকে এগিয়ে গেলো। সে বালিশটা তুলতেই দেখি, আব্বাসাহেবের মুখ নীল হয়ে আছে, চোখ উল্টে জিভ বের করে পড়ে আছেন! সেই চেহারা দেখে আমরা আবার চিৎকার করে উঠলাম, আর এই বসুনিয়াটা, জানেন, খিকখিক করে হেসে ফেললো! তখন আব্বাসাহেব পট করে একটা চোখ খুললেন। তারপর কাঁপতে কাঁপতে একটা হাত তুলে একবার বজরঙ্গকে, আর একবার বসুনিয়াকে দেখিয়ে বললেন, "ব --- ব --- ব --- ব ---", তারপর তাঁর হাতটা বিছানাতে পড়ে গেলো। আমি তখন কাছে গিয়ে ওনার বুকে কান পেতে দেখি, কোন শব্দ হচ্ছে না। তারপর বনু কাঁদতে কাঁদতে ফিট হয়ে গেলো। তারপর এই বজরঙ্গ ডাক্তার আর পুলিশকে ফোন করলো। তারপরই তো আপনারা এলেন।'

ঝাকানাকা মনোযোগ দিয়ে সব শুনলেন, তারপর বজরঙ্গ আর বসুনিয়ার দিকে ফিরলেন। দুজনেই মহা চটে বল্টু জব্বলপুরীর দিকে রোষকষায়িত চোখে তাকিয়ে আছে, দুজনেরই পাঞ্জাবীর হাতা গোটানো, বাইসেপ বিপজ্জনকভাবে উদ্যত। 'ইনি যা বললেন, তা সত্যি?"

'মোটেও না!' গরম গলায় বলে বজরঙ্গ। 'মিথু্যকটা আগাগোড়া মিথ্যে কথা বলছে! আমাদেরকে কায়দা করে ফাঁসিয়ে দিতে চায় ব্যাটা ফেরেব্বাজ! আর আমি মোটেও তাড়িফাড়ি খাই না, বরং এই ব্যাটা বল্টুই মাঝে মাঝে রাতে ছাদে গিয়ে ব্যাটারিভেজানো ধেনো খায়!'

'হ্যাঁ!' জোর গলায় সমর্থন জানালেন বসুনিয়া। 'ও ব্যাটা নিজে খুন করে আমাদের ওপর দোষ চাপাতে চায়! ও আগেও এমন করেছে। বাজারের পয়সা মেরে আমার ঘাড়ে দোষ চাপিয়েছে!'

'চোপ!' গর্জে ওঠেন ঝাকানাকা। 'এবার বজরঙ্গ, আপনি বলুন। কী ঘটেছিলো সে রাতে?'

বজরঙ্গ গলা খাঁকরে শুরু করেন। 'আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। অনেক ভোরে উঠতে হয় ঘুম থেকে, ব্যায়াম করতে হয়, নাশতা করতে হয়, তো, সকাল সকাল না ঘুমোলে আমার পোষায় না। আমার ঘরটা দোতলার এক কোণে, এই বল্টুর ঘরের উল্টোদিকে, সিঁড়ির এপাশে। চেঁচামেচির শব্দে আমার ঘুম ভেঙে যায়, আমি উঠে বসি। তারপর শুনতে পাই, বনা বলছে, "হায় হায়, এখন কী হবে?" তার জবাবে শুনলাম বল্টু বলছে, "চিৎকার করো না বুদ্ধু মেয়েছেলে, পাড়াপড়শী সবাই এসে জড়ো হবে তাহলে।" এই শুনে আমি আমার ঘর থেকে বের হই, দেখি মামার ঘরের দরজায় বনা দাঁড়িয়ে, আর এই বল্টু মামার ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে। আমার খটকা লাগলো, আমি দৌড়ে গিয়ে ঘরে ঢুকে দেখি, ঘরে আলো জ্বলছে, মামা হাত পা কেৎরে বিছানার ওপর শুয়ে, মুখের ওপর সেই ময়লা বালিশটা গোঁজা। আমি বুঝলাম, একটা ঝামেলা করেছে বল্টু। আমি চিৎকার করে বসুনিয়াকে ডাকতে লাগলাম। তো, আমার চিৎকার শুনে বসুনিয়া দৌড়ে এলো বাইরে থেকে। সে এই ঘটনা দেখে হাউমাউ করে চেঁচিয়ে উঠলো। তখন বল্টু বললো, "রাখ রাখ, আর মরাকান্না কাঁদিসনি, খুন করে রেখে গেছিস, আবার চোখের জল ঝলসাচ্ছিস যে বড়! এই বজরঙ্গ, বালিশটা তুলে দেখ, কঞ্জুষ বুডঢার কী অবস্থা।" আমি বললাম, "তুই দেখ না, আমি ঐ ময়লা বালিশে হাত দিতে পারবো না।" আমার আবার, স্যার, একটু শুচিবাই আছে। তো, এই কথা শুনে বল্টু খুব লাফাতে লাগলো, বললো, "খুন করার সময় তো ঠিকই ধরেছিলি, আর এখন ধরতে মানা? ভন্ডামির আর জায়গা পাস না? পীর সাজতে চাস? আউলিয়া বনতে চাস? পেঁদিয়ে তোর পীরগিরি যদি না ছোটাই তো আমার নাম বল্টুই নয়!" তো, আমিও স্যার, লুঙ্গিটা মালকোঁচা মেরে তৈরি হয়েছি, শালাকে মাথার ওপর এক পাক ঘুরিয়ে একটা আছাড় মারবো, তখন বনা বললো, 'বল্টু, ভাইয়া, তোমরা যদি বেশি গ্যাঞ্জাম করো, দুজনকেই ঝাড়ু মেরে খেদিয়ে দেবো কিন্তু!" তো, আমরা এই কথা শুনে চুপ করে গেলাম। তখন বনা এগিয়ে গিয়ে মামার মুখ থেকে বালিশটা সরালো। দেখলাম, মামার মুখ পুরো নীল হয়ে আছে, মুখে ফেনা, চোখ বন্ধ। বসুনিয়া তখন "দুলাভাই গো" বলে কেঁদে উঠলো, আর এই বল্টু শালা বললো, "হে হে হে, এক্কেবারে সিনেমার মতো, ঠিক সিনেমার মতো!" তখন মামার হাত নড়ে উঠলো। তারপর মামা চোখ খুলে একটা হাত উঁচু করে কোনমতে বললেন, "ব --- ব --- ব --- ব ---।" তারপর তিনি ঢলে পড়ে গেলেন। এই সিন দেখে বনা গেলো ফিট হয়ে। --- এই তো, তারপর আমরা আপনাদের খবর দিলাম।'

'ইন্টারেস্টিং!' বলে উঠলেন ঝাকানাকা।

'খুবই।' মাথা দোলালেন কিংকু চৌধারি।

বল্টু লাফিয়ে উঠলেন। 'একগাদা মিথ্যে বলেছে এই বজরঙ্গ হারামীটা!' গলার রগ ফুলিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি। 'মোটেও আমি আব্বার ঘরে আগে ঢুকিনি! আমরা সবাই একসাথে আব্বাসাহেবের ঘরে ঢুকেছি! আর --- আর কখনো আমি আব্বাসাহেব সম্পর্কে এমন বাজে --- এমন বাজে উক্তি করিনি!'

'এহেহেহেহে!' ভেঙচে উঠলেন বসুনিয়া। 'উক্তি করিনি! উক্তি করিনি! --- উক্তি করিসনি মানে? দিনরাত দুলাভাইকে গাল দিয়ে বেড়াতিস, আবার এখানে সাধু সাজতে চাস!'

ঝাকানাকা একটা সম্ভাব্য মারামারিকে গলা টিপে মেরে ফেলেন। 'চোপ! বল্টু, বসে পড়ুন, নয়তো সোজা গারদে পুরে দেবো। আর বসুনিয়া, এবার আপনার পালা। বলুন, কী হয়েছিলো সে রাতে?'

বসুনিয়া অস্বস্তিতে শরীর মুচড়ে শুরু করেন, 'ইয়ে --- মানে, আমি থাকি বাইরের ঘরটাতে। এ বাসায় কোন দারোয়ান নেই, তাই আমাকেই অনেকটা চারদিকে ইয়ে --- মানে, মাঝে মাঝে রাতে চোখকান একটু খোলা রাখতে হয় আর কি। কিন্তু, সেদিন সন্ধ্যাবেলা আবার আমাকে আটা কিনতে বাজারে যেতে হয়েছিলো। আমরা আবার কয়েকমাসের আটা একবারে কিনে রাখি, তাতে দরে সস্তায় পড়ে তো! তাছাড়া এই বজরঙ্গ ছেলেটা, সত্যি বলতে কি, খায় একটু বেশি।' বজরঙ্গ একটু নড়েচড়ে বসে, কিন্তু কিছু বলে না। 'তো, সেই কয়েকমণ আটা বয়ে এনে বেজায় কাহিল লাগছিলো আমার। তার ওপর, রাতে বনা রান্না করেছিলো খিচুড়ি আর মাছ ভাজা। তো, আমার এমন ঘুম পাচ্ছিলো, বুঝলেন, একটু জলদি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ---।"

বল্টু লাফিয়ে ওঠেন, 'এই ব্যাটার কাজ হচ্ছে দারোয়ানগিরি করা, আর এই শালা রাতে জেগে থেকে হয় গাঁজা খায়, নয়তো আদপে জেগেই থাকে না, পড়ে পড়ে ঘুমোয়। ওর গাফিলতির জন্যেই এই বজরঙ্গ বদমাশটা মামাকে খুন করতে পেরেছে!'

বজরঙ্গ এবার তেড়ে যান বল্টুর দিকে। 'বটে? আর তুই খুব সাধু নাকি? তোরও তো হপ্তায় তিন দিন দরোয়ানের ডিউটি করতে হয়, তুই তখন কী করিস রে, য়া্যাঁ, শুনি? তুই তো তখন এই বসুনিয়ার কল্কেতে করেই গাঁজা টানিস, ব্যাটা নেশারু!'

বসুনিয়া চেঁচিয়ে ওঠেন, 'ডাঁহা মিথ্যে কথা, আমার কোন কল্কে নেই!'

ছাগলটা এবার সটান দাঁড়িয়ে গিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে, ম্যাঅ্যাঅ্যা!

ঝাকানাকা গর্জে ওঠেন, 'চোপ!' কল্কে না পেয়ে সবাই বসে পড়ে। ছাগলটাও।

'বসুনিয়া, বলে যান। এরপর যে কথার মাঝখানে কথা বলবে তাকে শরীরের নরম অংশে দু'ঘা বেত লাগানো হবে।' ফাঁকতালে বজ্রকন্ঠে বলে ওঠেন কিংকু চৌধারি। ঝাকানাকা আড়চোখে তাকান তাঁর দিকে।

বসুনিয়া বলতে থাকেন, 'আমি সেদিন ভরপেট খেয়ে একটু তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ একটা গোলমালে আমার ঘুম ভেঙে গেলো। আমি শুনলাম, ওপরে বজরঙ্গ আমাকে ডাকছে, "বসুনিয়া, জলদি আয়, খুন, খুন হয়েছে!" আমি তাড়াহুড়ো করে চাবি দিয়ে দরজা খুললাম, তারপর ভেতরে ঢুকে আবার চাবি দিয়ে দরজা বন্ধ করলাম। তারপর দৌড়ে ওপরে উঠে দেখি, দুলাভাইয়ের ঘরের ভেতরে সবাই ভিড় করে দাঁড়িয়ে, মামার ঘরে আলো জ্বলছে। আমি বুঝলাম, ডাল মে কুছ কালা হ্যায়। ভেতরে ঢুকে দেখি, দুলাভাই বিছানায় হাত পা ছড়িয়ে পড়ে আছে, মুখের ওপর একটা বালিশ চাপা দেয়া, আর বনা খুব কান্নাকাটি করছে। তখন, আমিও চিৎকার করে উঠলাম। তখন এই বল্টু শালা আমাকে ভ্যাঙাতে লাগলো, বললো, আমিই নাকি খুন করে রেখে গেছি, এখন বাঙলা সিনেমায় শাবাহানার মতো ন্যাকা সেজে নকল কান্নাকাটি করছি। তারপর বল্টু বজরঙ্গকে বললো বালিশটা তুলে দেখতে। বজরঙ্গ বললো, সে এসব ময়লা জিনিসে হাত লাগাতে পারবে না, তার নাকি তাহলে পরে চুলকানি হতে পারে। বল্টু তখন মুখ ভেঙচে বললো, "বটে? তাহলে খুন করার সময় কি দস্তানা লাগিয়ে ধরেছিলি নাকি? এক চড়ে মামাবাড়ি পাঠিয়ে দেবো, ব্যাটা বেলি্লক, মুখের ওপর কথা বলিস!" বজরঙ্গ তখন ধমক দিয়ে বললো, এটাই তার মামাবাড়ি। বল্টু তখন বললো, এই মামাবাড়ি নয়, সে বজরঙ্গকে জেলখানার মামাবাড়িতে পাঠিয়ে দেবে। বজরঙ্গ তখন হো হো করে হেসে উঠে বললো, "অশিক্ষিত কোথাকার, লোকে জেলখানাকে মামাবাড়ি বলে না, বলে শ্বশুরবাড়ি।" তখন বল্টু একটা ঘুষি পাকিয়ে খুব লম্ফঝম্ফ করতে লাগলো। তখন বনা দুজনকে ধমকে দিয়ে নিজেই গিয়ে বালিশটা তুললো। তুলতে দেখি, দুলাভাইয়ের মুখ নীল হয়ে আছে, মুখে ফেনা গড়াচ্ছে, চোখ উল্টে আছে। আমরা এটা দেখে আবারো হায় হায় করে উঠলাম, বল্টু খ্যাকখ্যাক করে হাসতে লাগলো, আর বজরঙ্গ বললো, "এহহে, কী অস্বাস্থ্যকর!" তখন দুলাভাই চোখ খুললেন, একটা হাত তুললেন, তারপর বল্টুকে দেখিয়ে চোখ পাকিয়ে বললেন, "ব --- ব --- ব --- ব ---!" তারপর তিনি মারা গেলেন। বল্টু তখন বললো, "মরে গেলো? গেলো তো? নাকি আবারও উঠবে?" বজরঙ্গ আর আমি দাঁড়িয়ে রইলাম, বল্টু এগিয়ে গিয়ে দুলাভাইয়ের পালস দেখলো, গালে চাপড় মারলো, শেষে বুকে কান পেতে শুনলো। তারপর বললো, "খতম!" বনা তখন চিৎকার দিয়ে মাটিতে পড়ে কাঁদতে লাগলো, তারপর মুখে গ্যাঁজলা তুলে ফিট হয়ে গেলো। ব্যস, তারপর আমরা ডাক্তার আর পুলিশে ফোন করলাম।'

বল্টু চোখ লাল করে কিছু একটা বলতে যাবেন, এমন সময় কিংকু চৌধারি বেতটা বের করে সবাইকে দেখালেন, সবাই চুপ করে গেলেন।

গোয়েন্দা ঝাকানাকা এবার এগিয়ে এসে বসলেন। তাঁর চোখ সরু, হাবভাব সুবিধের নয়। তিনি একটা বাঁকা হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে বললেন, 'বটে? দেখা যাক। সব কিছু চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেখা যাক।' এই বলে তিনি নিজেই একটা নোটবই খুলে পেন্সিল বাগিয়ে ধরেন। আর সেইসাথে তাঁর খেইল শুরু হয়।

'মৃত আওরঙ্গ আলম, তিনি ছিলেন বিপত্নীক, এবং অপুত্রক। নবীন পাঠকদের সুবিধার জন্যে সোজা বাংলায় বলছি, তাঁর স্ত্রী মারা গিয়েছিলেন, এবং কোন ছেলে জন্মায়নি। তিনি প্রচুর টাকা পয়সা এবং সম্পত্তি রেখে গেছেন, যাঁর অংশীদার, যথাক্রমে তাঁর কন্যা, জামাতা, ভাগ্নে আর শালা। এঁরা ছাড়া তাঁর নিকটাত্মীয় কেউ ছিলো না। এবং, এঁরা অনেকদিন ধরেই তাঁর সাথে বাস করছেন।' ঝাকানাকা পকেট থেকে একটা চকলেট বের করে মুখে পুরে দেন। অন্যান্য গল্পের গোয়েন্দাদের মতো পানতামাক খাবার বদভ্যেস তাঁর নেই। চকলেট খেতে খেতে আবারো বলতে থাকেন তিনি।

'কিন্তু, আওরঙ্গ আলম ছিলেন, যাকে বলে হাড়কেপ্পন, মাইজার টু দ্য কোর। এত টাকা থাকা সত্ত্বেও তিনি রিকশায় চড়তেন, গাড়ি কেনেননি। একটা বালিশ দিয়েই তিনি বছরের পর বছর কাটিয়ে দিয়েছেন। তিনি খবরের কাগজ পড়তেন বছরে তিনবার, নাপিতের দোকানে গিয়ে। তাঁর বাড়িতে কোন কাজের লোক নেই, বরং ঘরের লোককেই সেখানে কাজ করে খেতে হয়। তাঁর রাঁধুনীর দায়িত্ব পালন করতেন বনানী পারভিন, তাঁর বাজারু-কাম-দরোয়ানের দায়িত্ব পালন করতেন জিন্দাদিল জব্বলপুরী, তাঁর পিয়ন-কাম-বাটলারের দায়িত্ব পালন করতেন বজরঙ্গ বাহরাম, আর তাঁর দরোয়ান-কাম-বাজারু ছিলেন বিল্লাল বসুনিয়া। শুধু তাই না! এঁদের প্রত্যেককেই পালা করে গোটা বাড়ি ঝাঁট দিতে হতো, নিজেদের জামাকাপড় নিজেদের কাচতে হতো, নিজেদের বাসনকোসন নিজেদের মাজতে হতো। আর জামাকাপড়ের অবস্থাও তথৈবচ, কারণ গতকাল গোটা বাড়ি আমি তন্নতন্ন করে তল্লাশী করেছি, এই দেয়াল আলমারিটা বাদে, কারণ ওটা চাবি লাগানো। কিন্তু একেকজনের কপালে পুরনো কয়েকটা মোটে জামা ছাড়া আর কিছুই জুটতে দেখিনি। এ বাড়িতে সবাই তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে বিদু্যতের খরচ বাঁচানোর জন্যে। এ বাড়ির টেলিভিশনটা আদ্যিকালের মডেলের, তাতে সরকারি টেলিভিশন ছাড়া আর মাত্র দুতিনটে চ্যানেল ধরে, নাচগানওয়ালা কোন চ্যানেল তাতে দেখা সম্ভব নয়। আর ধরলেও লাভ হতো না, কারণ, আওরঙ্গ আলম স্যাটেলাইটের কানেকশন নেননি। এমনকি লোকে বাঁশের আগায় হাঁড়িপাতিল ফিট করেও তো দুয়েকটা চ্যানেল পাকড়াতে পারে, কিন্তু তিনি সে চেষ্টাও করেননি।' সবাই অধোবদনে বসে থাকে।

'এর মানে কী? এর মানে হচ্ছে, এ বাড়ির সদস্যরা, যারা হয়তো আধুনিক জীবন সম্পূর্ণভাবে উপভোগ করতে চান, তাঁরা বাধ্য ছিলেন কৃপণের মতো জীবন যাপন করতে। কিন্তু কে না চায়, বুয়ার হাতে রান্না খেতে, কাজের লোকের হাতে বাজার করাতে, দারোয়ানের হাতে গ্যাসপানিবিদু্যতের বিল পাঠাতে? কে না চায় হাল ফ্যাশানের জামাকাপড় পরে শপিং করতে, লেটেস্ট মডেলে গাড়িতে চড়ে দামী রেস্তোরাঁয় খেতে যেতে, সন্ধ্যেবেলা টিভি ছেড়ে ইদানীংকার নাচে গানে ভরপুর সিনেমাগুলো দেখতে? কাজেই, এই হাড়ভাঙ্গা হাড়কঞ্জুষ জীবন থেকে নিষ্কৃতি পেয়ে বিলাসব্যসনে জীবন কাটানোর একটি মাত্রই পথ খোলা ছিলো তাঁদের সামনে, সেটি হচ্ছে, আওরঙ্গ আলমকে তার জীবন থেকে নিষ্কৃতি দেয়া। অর্থাৎ, আমি বলতে চাইছি, এ ব্যাপারে তাঁদের প্রত্যেকেরই একটি জোরালো মোটিভ ছিলো। কাজেই, এঁদের মধ্যে যে কোন এক, বা একাধিক লোক এই খুন করে থাকতে পারেন। আপনাদের জোরালো কোন অ্যালিবাই নেই, কাজেই আমার চোখে এখানে সবাই খুনী। তবে, আমার ধারণা, খুনের ফলে সবাই উপকৃত হলেও, খুনটা করেছে একজন, বা দু'জন।' তবুও সবাই অধোবদনে বসে থাকে। 'এবার আসুন, আমরা আরো দূর অতীতকে যাচাই করে দেখি। প্রথমেই যিনি অনুপস্থিত, সেই বনানী পারভিনের ঘটনা। এ ঘটনা আমরা জানতে পেরেছি প্রতিবেশী মিসেস হাক্কানীর কাছ থেকে, যিনি মাঝে মাঝে এ বাড়িতে বেড়াতে আসতেন। গত পরশু দিন, সন্ধ্যে ঊনিশশো ঘন্টায়, আওরঙ্গ আলমের সাথে বনানীর তুমুল বচসা হয়। বনানী বলেন, সারাটা জীবন তিনি আওরঙ্গ আলম আর তাঁর একপাল জ্ঞাতিগোষ্ঠীর খেদমত করে আসছেন, রান্নাঘরেই তিনি গোটা জীবনটা কাটিয়ে দিয়ে গেলেন, নিজের জামা কেচে, নিজের বাসন মেজে, আর নিজের ঘর ঝাঁট দিতে দিতে তাঁর হাতে কড়া পড়ে গেছে। বদলে তিনি কী পাচ্ছেন? শান্তিমতো একটু বসে চা খেতে খেতে ইদানীংকার হিন্দি কুচুটে সিরিয়ালগুলোতে শাশুড়ি-বউয়ের ঝগড়ার আধুনিক কানুন সম্পর্কে যে একটু ওয়াকেবহাল হবেন, তারও তো উপায় নেই। সরকারি টিভিতে প্রধানমন্ত্রী আর তার তেলবাজ চ্যালাচামুন্ডাকে দেখে দেখে চোখ ব্যথা হয়ে গেলো। আর ঐ টিভিতে যেসব নাটকসিনেমা দেখায়, সেটা ভদ্রলোকের দেখার উপযোগী নয়। তাছাড়া ওতে শিক্ষণীয় কিছু নেই, যাবতীয় আধাশিক্ষিত লোকজন সেখানে উপস্থাপক-নাট্যকার-নির্দেশক। কাজেই অবিলম্বে বাড়িতে ডিশের সংযোগ দিতে হবে। এর জবাবে আওরঙ্গ আলম বলেন, তিনি যখন চুল কাটাতে যান, তখন নাপিতের দোকানে বসে খবরের কাগজ পড়ার সুযোগ হয় তাঁর। ওতে তিনি পড়েছেন, আকাশ সংস্কৃতি নামের একটা বাজে জিনিস নাকি এই ডিশের কল্যাণে দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। তাঁর মোটেও ভালো লাগেনি জিনিসটা। আর তাছাড়া, বসতে দিলেই লোকে শুতে চায়। এই ডিশের সংযোগ বাড়িতে এলে দুদিন পর বনানী পারভিন আবারো একটা বায়নাক্কা ধরবেন। ওসব তিনি বরদাশ্ত করবেন না। কাজেই যেমন ছিলো, তেমনই চলবে। তিনি বেঁচে থাকতে, আই রিপিট, তিনি বেঁচে থাকতে এ বাড়িতে ডিশের সংযোগ লাগবে না।' তিন ব্যক্তি একে অপরের দিকে তাকান। 'কি, খুব চমকে গেলেন? ভাবছেন, বনানী পারভিনই খুন করেছেন? দাঁড়াও পথিকবর! এবার জিন্দাদিল জব্বলপুরী, ওরফে বল্টু। গত পরশু সকালে আপনার সাথেও আওরঙ্গ আলমের এক চোট ঝগড়া হয়েছে। এর সাক্ষী বাজারে পানের দোকানদার মন্টু মিয়া, যাঁর দোকানে আপনি একজন নিয়মিত খরিদ্দার। কোন এক অজ্ঞাত কারণে সেদিন আওরঙ্গ আলম স্বয়ং আপনার সাথে বাজারে গিয়েছিলেন, উদ্দেশ্য, জিনিসপত্রের সত্যিকার দাম যাচাই করা। সম্ভবত, তিনি টের পেয়েছিলেন, যে আপনি মাঝে মাঝেই বাজারের জন্যে বরাদ্দ টাকাপয়সা থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা আত্মসাৎ করেন। সেদিন বাজারে ঘুরে ঘুরে আলু, পেঁয়াজ, সব্জি, মুরগী, গরু, খাসি, মাছ, মশলা ও ফলের দরদাম করে তিনি অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হন, এবং আপনাকে ছোটলোক, বাটপার বলে গালাগালি করেন। সবই আপনি সহ্য করে যান। এরপর পানের দোকানদার মন্টু মিয়ার দোকানের সামনে দিয়ে যাবার সময় সে হঠাৎ আপনাকে ডেকে বলে, "ভাইজান, আজকে পান খাবেন না?" অমনি আওরঙ্গ আলম তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন, এবং মন্টু মিয়াকে উপর্যুপরি জেরা করে জানতে পারেন, আপনি মন্টুর বহু বছরের পুরনো কাস্টোমার। এতে তিনি আরো ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন, আপনাকে শাপশাপান্ত করতে থাকেন, এবং হুমকি দেন, ভবিষ্যতে আর তিনি আপনাকে বাজার করতে পাঠাবেন না, এ দায়িত্ব হস্তান্তর করবেন বজরঙ্গ বাহরামের ওপর, অথবা, তিনি নিজেই রোজ বাজার করতে বেরোবেন। এবং এরপর তিনি আরো গজগজ করতে থাকেন, আপনি যে এভাবে বাজারের পয়সা মেরে পানতামাক খেয়ে খেয়ে মোটা হয়েছেন, সেটা তিনি মোটেও বুঝতে পারেননি, তিনি ভেবেছিলেন আপনি মোটা বংশের ছেলে, কিন্তু এখন তিনি বুঝতে পারছেন, আপনাদের বংশ ঠিক কী পদ্ধতিতে মোটা হয়েছে। মন্টুর সাক্ষ্য অনুযায়ী, আপনিও এতে খুব ক্রুদ্ধ হন, এবং বলেন, "আব্বাসাহেব, বংশ তুলে কথা বলা ঠিক নয়! আমরা জব্বলপুর থেকে আগত জমিদার বংশের লোক, আমার পূর্বপুরুষ হাঁসের মাংস আর যবের রুটি খেয়ে খেয়ে তাগড়াই হয়েছিলেন!" তখন নাকি আওরঙ্গ আলম দাঁত খিঁচিয়ে বলেছিলেন, "বটে? তা ঐ হাঁস আর যব কি ক্ষেত থেকে ধরে আনা, নাকি বাজারের পয়সা মেরে কেনা?" এর উত্তরে আপনি কিছু বলেন না, মাথা চুলকাতে থাকেন। তখন আওরঙ্গ সাহেব বলেন, জীবন থাকতে তিনি আর আপনার মতো একটা গাঁটকাটাকে বাজারে পাঠাবেন না, তাঁর অনেক শিক্ষা হয়েছে। আপনাকে তিনি আর বুকে বসে দাড়ি ওপড়ানোর সুযোগ দেবেন না, এই মর্মে ঘোষণা দিয়ে তিনি মন্টুর দোকান ত্যাগ করেন। মন্টু তখন আপনাকে বিড়বিড় করে অকথ্য গালাগালি করতে শুনেছে, এবং আপনি নাকি বলেছিলেন, "দাঁড়া বুডঢা, আজকেই তোর হালুয়া টাইট করে ছাড়বো!" এরপর আপনারা দুজন রিকশায় করে বাড়ি ফিরে যান।'

বল্টু ভীষণই উত্তেজিত হয়ে বলেন, 'মোটেও না, আব্বাসাহেব আমাকে ভীষণই স্নেহ করতেন, তিনি নিজেই আমাকে লুকিয়ে পয়সা দিতেন পান খাওয়ার জন্যে, আর আমি মোটেই ওসব গালাগালি করিনি! এই মন্টু হারামজাদা মিছে কথা বলেছে!'

ঝাকানাকা মৃদু হাসেন। তারপর চোখ পাকিয়ে কড়া গলায় বলেন, 'বটে? আহ্লাদের আর জায়গা পাও না? তুমি বাদে সবাই খালি মিছে কথা বলে, আর তুমি বড়পীর আবদুল কাদের জিলানী, খালি সত্য কথা কপচাও, অ্যাঁ? একদম চুপ করে বসে থাকো। ট্যাঁফোঁ করলেই বেত।' কিংকু চৌধারি বেতটা উঁচিয়ে দেখান সবাইকে। বল্টু চুপ করে বসে পড়েন, তাঁর মুখ চুন।

এরপর বজরঙ্গ বাহরামের দিকে ফেরেন তিনি। 'এইবার, আপনার পালা, জনাব বজরঙ্গ বাহরাম। গত পরশুদিন সকালে আপনার সাথেও আওরঙ্গ আলমের মতবিভেদ হয়েছে। এর সাক্ষী পাশের বাড়ির হাক্কানী সাহেব। তিনিও আপনার মতো ব্যায়ামবাগীশ লোক, আপনার মতো তাঁরও কিঞ্চিৎ স্বাস্থ্যবাতিক রয়েছে, তিনিও আপনার মতো রোজ ছাদে উঠে ব্যায়াম করেন। নাকি? হ্যাঁ। তার কথা মতো, পরশুদিন ভোরে, যখন আপনি ব্যায়াম করছিলেন, তখন আওরঙ্গ আলম ছাদে উঠে আসেন। এসে আপনাকে কষে বকাবকি করতে থাকেন। তিনি বলেন, রোজ ভোরে এরকম ধুপধাপ করা চলবে না। ওরকম মোষের মত গতর নিয়ে ছাদের ওপর দাপিয়ে বেড়ালে মানুষের ঘুমের দস্তুরমতো ব্যাঘাত হয়, এটা কি আপনি বোঝেন না? আর এত জায়গা ফেলে ছাদে উঠে কেন ব্যায়াম করতে হবে আপনাকে? নাকি ছাদে উঠে ব্যায়াম করা নয়, বরং পাশের বাড়ির কতিপয় তরুণীকিশোরীর সাথে টাঙ্কি মারাই আপনার উদ্দেশ্য? হাক্কানী সাহেবের একটি তরুণী কন্যা মাঝে মাঝে ভোরে ছাদে ফুলগাছে পানি দিতে আসে, কাজেই আওরঙ্গ সাহেবের সন্দেহ হয়তো অমূলক নয়। তখন আপনি ব্যায়াম থামিয়ে মাথা চুলকে বলেন, আপনাকে কোন একটা জিমনেসিয়াম কি ব্যায়াম ক্লাবে ভর্তি করিয়ে দিতে, অথবা কিছু ব্যায়ামের যন্ত্রপাতি কিনে দিতে, যাতে আপনি হয় বাড়ি থেকে দূরে, অথবা ঘরে বসে নিঃশব্দে ব্যায়াম করতে পারেন। তখন আওরঙ্গ আলম জানতে চান, টাকা কি আদৌ গাছে ধরে কি না। যদি ধরে থাকে, তাহলে ওরকম একটা গাছ তিনি শিগগীরই আনাবেন, কারণ সেই গাছের গোড়ায় যোগানোর মতো গোবর সারের অভাব মাশাআল্লা আপনার মাথায় নেই। আপনার এই মোষের মতন গতরের পেছনে এমনিতেই নাকি তাঁর মাসে মোটা অঙ্কের টাকা গচ্চা যায়, আপনার খোরাকির টাকায় নাকি এক ডজন লোক পোষা যায়, আর আপনি কোন সাহসে এর পরও তাঁর কাছে টাকা চাইতে সাহস করেন। তখন আপনি চড়া গলায় বলেন, আপনার মামা আপনাকে যে হারে খাটিয়ে মারেন, যেভাবে আপনাকে পায়ে হেঁটে এখানে ওখানে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়, এবং মাঝে মাঝে যেভাবে পাওনাদারদের ওপর গুন্ডামি করতে হয়, তাতে করে চামচিকের মতো গতর পোষা আপনার পোষায় না। মোষের মতো কাজ করতে হলে তো গতরটাও সেই অনুপাতে, নূ্যনতম মোষের মতোই হওয়া চাই। শুয়ে বসে থেকে আর কব্জি শুকনো রেখে খাওয়দাওয়া করে তো তা হওয়ার নয়। কাজেই এমন হারে ব্যায়াম আর ভোজন আপনাকে চালিয়ে যেতেই হবে। আর ছাদের ওপরটাই আপাতত আপনার ব্যায়ামের জন্যে প্রশস্ত স্থান, সেখানে পর্যাপ্ত পরিমাণে আলোহাওয়া আসে। তখন আওরঙ্গ সাহেব বলেন, তিনি বেঁচে থাকতে এই ছাদের ওপর ব্যায়ামের নামে অত্যাচার চলতে দেবেন না। আপনি বেশি বাড়াবাড়ি করলে তিনি আপনার খোরাকি কমিয়ে দেবেন, বিশেষ করে ছোলার পেছনে যে খামাখা পয়সাটা বেরিয়ে যায়, সেটা নাকি তিনি আটকে দেবেন। তখন আপনি ক্ষেপে গিয়ে বলেন, পালোয়ানদের দুধঘিকাবাব খেতে হয়, আর আপনি খান সামান্য ছোলা, তাতেও আওরঙ্গ সাহেবের গা জ্বলে কেন? তখন আওরঙ্গ সাহেব আপনাকে বলেন, বেশি বাড়াবাড়ি করলে তিনি আপনাকে জুতিয়ে আঞ্জুমানে মফিদুলের গোডাউনে পাঠিয়ে দেবেন। তখন আপনি নাকি বাইসেপ বাগিয়ে শাসান, আপনার মামা নাকি সাপের পাঁচ পা আর ঘুঘু দুটোই দেখেছেন, কিন্তু ফাঁদ দেখেননি। আপনি তাঁকে উৎপাত করতে নিষেধ করেন, এবং আরো হুমকি দেন, আপনি সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে ঘিয়ের বোয়াম কাত করতে জানেন। তখন আওরঙ্গ সাহেব কোন কথা না বলে গটগটিয়ে নিচে নেমে যান।'

বজরঙ্গ মাথা নেড়ে বলেন, 'মামা আমাকে দুদিন পরপরই এমন করে শাসাতেন। প্রায়ই ছোলামটর বন্ধ করে দেবার ভয় দেখাতেন, আর আমিও মেজাজ গরম করতাম। এটা এমন কিছু নয়।'

বল্টু আবারো তড়াক করে দাঁড়িয়ে যান। 'এমন কিছু নয়? ব্যাটা মর্কট, রোজ ভোরে ধুপধাপ করে কাঁচা ঘুম ভাঙিয়ে দিস, আবার বলিস এমন কিছু নয়? তোর জ্বালায় আমরা বছরের পর বছর ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠছি! আব্বাসাহেবের উচিত ছিলো চাবকে তোকে ছাদ থেকে ছুঁড়ে ফেলা!'

বজরঙ্গ কিছু বলেন না, শুধু রক্তচক্ষু মেলে তাকিয়ে থাকেন বল্টুর দিকে। কিংকু চৌধারিও অনুরূপ রক্তিম দৃষ্টিতে বেতটা বল্টু জব্বলপুরীর নাকের সামনে থেকে ঘুরিয়ে আনেন।

ঝাকানাকা এবার বসুনিয়ার দিকে তাকান। 'আর আপনি, জনাব বসুনিয়া, আপনিও একজন ঘুঘু। আপনার নামে অভিযোগ গুরুতর। এর সাক্ষী উল্টোদিকের বাড়ির দারোয়ান খেলাত মিয়া। আপনাকে নাকি সেদিন দুপুরে আওরঙ্গ সাহেব পাড়া মাথায় তুলে ধমকাধমকি করেছেন, শাসিয়েছেন বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেবেন বলে। তিনি আপনাকে গ্যাস, পানি আর বিদু্যতের বিল দেয়ার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু আপনি গত পাঁচমাস ধরে বিল দেননি, বরং ব্যাঙ্কের সীল এবং সইসাবুদ জাল করে সেই টাকা গাপ করেছেন, খুব সম্ভবত গাঁজার বাজেট যোগানোর জন্যে। তখন তিতাস-ওয়াসা-ডেসা সব জায়গা থেকে লোক এসেছিলো যথাক্রমে গ্যাসপানিবিদু্যতের লাইন কেটে দিতে, তাদের নিরস্ত করতে আওরঙ্গ সাহেবকে রীতিমতো পয়সা খরচ করতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, গত পাঁচ মাসের বিলও পরিশোধ করতে হয়েছে নতুন করে। এ ছাড়াও, আপনার দুলাভাইয়ের ধারণা, আপনি রাতে ঠিকমতো পাহারা দেন না, বরং নেশা করে ঘুম দেন, তিনি নিজে তার আগের দিন রাতে আপনার নাক ডাকার শব্দ শুনেছেন। তখন আপনি বলেছিলেন, তাতে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়েছে, দরোয়ান বলে কি আপনি মানুষ নন? আপনার কি সাধআহ্লাদ নেই? তখন আওরঙ্গ সাহেব গর্জন করে বলেছেন, "শালা ছোটলোক, তুই যদি এই পাঁচমাসের বিল কড়ায়গন্ডায় চুকিয়ে না দিস আমাকে, তোর নামে আমি মামলা করবো, তোকে জেলের রুটি খাইয়ে ছাড়বো। তোর ঘরে যে গাঁজার পেটি রাখা আছে, জানি আমি।' তখন আপনি নাকি বলেছেন, "বেশি তেড়িবেড়ি করবেন না দুলাভাই, দিনকাল খারাপ, রাতকাল আরো খারাপ!" তখন আপনার দুলাভাই বলেন যে তিনি আগামীকাল ভোরেই পুলিশ দিয়ে আপনাকে হটিয়ে দেবেন বাড়ি থেকে।'

বসুনিয়া ঢোঁক গিলে বলেন, 'কিন্তু আমি তো পরে দুলাভাইয়ের কাছে মাফ চেয়েছি, উনি বলেছিলেন, আমি ছোট মানুষ, তাই এবারের মতো আমাকে মাফ করে দিয়েছেন, ভবিষ্যতে যাতে এমন আর না করি!'

বল্টু মুখ ভেঙচে বলেন, 'মাফ চেয়েছিস তুই? তোর মতো একটা ইতর, যে কি না সারাটা জীবন গুন্ডামি করে বেরিয়েছে, তোর ভয়ে আব্বাসাহেব রাতে ঠিকমতো ঘুমাতেও পারতেন না, আর তুই চাইবি মাফ?'

বসুনিয়া গর্জে ওঠেন, 'আর তুই? তুই আমাকে ব্ল্যাকমেইল করে আমার ঘরে বসে আমারই কল্কেতে করে গাঁজা খাস, আর সেই তুই-ই তো দুলাভাইয়ের কাছে গিয়ে চুকলি কেটেছিস, ব্যাটা জাত ছোটলোক!'

বল্টু চেঁচিয়ে ওঠেন, 'খবরদার, জাত তুলে কথা বলবি না, জানিস, আমরা জব্বলপুরের জমিদার বংশের লোক, তোর মতো লোক আমাদের জুতো পাহারা দিতো ---।'

বসুনিয়াও চিল চিৎকার দেন, 'কারণ জুতো ছাড়া আর কিছু তোদের জুটতো না পরার জন্যে, চোট্টা কাঁহিকা!'

বজরঙ্গ নাক সিঁটকে বললেন, 'বসুনিয়া, তুই না একটু আগে বললি, তোর কোন কল্কে নেই?'

ছাগলটা ম্যা করে ডেকে ওঠে।

ঝাকানাকা বেতটা হাতে তুলে নেন, সবাই চুপ করে যায়।

গোয়েন্দাপ্রবর এবার একটা ক্রুর হাসি দিয়ে বলেন, 'বেশ বেশ, অনেক কিছু জানতে পারলাম আমরা। বনানী পারভিনের জবানবন্দি নিলে আরো অনেক কিছু জানতে পারবো আমরা, আশা করা যায়। এবার গোটা চিত্রটা খুঁটিয়ে দেখি আমরা। আওরঙ্গ আলম মারা গেছেন, এবং যে রাতে মারা গেলেন, তাঁর আগের দিনই আপনাদের চারজনের সঙ্গে তাঁর ঝগড়া, বলা যায়, সিরিয়াস ঝগড়া হয়েছে। এবং চারটি ক্ষেত্রেই তিনি এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন, যাতে আপনারা প্রত্যেকেই তাঁকে তড়িঘড়ি করে খুন করার জন্যে উৎসাহিত হতে পারেন। তাঁকে চটজলদি মেরে ফেললে বনানী পারভিন ডিশের সংযোগ দিতে পারবেন, বল্টু সাহেব বাজারের দায়িত্বে বহাল থাকতে পারবেন, বজরঙ্গ সাহেব ছোলামটর খেয়ে ছাদে ব্যায়াম চালিয়ে যেতে পারবেন, এবং বসুনিয়াও এই বাড়িতে বহাল থেকে গাঁজা খেতে পারবেন। তাই না?' তিন ব্যক্তি এ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। 'কাজেই, আপনাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যিনি আওরঙ্গ আলমের মৃতু্যতে উপকৃত হননি, উপকারের কিসিম যতই বিদঘুটে হোক না কেন।' ঝাকানাকা ঠা ঠা করে হাসেন। 'এবার তবে চলুন, আপনাদের গপ্পো অনুযায়ী ঘটনাটা যাচাই করে দেখা যাক।' সবাই নড়েচড়ে বসেন, ছাগলটা ডান কাতে শুয়ে ছিলো, সে বাম কাতে শোয় এবার।

'বল্টু!' হাঁক ছেড়ে বলেন ঝাকানাকা। 'আপনার কথামতো, সেদিন রাতে নিচে একটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ হয, তারপর সিঁড়িতে খুটখাট শব্দ হয়, তারপর আওরঙ্গ আলমের ঘরে ধস্তাধস্তির শব্দ হয়, তারপর আবার সিঁড়িতে খুটখাট শব্দ, এবং সবশেষে আবার ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ হয়। তাই তো?'

বল্টু জব্বলপুরী মাথা নাড়েন।

'আপনার সাক্ষ্য থেকে ধরে নেয়া যেতে পারে, কেউ একজন নিচ থেকে ওপরে উঠে এসেছিলো, তারপর আওরঙ্গ আলমকে মুখে বালিশ চেপে ধরে খুন করেছিলো, তারপর আবার নিচে নেমে গিয়েছিলো। তাই না?' বল্টু আবারো মাথা নাড়েন। 'তাহলে, আপনার ভাষ্য অনুযায়ী, খুনী নিচে নেমে যাবার পর আপনি এবং বনানী পারভিন নিহত আওরঙ্গের ঘরে যান।' 'হ্যাঁ।' জোর দিয়ে বলেন বল্টু। 'এবং আপনাদের চিৎকার শুনে দোতলার ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন বজরঙ্গ বাহরাম?' 'হ্যাঁ।' 'তাহলে বজরঙ্গ বাহরাম তো খুন করতে পারেন না, তাই না?'

বল্টু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে ঢোঁক গিলে এদিক ওদিক তাকিয়ে বলেন, 'কেন, পারে না কেন?'

'কারণ আপনার কথামতো খুনী নিচে নেমে গেছে, আর বজরঙ্গ বের হয়েছেন দোতলার ঘর থেকে। তিনি খুন করলে নিচে গেলো কে, আর তিনি নিচে গেলে দোতলার ঘর থেকে বেরোলেন কী করে?'

বল্টু নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন, 'এটা একটা কথা? ওই ব্যাটা এক ছুটে নিচে নেমে গিয়ে, আবার পা টিপে টিপে দোতলায় নিজের ঘরে ঢুকে গিয়েছিলো। অথবা রেলিং ধরে দোল খেয়েও ওপরে উঠে যেতে পারে। ওর পক্ষে সবই সম্ভব।'

'সেটা তিনি কেন করবেন?'

'আমাদের ধোঁকা দেয়ার জন্যে।' এবার বল্টুর মুখে হাসি ফোটে। 'তাছাড়া ওর স্বাস্থ্যটা দেখুন না। আব্বাসাহেবের মতো লোককে মুখে বালিশ চেপে খুন করার মতো তাগদ ওর আছে!'

এবার বজরঙ্গ মুখ খোলেন, 'সেটা তো তোদের দুজনেরও আছে। তুই আর বনা মিলে যে কাজটা করিসনি তার কী প্রমাণ আছে রে ব্যাটা নির্বংশের পো?'

বল্টু তেড়েফুঁড়ে ওঠেন, 'খবরদার, বংশ তুলে কথা বলবি না! আমার খুন করার কী দায় পড়েছে রে? আমি জামাই মানুষ, নিতান্ত আপনজন। তুই ব্যাটা ভুঁইফোঁড় ভাগ্নে, ভাগ নেয়ার তালে ফোকটে বছরের পর বছর খেয়ে চলছিস, যেই আব্বাসাহেব খেদিয়ে দেয়ার হুমকি দিয়েছেন, অমনি খুন করে বসেছিস!'

'থামুন, থামুন!' ঝাকানাকা হেঁকে ওঠেন। 'উঁহু বল্টু, আপনার থিয়োরি বড্ড ঝামেলা করছে। খুনখারাবা করার পর অত দড়াবাজি করা কি পোষায়, বলুন? আর বজরঙ্গের যা মোষের মত গতর, সিঁড়ির রেলিং ধরে দোল খেতে চাইলে গোটা রেলিং ধ্বসে পড়তে পারে। বল্টু, আপনার কথা সত্যি হলে বজরঙ্গকে সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দিতে হবে।'

'ইয়াহু!' হাততালি দিয়ে ওঠেন বজরঙ্গ। 'উঁহু, অত খুশি হবার কিছু নেই, জনাব বজরঙ্গ। কারণ, বল্টু যে সত্যি কথা বলছেন, তার কোন প্রমাণ নেই। যাই হোক, বল্টুর কথামতো, চিৎকার করার পর নিচ থেকে ছুটে আসেন বসুনিয়া। কাজেই, তাঁকে আমরা খুনী হিসেবে সন্দেহ করতে পারি।'

বসুনিয়া চেঁচিয়ে ওঠেন, 'এটা একটা কথা হলো? আমি নিচে থাকি, এটাই আমার পাপ?'

'উঁহু, বসুনিয়া, চেঁচাবেন না, চেঁচালেই পাছায় বেতের বাড়ি পড়বে, বলে দিচ্ছি! --- আপনি নিচ থেকে ছুটে এসেছেন, কথা সত্য। আরেকটা সত্যি কথা হচ্ছে, আপনি গদাম করে দরজাটা খুলে, তারপরে ভেতরে ঢোকেন। আপনাদের বাহিরের দরজা আমি পরীক্ষা করে দেখেছি, সেটা খোলার সময় কোন ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ হয় না, বরং কুকুরের হাই তোলার মতো একটা আওয়াজ হয়। আর দরজা বন্ধ করলে যে শব্দটা হয়, সেটা ঠিক গদাম নয়, বরং ধড়াম! যাই হোক, যেই লাউ সেই কদু, কাজেই এই ক্যাঁচক্যাঁচ আর গদামই আপনাকে বাঁচিয়ে দিচ্ছে, কারণ আপনি যদি বাইরে থেকে ভেতরে ঢুকতেন, তাহলে শুরুতেই একটা কুকুরের হাই শোনা যেতো, তারপর বেরিয়ে যাবার সময় একটা গদাম শোনা যেতো। সেটা যখন শোনা যায়নি, তখন আপনি সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ।'

বসুনিয়া দুহাতে কল্কে ধরার ভঙ্গি করে বললেন, 'হক মাওলা!'

'উঁহু, বসুনিয়া, অত নাচবেন না। কে জানে, বল্টু হয়তো গোড়া থেকেই মিছে কথা বলে চলছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আপনাদের দুজনকে বাদ দিলে থাকেন কে কে? বল্টু আর বনানী। আবার, বজরঙ্গ বল্টুকে ঘরের ভেতর থেকে বেরোতে দেখেছেন। সেক্ষেত্রে কান চেপে ধরতে হচ্ছে মিস্টার অ্যান্ড মিসেস বল্টুর।'

বল্টু প্রতিবাদের জন্যে মুখ খোলেন, ঝাকানাকা বেত নিয়ে তেড়ে যান তার দিকে।

এমন সময় ঘরের দরজায় টোকা পড়ে। কিংকু চৌধারি হাঁক পাড়েন, 'কে ওখানে?'

বাহির থেকে উত্তর আসে, 'হাসপাতাল থেকে এসেছি, মিসেস পারভিনকে নিয়ে।'

কিংকু চৌধারি এগিয়ে গিয়ে দরজা খোলেন। সাদা পোশাক পরা দুই অ্যাটেন্ড্যান্ট বনানী পারভিনকে নিয়ে বাড়িতে ঢোকেন, পেছনে ভারপ্রাপ্ত পুলিশের ডাক্তার জনাব মুশকিল আহসান।

'এনার স্বামী কে?' কড়া গলায় প্রশ্ন করেন ডাক্তার।

'আমি।' উঠে দাঁড়ান বল্টু।

'নিন, এই রসিদে সই করুন, এই যে লেখা আছে, আমি রোগীকে সুস্থ অবস্থায় আমার হেফাজতে বুঝিয়া পাইলাম।' একটা রসিদ এগিয়ে দেন ডাক্তার। বল্টু কলম হাতে ইতস্তত করতে থাকেন, তারপর বলেন, 'ও এত জলদি সুস্থ হয়ে গেলো, ডাক্তার সাহেব? আরো মাসখানেক হাসপাতালে থাকলে কি আরো সুস্থ হতো না?'

ডাক্তার মুশকিল কড়া চোখে আপাদমস্তক দেখেন বল্টুকে। তারপর বলেন, 'না, একেবারেই চলতো না। আর উনি একদম ফিট, খামাকা হাসপাতালের সিট দখল করে পড়ে থাকবেন কেন? আর শুনুন জনাব, আপনার স্ত্রী জ্বালিয়ে একশা করে মেরেছে আমাদের। হাসপাতালের টেলিভিশনের সামনে দিনরাত হাঁ করে পড়ে থাকতেন, বস্তাপঁচা হিন্দি কিছু সিরিয়াল দেখায় কী একটা চ্যানেলে, সেগুলো গিলতেন বসে বসে। ইংল্যান্ড আর সাউথ আফ্রিকার ওয়ানডে ম্যাচ ছিলো একটা, ওনার জ্বালায় কেউ খেলা দেখতে পারেনি!'

বনানী পারভিন কাংস্যবিনিন্দিত গলায় বলেন, 'কী হলো বল্টু, হাঁ করে তাকিয়ে আছো কেন? পটাপট একটা সই করে এই বাজে লোকটাকে বিদায় করো না!'

বল্টু একটা সই দেন। ডাক্তার সাহেব তাঁর অনুচরদের নিয়ে বিদায় হন।

ঝাকানাকা মোচে তা দেন। 'বসুন, মিসেস বল্টু। এখানে পরিস্থিতি গুরুতর। যতদূর মনে হয়, খুনটা আপনি আর বল্টু সাহেব মিলেই করেছেন।'

বনানী পারভিন কষে একটা ধমক দেন, 'চোপ! ফালতু কথা বলার জায়গা পান না? ঝাড়ু মেরে খেদিয়ে দেবো বাসা থেকে!' এদিক ওদিক তাকিয়ে ঝাড়ু খোঁজেন তিনি। 'একটা দিন আমি বাড়িতে নেই, কী বিশ্রী হাল হয়েছে ঘরদোরের। একগাদা আবর্জনা জমেছে, আর এসে জুটেছে কিছু ফালতু লোকজন ---!'

ঝাকানাকা নিরাপদ দূরত্বে সরে গিয়ে বললেন, 'দেখুন, ভায়োলেন্স আমি মোটেও পছন্দ করি না। ভালোয় ভালোয় যদি তদন্তে সহযোগিতা না করেন, তাহলে কিন্তু কোমরে দড়ি বেঁধে থানায় নিয়ে যাওয়া হবে।'

বনানী উজ্জ্বল মুখে বললেন, 'থানায় টিভি আছে?' ঝাকানাকা মাথা নাড়েন। 'জ্বি না ম্যাডাম। ওখানে ছারপোকা আর অপরাধী ছাড়া কিছু নেই। কাজেই দয়া করে বলুন, কে খুন করেছিলো আওরঙ্গ সাহেবকে, আপনি, বল্টু নাকি আপনারা দুজনেই?'

বনানী চটে গিয়ে বলেন, 'আপনারা আমাদের নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করছেন কেন? বাবাকে খুন করেছে ওনার এক পাওনাদার!'

সবাই এবার চুপ হয়ে যায়। 'বলেন কী?' হতভম্ব ঝাকানাকা কোনমতে বলেন।

'হ্যাঁ। এক মাস ধরে হুমকি চিঠি পাঠাচ্ছিলো লোকটা, পাওনা টাকা শোধ না করলে নাকি সে বাবাকে খুন করবে। তো, এমন অনেক পাওনাদারই হুমকিটুমকি দিতো বাবাকে, বাবা পাত্তা দিতো না। সেদিন সন্ধ্যাবেলা লোকটা বাসায় ফোন করেছিলো, আমিই ফোন ধরেছিলাম। লোকটা আমাকে বললো, যেহেতু টাকা শোধ করা হয় নি, কাজেই আমার বাবার হায়াত নাকি শেষ, শিগগীরই পটল তুলবেন তিনি। আমি বললাম যে বাবার মতো কঞ্জুষ দুনিয়াতে দুটো নেই, কাজেই তিনি যেন এই টাকার আশা বাদ দেন। তখন লোকটা বললো, টাকার আশা সে বাদ দিয়েছে এর মধ্যেই, কিন্তু আমরাও যাতে বাবার বাঁচার আশা বাদ দেই, আজ রাতেই নাকি সে একটা হেস্তনেস্ত করে ছাড়বে। বললো, বদরু খাঁ-র টাকা মেরে বেঁচে থাকবে, এমন বান্দা নেই দুনিয়াতে ---।'

'কী নাম বললেন?' গর্জে উঠলেন ঝাকানাকা।

'বদরু খাঁ।' একটু অবাক হয়ে বলেন বনানী।

উত্তেজনায় লাফিয়ে ওঠেন কিংকু চৌধারি।

'আলবাত!' দাঁতে দাঁত পিষলেন ঝাকানাকা। 'বদরু খাঁ ছাড়া আর কে-ই বা হতে পারে? সেই পিশাচ খুনে, যে খুন করতে দ্বিধা করে না, যে রাত বারোটা ছাড়া কখনো খুন করে না, যে ছদ্মবেশে আমার মতোই পাকা, যাকে আমি এখনো পর্যন্ত গ্রেপ্তার করতে পারিনি, যে আমার প্রতিটি গল্পে হাজির হয়ে আমার তদন্তের বারোটা বাজায়, সেই বদরু খাঁ ছাড়া আর কে-ই বা করতে পারে এই খুন? এই বল্টু-বজরঙ্গ-বসুনিয়া তো বদরুর কাছে নস্যি! আর তার নামও তো, যাকে বলে গিয়ে, ব দিয়ে শুরু! য়্যাঁ? তার মানে, বদরু খাঁ-ই খুনটা করেছে, আর তার নামই বলতে চাচ্ছিলেন হতভাগা আওরঙ্গ আলম, কিন্তু ব-এর বেশি এগোতে পারেন নি!' সবাই হাঁপ ছেড়ে বাঁচে, বিশেষ করে বল্টু। 'মিসেস বল্টু ---।' থেমে পড়তে বাধ্য হন ঝাকানাকা।

'আমার নাম বনানী, খবরদার মিসেস বল্টু বলবেন না!' বনানী গর্জে ওঠেন।

'আচ্ছা, নিশ্চয়ই, মিসেস বনানী। সেই হুমকি চিঠিগুলো কোথায় রেখেছেন? নাকি ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছেন?'

'বাবা ছিঁড়ে ফেলতে চেয়েছিলো, কিন্তু আমি দিইনি, জমিয়ে রেখেছি।'

'কেন জমিয়ে রেখেছেন?' ঝাকানাকা ভুরু কুঁচকে বলেন।

'ভেবেছিলাম কাগজওয়ালার কাছে বেচে দেবো, লোকটা যা লম্বাচওড়া চিঠি লিখতো, সব মিলিয়ে কয়েক কেজি কাগজ জমেছিলো ---।'

'ঠিক আছে, কোথায় রেখেছেন সেটা, নিয়ে আসুন।' ঝাকানাকা পায়চারি করতে থাকেন।

'এই যে, নিচতালার দেয়াল আলমারিতে।' বনানী এগিয়ে যান। আঁচলে বাঁধা চাবি দিয়ে দেয়াল আলমারিটা খুলতেই একটা চেনা শব্দ ঘরে ছড়িয়ে পড়ে, ক্যাঁচক্যাঁচ ক্যাঁচক্যাঁচ!

ঝাকানাকা ঝট করে ফেরেন। তারপর ছুটে যান দেয়াল আলমারির দিকে। কঞ্জুষদের আলমারি যেমনটা হয়, প্রায় ফাঁকা। সেখানে অনায়াসে একজন মানুষ লুকিয়ে থাকতে পারে।

'তার মানে, এই আলমারিতেই লুকিয়ে ছিলো বদরু খাঁ!' চেঁচিয়ে ওঠেন ঝাকানাকা। 'এখান থেকে বেরিয়েই সে আওরঙ্গ সাহেবকে খুন করে, তারপর আবার এখানে এসে ঢোকে!'

কিংকু চৌধারি মোলায়েম ভাবে কাশেন। 'কিন্তু, তাহলে আলমারিটা তো খোলা থাকার কথা, এটা বন্ধ ছিলো কেন?' হক কথা।

ঝাকানাকা চিন্তিত হয়ে পড়েন।

কিংকু চৌধারি সমাধান যুগিয়ে দেন, 'অবশ্য, এই সামান্য তালা বদরু খাঁ-র কাছে কোন সমস্যাই নয়! যে লোক জর্দানের বাদশার ব্যক্তিগত গুদাম থেকে উট চুরি করতে পারে, তার কাছে এসব তালা তো বাম হাতের কড়ে আঙুলের মামলা!'

হক কথা। ঝাকানাকার মুখে হাসি ফোটে।

'তাহলে ভাইসব, আসুন দুয়ে দুয়ে চার মেলাই।' উদাত্ত গলায় বলেন ঝাকানাকা, আর বলবেন না-ই বা কেন, রহস্যের জট যখন খুলে গেছে। 'কোন এক ফাঁকে আপনাদের বাড়িতে এসে ঢোকে বদরু খাঁ। সেটা তার জন্যে কোন সমস্যাই নয়, বিশেষ করে, দরোয়ানের দায়িত্বে যখন একজন গাঁজাখোর বহাল থাকেন। সে এসে এই দেয়াল আলমারির মধ্যে লুকিয়ে থাকে। তারপর বারোটা বাজতেই সে বেরিয়ে পড়ে --- কেন না রাত বারোটা না বাজলে এই খুনজখমের কাজটা তার ঠিকমতো আসে না --- যথাক্রমে ক্যাঁচক্যাঁচ এবং খটখট শব্দ করে ওপরে উঠে গিয়ে আওরঙ্গ আলমকে তুমুল ধস্তাধস্তির পর বালিশ চেপে খুন করে, তারপর আবার, যথাক্রমে খটখট ও ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে এসে ঢোকে এই আলমারির ভেতরে। কিন্তু তাঁর খুনের মধ্যে গলদ ছিলো, যেমনটা থাকে প্রত্যেক খুনে, আওরঙ্গ আলম পুরোপুরি মরেননি। মুখের ওপর থেকে বালিশ তুলতেই তিনি আবার জ্যান্ত হয়ে ওঠেন, তাঁর আততায়ীর নাম বলার চেষ্টা করেন, তারপর মারা যান। এখন যেহেতু মিসেস বল্টু --- ইয়ে, মিসেস বনানীর জবানবন্দি আমরা অনেক দেরিতে পেয়েছি, তাই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে আমাদের একটু দেরি হয়েছে। আর, যেহেতু আপনাদের সবার নামই ব দিয়ে শুরু, কেন কে জানে, তাই স্বাভাবিকভাবেই আপনাদের ওপর সন্দেহ এসে পড়ে। তাছাড়া, আপনারা ছাড়া তো এই বাড়িতে আর কেউ থাকারও কথা নয়, তাই আপনাদের একটু জ্বালাতন করতে হলো। কিছু মনে করবেন না। --- যাই হোক, এখন আমাদের কর্তব্য বদরু খাঁকে গ্রেপ্তার করা! সে কোন জাহান্নামে পালিয়ে গেছে কে জানে?'

কিংকু চৌধারি কাশেন। 'না স্যার, সেটা সম্ভব নয়। আমার লোক এখানে আসার পর থেকেই গোটা বাড়ি কর্ডন করে রেখেছে।'

ঝাকানাকা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসেন। 'কী যে বলেন চৌধারি সাহেব! আপনার লোকগুলো সব জরদ্গব। বদরু খাঁকে জানেন না আপনি? সে কোন ফাঁকে কী ছদ্মবেশে বেরিয়ে গেছে, আপনার লোক বুঝবে কিভাবে?'

কিংকু চৌধারি তবুও আপত্তির চেষ্টা করেন, কিন্তু ঝাকানাকা তাঁকে থামিয়ে দেন। 'বের হবার জন্যে অনেক সময় পেয়েছে সে। সবাই যখন ওপরে হাউকাউ করছিলো, তখনই সে আলমারি ছেড়ে বেরিয়ে এসে সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে।'

বসুনিয়া বলেন, 'কিন্তু, আমি তো দরজায় তালা মেরে এসেছিলাম।'

ঝাকানাকা বলেন, 'আরে, শুনলেন না, সামান্য একটা তালা তার জন্যে কোন সমস্যাই নয়। যে লোক জিম্বাবুয়ের প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত গুদাম থেকে হাতি চুরি করতে পারে, তার কাছে তো এসব তালা নস্যি ---।'

বসুনিয়া তবুও আপত্তি তুলতে চান, বলেন, 'কিন্তু স্যার, লৌহজং কোম্পানির তালা, খুব মজবুত ---।'

ঝাকানাকা ভ্রুকুটি করেন, বসুনিয়া চুপ করে যান।

'যাই হোক,' বলেন ঝাকানাকা, 'আপনারা চিন্তা করবেন না, তাকে আমরা ঠিক পাকড়াও করবো।'

সবাই একটা আনন্দের ধ্বনি তোলে, আর তুলবে না-ই বা কেন, এখন থেকে বনানী ডিশের সংযোগ নিতে পারবেন, বল্টু জব্বলপুরী বাজারের পয়সা ইচ্ছেমতো চুরি করতে পারবেন, বজরঙ্গ ছাদে ইচ্ছেমতো ব্যায়াম করতে পারবেন, বসুনিয়াও নিজের ঘরে বসে গাঁজা খেতে পারবেন। সবার সুদিন। ছাগলটাও একটা আনন্দসূচক ম্যা বোল তোলে।

অমনি বনানী পারভিন ঘোরেন সেটার দিকে।

'এ কি? আপনার তো সাহস কম নয়?' ঝাকানাকার দিকে তর্জনী তুলে গর্জন করে ওঠেন তিনি। 'ছাগল নিয়ে ঢুকেছেন আমার বাড়িতে? --- ইশ, বড়ি ছেড়ে আর হিসি করে ড্রয়িংরূমটাকে নোঙরা করে ছেড়েছে জানোয়ারটা!'

এতক্ষণে ঝাকানাকার চোখ পড়ে ছাগলটার দিকে, তিনি বিস্মিত হয়ে কিংকু চৌধারির দিকে ফেরেন। 'ও কি, কিংকু সাহেব? ছাগল নিয়ে তদন্ত শুরু করলেন কবে থেকে? আমি তো জানতাম, পুলিশ কুকুর নিয়ে তদন্তে আসে?' বল্টু দাঁত বের করে আসেন।

'আরে এখন তো ছাগলেরই যুগ চলছে ভাই, কুকুরের তো খুবই দুর্দিন যাচ্ছে। লোকে হোটেলে ছাগলের মাংস না চালিয়ে কুকুরের মাংস চালিয়ে দিচ্ছে, আর ঐ ছাগলগুলো সব পুলিশে চাকরি পেয়ে যাচ্ছে, হে হে।'

কিংকু চৌধারি চটে গিয়ে বলেন, 'আশ্চর্য! আমি ছাগল নিয়ে ইন্সপেকশনে আসবো কেন? আমি তো সেই রাত থেকেই দেখছি, এই ছাগলটা আপনাদের বৈঠকখানায় ঘুরঘুর করছে। একবার তো প্রায় বেরিয়েই যাচ্ছিলো, আমার এক কনস্টেবল দেখতে পেয়ে আবার তাড়া করে ধরে নিয়ে এসেছে, বললো যে আপনাদের কুলখানির ছাগল ---।'

'কুলখানি? ছাগল কেটে কুলখানি?' বল্টু হে হে করে হাসে। 'আব্বাসাহেবের টাকাপয়সা সব ব্যাঙ্কে, উকিল এসে বলেছে, সম্পত্তি নিয়ে মিটমাট হতে দেরি হবে। আমাদের হয় চিঁড়াবাতাসা, নয়তো গুড়মুড়ি দিয়ে কুলখানি করতে হবে।'

'তাহলে ছাগল কেনার পয়সা পেলেন কোথায়?' চটে উঠলেন ঝাকানাকা।

'কী আশ্চর্য!' চেঁচিয়ে উঠলেন বনানী। 'বলছি এটা আমাদের ছাগল নয়! কখনো শুনেছেন, ছাগল কেউ ঘরের ভেতরে পোষে?'

'রাখে বৈকি!' মিটিমিটি হাসে বল্টু। 'আমাদের ঘরে যেমন একটা পেল্লায় সাইজের ছাগলকে ছোলামটর খাইয়ে বছরের পর বছর ধরে পোষা হচ্ছে!'

বজরঙ্গ হাতা গোটান। বসুনিয়া বলেন, 'এত প্যাচালের কী দরকার? ছাগল যখন একটা হাতের নাগালে চলেই এসেছে, এটাকেই কেটেকুটে গুড়মুড়ির সাথে চালিয়ে দেয়া যেতে পারে।'

ছাগলটা মেঝে থেকে সটান দাঁড়িয়ে যায়।

'থামুন!' বজ্রকন্ঠে বলেন ঝাকানাকা। 'ওটা আপনাদের ছাগল নয়, পুলিশের ছাগলও নয়, আর, অবশ্যই আমার ছাগল নয়, তাহলে সেদিন রাত থেকে এটা এখানে আছে কিভাবে?'

সবাই থেমে যায়।

ঝাকানাকা তীক্ষ্ম চোখে তাকান ছাগলটার দিকে।

ছাগলটাও পাল্টা তার দিকে তাকিয়ে থাকে, সেই তীক্ষ্ম চোখ করেই।

ঝাকানাকা হঠাৎ বলেন, 'এই ছাগলটার থুতনিতে দাড়ি আছে।'

কিংকু চৌধারি মাথা নাড়েন, 'আছে।'

'বদরু খাঁ-রও থুতনিতে দাড়ি আছে।' ফিসফিস করে বলেন ঝাকানাকা।

সবাই চমকে ওঠে।

ঝাকানাকা ছাগলটার দিকে এক পা এগিয়ে যান। ছাগলটা দু'পা পিছিয়ে যায়। ঝাকানাকা আরো এগোন, ছাগলটা পায়ে পায়ে পিছিয়ে যেতে থাকে। তারপর ঝাকানাকা একটা হুঙ্কার ছেড়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন ছাগলটার ওপরে। আর ছাগলটাও হঠাৎ করে তেড়ে আসে ঝাকানাকার দিকে। একটা হুটোপুটি বেঁধে যায়।

অচিরেই ঘটে এক অশৈলী কান্ড, পিচকিনি সেই ছাগলের খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসে ইয়া তাগড়া সাড়ে ছয়ফুট লম্বা এক ভীমরূপী লোক, তার থুতনিতে ছাগুলে দাড়ি, চোখ দুটো জ্বলছে ভাটার মতো। অভিজ্ঞ পাঠকেরা, নিশ্চয়ই বুঝে ফেলেছেন, এ আর কেউ নয়, সেই আলোচ্য খুনী দসু্য, বদরু খাঁ!

দাঁতে দাঁত পিষে বদরু খাঁ বলে, 'অনেকক্ষণ ধরে তোর এই ছাগলামি সহ্য করেছি, ঝাকানাকা! সবকিছুরই একটা সীমা আছে! আর সহ্য করবো না। আজ তোর একদিন কি আমার একদিন!'

উত্তরে ঝাকানাকা বিপজ্জনক মুদ্রায় মোচে তা দেন। 'বটে? সারাটা ঘর পাঁঠার গন্ধে ম' ম' করছে, বড়ি ছেড়ে আর হিসি করে জায়গাটা নর্দমার চেয়ে ময়লা করে ফেলেছিস, আর ছাগলামির দোষ চাপাচ্ছিস আমার ঘাড়ে? দেখা যাক আজ কার ঘাড়ে ক'টা মাথা!'

দুজন চক্রাকারে ঘুরতে থাকেন ঘরের মধ্যে। বনানী পারভিন একটা বিকট চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন আগেই, এবার বল্টু বজরঙ্গ বাহরামের পেছনে আত্মগোপনের চেষ্টা করতে থাকেন, বজরঙ্গ বাহরাম সটান শুয়ে পড়ে বড়বড় শ্বাস নিতে থাকেন, বোধহয় শবাসন বা এমনি কোন আসন, আর বিল্লাল বসুনিয়া কপাল চাপড়ে হায় আফসোস করতে থাকেন, এমন নধর একটা ছাগল হাতছাড়া হয়ে যাবার দুঃখে। আর কিংকু চৌধারি লাফিয়ে সোফার পেছনে গিয়ে দাঁড়ান, আর উত্তেজনার বশে পিস্তলের বদলে বেতটা বাগিয়ে 'হ্যান্ডস আপ, হ্যান্ডস আপ' বলে চেঁচাতে থাকেন।

বদরু খাঁ হিসিয়ে ওঠে, 'ওরকম কলুর বলদের মতো পাক খাচ্ছিস কেন? সাহস থাকে তো আয় না কাছে! আজ তোকে পেঁদিয়ে বৃন্দাবন দেখিয়ে দেবো, ব্যাটা রামছাগল!'

ঝাকানাকা পাল্টা খেঁকিয়ে ওঠেন, 'মুখ্যু পাঁঠা, জানিস না, এটা মারামারির একটা কায়দা? আর তোর সাহস থাকে তো তুই আয় না কাছে!'

কিন্তু বদরু খাঁ দূরত্ব বজায় রেখে পাক খেতে থাকে, ভুলেও কাছে আসে না, কারণ সে জানে, ঝাকানাকার মারপিটকুশল দাঙ্গাপরায়ণ ভাঙচুরপ্রবণ মারাত্মক হাতপায়ের নাগালে আসাটা বোকামি। আর ঝাকানাকাও তফাতে থেকে পাক খেয়ে চলেন, কারণ তিনিও জানেন, বদরু খাঁয়ের গায়ে গন্ডারের মতো জোর।

কিন্তু অচিরেই বদরু খাঁ হুঙ্কার ছেড়ে সামনে লাফিয়ে পড়ে, আর ঝাকানাকাও ডিগবাজি খেয়ে বদরুর ঘাড়ের ওপর বর্ষিত হন। ঘোর মারামারি চলতে থাকে দুজনের মধ্যে। ঝাকানাকা প্রথমে জাপানে শেখা কায়দায় বদরুর কানের ওপর একটা কিল বসিয়ে দেন, বার্মার জঙ্গলে গেরিলাদের কাছে শেখা কৌশলে বদরুর গালে একটা খামচি দেন, সবশেষে মঙ্গোলিয়ার মরুভূমিতে তদন্তের কাজে গিয়ে তাতার যাযাবরদের কাছে শেখা রীতিতে কষে একটা চড় মারেন বদরু খাঁর ছয়ফুট উঁচুতে অবস্থিত গাল দুটোয়। ওদিকে বদরু খাঁও দুনিয়ার অনেক দেশে গুন্ডামি করতে গিয়েছে, প্যাঁচ পয়জার সে-ও কিছু কম শেখে নি। গুয়াতেমালার বিদ্রোহীদের স্টাইলে সে ঝাকানাকার পাঁজরে কষে একটা কনুই বসিয়ে দেয়, মরোক্কোর তুয়ারেগদের কায়দায় ঝাকানাকার পিঠে একটা কিল বসায়, আর গুলিস্তানের মোড়ে এক অন্ধ ভিক্ষুকের কাছে শেখা বিশ্রী সব দেশী গালাগালি দিতে থাকে সমানে।

কিন্তু বদরু খাঁ টের পায়, গায়ে তার যতোই জোর থাকুক না কেন, কৌশলে সে ঝাকানাকার কাছে নস্যি। সে আরো টের পায়, বার্মার জঙ্গলের গেরিলাগুলোর কায়দা গুয়াতেমালার বিদ্রোহীদের চেয়ে ভালো, আর মঙ্গোলিয়ার যাযাবররাও এ ব্যাপারে মরক্কোর তুয়ারেগদের চেয়ে অনেক বেশি কামেল, আর সর্বোপরি, যেসব গালি সে গুলিস্তানের কানা ফকিরটার কাছে শিখেছে, সেগুলোও ঝাকানাকার ওপর কোন আছর ফেলতে পারছে না। তাই হঠাৎ কী একটা নামনাজানা বিদেশি প্যাঁচ কষে বদরু খাঁ আমাদের গল্পের নায়ককে ছুঁড়ে ফেলে দূরে, তারপর ছুটে গিয়ে জানালার ওপর লাফিয়ে পড়ে। ঝনঝন করে ভেঙে পড়ে সেটা, চোখের পলকে সে বাইরে অদৃশ্য হয়ে যায়। তার টিকিটিও আর দেখা যায় না, আর দেখা যাবেই বা কিভাবে, বলুন, তার মাথায় আদৌ টিকিই নেই!

ঝাকানাকা মেঝে থেকে উঠে দাঁড়িয়ে টলতে টলতে সেদিকে ছুটে যান। কিন্তু জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পান না। ঝাকানাকা পিঠের কাছটা ডলতে ডলতে বলেন, 'দাঁড়া ব্যাটা, আসছে গল্পে তোকে যদি সেই তিব্বতী উষ্টাটা না মারি, তবে আমার নাম ঝাকানাকাই নয়!'



২.

নবীন পাঠক ভাইসব, আপনারা নিশ্চয়ই বুঝে ফেলেছেন, দুর্ধর্ষ গোয়েন্দা ঝাকানাকা এই দুর্ধর্ষ দসু্য বদরু খাঁ-কে এত সহজে ছেড়ে দেবেন না, তিনি বদলা নিয়েই ছাড়বেন, আর সেই প্রতিশ্রুত তিব্বতী উষ্টা, যেটি তিনি দালাই লামার সাক্ষাৎ সহচরের কাছ থেকে কয়েক বছর আগে --- দেখে নয়, ঠেকে --- শিখেছিলেন, সেটিও প্রয়োগ করবেন।

কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, বদরুর খাঁর খোঁজ পেতে হলে ভবিষ্যতে কোন এক রাত বারোটায় আরেকটা খুন হতে হবে, নইলে তার হদিস পাওয়া বড় শক্ত। কাজেই, ভাইসব, অপেক্ষা করুন, শিগগীরই আলোছায়া প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে নিঝুম পুরীর লেখা গোয়েন্দা ঝাকানাকা সিরিজের খুনজখমে ভরপুর পরবর্তী বই, "বদমাশ বদরু খাঁ বনাম গোয়েন্দা ঝাকানাকা"।

.
.
.


গোয়েন্দা ঝাকানাকা! | Promote Your Page Too

.
.
.
[]

3 comments:

  1. apnar golpo niye natok banate chai... jodi onumoti diten.. please mail me at mahmudur.rahman@chhayabani.com

    ReplyDelete

রয়েসয়েব্লগে মন্তব্য রেখে যাবার জন্যে ধন্যবাদ। আপনার মন্তব্য মডারেশন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে যাবে। এর পীড়া আপনার সাথে আমিও ভাগ করে নিলাম।